স্রোত
স্রোত
সুজিত পাত্র
(দেখা যাক সময় কাকে কোন পথে নিয়ে যায়)
আমরা অনেকেই আমাদের লক্ষ্যে ঠিক পৌঁছাতে পারিনাো; অথচ আমাদেরকে ঘিরে কত চাওয়া কত প্রত্যাশা চারপাশে দানা বেঁধে ওঠে। কিন্তু, সময়ের অভিঘাতে আর পারিবারিক বিপন্নতায় আমরা দিশাহারা হয়ে যাই। এই সংকটের গভীরে ঢুকে আমাদের নালিশ শোনার যেমন কেউ নেই, তেমনি আমাদের নিয়ে ভাববার ও কেউ নেই। আমি কিন্তু একজনের কথা ভবি, খুব বেশি করে ভবি। কারণ তার লেখা একটা চিঠি আমি পেয়েছিলাম লাইব্রেরির পুরোনো বইয়ের ভাঁজে । তার চিঠির প্রত্যেকটা কথা আজও আমার বুকে বিঁধে আছে। পাঠককে একান্ত আপন ভেবেই তার চিঠির কিছু কিছু অংশ আমি তুলে দিচ্ছি। তবে তাঁর বর্তমান অবস্থা আমার অজ্ঞাত। সেটুকু ভেবে নেবার দায়িত্ব যে যার ব্যক্তিগত। এই চিঠির সাপেক্ষে আমি অন্তত যেটুকু ভাবতে পেরেছি তাই সাজিয়ে দিচ্ছি।
[চিঠির প্রথম অংশঃ
...মা, আমার আজও একলা চলতে ভয় হয় ভয় হয়। দাঁত নখ বার করে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল শহরে বিশাল শহরে দৈত্যগুলোকে দেখে। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাই,কিন্তু তারা যেন আমার ছায়াটাকে টেনে ধরে রাখে। মা, এখন আমার অর্ধেকটা ছায়া আমি খুঁজে পাচ্ছিনা কেন? আর বাকি অর্ধেকটা! পার বাকী অর্ধেকটা! কী আশ্চর্য সেটা থেকেও যেন কেমন পোড়া পোড়া গন্ধ। তুমি তো জানো না যেদিন তুমি পুড়ে যাচ্ছিলে, কুন্ডলি পাকিয়ে ধোয়ারা প্রাণ পনে বেরিয়ে আসছিল বাইরে, আর তোমার প্রান টা খাঁচা ছেড়ে -- তোমার প্রত্যেক রোমকূপ বলছিল আমাকে বাঁচা, আর বুঝি বোধ হয় বলছিলে- শান্তি। সেদিন বাড়ি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আপাদমস্তক পুড়ছিল আমার এই অর্ধেকটা ছায়া।আজ সেই অর্ধদগ্ধ, অর্ধহারা অস্তিত্ব নিয়ে আমি দিশাহারার মত ঘুরছি। ঠিক যেমনভাবে শরীর সর্বস্ব অস্তিত্বহীন আঁকুপাঁকু অবস্থায় তোমার নারী ছিঁড়ে বার করে বোষ্টমী দাই আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল এই পৃথিবীতে - ঠিক তেমনি..ই...)
শত শত হেডলাইটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাত্রি ছুটে চলেছে, পোড়া পেট্রোল আর ডিজেলের গন্ধে অনুভূত হচ্ছে সন্ধ্যার স্পন্দন। জনসমুদ্রের এককোণে এক কাপ লাল চা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনিকেত। প্রায় সাতটা বেজে গেল। এতক্ষণে হয়তো ওর মাধ্যমিক ছাত্রটির অভিভাবকেরা বলবেন,- ' না: এসব মাস্টারকে দিয়ে হবে না - এত্ত লেট! অথচ মনোহর দাসের কোনো হেলদোল নেই - পাক্কা আধ ঘন্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছে। হঠাৎ এক পুরোনো বন্ধু, এখন এই শহরেরই নামি স্কুলের শিক্ষক, অজয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে মুখোমুখি সাক্ষাতের ভদ্রতটুকু সেরে নিল।
- ' আরে , অনিকেত ভালো আছিস?'
হঠাৎ কি বলবে অনিকেত ভেবে পেলনা। প্রতিসম্ভাষণের জন্য হাত তুলতেই সে আশ্বস্ত হল। দেখল বাঙালির সময়জ্ঞানের মাথা খেয়ে মনোহর দাস তার সামনে এসে দাঁড়াল একগাল ব্যস্ততা নিয়ে। কোনো ভূমিকা না করেই বলল,-
' বুঝলে ভায়া, বুঝতেই তো পারছ, কম্পিটিশনের মার্কেট। তারপর এই শালার দেশে বেকার এত বেড়ে গেছে, সরকারই বল, আর কোম্পানিই বল, কারোর বাবার ক্ষমতা নেই সবাইকে প্লেসমেন্ট দেয়... বেকারে বেকারে দেশটা বেকারি হয়ে গেল। এখন সোডিয়াম বাই কার্বনেট মিশিয়ে নিজেকে ফাঁপাও - তবে দাম পাবে, নইলে নয়।'
অনিকেত চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে দেখল - ইতিমধ্যে গ্লাসটা খালি হয়ে গেছে। মনোহর বলে যাচ্ছে -
' ...এখন প্রায় সব কোম্পানিই চাইছে সায়ান্স গ্রাজুয়েট। সিম্পল বি এ পাশে কাজ পাওয়াটা বেশ সমস্যার...তবু দেখি কি করতে পারি।'
অনিকেত মনে মনে অস্থির হিয়ে উঠেছে, 'কিন্তু মনোহর দা, তুমি তো ম্যানেজার, তোমার সুপিরিয়রদের বলে একটু দেখোনা, প্লিস...'
- 'তা আমি এ এস এম কে বলেছি তোমার ব্যাপারে, লোকটা বড্ড খ্যাঁচড়া ভাই। শালা বলে এক্সপিতিয়েন্স চাই, গাড়ি চাই, ইয়ে চাই... অনেক করে বলার পর মালটা একটু নরম হয়েছে। লেগে থাকলে হয়ে জেতে পারে, একটু ধৈর্য ধর।'
একটু আশার কথা শুনে স্ট্রিট ল্যাম্পের মত নিবু নিবু স্বরে অনিকেত বলে-
' একমাত্র তুমিই জা ভরসা, বুঝতেই তো পারছ অবস্থা। শিব্রাত্রির সলতে হয়ে একা একা আর কত পুড়ব কে জানে!'
দিন্ সাত পর তার সঙ্গে দেখা করতে বলে মনোহর দাস যেতে উদ্যত হতেই অনিকেত তাকে থামায়, কানাইকে উদ্দেশ্য করে বলে - 'দাদা, দুটো চা-'
(দ্বিতীয় অংশঃ
... ঘুম পেলে চোখে সরসের তেল নিতে বলতে; চোখ জলে ভরে যেত জ্বালায়,। আর তুমি হ্যারিকেন না নেভানো পর্যন্ত সেই দুঃখী আবছায়ায় বুনে যেতে সোয়েটার- আমার - বাবার, হয়তো বোনের জন্যও বুনতে যদি না বোনটা আমার সুখ আর স্বপ্নের ভিতের তলায় চাপা পড়ে হারিয়ে না যেত... তারপর তোমার কোলে আমাকে সেঁটিয়ে নিয়ে সেই অন্ধকার রাতে বুনতে আমার স্বপ্নকেও - রুপকথা আর প্রত্যাশার আপ্তকথন দিয়ে। আর আমি তোমার আঁচলের দোলায় দুলতে দুলতে ভাসতাম রূপকথার ভবিষ্যতে- বন্ধুর সঙ্গে যুক্তি করে তালপাটালি চুরি করেছিলাম বলে যে শিবু কাকা আমাকে 'পাকা চোর' হবার ভবিষ্যতবানী করেছিল, সীমানার ধারে সজনে গাছ কাটার সময় এক বৈশাখের সকালে যে বিমলি কাকি তোমায়- 'শয়তান মাগি, নির্বংশ হবি...পথের ভিখারি হবি...' অভিশাপ দিয়েছিল, আর যারা যারা আমাকে-তোমাকে প্রতি পদে পদে অপমান লাঞ্ছনা করত, তাদের সকলের চোখের সামনে স্কুল ঘরটার মত একটা বড় বাড়ি বানাব। স্বপ্নের বাইকে চেপে অহংকারি আর অভিশপ্ত মুখগুলো মুচড়ে দিয়ে তোমার পায়ের তলার মাটিটা করব শক্ত। তোমার সোনা ছেলের একটা ফুটফুটে সোনা বৌ এনে তোমার ঘর আলো করব ...
-এখোনো মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি, আর কেঁদে কেঁদে জেগে উঠি হঠাৎ। দ্যাখো মা, এখোনো অবিরাম জল ঝরছে আমার চোখে...)
... অনিকেত বেরিয়ে আসছিল একটা ইন্টারনেট ক্যাফে থেকে, একটা মোটর কারের জোর হর্ণ তার সম্বিৎকে চমকে দিয়ে তার সম্মুখ দৃষ্টির বুকের ওপর দিয়ে পেরিয়ে গেল। বিপরীত দিক থেকে আসা এক ভদ্রলোকের প্রশ্নের উত্তরে তাকে বলতে হল - 'না, এবারেও হয়নি।'
ভদ্রলোকটি একটু আফশোস করেই বললেন- ' তা বাবা কী-ই আর করার আছে বল, সরকারি চাকরি তো আর সহজ নয়, থাকত মামা-কাকা বা ট্যাঁকের জোর, দেখতে এর চেয়ে সহজ আর কিছুই থাকত না। নেক্সট টাইম চেস্টা কর-'
প্রচন্ড কান্না পেয়ে গেল অনিকেতের, এই শেষ কথাটুকু শুনেই। কোনো মতে নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁটের ওপর ঠোঁট ছেপে চলতে লাগল। মনোহর দা'কে চেপে ধরতেই হবে। মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ এর কাজটা জোগাড় করতেই হবে তাকে। সকাল এগারোটার শহুরে ব্যস্ততার মধ্যেও দেখল রাস্তাটা যেন একটা মড়ার মত নিস্পন্দ - নিস্প্রাণ। মাথাটা ঝিমঝিম করছে তার...
(তৃতীয় অংশঃ
...তোমাদের প্রতাশার পারদটা ছিল অনেক উঁচুতে, আর আদরটা ছিল তারও বাড়া; ফলে নিজেকে প্রশ্রয়ই দিয়ে গেছি। প্রথম দিকের বেস্ট বয় এর সুখ্যাতিতে- আজ তোমাকে সত্যি বলছি - আত্মতুস্টি ছিল চরমে- যার প্রত্যক্ষ ফল অবশ্য পেয়েছিলাম অব্যবহিত পরেই। তুমি তো জানো মা, শ্রেষ্ঠত্বের ভাঁপে ইঁচড়েও পেকেছিলাম খুব। আজ তোমাকে সত্যি বলছি, সেদিন স্নিগ্ধার জামা টেনে ধরে ক্লাসের মধ্যে চরম ভুল করেছিলাম- কিন্তু বিশ্বাস কর, আর আর সমস্ত অভিযোগের দায়ী আমি ছিলাম না। যার জন্য স্কুলে গিয়ে তোমাকে এতো অপমানিত হতে হয়েছিল।
আজ আমি বুঝতে পারছি তোমার দুঃখ যন্ত্রণার কথা সেভাবে কোনোদিনই ভাবতে পারিনি। কিন্তু সেদিন হেডমাস্টার মশাইয়ের সামনে স্নিগ্ধার বাবার প্রতিটি কথার তোপে দগ্ধ হতে হতে তোমার মতো আমিও নিজের জন্য লজ্জায়, ঘৃণায় আর শত অনুশোচনায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছিলাম। মনে মনে শতবার ক্ষমা ছেয়েছিলাম তোমার কাছে। আর দ্যাখ, আজও আমি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারিনি...)
কলেজের প্রাচীর ঘেঁসে অনুগত যে রাস্তাটা চলে গেছে, তারই এক পাশে দাঁড়িয়ে পূর্বা আর অনিকেত। বরাবর সাহস জুগিয়ে এসেছে মেয়েটা অনিককে। আজও বলে- '
-'সোজা হয়ে চলতে শেখো, শিরদাঁড়ায় আঘাত আসবে শত, হাড়ের গিঁট যাবে খুলে তবু, জেনো অস্তিত্বটা এখোনো তমার খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে যায়নি। আর তারই তাগিদে বাসনার মুক্তি ঘটাও, - নিজেকে ভালোবেসে- একটু আমার কথা ভেবে, সামনে তাকিয়ে চল - আমি তো আছি-'
শীতের সন্ধ্যা। এখনই সব দোকানে ঝাঁপ ফেলতে শুরু করেছে। অজ্ঞাতে ফেলা দীর্ঘশ্বাসে অনিকেত যেন সম্বিত ফিরে পেল। হঠাৎ পূর্বার ডান হাতটা চেপে ধরে ধরা গলায় বলল-
'বড্ড ভয় করে- ফুরোতে ফুরোতে তো তলানিতে এসে পড়েছি, আস্তাকুড় ছাড়া গতি থাকবে না।'
হতাশাটা এত বেশি দীর্ঘশ্বাসেই তার মালুম। খানিক্ষণ নীরব থেকে পূর্বা বলল-
'এতটা বিশ্বাস করে যখন তোমার সঙ্গ দিতে পেরেছি, তখন জেনে রেখো, এই আলম্বন অনুঘটকের দায়িত্বটা আমাদের সুখের সুচনা পর্যন্ত তো থাকবেই...
(চতুর্থ অংশঃ
... স্কুল থেকে ফিরে এসেই দেখলাম তুমি বিছানায় বসে চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছ। ক্লাস টেস্টে প্রথম হওয়ার আনন্দটা আর চৌকাঠ পেরোলো না।আমাকে দেখে তুমি কান্না লুকিয়ে বেরিয়ে গেলে বাইরে। ফিরে এলে, কিন্তু তোমার চোখে মুখে শান্ত্বনার ঝাপটা দেখতে পেলাম না। গম্ভীর গলায় বললে- 'বোস- দিচ্ছি-'
মনে পড়ে তোমার ওই কান্নার কারন অনুসন্ধানের জন্য ভাবনাটা এত ঘুরপাক খাচ্ছিল, - ভাত না কী যেঁ খেলাম কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। বিকেলে খেলতে যাবার পথে হঠাৎ কানে এল-
'...ঐ এক ছেলে, ক্যামন পীরিত করতে গিয়ে স্কুল থেকে রাস্টিকেট হয়েছিল- কার ছেলে দেখতে হবে তো ...'
একেবারে কচি খোকাটি ছিলাম না, তাই ওই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতেই তোমার কান্নাএ একটা কল্পিত কারন খুঁজেছিলাম, - সেদিন প্রচন্ড ঘৃণা করেছিলাম তোমায়। তারপর খেলতে গিয়ে গেলাম সব ভুলে...)
...আজ হঠাৎ টিউশান পড়াবার সময় মনোহর দাস ফোন করে জানাল- 'ভায়া হয়ে গেছে-... এই মাত্র আর এস এম ফোনে জানালেন তুমি সিলেক্টেড - ভাগ্যিস ইন্টারভিউটা দিয়ে এলে - তাহলে ভায়া আমার ক্যালি আছে বল...পার্টি কবে দিচ্ছ...'
প্রথম দুটো কথাই সারাক্ষণ ধরে কানে বাজছিল অনিকেতের। তারপর সে আর কিছুই শোনেনি। অনন্দে ত৬য়ার দুচোখ জলে ভরে গেল। কোনো মতে সামলে নিয়ে সটান চলল সুখ-দুখের সাথী পূর্বাকে খবর দিতে। আর কেউ আটকাতে পারবে না তাকে। আজ সন্ধ্যার আলোগুলোকে বড্ড বেশি আপন মনে হল। সে যেন পরিস্কার শুনতে পাচ্ছে- মোটর গাড়ির স্বপ্ন তাকে ডাকছে তার নাম ধরে।কিছু ডাউন পেমেন্ট করে বাইক কিনেই - মা তো নেই, পূর্বাকে চাপিয়েই সোজা স্বপ্নের পথে পাড়ি দেবে। মাত্র আট দিন পর কোম্পানির ট্রেনিং- তারপর- ব্যাস। এখন সে আর বেকার নয়, এম আর।
(পঞ্চম অংশঃ
... বারো মাসের তের মাসই বাবা কাটাতেন বাইরে। শুধু এটুকু জেনে শান্ত্বনা পেতাম তাঁর চাকরিতে ছুটি কম। আর তোমার সঙ্গে তার সম্পর্ক যেন শুধু মানি অর্ডারের খাম আর ক্বচিৎ দর্শনে। তাতেও সুখী ছিলাম বেশ। কিন্তু আজ আমার এই নিরবিচ্ছিন একাকীত্বের কোনো নিশ্চিন্ত কারন খুঁজে পাইনি অনেকদিন। শুধু তোমার মৃত্যুর পর পাড়ার লোকের মুখে শুনেছিলাম এতদিনের গোপনে থাকা বাবার দ্বিতীয় সংসারটির কথা। তাকে তো সেভাবে কোনো দিনই পেলাম না; আর তুমিও শান্তির দেশে চলে গেছ এই উথাল পাথাল সমুদ্রের মাঝখানে আমাকে ফেলে।তারপর কিছুদিন মামার বাড়িতে থেকে, কিছুদিন হোস্টেকে আর এখন মেসে থেকে নিজের চেষ্টা আর তাগিদ নিয়ে অনাহুত হয়ে বেঁচে আছি। পাশে পালাম পূর্বাকে, নইলে হয়তো বাঁচতেই পারতাম না। কোনো মতে পাশ করে - তোমার স্বপ্ন পূরণ না হোক, বেঁচে থাকার মতো একটা কাজ পেলেই নিশ্চিন্ত। দেখা জাক সময় আমাকে কোন পথে নিয়ে যায়...)
তে মাথার মোড়ে ফুলের দোকান থেকে একতোরা সতেজ মালা নিয়ে বেরোবার সময় অনিকেত বলল- ' বুঝলে পূর্বা, বহুদিন পর আজ মায়ের মুখোমুখি হব। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম- প্রথম মাইনে পেলেই তার এত দিনের প্রত্যাশা পুরণের মালা দিয়ে ভরিয়ে দেব মায়ের ছবিটা - যাতে অন্তত পুড়ে যাওয়া মনটা একটু শান্তি পায়...' একটা শ্বাস নিয়ে চোখ বুজল অনিকেত, দেখতে পেল - সেই কর্মব্যস্ত হাসিখুশি পঁয়ত্রিশোর্ধ মা গলায় মালা পরে দুহাতে আশীর্বাদ করছে তাকে - তাঁর মুখে পরিতৃপ্তির হাসি... তাঁর পায়ের মাটি আজ বেশ শক্ত...
9.4.2009, jogeshpally
সুজিত পাত্র
(দেখা যাক সময় কাকে কোন পথে নিয়ে যায়)
আমরা অনেকেই আমাদের লক্ষ্যে ঠিক পৌঁছাতে পারিনাো; অথচ আমাদেরকে ঘিরে কত চাওয়া কত প্রত্যাশা চারপাশে দানা বেঁধে ওঠে। কিন্তু, সময়ের অভিঘাতে আর পারিবারিক বিপন্নতায় আমরা দিশাহারা হয়ে যাই। এই সংকটের গভীরে ঢুকে আমাদের নালিশ শোনার যেমন কেউ নেই, তেমনি আমাদের নিয়ে ভাববার ও কেউ নেই। আমি কিন্তু একজনের কথা ভবি, খুব বেশি করে ভবি। কারণ তার লেখা একটা চিঠি আমি পেয়েছিলাম লাইব্রেরির পুরোনো বইয়ের ভাঁজে । তার চিঠির প্রত্যেকটা কথা আজও আমার বুকে বিঁধে আছে। পাঠককে একান্ত আপন ভেবেই তার চিঠির কিছু কিছু অংশ আমি তুলে দিচ্ছি। তবে তাঁর বর্তমান অবস্থা আমার অজ্ঞাত। সেটুকু ভেবে নেবার দায়িত্ব যে যার ব্যক্তিগত। এই চিঠির সাপেক্ষে আমি অন্তত যেটুকু ভাবতে পেরেছি তাই সাজিয়ে দিচ্ছি।
[চিঠির প্রথম অংশঃ
...মা, আমার আজও একলা চলতে ভয় হয় ভয় হয়। দাঁত নখ বার করে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল শহরে বিশাল শহরে দৈত্যগুলোকে দেখে। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাই,কিন্তু তারা যেন আমার ছায়াটাকে টেনে ধরে রাখে। মা, এখন আমার অর্ধেকটা ছায়া আমি খুঁজে পাচ্ছিনা কেন? আর বাকি অর্ধেকটা! পার বাকী অর্ধেকটা! কী আশ্চর্য সেটা থেকেও যেন কেমন পোড়া পোড়া গন্ধ। তুমি তো জানো না যেদিন তুমি পুড়ে যাচ্ছিলে, কুন্ডলি পাকিয়ে ধোয়ারা প্রাণ পনে বেরিয়ে আসছিল বাইরে, আর তোমার প্রান টা খাঁচা ছেড়ে -- তোমার প্রত্যেক রোমকূপ বলছিল আমাকে বাঁচা, আর বুঝি বোধ হয় বলছিলে- শান্তি। সেদিন বাড়ি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আপাদমস্তক পুড়ছিল আমার এই অর্ধেকটা ছায়া।আজ সেই অর্ধদগ্ধ, অর্ধহারা অস্তিত্ব নিয়ে আমি দিশাহারার মত ঘুরছি। ঠিক যেমনভাবে শরীর সর্বস্ব অস্তিত্বহীন আঁকুপাঁকু অবস্থায় তোমার নারী ছিঁড়ে বার করে বোষ্টমী দাই আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল এই পৃথিবীতে - ঠিক তেমনি..ই...)
শত শত হেডলাইটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাত্রি ছুটে চলেছে, পোড়া পেট্রোল আর ডিজেলের গন্ধে অনুভূত হচ্ছে সন্ধ্যার স্পন্দন। জনসমুদ্রের এককোণে এক কাপ লাল চা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনিকেত। প্রায় সাতটা বেজে গেল। এতক্ষণে হয়তো ওর মাধ্যমিক ছাত্রটির অভিভাবকেরা বলবেন,- ' না: এসব মাস্টারকে দিয়ে হবে না - এত্ত লেট! অথচ মনোহর দাসের কোনো হেলদোল নেই - পাক্কা আধ ঘন্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছে। হঠাৎ এক পুরোনো বন্ধু, এখন এই শহরেরই নামি স্কুলের শিক্ষক, অজয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে মুখোমুখি সাক্ষাতের ভদ্রতটুকু সেরে নিল।
- ' আরে , অনিকেত ভালো আছিস?'
হঠাৎ কি বলবে অনিকেত ভেবে পেলনা। প্রতিসম্ভাষণের জন্য হাত তুলতেই সে আশ্বস্ত হল। দেখল বাঙালির সময়জ্ঞানের মাথা খেয়ে মনোহর দাস তার সামনে এসে দাঁড়াল একগাল ব্যস্ততা নিয়ে। কোনো ভূমিকা না করেই বলল,-
' বুঝলে ভায়া, বুঝতেই তো পারছ, কম্পিটিশনের মার্কেট। তারপর এই শালার দেশে বেকার এত বেড়ে গেছে, সরকারই বল, আর কোম্পানিই বল, কারোর বাবার ক্ষমতা নেই সবাইকে প্লেসমেন্ট দেয়... বেকারে বেকারে দেশটা বেকারি হয়ে গেল। এখন সোডিয়াম বাই কার্বনেট মিশিয়ে নিজেকে ফাঁপাও - তবে দাম পাবে, নইলে নয়।'
অনিকেত চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে দেখল - ইতিমধ্যে গ্লাসটা খালি হয়ে গেছে। মনোহর বলে যাচ্ছে -
' ...এখন প্রায় সব কোম্পানিই চাইছে সায়ান্স গ্রাজুয়েট। সিম্পল বি এ পাশে কাজ পাওয়াটা বেশ সমস্যার...তবু দেখি কি করতে পারি।'
অনিকেত মনে মনে অস্থির হিয়ে উঠেছে, 'কিন্তু মনোহর দা, তুমি তো ম্যানেজার, তোমার সুপিরিয়রদের বলে একটু দেখোনা, প্লিস...'
- 'তা আমি এ এস এম কে বলেছি তোমার ব্যাপারে, লোকটা বড্ড খ্যাঁচড়া ভাই। শালা বলে এক্সপিতিয়েন্স চাই, গাড়ি চাই, ইয়ে চাই... অনেক করে বলার পর মালটা একটু নরম হয়েছে। লেগে থাকলে হয়ে জেতে পারে, একটু ধৈর্য ধর।'
একটু আশার কথা শুনে স্ট্রিট ল্যাম্পের মত নিবু নিবু স্বরে অনিকেত বলে-
' একমাত্র তুমিই জা ভরসা, বুঝতেই তো পারছ অবস্থা। শিব্রাত্রির সলতে হয়ে একা একা আর কত পুড়ব কে জানে!'
দিন্ সাত পর তার সঙ্গে দেখা করতে বলে মনোহর দাস যেতে উদ্যত হতেই অনিকেত তাকে থামায়, কানাইকে উদ্দেশ্য করে বলে - 'দাদা, দুটো চা-'
(দ্বিতীয় অংশঃ
... ঘুম পেলে চোখে সরসের তেল নিতে বলতে; চোখ জলে ভরে যেত জ্বালায়,। আর তুমি হ্যারিকেন না নেভানো পর্যন্ত সেই দুঃখী আবছায়ায় বুনে যেতে সোয়েটার- আমার - বাবার, হয়তো বোনের জন্যও বুনতে যদি না বোনটা আমার সুখ আর স্বপ্নের ভিতের তলায় চাপা পড়ে হারিয়ে না যেত... তারপর তোমার কোলে আমাকে সেঁটিয়ে নিয়ে সেই অন্ধকার রাতে বুনতে আমার স্বপ্নকেও - রুপকথা আর প্রত্যাশার আপ্তকথন দিয়ে। আর আমি তোমার আঁচলের দোলায় দুলতে দুলতে ভাসতাম রূপকথার ভবিষ্যতে- বন্ধুর সঙ্গে যুক্তি করে তালপাটালি চুরি করেছিলাম বলে যে শিবু কাকা আমাকে 'পাকা চোর' হবার ভবিষ্যতবানী করেছিল, সীমানার ধারে সজনে গাছ কাটার সময় এক বৈশাখের সকালে যে বিমলি কাকি তোমায়- 'শয়তান মাগি, নির্বংশ হবি...পথের ভিখারি হবি...' অভিশাপ দিয়েছিল, আর যারা যারা আমাকে-তোমাকে প্রতি পদে পদে অপমান লাঞ্ছনা করত, তাদের সকলের চোখের সামনে স্কুল ঘরটার মত একটা বড় বাড়ি বানাব। স্বপ্নের বাইকে চেপে অহংকারি আর অভিশপ্ত মুখগুলো মুচড়ে দিয়ে তোমার পায়ের তলার মাটিটা করব শক্ত। তোমার সোনা ছেলের একটা ফুটফুটে সোনা বৌ এনে তোমার ঘর আলো করব ...
-এখোনো মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি, আর কেঁদে কেঁদে জেগে উঠি হঠাৎ। দ্যাখো মা, এখোনো অবিরাম জল ঝরছে আমার চোখে...)
... অনিকেত বেরিয়ে আসছিল একটা ইন্টারনেট ক্যাফে থেকে, একটা মোটর কারের জোর হর্ণ তার সম্বিৎকে চমকে দিয়ে তার সম্মুখ দৃষ্টির বুকের ওপর দিয়ে পেরিয়ে গেল। বিপরীত দিক থেকে আসা এক ভদ্রলোকের প্রশ্নের উত্তরে তাকে বলতে হল - 'না, এবারেও হয়নি।'
ভদ্রলোকটি একটু আফশোস করেই বললেন- ' তা বাবা কী-ই আর করার আছে বল, সরকারি চাকরি তো আর সহজ নয়, থাকত মামা-কাকা বা ট্যাঁকের জোর, দেখতে এর চেয়ে সহজ আর কিছুই থাকত না। নেক্সট টাইম চেস্টা কর-'
প্রচন্ড কান্না পেয়ে গেল অনিকেতের, এই শেষ কথাটুকু শুনেই। কোনো মতে নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁটের ওপর ঠোঁট ছেপে চলতে লাগল। মনোহর দা'কে চেপে ধরতেই হবে। মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ এর কাজটা জোগাড় করতেই হবে তাকে। সকাল এগারোটার শহুরে ব্যস্ততার মধ্যেও দেখল রাস্তাটা যেন একটা মড়ার মত নিস্পন্দ - নিস্প্রাণ। মাথাটা ঝিমঝিম করছে তার...
(তৃতীয় অংশঃ
...তোমাদের প্রতাশার পারদটা ছিল অনেক উঁচুতে, আর আদরটা ছিল তারও বাড়া; ফলে নিজেকে প্রশ্রয়ই দিয়ে গেছি। প্রথম দিকের বেস্ট বয় এর সুখ্যাতিতে- আজ তোমাকে সত্যি বলছি - আত্মতুস্টি ছিল চরমে- যার প্রত্যক্ষ ফল অবশ্য পেয়েছিলাম অব্যবহিত পরেই। তুমি তো জানো মা, শ্রেষ্ঠত্বের ভাঁপে ইঁচড়েও পেকেছিলাম খুব। আজ তোমাকে সত্যি বলছি, সেদিন স্নিগ্ধার জামা টেনে ধরে ক্লাসের মধ্যে চরম ভুল করেছিলাম- কিন্তু বিশ্বাস কর, আর আর সমস্ত অভিযোগের দায়ী আমি ছিলাম না। যার জন্য স্কুলে গিয়ে তোমাকে এতো অপমানিত হতে হয়েছিল।
আজ আমি বুঝতে পারছি তোমার দুঃখ যন্ত্রণার কথা সেভাবে কোনোদিনই ভাবতে পারিনি। কিন্তু সেদিন হেডমাস্টার মশাইয়ের সামনে স্নিগ্ধার বাবার প্রতিটি কথার তোপে দগ্ধ হতে হতে তোমার মতো আমিও নিজের জন্য লজ্জায়, ঘৃণায় আর শত অনুশোচনায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছিলাম। মনে মনে শতবার ক্ষমা ছেয়েছিলাম তোমার কাছে। আর দ্যাখ, আজও আমি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারিনি...)
কলেজের প্রাচীর ঘেঁসে অনুগত যে রাস্তাটা চলে গেছে, তারই এক পাশে দাঁড়িয়ে পূর্বা আর অনিকেত। বরাবর সাহস জুগিয়ে এসেছে মেয়েটা অনিককে। আজও বলে- '
-'সোজা হয়ে চলতে শেখো, শিরদাঁড়ায় আঘাত আসবে শত, হাড়ের গিঁট যাবে খুলে তবু, জেনো অস্তিত্বটা এখোনো তমার খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে যায়নি। আর তারই তাগিদে বাসনার মুক্তি ঘটাও, - নিজেকে ভালোবেসে- একটু আমার কথা ভেবে, সামনে তাকিয়ে চল - আমি তো আছি-'
শীতের সন্ধ্যা। এখনই সব দোকানে ঝাঁপ ফেলতে শুরু করেছে। অজ্ঞাতে ফেলা দীর্ঘশ্বাসে অনিকেত যেন সম্বিত ফিরে পেল। হঠাৎ পূর্বার ডান হাতটা চেপে ধরে ধরা গলায় বলল-
'বড্ড ভয় করে- ফুরোতে ফুরোতে তো তলানিতে এসে পড়েছি, আস্তাকুড় ছাড়া গতি থাকবে না।'
হতাশাটা এত বেশি দীর্ঘশ্বাসেই তার মালুম। খানিক্ষণ নীরব থেকে পূর্বা বলল-
'এতটা বিশ্বাস করে যখন তোমার সঙ্গ দিতে পেরেছি, তখন জেনে রেখো, এই আলম্বন অনুঘটকের দায়িত্বটা আমাদের সুখের সুচনা পর্যন্ত তো থাকবেই...
(চতুর্থ অংশঃ
... স্কুল থেকে ফিরে এসেই দেখলাম তুমি বিছানায় বসে চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছ। ক্লাস টেস্টে প্রথম হওয়ার আনন্দটা আর চৌকাঠ পেরোলো না।আমাকে দেখে তুমি কান্না লুকিয়ে বেরিয়ে গেলে বাইরে। ফিরে এলে, কিন্তু তোমার চোখে মুখে শান্ত্বনার ঝাপটা দেখতে পেলাম না। গম্ভীর গলায় বললে- 'বোস- দিচ্ছি-'
মনে পড়ে তোমার ওই কান্নার কারন অনুসন্ধানের জন্য ভাবনাটা এত ঘুরপাক খাচ্ছিল, - ভাত না কী যেঁ খেলাম কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। বিকেলে খেলতে যাবার পথে হঠাৎ কানে এল-
'...ঐ এক ছেলে, ক্যামন পীরিত করতে গিয়ে স্কুল থেকে রাস্টিকেট হয়েছিল- কার ছেলে দেখতে হবে তো ...'
একেবারে কচি খোকাটি ছিলাম না, তাই ওই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতেই তোমার কান্নাএ একটা কল্পিত কারন খুঁজেছিলাম, - সেদিন প্রচন্ড ঘৃণা করেছিলাম তোমায়। তারপর খেলতে গিয়ে গেলাম সব ভুলে...)
...আজ হঠাৎ টিউশান পড়াবার সময় মনোহর দাস ফোন করে জানাল- 'ভায়া হয়ে গেছে-... এই মাত্র আর এস এম ফোনে জানালেন তুমি সিলেক্টেড - ভাগ্যিস ইন্টারভিউটা দিয়ে এলে - তাহলে ভায়া আমার ক্যালি আছে বল...পার্টি কবে দিচ্ছ...'
প্রথম দুটো কথাই সারাক্ষণ ধরে কানে বাজছিল অনিকেতের। তারপর সে আর কিছুই শোনেনি। অনন্দে ত৬য়ার দুচোখ জলে ভরে গেল। কোনো মতে সামলে নিয়ে সটান চলল সুখ-দুখের সাথী পূর্বাকে খবর দিতে। আর কেউ আটকাতে পারবে না তাকে। আজ সন্ধ্যার আলোগুলোকে বড্ড বেশি আপন মনে হল। সে যেন পরিস্কার শুনতে পাচ্ছে- মোটর গাড়ির স্বপ্ন তাকে ডাকছে তার নাম ধরে।কিছু ডাউন পেমেন্ট করে বাইক কিনেই - মা তো নেই, পূর্বাকে চাপিয়েই সোজা স্বপ্নের পথে পাড়ি দেবে। মাত্র আট দিন পর কোম্পানির ট্রেনিং- তারপর- ব্যাস। এখন সে আর বেকার নয়, এম আর।
(পঞ্চম অংশঃ
... বারো মাসের তের মাসই বাবা কাটাতেন বাইরে। শুধু এটুকু জেনে শান্ত্বনা পেতাম তাঁর চাকরিতে ছুটি কম। আর তোমার সঙ্গে তার সম্পর্ক যেন শুধু মানি অর্ডারের খাম আর ক্বচিৎ দর্শনে। তাতেও সুখী ছিলাম বেশ। কিন্তু আজ আমার এই নিরবিচ্ছিন একাকীত্বের কোনো নিশ্চিন্ত কারন খুঁজে পাইনি অনেকদিন। শুধু তোমার মৃত্যুর পর পাড়ার লোকের মুখে শুনেছিলাম এতদিনের গোপনে থাকা বাবার দ্বিতীয় সংসারটির কথা। তাকে তো সেভাবে কোনো দিনই পেলাম না; আর তুমিও শান্তির দেশে চলে গেছ এই উথাল পাথাল সমুদ্রের মাঝখানে আমাকে ফেলে।তারপর কিছুদিন মামার বাড়িতে থেকে, কিছুদিন হোস্টেকে আর এখন মেসে থেকে নিজের চেষ্টা আর তাগিদ নিয়ে অনাহুত হয়ে বেঁচে আছি। পাশে পালাম পূর্বাকে, নইলে হয়তো বাঁচতেই পারতাম না। কোনো মতে পাশ করে - তোমার স্বপ্ন পূরণ না হোক, বেঁচে থাকার মতো একটা কাজ পেলেই নিশ্চিন্ত। দেখা জাক সময় আমাকে কোন পথে নিয়ে যায়...)
তে মাথার মোড়ে ফুলের দোকান থেকে একতোরা সতেজ মালা নিয়ে বেরোবার সময় অনিকেত বলল- ' বুঝলে পূর্বা, বহুদিন পর আজ মায়ের মুখোমুখি হব। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম- প্রথম মাইনে পেলেই তার এত দিনের প্রত্যাশা পুরণের মালা দিয়ে ভরিয়ে দেব মায়ের ছবিটা - যাতে অন্তত পুড়ে যাওয়া মনটা একটু শান্তি পায়...' একটা শ্বাস নিয়ে চোখ বুজল অনিকেত, দেখতে পেল - সেই কর্মব্যস্ত হাসিখুশি পঁয়ত্রিশোর্ধ মা গলায় মালা পরে দুহাতে আশীর্বাদ করছে তাকে - তাঁর মুখে পরিতৃপ্তির হাসি... তাঁর পায়ের মাটি আজ বেশ শক্ত...
9.4.2009, jogeshpally
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
অর্ঘ্যদীপ চক্রবর্তী ০৪/০৩/২০২৬খুব ভালো
-
জে এস এম অনিক ২২/০২/২০২৬অসাধারণ
-
ডঃ মধুমঙ্গল সিনহা ২১/০২/২০২৬খুব ভালো লাগলো লেখাটা পড়ে।
-
ফয়জুল মহী ২১/০২/২০২৬সুন্দর লেখা
-
মোঃ বুলবুল হোসেন ২০/০২/২০২৬সুন্দর
