www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

করোনায় একজন প্রবাসী।

করোনায় একজন প্রবাসী ।
২১তম পর্ব।

অনেক পুরাতন ইতিহাস। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সহজে স্বীকৃতি দেয়নি সৌদি আরব। স্বীকৃতি পেতে পেতে দেশে ঘটে অনেক রাজনৈতিক পরিবর্তন ক্ষমতার পালা বদলে মেজর জিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তখন আর সৌদিতে বাদশা ফাহাদ । মেজর জিয়া মুসলিম দেশের সাথে কূটনীতি জোরালো করতে সিদ্ধান্ত নেন । তার ফলশ্রুতিতে বাদশা ফাহাদ মেজর জিয়াকে সৌদিতে আমন্ত্রণ জানান। রাষ্ট্রপতি জিয়া সৌদি সফরে যান এবং অত্যন্ত সম্মানের সাথে সৌদি বাদশা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে গ্রহন করেন। মেজর জিয়া যাওয়ার সময় কিছু নিম গাছ নিয়ে যান । এই ঔষধি গাছ যাহা মরুভূমিতে অল্প পানি ফেলেও বেঁচে থাকতে পারবে । এবং নিম গাছের পাতা পানি ধারণ করে বলে পরিবেশ ঠান্ডা রাখে। যেখানে এই গাছ আছে সেখানে পরিবেশ শীতল ও রোগ জীবাণু মুক্ত থাকে।

জিয়া বলেন হে প্রিয় বাদশা আমি গরিব দেশের গরিব রাষ্ট্রপতি আপনাকে দেওয়ার মত কিছু নেই । এই কয়েকটি ঔষধি গাছ নিয়ে আসলাম এতে সৌদি আরবের বাদশা অত্যন্ত খুশি হন। বাদশা বলেন আমি আপনার দেশের জন্য কি করতে পারি। জিয়া বলেন আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় কাজ নেই যদি আপনি আমার দেশ হতে শ্রমিক নিয়ে আসেন তাহলে আমরাও আপনার দেশের উন্নয়নে অংশদারিত্ব হতে পারবো। আপনার দেশে এসে কাজ করার বিনিময় যে পয়সা পাবে তাতে আমার দেশ উপকৃত হবে। এতে বাদশা ফাহাদ রাজি হয়ে যান এবং ১৯৭৭ সাল হতে সৌদি আরবে বাংলাদেশী শ্রমিক আসা শুরু হয়। আর বর্তমানে বাইশ লক্ষ বৈধ এবং প্রায় আরো এক লক্ষ অবৈধ শ্রমিক সৌদিতে কাজ করে। এর বাহিরে বাংলাদেশী পরিচয়ে আছে বৈধ অবৈধ মিলে আরো এক লক্ষ রোহিঙ্গা । তখন হতে সৌদি আরব গিয়ে কোটি কোটি পরিবার সচ্ছলতার মুখ দেখেছে দেশের উন্নয়ন হয়েছে।

নিম গাছ বর্তমানে সৌদিতে জিয়া সিজারা (জিয়া গাছ) নামে পরিচিত। এই গাছ আরাফাতের ময়দানে সারি সারি হাজারো লাগানো আছে । হজ্ব করতে গেলে লক্ষ লক্ষ হাজ্বী এই নিম গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নেন। যেসব এলাকায় প্রচুর পরিমাণে এই গাছ লাগানো হয়েছে সেখানে বৃষ্টির পরিমাণ বেশী , এই গাছে পরিবেশ রক্ষা করার সাথে সাথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও সৃষ্টি করেছে। তাই হজ্ব ছাড়াও হাজারো সৌদি নর নারী আরাফাতের ময়দানে প্রতিদিন ঘুরতে যায় বিশ্রাম নিতে যায়। সেসব বাংলাদেশী শ্রমিক আরাফাতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করে অনেকই গর্ববোধ করে জিয়া সিজারার ইতিহাস জেনে এবং কখনো কখনো তারাও অন্যদেশের লোকদের এই ইতিহাস বর্ণনা করে। একজন বাংলাদেশী অনেক বছর ধরে সেখানে বাকালা (মুদি দোকান ) করে সে এই গাছের ইতিহাস বলতে গিয়ে তার চোখে মুখে প্রচণ্ড উজ্জ্বলতা ফুটে উঠে

একসময় সৌদিতে আমাদের একটা সম্মান ছিল একটা ইজ্জত ছিল বাংলাদেশী শ্রমিকের চাহিদা ছিল সেই অবস্থা এখন আর নেই। আমরাই সেই অবস্থা নষ্ট করেছি সেটা এখন ভারত আর নেপালের দখলে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি নষ্ট মানুষের দেশ মনে করে তারা তাই শ্রমিক পাঠানোর আগে সৌদির কঠোর আইন কানুন মেনে চলার জন্য মানসিক উন্নতি করে কাজে দক্ষ করে লোক পাঠানো দরকার।একসময় ইরাক শ্রম বাজার ছিল একসময় লিবিয়া শ্রম বাজার ছিল এখন তা তাদের ক্ষমতা আর রাজনৈতিক হানাহানির কারণে প্রায় মৃত্যুকুপ এইসব দেশে না যাওয়াই উত্তম। (চলবে)

করোনায় একজন প্রবাসী।
২২তম পর্ব।

এই মহামারীতে মানুষ মরেছে এমন নয় অনেক মানুষ বেঁচে থেকেও জিন্দা লাশ হয়েছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে। সারা বিশ্বে শ্রম বাজার সংকটময় সৌদিও এর বাহিরে নয় বিরাট এক অর্থনৈতিক ধস নেমেছে। তারপরও সৌদিতে কাজের চাহিদা আছে কিন্তু পারিশ্রমিক আগের মত নেই। এই মহামারীর ধাক্কায় অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়েও মধ্যপাচ্যের রাজনীতি বন্ধ হয়নি । ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়া নিয়ে রাজ পরিবারে মত বিরোধ প্রকাশ পেয়েছে। আরব আমিরাত এবং বাহারাইন স্বীকৃতি দিয়ে কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপন করলেও সৌদি বাদশাহ সুলতান চায় ফিলিস্থিনের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং অধিকার ঠিক রেখে সম্পর্ক করতে। তাও আবার মক্কা মদিনার মর্যাদার কথা মনে করে পিছে হটে কিন্ত বাদশাহর ছেলে চায় অতি সত্তর সম্পর্ক স্থাপন করে ইরান বিরোধী জোট গঠন করতে । যাতে করে ইরান ও তুর্কী বিরোধীদের পরাভূত করা যায় আমেরিকার শক্তি দিয়ে। আসলে সবদিকে মিলে মধ্যপাচ্য তুরস্ক এক মহাশক্তিধর রাষ্ট্র পরিণত হচ্ছে।

তুরস্কের সহায়তায় কাতার সৌদি জোটকে যথাযথ মোকাবিলা করে ইরানের সাথে মিলে ফিলিস্তিনের অধিকার আদায় চেষ্টা করতেছে তবে মজার কথা আমেরিকা আবার কাতারের বিশ্বস্ত বন্ধু।সৌদি জোট কাতারে হামলা করার সিদ্ধান্তও নিয়ে ছিল কিন্তু একদিকে তুরস্ক ও ইরান অপরদিকে আমেরিকা বাধা হয়। এই সংকটে আমেরিকা মিলিয়ন মিলিয়ন রিয়ালের অস্ত্র বিক্রি করে কাতারে। সৌদি জোট কাতারের অবরোধ প্রত্যাহার করতে বেশ কিছু শর্ত দেয় তবে কাতার একটাও মানেনি । আলজাজিরা টিভি বন্ধ , ইরান এবং তুরস্কের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং ফিলিস্তিনের হামাজ ও ফাত্তাহকে সাহায্য করা বন্ধসহ আরো কয়েকটি ।

এইসব শর্ত না মেনে কাতার শুরু করে কূটনীতিক রাজনীতি আর এতে সাফল্য পায় কাতার। বর্তমানে কাতারে আগের চেয়ে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বহুগুণ বেশী। ২০২২ সালে সফলভাবে ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করবে। আমেরিকা ঘোষণা দিয়েছে অচিরে কাতারের অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে। সবচেয়ে বড় খবর শ্রমিকদের সুবিধার জন্য একটা রোড়ম্যাপ ঘোষণা করেছে । কাজের ধরন অনুসারে নিম্ন বেতন আঠারশত দেরহাম দিতে হবে শ্রমিককে। ইকামার মেয়াদ থাকলে শ্রমিক ইচ্ছামত কাজ করতে পারবে এবং মালিক পরিবর্তনও করতে পারবে। শ্রমিকের সাথে কোন ধরনের জোরজুলুম করা যাবে না। আর সৌদিতে হচ্ছে এর বিপরীত ।

বর্তমানে সৌদিতে ইকামার সরকারি ফিস সব মিলে দশ হাজার রিয়েল (দুই লাখ ত্রিশ হাজার টাকা প্রায়)।শ্রমিকদের নিম্নে বেতন এক হাজার রিয়েলের নিচে আবার জিনিসপত্রেরও দাম বেশী। এই করোনা কালের ভিতর সরকার ভ্যাট বাড়ায় পনর পারসেন্ট। সৌদি আরবের নাগরিক হিমশিম খাচ্ছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয় করতে গিয়ে তবে কোন প্রতিবাদ নেই । শুনেছি রাজ পরিবার বিরোধীরা বিভিন্ন দেশে যারা পালিয়ে আছে তারা একটা রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরি করেছে রাজা বিরোধী । (চলবে)।

করোনায় একজন প্রবাসী
২৩তম পর্ব।

লোকমান, নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ির বাসিন্দা।দুই বছর হয়েছে সৌদি আরব আসার মেয়াদ। কিন্তু ইকামা পায়নি অদ্যাবধি পাবেও না কারণ কপিল (মালিক) তার ভিসা ক্যানসেল করে ফেলছে। দেশে ভিসা দালালের মিষ্টি কথায় সৌদি এসে মালিক খুজে পায়নি কিংবা সৌদিতে বাংলাদেশী দালালও মালিক খোজ করতে কোন সহযোগিতা করেনি। এইখানে সেখানে হাবুডুবু খেয়ে ছয় মাস পার করেছে। তারপর এক হুক্কা দোকানের পরিচ্ছন্ন কর্মীর কাজ পায় । মর্ধ বয়সী লোকমান কথাবার্তায় যেন ঝাল মরিচ মুখটা তার হাওয়ার আগে চলে। অথচ কষ্কালসার শরীর নিয়ে কাজ করতে দম যায় যায় তবুও চলে। দেশে সিএনজি চালতো সংসার চলতো কিন্তু বউ বলে সৌদি যাও টাকা কামাও ছেলেমেয়ে এর ভবিষ্যৎ গঠতে হবে। বউর চাপে ভিসা দালালের দারস্ত হয় আর দালাল করে বাজিমাত। আবুল কালামের কাজের পাশে হুক্কা দোকান তাই পরিচয় দুইজনে। লোকমানের কাজের কয়েক মাস যেতেই মার্চ মাসে করোনার প্রচণ্ড ধাক্কা সৌদিতে লাগে। আর প্রথম ধাক্কায় হুক্কা দোকান বন্ধ ঘোষণা করে সৌদি সরকার

হুক্কা দোকান অন্য দেশের মদের বারের মত। হুক্কা , চা পানি ও খাওয়ার আইটেম সব পাওয়া যায়। রাত বাড়তে থাকলে লোক সমাগম বাড়তে থাকে তবে চব্বিশ ঘন্টা খোলা থাকে। সরকারি ছুটির দিনে ঈদের মত উপচে-পড়া ভিড় থাকে। রাস্তাঘাটে গাড়ি আর গাড়ি ঠিক যেমন হয় কোন ফুটবল খেলা থাকলে। ছোট ছোট ব্যক্তিগত রুম , খোলা দরজার রুম থাকে এইছাড়াও আছে খোলা জায়গায় সোফা বসানো। বড় বড় টিভিতে ফুটবল দেখতে খুব মজা পায় সৌদিয়ান। সৌদির কয়েকটা জাতিয় দল ছাড়াও আমেরিকা ইউরোপীয় ক্লাব ও দলের প্রতি প্রচুর আকৃষ্ট তারা। সৌদি জাতিয় দলগুলো এতই জনপ্রিয় যে বড় দুই দলে খেলা হলে সরকারি ছুটির আমেজ নেমে আসে। এইসব দোকানে ইয়েমেন ও বাংলাদেশি শ্রমিক বেশীর ভাগ কাজ করে। আগে প্রচুর বকশিস পেলেও এখন আগের মত সেই দিন নাই। দিন দিন সৌদিতে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে , জনসংখ্যা বেড়েছে এবং রোজগার কমেছে অর্থনৈতিক মন্দায় পড়ে।

এখন তারা কেউ কেউ দুই এক রিয়েলের জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেয় অবলীলায়। চুরি করে ছিনতাই করে তবে আইনের কঠোর প্রয়োগে এখনো মাত্রাতিরিক্ত হয়নি। লোকমানের শাররীক অবস্থার কারণে এমনি বেতন কম তার উপর তেমন কেউ বকশিসও দিতো না। কারণ সে ভাষা জানতো না কোন সৌদি কাস্টোমার কিছু চাইলে বাংলায় গালি দিতো এবং লোকমান প্রচণ্ড বিরক্তি প্রকাশ করতো। তারপরও রোজ রোজ যা পেত তা দিয়ে খাওয়ার খরচ চালিয়ে নিতো লোকমান বেতনের টাকা পুরোই দেশে পাঠাতো বউয়ের কাছে। এখন তার কাছে কোন টাকা পয়সা না থাকায় খুব কষ্টে পড়ে আছে। প্রথম প্রথম মালিক কিছু টাকা পয়সা দিতো খাওয়ার খরচ বাবত। তিন চার মাস দেওয়ার পর তা মালিক দেওয়া বন্ধ করে দেয়।

সাত মাস হলো লোকমানের হুক্কা দোকান বন্ধ চরম অমানবিক জীবনের পথে লোকমান। মালিক গোসলের কিংবা খাওয়ার পানির বিল দেওয়াও বন্ধ করে দেয় তবে বিদ্যুৎ বিল দেওয়া চালু রাখছে। প্রথম প্রথম লোকমান নিজের পরিচিত লোকজনের কাছে হাত পেতে চললেও এখন তাও সম্ভব না কারণ সবার একটা হাহাকারের ভিতর দিন কাটছে কে কাকে সাহায্য করবে। তাই বাধ্য হয়ে লোকমান পা বাড়ায় ভিক্ষায়। (চলবে)।

করোনায় একজন প্রবাসী
২৪তম পর্ব।

প্রতিদিন সন্ধ্যার পর লোকমান বাহারাইন রিয়াদ রোড়ের পাশে একটা তেলের পাম্পে সুপার মার্কেটের সামনে গিয়ে দাড়ায়। লোক দেখে সুযোগ করে আধা বাংলা আধা আরবী মিশিয়ে টাকা চায় সৌদিয়ানদের কাছে। কখনো কখনো হাতে থাকা কাপড় দিয়ে গাড়ির ধুলাবালি পরিস্কার করে সৌদিয়ানদের মন জয় করতে চেষ্টা করে। তবে তার এই কাজ সবারই অপছন্দ কিন্তু লোকমান শুনে না। সুপার মার্কেট এর ক্যাশে ইয়েমেনি নাগরিক সে অনেকবার লোকমানকে বারণ করেছে মাঝে মাঝে দুই এক রিয়েল সেও দেয়। এইভাবে চলছে লোকমানের দিনকাল সারাদিন ঘুম সন্ধ্যায় এই কাজ না হলে যে উপবাস থাকতে হবে। তার সাথের লোকজন নিষেদ করে এই কাজ করতে, এই ভিক্ষাবৃত্তি সৌদি নাগরিক পৌরসভার অনুমতিপত্র নিয়ে করতে পারে আর কেউ না। অবশ্যই শুক্রবারে সৌদি মহিলা সমজিদের দরজায় বসে ভিক্ষা করে। তাদের অনেকের হাতে অনুমতিপত্র দেখা যায়্য ।

লোকমানের সাথে একদিন রীতিমত চিটাং এর আমিন ভাইয়ের ঝগড়া হয়ে যায়। আমিন ভাই বলে এইটা এখানে অবৈধ কাজ তারপরে নাই তোমার ইকামা একদিন পুলিশের হাতে ধরা পড়বে । তাহাছাড়া এতে দেশের বদনাম সবাই বলে বাঙ্গালী ভিক্ষা করে। এতে লোকমান প্রচণ্ড রাগ করে, বদনাম হলে আমি কি করবো আমাকে কে খাওয়াবে। তবে ভারতীয় এবং পাকিস্তানীও ভিক্ষা করে বাঙ্গালী হিন্দি ও পাকিস্তানী লোকজনের বাসায় চুপি চুপি এতে তারা ভিন্ন মিথ্যার আশ্রয় নেয় ভালো রোজগার করে। লোকমান কখনো কখনো নিরাশ হয়ে নিরব বসে থাকে দেখলে মায়া হয় কিন্তু কিছু করার নাই আমিও যে নিরুপায়। তারপরও মাঝে মাঝে এটা সেটা দিতে চেষ্টা করি কিন্তু মুখ পাকা বলে বিরক্ত লাগে।

সৌদিতে আসার জন্য নেওয়া ধার দেনা কিছুই শোধ হয়নি। করোনার আঘাতে সব লণ্ডভণ্ড না হয় এতদিনে একটা কূল পাওয়া যেত। এখনতো ঘরে চাল ডালও থাকে না ভাইবোন কত আর সাহায্য করবে। ছোট শালীর স্বামীটা দয়ালু ও সচ্ছল সেই এখন বউ বাচ্চার ত্রাণ দাতা। কিন্তু কত মাস আর চাওয়া যায় লজ্জায় পড়ে আজও রান্না বিহীন চুলা। অথচ এই সৌদিতে এসে কতজন কোটিপতি হলো আর আমাকেই পেল করোনা। এই যে করিম বক্সের ছেলে শিবির করতো বলে সৌদি পাঠিয়ে দিল। এখনো মনে হয় সেই দিন আসলো সৌদি আর আজ কয়েক কোটি টাকার মালিক হয় দেশে চলে গেল। অবশ্যই আমিও দেখেছি তার নয়ছয় কাজ গুদাম হতে চুরি করে মালপত্র গাড়িয়ে গাড়িয়ে বিক্রি করতে। করোনায় লকডাউন হওয়ার দশদিন আগে ছুটি চলে গেল। শুনেছি কোম্পানির হিসাবরক্ষক চেক দিয়ে ছিল ব্যাংক হতে টাকা তুলে দিতে কারণ সে ড্রাইভার আর তখন তার হাতে ছুটি যাওয়ার পাসপোর্ট টিকেটও সে টাকা কোম্পানিতে না দিয়ে সে দেশে চলে যায়।

এক সময় যারা তার রাজনৈতিক বিরোধী ছিল তাকে মেরে পুলিশে দিয়েছে তারা আজ তার বড়িগার্ড। কুমিল্লার কান্দির পাড়ে ছয় তলা প্রাসাদ তার। বউটা রাখবে না গরিব মামতো বোন বিয়ে করা বউ এখন অচল তাই শুশুরকে (মামা) নাকানি চুবানি খাওয়ায়। মামা সালিশ বৈঠক করে নিজের মেয়েকে চোখের জলে ঘরে তোলে। মানুষ আচার্য হয় সহজ সরল ছেলেটা সৌদির টাকার গরমে নিজের অতীত ভুলে আকাশের চিল হওয়ায়। আর আমি সৌদি এসে কাঁদি কোথাও আমার চুলা জ্বলে না বলে। (চলবে)

করোনায় একজন প্রবাসী
২৫তম পর্ব।

চারিদিকে মাগরিবের আজান, একসাথে একসময় মাইকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। মন উতলা হয় ওখন আল্লাহর পেয়ারে । যে কোন মুসলিম মানুষের মন উতলা হবেই যদি মনে আল্লাহকে ভয় থাকে । আর একসাথে একসময় চারিদিকে আল্লাহ শ্রেষ্ঠ আল্লাহ শ্রেষ্ঠ বর উঠে তাহলে যে কোন লোক আল্লাহর কাছে নত স্বীকার করবেই। তাই মনে হয় অন্য ধর্মের লোক সৌদিতে কাজ করতে এসে কখনো কখনো ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে ফেলে। আজানের সাথে সাথে মানুষও কাজকর্ম ছেড়ে মসজিদের দিকে ছুটে আল্লাহর দরবারে নিজেকে সমর্পণ করতে। মুখ ফুটে বলতে হয় না আমি তোমার দরবারে হাজির । এই জন্য হয়তো তারা মোনাজাত করে না কারণ একমাত্র আল্লাহর কাছে মাথা নত করে নিজের মন ধ্যান সব একাত্মতা করে আল্লাহর একাত্মবাদে। নামাজের সেজদাই সব চাওয়া পাওয়ার কেন্দ্র বিন্দু তাই হাত তুলে চাওয়ার প্রয়োজন তেমন মনে করে না। আজান ছাড়া অপ্রয়োজনীয় কোন কথাই মাইকে প্রচার করে না। মসজিদের জায়গা একমাত্র মাথা করার স্থান আর কোন জায়গায় কোন ধরনের পুজা অর্চনা কল্পনাতীত । তবে নামাজ যে কোন জায়গায় পড়া যায় কোন বিধিনিষেধ নাই এতে।

আজ লোকমান মাগরিবের আজানের আগেই তেলের পাম্পে হাজির হয়। নামাজ পড়ে অনেকের সাথে তবে এখানে আইনের কঠোর প্রয়োগে সবাই মুখোশ পরে থাকে। মুখোশ না পরলে সৌদিয়ানের এক হাজার রিয়েল জরিমানার কোন ছাড় নাই কোন মাফ নাই। বহিরাগতদের প্রথম বলে বাসায় পাঠায় দ্বিতীয় ধপায় মাফ নাই। পাশে ট্রি স্টল লোকমান একটা লেমন চা নিয়ে বসে সোড়িয়াম বাতির আলোয়। হাতে ধরা গ্লোডলিফে টান মারে একটা দুইটা পরে দম মেরে সুখ টান । কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোয়া আকাশ পানে ছুড়ে মারে তারপর বিটবিট করে কি জানি গান বলে নাকি বিধাতাকে মন্দ বলে। একবার চায়ে চুমুক আরেকবার সিগারেটে চুমুক দুইয়ের মিলনে লোকমান চিত্র করে শিল্পীর। লোকমানের এই আর্টে থাকে হয়তো বউ বাচ্চার চাল ডালের যোগান না দিতে পারার গভীর ব্যর্থতা । আবার কখনো কখনো হাতে ধরা সিগারেট উপুড় করে জ্বলে যাওয়া দেখে। এই সময় কালো একটা কার এসে থামে।

বসা হতে দাঁড়িয়ে লোকমান তাদের সালাম দেয় হাত তোলে। তারা নেমে দ্রুত দোকানে চলে যায় লোকমান বসে পড়ে। তবে এদের দেখে লোকমানের কালো মাংসহীন মুখে হাসির ঝিলিক মারে। তারা ফিরে আসলে লোকমান সামনে গিয়ে দাঁড়ায় মাথা নিচু করে একজন পকেটে হাত দেয়। আবার লোকমান আগের জায়গায় গিয়ে বসে লোকগুলি চলে যায়। এইভাবে চলে লোকমানের সময় ঘন্টা দুয়েক কেউ কিছু বলে না। কালো পোষাকে পুলিশ আসে কখনো কখনো দেখতে আমাদের দেশের র্যাব এর মত হাতে কোন অস্ত্র থাকে না কোমরে থাকে পিস্তল। আগে ইকামা দেখার বাহিনী আলাদা ছিল রাস্তায় টহল দিতো জলপাই রংয়ের পোষাক পরে এখন তেমন রাস্তায় দেখা যায় না । কালো পোষাকের পুলিশই এখন আধুনিক বাহিনী রাস্তায় টহল দেয় ইকামা দেখে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করে।

লোকমান উঠে দোকানে যায় কিছু কিনতে । একজন পুলিশও এসে দোকানে ঢুকে পানি সিগারেট কিনে বের হয়। লোকমান পুলিশ দেখে ভয় পায় না কারণ করোনা কালে তেমন ইকামা চেক করে না । কিন্তু হঠাৎ করে সেই দিন লোকমানকে দোকানের সামনে পুলিশ বলে জিব ইকামা (ইকামা দাও তোমার ) । (চলবে)
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১৮১ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৮/০৯/২০২০

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • এম. মাহবুব মুকুল ২৮/০৯/২০২০
    ইতিহাস জানলাম। ধন্যবাদ্
  • বাহ! ইতিহাস যে কথা বলে তা পড়লাম।
    শুভেচ্ছা জানাই লেখককে।
 
Quantcast