www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ম্যাজিক নজরুল

পকেট থেকে হাত বের করার সময় একটি দু' টাকার নোট বারবার বের হয়ে আসে। উপায়ান্তর না দেখে উল্টেপাল্টে দেখে নজরুল। পেশায় ম্যাজিশিয়ান। আজ কয়েকদিন কোন শো দেখাতে যায়নি। পকেটে খাবার টাকাও নেই। তথাপিও উদাসীন দু'টি চোখ খেলে একটি টাকার নোটে। বাংলাদেশের দু' টাকার নোট। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর কাগুজে টাকার স্বীকৃতি পেলো। সেই টাকার নোট নিয়েও কোনরূপ কৌতূহল পরিলক্ষিত হয় না। কবি নজরুলের নামে রাখা নামেই কি না অভাব অনটনের জীবন। দারিদ্র‍্য কবি নজরুলকে খ্রিষ্টের সম্মান দিয়েছিলো কি না জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহ পোষণ না করলেও এই নামের কারণে মানুষ তাকে কিছুটা হলেও সম্মান দিয়ে থাকেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে দেশে এনে জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করেছেন।

নজরুল নতুন টাকার নোটটি চিকন সরু নলের মতো করে মুখে নিয়ে সিগারেট খাওয়ার ভঙ্গিমায় ফুঁকতে থাকে। কোন ধোঁয়া নেই। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। মানুষ সিগারেটের আগুনের মতো জ্বলতে পারে না। তবু পুড়তে থাকে। চিতার আগুনে পোড়ার সাথে তুলনা দিয়ে নিজেকে হালকা করে। মানুষ কষ্টে থাকে আবার ঘুরে দাঁড়ায়। চিরদুঃখিও সুখের পেছনে ছোটে। সুখি মানুষ দুঃখের পেছনে ছুটতে চায় না। দুঃখ এসে আঁকড়ে ধরে। অবশ্য কিছু দুঃখ বিলাসী মানুষের কথা আলাদা। যেমন নজরুল ইসলাম সবুজ। সবুজ তার ডাকনাম। পরিবারের দেয়া। পরিচিত মানুষজন সবুজ নামেই ডাকে। কে কি নামে ডাকলো তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। আদম সন্তানের একটি নাম থাকা দরকার তাই বিভিন্ন নাম। কেউ উপলক্ষ করে নাম রাখে কেউ রাখে না। তাতে কদর কমে মনে হয় না। যাক এসব ভাবনার বিষয় নয়। ভাবনা কখনো সুশৃঙ্খল হয় না।
আজ টাকার নোটটি একমাত্র সঙ্গী। অথচ সকাল দুপুর রাত পড়ে আছে সামনে। খালি পেট পকেটও খালি। মাথায় চিন্তা ভর করে।

মনে পড়ে যায় ছোটবেলায় দেখেছে দেশপ্রেমী নেতা দাবী আদায়ের বর্ম হিসেবে অনশন করে থাকেন। সেক্ষেত্রে দিনশেষে কর্তৃপক্ষ এসে শরবত অথবা জুশ খাইয়ে অনশন ভাঙান। অবশ্য আমরণ অনশন হলে আলাদা কথা। নজরুলও আজকের দিনটাকে অনশন দিবস ঘোষণা করে মনে মনে। তার এ অনশন ভাঙাবার কোন কর্তৃপক্ষ নেই। তার এই স্বেচ্ছা অভুক্ত থাকার কথা সে ছাড়া আর কারও জানার কথা নয়। কোন কারণও নেই।

রাস্তার একপাশ মানে ডানপাশ করে হাঁটার নিয়মে হাঁটলেও জীবনটা অনিয়মের নিয়মে দাঁড়িয়েছে মধ্যবয়সে। দেড়কিলোমিটার হাঁটার পর বুঝতে পারে যে অবধি এসে থামার কথা তা বহু আগেই পার হয়ে এসেছে। বাড়ী থেকে বের হয়ে এই রাস্তাতেই যাওয়াআসা। আজ পথটাকে খুব অচেনা মনে হচ্ছে। হাতের সঙ্গী টাকার নোটটা আনমনে ফেলে দিয়েছে। যেমন সিগারেট শেষ হলে ধূমপায়ী তা ফেলে দেয়। কিছুদূর যাওয়ার পর বুঝতে পারে হাতে থাকা দু' টাকার নোটটি আর হাতে নেই। হঠাৎ থমকে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে যায়। আবার বিলীন হয়ে যায় সেই হাসি।

একজন ভিক্ষুক এসে হাত পাততেই নজরুল অন্যমনস্ক হওয়ার ভান করে। মনের মধ্যে একটা আক্ষেপ খেলে যায় আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। যদি দু' টাকার নোটটি থাকতো তবে তা দিয়ে ভিখারিকে বিদায় করা যেত অন্ততপক্ষে। তা আর হলো নাহ। ভিখারিও বিদ্রূপ করে কিছু একটা আওড়াতে আওড়াতে চলে যায়। শরীরে হালকা শীত শীত অনুভূত হয় নজরুলের। গায়ে পুরনো ধাঁচের একটা নীল রঙা ব্লেজার তার ভেতর একটি চে গুয়েভারার ছবিওয়ালা টিশার্ট। পরণে জিন্স প্যান্ট। পায়ে বছরের বারোমাস ফিতাওয়ালা কেডস। বাইরে বের হলে একটি রাখালবয় টুপি রোদ এবং বৃষ্টিতে তাকে রক্ষা করে। নিতান্তই সাদামাটা জীবন ধরণ। প্রকৃতির বেখেয়াল রূপ নিয়ে মানুষ তার আপন গতিতে এগিয়ে চলে। নজরুলের একটি স্বভাব হচ্ছে হাঁটার সময় ডান হাত পকেটে রাখা। যাতে চলতি পথে কারো সাথে হাত মেলাতে না হয়। এ গ্রামীণ জনপদের মানুষগুলোকে তার কাছে জটিল কুটিল মনে হয়। সে নিজেকে নিয়ে না ভাবলেও সমাজের কুসংস্কার তাকে পীড়িত করে তোলে। প্রকাশের ব্যাপকতা না থাকলেও নিজে নিজে চিন্তায় খুব যে সুশীল শ্রেণী থেকে পিছিয়ে রয়েছে তাও নয়। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে যা ভেবেছে তাই ঘটেছে। সে হিসেবে নজরুল একজন বিচক্ষণ বোদ্ধাও বটে।

নজরুল হাঁটতে থাকে। ফিরে আসার তাগাদাহীন। গন্তব্য ষেষ হয় না। জীবন নিয়ে কোন দুঃখবোধ নেই। দিনের পর রাত, রাতের পর দিন চব্বিশঘণ্টার শিকলে বাঁধা থাকেনা সময়। যখন ইচ্ছা ঘুম। যখন ইচ্ছা ঘরে শুয়ে বসে দিন কাটানো। আজ তার ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে তাই বেশি হেঁটে শরীর দুর্বল হতে দেয়া যাবে না। তার খেয়াল যত বেলা গড়াবে ততো নিজেকে আরো দৃঢ় করবে যাতে এমনদিনে বিচলিত হওয়ার মতো কোন কিছু না ঘটে। চালচুলোহীন সংসারে সংসার বলতে যা বোঝায় নজরুল সে আটপৌরে বাঁধা পড়তে চায় না। মানুষ সামাজিক জীব সংসার থাকা ততটা জরুরী কিছু নয়। প্রাণীকুলে সকলের সংসার থাকা নিয়ে তারও কোন মাথাব্যথা নেই। ম্যাজিক দেখানো তার পেশাই শুধু নয় নেশাও। আর তাই আজ এ শহর তো কাল ওই শহর করে গ্রাম পাড়া বাজার মহল্লা রেলস্টেশন কিছুই বাদ যায় না। শেষ যে বার বাড়ী থেকে বের হয়েছে ফিরে এসে মা বাবা ভাই বোন ঘরবাড়ী কিছুই পায়নি। নদী ভাঙ্গন সব নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে গেছে। সেই থেকে আপন বলতে রক্তের সম্পর্কের কেউ রইলো না। আর তাতেই সংসারে যত অনীহা। যত না সংসার টানে হারানোর ভয় আরো বেশী করে পিছু টানে।

এবার রাস্তা ছেড়ে দিয়ে মেঠোপথ ধরে হাঁটতে থাকে নজরুল। অগ্রহায়ণ মাস। ধান কাটার মওসুম। পৃথিবীর সবকিছুর মওসুম আছে ম্যাজিক দেখানোর কোন মওসুম নেই। আজ ম্যাজিকের সরঞ্জামাদিও সাথে না থাকায় ইচ্ছে করলেই টাকা রোজগার করতে পারবে না। গুনগুনিয়ে গাইতে থাকা 'ভাঙা তরী ছেঁড়া পাল, এভাবে আর কত কাল, ভাবি আমি একা বসিয়া রে দয়াল' গানটি সুউচ্চ মাত্রায় বের হয়ে আসে। মানুষ জমে যায়। সবাই বলাবলি করছে গায়েনের গলা ভারী সুন্দর। আচানক জাদু আছে। নজরুল চোখ খুলে সবার দিকে একপলক তাকিয়ে আবার উদ্দেশ্যহীন গন্তব্যের যাত্রায় পা বাড়ায়।

১৮ ও ২৬ নভেম্বর, ২০১৮
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৭৭ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ৩০/১১/২০১৮

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast