www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

নেলসন ম্যান্ডেলা


জন্ম এবং বাল্যকালঃ
নেলসন রলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা ১৯১৮ সালের ১৮ ই জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার একটা ছোট গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। গ্রামের নাম এম্ভেয। দেশের এই দিকটায় সাধারনত থেম্বু জনগন বাস করে। তাঁর বাবার নাম ছিল চিফ গাডলা ম্যান্ডেলা। তিনি ছিলেন থেম্বু সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন গুরুত্তপূর্ণ বাক্তি এবং  গ্রাম্য প্রধান। ম্যান্ডেলা যখন খুব ছোট তখন তাঁর বাবার চাকরী চলে যায় কারন তিনি তাদের এলাকায় যে শেতাঙ্গ প্রধান ছিলেন তার সাথে সব সময় একমত পোষণ করতেন না। যখন  ম্যাডেলার ৭ বছর বয়স ম্যানডেলার মা ম্যান্ডেলা কে নিয়ে অন্য গ্রামে চলে যায়, নাম কুনু। ম্যান্ডেলা স্কুলে যাওয়া শুরু করে। যখন তাঁর বয়স ১০ তাঁর পিতা মারা যান। ম্যান্ডেলা এর মা তাকে নিয়ে আবার এমহেকেয ওয়েনি নামক একটা গ্রামে  যায়, এটা হল থেম্বু সম্প্রদায়ের রাজার বাড়ি। রাজা চিফ জঙ্গিন্টাবা চাচ্ছিলেন  ম্যান্ডেলা তাঁর কাছে থেকে পড়ালেখা করুক। এখানে ম্যান্ডেলা এর নতুন জীবন শুরু হল। ম্যান্ডেলা কে এমখিকেয ওয়েনি থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে একটা স্কুল এ ভর্তি করা হল। স্কুল এর সব ছাত্র ছাত্রী কালো, কিন্তু স্কুল প্রধান ছিলেন শেতাঙ্গ।
কিশোর থেকে যুবকঃ
যখন তাঁর বয়স ২১ তখন তিনি  ফরট হেয়ার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হোন। এখানেই তিনি তার বন্ধু অলিভার টাম্বর সাথে মিলিত হোন। মাঝে মাঝে ম্যান্ডেলা আর তার বন্ধু সানডে তে কোন রেস্টুরেন্ট  এ খাবার খেতে গেলে তাদের কে মেইন ডাইনিং রুম এ বসতে  দিতনা কারন তারা কালো। এবং তখন থেকেই তিনি অনুধাবন করেন যে দেশের সব জনগন কালো হলে ও ক্ষমতায় শেতাঙ্গ জনগন। কালো লোকদের স্কুলে যাওয়ার কোন সুযোগ ছিলনা,সব ধরনের চাকরীর সু্যোগ  ও তাদের ছিলনা, এমন কি তারা দেশের সব জায়গায় অবাধভাবে চলাচল করতে পারতনা। দক্ষিন আফ্রিকার শেতাঙ্গ সরকার তাদেরকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সবকিছু থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল।তাদের কোন ভোটের অধিকার ছিলনা।  ইউনিভারসিটির সবাই তাকে লিডার হিসাবে দেখত। হোস্টেলের খাবারের মান  ভাল ছিল না, তাই সবাই ম্যান্ডেলা কে  ধরল কর্তৃপক্ষকে জানাতে, ম্যান্ডেলা কর্তৃপক্ষকে বুঝালেন এবং বললেন খাবারের মান পরিবর্তন করতে, এর ফলে কর্তৃপক্ষ রেগে গিয়ে তাকে ইউনিভারসিটি থেকে বের করে দিলেন।
                                                               
জোহানসবার্গের জীবন, এ এন সি তে যোগদানঃ
এর পর ১৯৪২ সালে ম্যান্ডেলা জোহানসবার্গে চলে আসেন, এখানে এসে তিনি উইট ওয়াটার ইউনিভারসিটিতে আইনে ভরতি হন। মান্ডেলা আফ্রিকান ন্যাশনাল  কংগ্রেস এ যোগ দেন আইন পড়ার  সময়ে। তিনি সব সময়ই চিন্তা করতেন কিভাবে এর পরিবর্তন করা যায়, কিভাবে সম অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়? বন্ধুদের সাথে এ নিয়ে সব সময় আলোচনা করতেন।  
১৯৪৮ সালে ক্ষমতায় আসে “ দি ন্যাশনাল পার্টি” । এর লিডার ছিলেন ড্যানিয়েল মালান। এই সরকারের আমলে কালোদের জন্য জীবন আরো কঠিন হয়ে পড়ে ।  দি ন্যাশনাল পার্টির সরকার দেশের জনগণকে চার ভাগে ভাগ করে ফেলেনঃ
১। শেতাঙ্গ ( আফ্রিকানারস এবং যারা ইংরেজীতে কথা বলে)
২। কালো ( দেশের ৭৫% জনগন ছিল কালো)
৩। এশিয়ান ( বেশীর ভাগই ইন্ডিয়া থেকে আগত)
৪। মিক্সড জনগন
দি ন্যাশনাল পার্টি প্রতিটা গ্রুপ এর জন্য অনেক আলাদা আলাদা আইন তৈরী করল, একসাথে এই সব  আইন কে বলা হয় এপারট হিড। এর মানে হচ্ছে “সবার থেকে আলাদা রাখা”। এই এপারট হিড  এর ভেতরে ছিল নিম্নরুপঃ
১। দেশের যে কোন জায়গায় কালোরা ভোট দিতে পারবেনা।
২। কোন শেতাঙ্গ এবং কালো  মানুষ বিয়ে করতে পারবেনা।
৩। যদি কোন কালো বাক্তি শেতাঙ্গ পরিচিত এলাকায় / শহর/ ফার্মে কাজ করতে চায় তাহলে তাকে কাগজ দেখাতে হবে।
৪। শেতাঙ্গ এবং কালোদের পৃথক হাস্পাতাল, স্কুল, এবং বাস। তারা এক টয়লেট ও ব্যবহার করতে পারবেনা। দেশের অনেক জায়গায় যেমন বিচ, পার্ক, লাইব্রেরিতে সাইন বোর্ডে লেখা থাকত “ ফর হোয়াইটস অনলি” ।
কেঊ  যদি এই আইন ভঙ্গ করে তাহলে তার শাস্তি ছিল খুবই কঠিন। প্রতি বছরই সরকার নতুন নতুন আইন পাশ করত,যার বেশীর ভাগ সুবিধাই ছিল শেতাঙ্গদের জন্য, কালোদের একপেশে করে রাখা হত।
বিদ্রোহ সূচনাঃ  
১৯৫০ সালে ম্যান্ডেলা  “এ এন সির” একজন গুরুত্বপূর্ণ  লিডার হলেন।১৯৫২ তিনি ম্যান্ডেলা আইন পাশ করলেন এবং তিনি এবং তার বন্ধু টাম্ব মিলে ব্ল্যাক জনগনের জন্য আইন বাবসা খুললেন। কিন্তু সরকার কোনমতেই  কালোদের কোন সুবিধা দিচ্ছিল না। তাই “এ এন সি” নতুন প্লান বের করল। তারা সব নন হোয়াইট দের বুঝাতে লাগল তোমরা “হোয়াইট অনলি” জায়গায় যাবে, অনেক লোক এগিয়ে এল তাদের আহবানে, তারা যেতে শুরু করল হোয়াইট টয়লেট, রেস্টুরান্ট, । ৬ মাসে প্রায় ৮০০০ জনগণকে  পুলিশ গ্রেফতার করল। এদের মধে ম্যান্ডেলা ও ছিলেন।ম্যান্ডেলা কোর্ট এ গেলেন কিন্তু তাকে জেলে পাঠানো হলনা কারন তার প্রটেস্ট  ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু সরকার তাকে চিনে ফেলল এবং তার উপর নজরদারি করতে লাগলো।  ম্যান্ডেলা দেশের কোথাও ভিসিট করতে পারবেনা এমনকি সে তার শহর থেকে ও  বের হতে পারবে না। এবং সরকার এ ও বলে দিল যে তুমি এ এন সির সঙ্গে আর কাজ করতে পারবেনা।
কিন্তু ম্যান্ডেলা থেমে ছিল না। তাঁর সাহায্য  নিয়েই এ এন সি সব রাজনৈতিক গ্রুপ কে চিঠি দেয় সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গরে তোলার জন্য। এর ফলাফল সরূপ সব রাজনইতিক দল মিলে একটা নতুন গ্রুপ তৈরী করল নাম দিল  “কংগ্রেস এলায়েন্স” । সব গ্রুপ একসাথে মিলে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গরে তুলল। , কিন্তু সরকার কারো কথাই শুনছিল  না। ১৯৬০ সালে জোহানসবার্গ এর কাছে শার্প ভাইল রাস্তায় একটা প্রটেস্ট হয় পুলিশ গুলি  করে ৬৯ লোক মেরে ফেলে।এবং  এতে প্রায় ২০০ লোক মারাত্তক আহত হয়। সারা বিসস এর নিন্দা করলে ও দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার কোন গুরুত্ত  ও দিলনা। রানী এলিজাবেথ এই নিয়ে কথা বললে দক্ষিন আফ্রিকা কমনোয়েলথ ছেড়ে চলে যায়। পুলিশ ম্যান্ডেলা কে গ্রেফতার করে এবং তথায়।৫ মাসের জন্য জেলে পাঠায়। ম্যান্ডেলা যখন বের হয়ে আসেন তখন তিনি চিন্তা করেন শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রতিরোধ কাজে দিচ্ছে না। চিন্তা  করতে লাগলেন  কিভাবে সরকারকে আঘাত করা যায়। তিনি এবং তার বন্ধু ওয়ালটার  সিস্লু একটা নতুন গ্রুপ এ যোগদান করেন নাম আমকন্ট, এটা এ এন সির  একটা অংশ। এই গ্রুপ প্লান করল যে তারা সরকারের কোন গুরুত্তপুরন কোন অফিস বা এই জাতীয় কিছু ধ্বংস করে দেবে। তাদের উদ্দেশ্য  ছিল জিনিস ধ্বংস করা কোন মানুষ না। ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে তারা প্রথম বোমা  ফেলে সরকারী অফিস এ। ম্যান্ডেলা তখন আমকন্ট এর লিডার।  সরকার তাকে যাতে ধরতে না পারে সেই জন্য এক জায়গা  থেকে আর এক জায়গায়   এক দেশ থকে আর এক দেশে  পালিয়ে বেড়াতে  লাগলেন।  তিনি শুধু দক্ষিন আফ্রিকার সমস্যা সম্পর্কে জনগণকে বুঝাতে চাচ্ছিলেন  এবং সারা পৃথিবীর  সব বড় বড় নেতাদের সাপোর্ট চাচ্ছিলেন।  ১৯৬২ সালে যখন তিনি দেশে ফেরেন, পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। নভেম্বারের ৭ তারিখে ম্যান্ডেলা কোর্ট এ উঠে এবং তাকে ৫ বছরের জন্য জেলে পাঠানো হয়।
রবেন আইল্যান্ড (অন্ধকারের  জীবন) ঃ  
প্রথমে তিনি পিরিটরিয়া জেলে ছিলেন। কয়েক  মাস পরেই তাকে রবেন আইল্যান্ড জেলে নিয়ে যায়। এই আইল্যান্ড টা ৩.৩ কিলোমিটার লম্বা মাঝখানে ৭ কিলোমিটার সাগর, আর ওপারে কেপ টাউন। ১৬০০ সাল থেকেই ইউরোপিয়ানরা এই আইল্যান্ড কে জেল হিসাবে ব্যবহার করে আসছে। সাধারনত তাদেরই এই জেলে রাখা হত যারা ইউরোপিয়ানদের বিরুদ্ধে কথা বলত। ১৯৫০ সালে সরকার বিদ্রোহীদের এখানে পাঠায়। আসামীরা আইল্যান্ড থেকে কেপ টাঊন শহর দেখতে পেত, কিন্তু সাগরের ঠাণ্ডা পানিতে কেউ সাঁতার দিয়ে ওপাশে যেতে পারতনা ।  
৫ বছরের মধ্যে ৯ মাস জেলে কাটানোর পর ম্যান্ডেলা এর জন্য একটা খারাপ সংবাদ আসে। দক্ষিন আফ্রিকার পুলিশের কাছে  নতুন ইনফরমেশন আছে যে তারা এ, এন সির  রিভনিয়া ফার্ম এ দেখতে পেয়েছে যে ১৯৬১ সালে সরকারের বিরুদ্ধে যে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছিল  তা ম্যান্ডেলা, ওয়াল্টার সিস্লু এবং এ, এন স্যার অন্যান্য নেতাদের দারা ঘটেছিল। ম্যান্ডেলা কে আবার কোর্ট এ উঠানো হয় এবং বিচারে কোর্ট নেলসন ম্যান্ডেলা কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। । ম্যান্ডেলা কে আবার রবেন আইল্যান্ড জেলে পাঠানো হয়।  
আসামীদের জন্য রবেন আইল্যান্ড এর জীবন খুবই কঠিন। তাদেরকে প্রতিদিন সকাল ৫.৩০ এ উঠতে হত, তারপর তাদের কাজ করতে হুত,বেশীর ভাগ কাজই ছিল পাথর ভাঙ্গা এবং পাথর বহনের কাজ।মাঝে দুপুরের খাবারের জন্য একটু বিরতি, তারপর ৪.০০ পর্যন্ত এই কাজ করতে হত। রাতের খাবার খেতে দিত ৪.৩০ এ, যার পরিমান খুবই কম। সধার দিকে তারা সাগরের ঠাণ্ডা পানিতে গসল করত। ম্যান্ডেলা যেটাকে  “তাঁর অন্ধকারের জীবন”  বলে আখ্যায়িত করেছেন।
                                             
১৯৮০ সালে এ, এন সির নেতারা আবারো সরকারি অফিসে বোমা ফেলে। এই সময়  শেতাঙ্গরা ও সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করে। ম্যান্ডেলা বন্ধু অলিভার টাম্ব  এখন এ এন সির একজন বড় নেতা। তিনি ইংল্যান্ড এ বাস করেন। তিনি ম্যান্ডেলা এর মুক্তির জন্য বিভিন্ন দেশের মানুষ এবং সরকার প্রধানের সাথে আলোচনা করতে লাগলেন। ১৯৮০ সালে ইউনাইটেড ন্যাশান ও বলা শুরু করল ম্যান্ডেলা কে জেল থেকে মুক্ত করে দেওয়া হোক। এই সময় সারা পৃথিবীর মানুষ  ম্যান্ডেলা র মুক্তির জন্য দক্ষিন আফ্রিকার সরকারের ওপর  চাপ দিতে থাকে।
ম্যান্ডেলা জেলে বসেই যতটুকু পারত খবর সংগ্রহ করতেন। ১৯৮২ সালের মার্চ মাস, গার্ড এসে ম্যান্ডেলা কে বললেন তোমার ব্যাগ গুছিয়ে নাও, ১৮ বছর পর ম্যান্ডেলা কে রবেন আইল্যান্ড জেল থেকে অন্য একটা জেল কেপ টাউন এর  পোলস্মুর পিরিজন  এ নিয়ে যাচ্ছে। এই জেলখানার জীবন মোটামুটি ভাল। এখানে ঘুমাবার জন্য বেড, বাথরুম, রেডিও এবং লাইব্রেরী আছে। এখানে আপন জনের সাথে দেখা করতে দুজনের মাঝখানে কোন কাচের গ্লাস ছিলনা। ২১ বছর পর ম্যান্ডেলা তার ওয়াইফ এর হাত টা ধরতে পারলেন । ১৯৮৫ সালের শুরুতে দক্ষিন আফ্রিকার সরকার পি ডাব্লিউ বোথা ম্যান্ডেলা কে মুক্ত করে দিতে চাইলেন একটা সাইন এর মাধ্যমে যে সে বাইরে গিয়ে আর আন্দোলন  করতে পারবেনা। ম্যান্ডেলা বললেন না, “ আমি পরাধীন দেশে মুক্ত হতে চায়না”।
১৯৮৭ সালে ম্যান্ডেলা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাঁকে দুই মাস হাসপাতালে থাকতে হয়। যখন তিনি সুস্থ হলেন, তাকে আর পোলস মুর এই জেলে ফিরে যেতে হয়নি, তাঁকে ভিক্টর ভারস্টের নামে একটা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এই বাড়িতে আছে তিন্ টা  বেডরুম। ৭১ তম জন্মদিনে এই বাড়িতে তাঁর ওয়াইফ, ছেলে মেয়ে, নাতি, নাতনী সবাই আসে সারাদিনের জন্য। এরই মধ্যে মিঃ বোথা পদত্যাগ করেন। এফ ডাব্লিউ ডি ক্লার্ক দক্ষিন আফ্রিকার নতুন লিডার। যদিও ক্লার্ক তাঁর প্রথম রাজনৈতিক জিবনে “এপারট হিড”  কে সাপোর্ট করতেন কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, সবকিছুর পরিবর্তন করতে হবে। তিনি সব রাজনৈতিক আসামীদের রবেন আইল্যান্ড থেকে মুক্ত করে দিলেন, এবং তিনি ঘোষণা করলেন সব আফ্রিকানরা ভোট দিতে পারবে। তিনি আরো বললেন ম্যান্ডেলা কে খুব তাড়াতাড়ি ছেড়ে  দেওয়া হবে।
দীর্ঘ ২৭ বছর পর মুক্তির স্বাদঃ
১৯৯০ সালের  ফেব্রুয়ারী মাসের ১১ তারিখ, রবিবার ,নেলসন ম্যান্ডেলা সকাল ৪.৩০ এ ঘুম থেকে উঠেছেন। যদি ও তিনি প্রতিদিনই একই সময়ে ওঠেন। কিন্তু ওই দিন ছিল অন্যান্য দিনের তুলনায় আলাদা। তিনি তখন ভিক্টর ভেরস্টের জেল নামক একটা  ছোট বাড়িতে। ঊনার ব্যাগ গুছানো হয়ে গেছে। দীর্ঘ ২৭ বছর পর ওই দিন উনি জেল থেকে মুক্ত হবেন।
দুপুরের দিকে ম্যান্ডেলা তাঁর বউ উইনিকে সাথে নিয়ে গাড়িতে  বসলেন। গাড়ি  তাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করল বাইরের পৃথিবীতে। কিন্তু জেল এর শেষ দরজা পার হবার আগে ম্যান্ডেলা ড্রাইভার কে থামিয়ে দিলেন, কারন ২৭ বছর জেলে থাকার পর  তিনি কিছুদুর হেটে যেতে চাইলেন। ম্যান্ডেলা তার ওয়াইফ এর হাত টা ধরে গেটের বাইরে আসলেন, বাইরে তখন হাজার হাজার মানুষ, বিভিন্ন পত্রিকার লোক, টেলিভিশন এর লোক সবাই দাড়িয়ে আছে, তারা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ আপনি যে এত দিন পর মুক্ত হলেন, আপনার এখন কেমন লাগছে?” ম্যান্ডেলা কোন উত্তর দিতে পারলেন না। কি উত্তর দেবেন তিনি। যখন তিনি জেলে যান তার বয়স ৪৫ এবং  জেল থেকে ছাড়া পেলেন যখন বয়স ৭১। নিজের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া এতগুলো বছর, কি বলবেন তিনি?
সবাই তখন ম্যান্ডেলা ম্যান্ডেলা বলে চিৎকার করছে, তখন তিনি ডান  হাত মুট করে মাথার উপরে তুলে ধরলেন ( এটা তাঁর রাজনৈতিক দল এ এন সির সাইন) এবং ওই হাত উঁচু করে সারা বিশ্বকে  জানিয়ে দিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার কালোদের সম অধিকারের  দাবিতে তিনি এখন ও সোচ্চার।
তাকে কারে করে কেপ টাউন  শহরে  সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে ১০০,০০০ লোক তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। নালসন ম্যান্ডেলা এই প্রথম ২৭ বছর পর দক্ষিন আফ্রিকার জনগনের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি সবাইকে  ( দক্ষিন আফ্রিকা এবং সারা পৃথিবীর মানুষকে ) ধন্যবাদ জানান । তিনি দক্ষিন আফ্রিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন।
                                                   
দক্ষিন আফ্রিকার জাতির পিতা নেলসন ম্যান্ডেলা ঃ
ম্যান্ডেলা আবার ও এ এন সির লিডার নিযুক্ত হন। ক্লার্ক সব আইনের সংস্কার  করলেন, এখন সব আফ্রিকানরা একই দালান, টয়লেট, স্কুল, কলেজ ব্যবহার করতে পারে। ১৯৯০ ম্যান্ডেলা ১৪ টা দেশ সফর করেন । তিনি সব দেশের প্রেসিডেন্ট এবং জনগণকে ধন্যবাদ দেন তাদের সাপোর্ট করার জন্য। তিনি ইউনাইটেড ন্যাশান এ ভাষণ দেন। ম্যান্ডেলা এবং ডি ক্লার্ক একসাথে নোবেল পুরস্কার পান। যদি ও অনেক কিছুতেই তাদের মতামত ভিন্ন কিন্তু ম্যান্ডেলা এবং ডি ক্লার্ক দেশ কে পরিবর্তনের  জন্য এক সাথে কাজ করতে লাগলেন। কারন কিছু শ্বেতাঙ্গরা দেশের পরিবর্তন চাচ্ছিল না। ডি ক্লার্ক তাদের বুঝাতে লাগলেন , ১৯৯২ সালে শুধু মাত্র শেতাঙ্গ দের জন্য ভোট গ্রহন অনুষ্ঠিত হয়, যে তারা পরিবরতন চায় কি না? ৬৯ % শেতাঙ্গ হা ভোট দেয়।
অনেক জল্পনা কল্পনার পর সরকার দিন ঠিক করে পরবর্তী সরকার গঠনের। ১৯৯৪, এপ্রিল ২৭। ভোটের দুই মাস আগে থেকে নেলসন ম্যান্ডেলা গ্রাম থেকে গ্রামে, শহর থেকে শহরে গেলেন, জনগনের সাথে কথা বললেন। তারপর এপ্রিল ২৭ ভোট গ্রহন অনুষ্ঠিত হল, এবং এ এন সি ৬২.৭ % ভোট পায়, ডি ক্লার্ক ন্যাশনাল পার্টি ( পুরোনো সরকার) পায় মাত্র ২০.৪  %। ৭৫ বছর বয়সে ম্যান্ডেলা দক্ষিন আফ্রিকার প্রথন  ব্ল্যাক প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন।
                                             
১৯৯৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জনগন আবার ও  এ এন সি কে ভোট দিয়ে নির্বাচিত  করে, কিন্তু ম্যান্ডেলা সিধান্ত নিলেন তিনি রাজনীতি কে বিদায় জানাবেন। ৮১ বছর বয়সে তিনি ঘোষণা দিলেন  এখন সময়  হয়েছে তরুন প্রজন্মের দেশের দায়িত্ব নেবার। ম্যান্ডেলা এর পদত্যাগের পর ডেপুটি প্রেসিডেন্ট থাব এম্বেকি প্রেসিডেন্ট হলেন। ম্যান্ডেলা তাঁর তিন নম্বর ওয়াইফ  গ্রাসা মিশেল কে নিয়ে তার সেই ছোটকালের ফেলে আসা কুনু গ্রামে চলে যান।
২০১০ সালে দক্ষিন আফ্রিকায় ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই সময় অনেক লোক দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করে। ফাইনাল খেলায় স্পেন জিতে যায়। ফাইনাল খেলা শেষ  হবার পর নেলসন ম্যান্ডেলা এবং তাঁর ওয়াইফ  সারা পৃথিবী থেকে আগত ৮৫,০০০ লোককে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান। ম্যান্ডেলা এর বয়স তখন ৯২ বছর ।তার সেই হাসি সারা পৃথিবীর মানুষকে একটা বার্তা পৌঁছে দেয়  “ দেখ , সারা পৃথিবীর মানুষ দেখ , ২০ বছর আগে ও শ্বেতাঙ্গ এবং কালো লোক একসাথে বসে ফুটবল খেলা উপভোগ করতে পারত না, তারা একই টিমে খেলতে পারত না, কিন্তু এখন দেখ!!! সবকিছু পাল্টে  গেছে,আর এটা সম্ভব হয়েছে দক্ষিন আফ্রিকার জাতির পিতা নেলসন ম্যান্ডেলা এর জন্য”।
বিষয়শ্রেণী: অন্যান্য
ব্লগটি ১৩৪০ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ০২/১১/২০১৩

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • অসাধারন হয়েছে
    • ইসমাত ইয়াসমিন ০৩/১১/২০১৩
      দাদা, আমার ব্লগে আপনাকে সাগতম।ভাল লাগছে আপনাদের পদধুলি পেয়ে, আশা করি সব সময় পাশে পাব।
      • একটু বেশিই বলে ফেললেন মনে হয়।
        নামটা দাদা হলে ও বয়স বেশি নয়।
        সবাই যদি ভাল বলে মানে ভালই লেখা হয়।
        আমাদের মাঝে স্বাগতম কেউ বড় ছোট নয়।
        • ইসমাত ইয়াসমিন ০৩/১১/২০১৩
          খুব সুন্দর লিখেছেন, আমি কিন্তু কবিতা এক লাইন ও লিখতে পারিনা। আপনি ছোট হোন আর বড় হোন আমি আপনাকে দাদা বলেই ডাকব।ভাল থাকবেন সব সময় এই দোয়া রইল।
  • অসম্ভব ভালো একটি লেখা।খুবই মনোযোগ দিয়ে পড়লাম।খুব ভালো লাগলো।একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস বেড়িয়ে গেলো বুকে থেকে।আপনি চালিয়ে যান।শুভকামনা আপনার জন্য।
    • ইসমাত ইয়াসমিন ০২/১১/২০১৩
      অনেক অনেক ধন্যবাদ সাখাওয়াৎ ভাই উৎসাহ দেবার জন্য ,ছবি এড করলে ভাল হত,কিন্তু পারিনি।
      • আপনাকে ও ধন্যবাদ ভালো লেখার জন্য।আপনার লেখাটি প্রিয় তে রেখেছি।যাক সময় করে নিয়মিত আসুন না আমার নিয়মিত আয়োজনে।
      • এই ব্লগটি পড়ুন >> http://www.tarunyo.com/dada/blog/copy/ আর ছবি এড করতে চাইলে নিচের চিত্রের হাইলাইট করা চার পাশে নীল দাগ দেওয়া অংশ লক্ষ করুন । ব্লগ লেখার সময় এখানে ক্লিক করে ছবির লিঙ্কটা পেস্ট করে দিলেই হবে
        • ইসমাত ইয়াসমিন ০৩/১১/২০১৩
          লিঙ্ক দেবার জন্য ধন্যবাদ। পরে সময় নিয়ে পড়ব।
 
Quantcast