www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

হাতুড়ে চিকিৎসকের থেকে দূরে থাকুন

পাঁচ মাস আগেও মাদারীপুরের বেল্লাল লিখত, ছবি আঁকত। ডানহাতি এ বালক ক্রিকেট খেলায় চার-ছক্কা হাঁকাত। অথচ আজ বেল্লাল ডান হাত দিয়ে একটা কাগজও তুলতে পারে না।

বেল্লালের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, স্থানীয় এক হাতুড়ে চিকিৎসকের ভুলের কারণে তাঁদের ছেলের আজ এ অবস্থা। এখন বেল্লালের হাত আর ঠিক হবে না। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলেছেন, বেল্লালের হাত কেটে ফেলতে হবে।

বেল্লাল রহমানের বয়স ১০ বছর। তার বাবা আনিসুর রহমান দিনমজুর ও মা লিলি বেগম একটি ধানের চাতালের শ্রমিক। এই পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা বরগুনার বেতাগী উপজেলার দক্ষিণ ছোপখালী গ্রাম। কাজের সুবাদে তাঁরা মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার টেকেরহাট বন্দরের তাঁতিকান্দা গ্রামে বসবাস করেন।

বেল্লালের ডান হাত এখন একদম শুকিয়ে গেছে। দেখলে মনে হয় শুধু হাড় আছে। এখন আর হাত দিয়ে কিছু করতে পারে না। ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা বলেন, বেল্লাল স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র। গত ১৪ জুন বিকেলে সে তার বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিল। এ সময় পড়ে গিয়ে সে ডান হাতে ব্যথা পায়। তাকে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসক তপন দের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। টেকেরহাট বন্দরে তপন দের একটি চেম্বার আছে।

বেল্লালের বাবা আনিসুর বলেন, তপন পাঁচ হাজার টাকার চুক্তিতে বেল্লালের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। তপন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে বেল্লালের হাত ব্যান্ডেজ করে দেন। এ সময় তিনি তপন দেকে জিজ্ঞেস করেন এক্স-রে করা লাগবে কি না। তখন তপন তাঁকে বলেন, তিনি (তপন) হাড় জোড়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। চিকিৎসা করার জন্য এক্স-রে লাগবে না।

আনিসুর আরও বলেন, দুই দিন পর বেল্লালের ব্যথা বেড়ে গেলে তাকে আবার তপনের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন তিনি এক মাসের ওষুধ লিখে দেন। এর এক মাস পরও বেল্লালের অবস্থা ভালো না হওয়ায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকেরা বলেন, বেল্লালের ভুল চিকিৎসা হয়েছে। এখন তার ডান হাত কেটে ফেলতে হবে।

বেল্লালের বাবা বলেন, তাঁরা ছেলেকে বরিশাল ও ঢাকার হাসপাতালেও নিয়ে গেছেন। সেখানকার চিকিৎসকেরাও একই কথা বলেছেন। তিনি রাজমিস্ত্রির জোগালি। তাঁর স্ত্রীও শ্রমিক। এখন এমন অবস্থা যে ছেলের হাতটা কেটে ফেলার জন্য যে টাকা লাগবে, তা-ও জোগাড় করতে পারছেন না।

বেল্লাল বলে, ‘আমার ডাইন হাইত ভাইঙ্গা গেছে। আম্মু-আব্বু কইছে আমি ভালো হয়ে যামু। আমি আগে ব্যাগ কান্ধে লইয়া স্কুলে যাইতাম, এহন আম্মু যাইতে দেয় না। মাডে বন্ধুগো লগে ব্যাট-বল খেলতেও পারি না।’

লিলি বেগম বলেন, বেল্লালের লেখাপড়া বন্ধ রেখেছেন। হাতে ব্যথা হয়। সে কোনো কিছুই ধরতে পারে না। হাতের যেখানে ভেঙেছিল, সেখানে আস্তে আস্তে শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন খাওয়াসহ প্রয়োজনীয় সব কাজ বাঁ হাত দিয়ে করে।

এ ঘটনায় আনিসুর চিকিৎসক তপন দের বিরুদ্ধে ১২ নভেম্বর রাজৈর থানায় একটি মামলা করেন। তপন রাজৈর উপজেলার খালিয়া দক্ষিণাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। এরপর পুলিশ তপনকে গ্রেপ্তার করে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তপন দে দীর্ঘদিন ধরে টেকেরহাটে ‘এলএমএএফপি এবং মা ও শিশুর জটিল ও পুরাতন রোগে অভিজ্ঞ’ পরিচয় দিয়ে টেকেরহাট জেনারেল হাসপাতালের পাশে চেম্বার খুলে চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। তাঁর চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে নাম লেখা রয়েছে ‘তপন ডাক্তার’। তিনি কোথা থেকে পড়ালেখা করেছেন, সেসব কোনো তথ্য কোথাও নেই।

এ বিষয়ে তপনের আত্মীয় ও রাজৈর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শান্তি দাস বলেন, তিনি তপনের সঙ্গে হাজতে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তপন তাঁকে বলেছেন, তিনি কোনো ভুল চিকিৎসা করেননি। ওই ছেলেটি হয়তো নিয়মিত ওষুধ খায়নি।

রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল মোর্শেদ বলেন, শিশু বেল্লালের ভুল চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়ে পেনাল কোডে ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অ্যাক্ট-২০১০ অনুযায়ী মামলা হয়েছে। তপনকে আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ মামলাটির তদন্ত করছে।

মানবাধিকারকর্মী সুবল বিশ্বাস বলেন, শিশুটির দিকে তাকালে যেকোনো মানুষের কষ্ট হবে। যে চিকিৎসকের কারণে শিশুটি আজ পঙ্গু, তাঁর কঠোর শাস্তি ও জরিমানা করতে হবে। পাশাপাশি রাজৈর উপজেলার ভুয়া চিকিৎসকদের উচ্ছেদসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া অতি জরুরি।
বিষয়শ্রেণী: সংবাদ
ব্লগটি ৪০২ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৫/১১/২০১৭

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast