www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

পূর্ব পাকিস্তান - আমাদের বঞ্চনাময় অতীত

১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের স্বাধীন মাতৃভুমি, বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রকে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি। কিন্তু তার আগে বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের অংশ পূর্ব পাকিস্তান ছিলো তখনকার পটভূমি সম্পর্কে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের ঠিক কতটুকু ধারণা আছে? ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া আমার নিজেরও তেমন কিছু ভালমতো জানা ছিলো না। তবে উইকিপিডিয়া এবং অন্যান্য ওয়েবসাইট ঘাটাঘাটি করতে করতে পূর্ব পাকিস্তানের সার্বিক চিত্র সম্পর্কে আরও পরিস্কার একটি ধারণা পেয়েছি, যা আর সবার সাথে এখানে শেয়ার করলাম।

ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ একসাথে তৎকালীন ভারতবর্ষের বঙ্গ (Bengal) রাজ্য হিসাবে পরিচিত ছিলো। দেশভাগের প্রস্তুতি হিসাবে ১৯৪৬ সালের ৩ জুলাই ভারতবর্ষের এই বঙ্গ রাজ্যকে দুইভাগে ভাগ করা হয়; হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ (East Bengal)। ১৯৪৭ সালের অগাস্টে যখন ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হয়, পূর্ববঙ্গ তখন পাকিস্তানের অংশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে পূর্ববঙ্গের নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান (East Pakistan) রাখা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি হওয়া স্বত্তেও সে তুলনায় সংসদে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আসন বরাদ্ধ ছিলো নিতান্তই অপ্রতুল। পাকিস্তানের দুই অংশের এই সাংবিধানিক বৈষম্য, এবং ভৌগলিক দূরত্বের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগন শুরু থেকেই পাকিস্তানের সংবিধান মেনে নিতে পারেনি।

ইতিমধ্যে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের সরকার ঘোষনা দেয় যে উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার মূল অংশই হচ্ছে বাংলাভাষী, যা কিনা সমগ্র পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার হিসাবেও সংখ্যাগরিষ্ঠ। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের কেবল অল্প কিছু অংশের জনগনের মাতৃভাষা হলো উর্দু। স্বভাবতঃই পূর্ব পাকিস্তানের জনগন বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবীতে আন্দোলন শুরু করে। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে যখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষনা দেয় যে পাকিস্তান সরকারের দাবীই মেনে নেয়া হবে, তখন ভাষার আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে উঠে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী পুলিশের ১৪৪ ধারা অমান্য করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী রাস্তায় মিছিলে নেমে পড়ে প্রতিবাদের স্লোগানে। মিছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশের গুলিতে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার সহ আরও অনেকে নিহত হন। এতে করে দাবানলের মতো আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান। অবশেষে জনগনের আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।


৫২-র ভাষা আন্দোলন


১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বগুড়ার নবাব পরিবারের সন্তান চৌধুরী মোহাম্মদ আলী বগুড়া-কে নিযুক্ত করা হয়। ইতিপূর্বে তিনি পাকিস্তানের প্রাথমিক সংসদের সদস্য থাকলেও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ-র সাথে মতবিরোধের জের ধরে তাকে বার্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) রাষ্ট্রদূত হিসাবে পাঠিয়ে দেয়া হয়। (পরবর্তীতে তিনি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রেও রাষ্ট্রদূত হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।) পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে ১৯৫৪ সালের ২২ নভেম্বর তিনি "ওয়ান ইউনিট পলিসি" নামে নতুন এক পরিকল্পনার ঘোষনা দেন। তার এই পরিকল্পনা "বগুড়া ফরমুলা" নামেও পরিচিত। এতে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাবনা করা হয়। সংসদের উচ্চকক্ষ হবে ৫০ আসনবিশিষ্ট, এবং নিম্নকক্ষ ৩০০ আসনবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষের জন্য প্রতি প্রদেশ থেকে ১০ জন করে সাংসদ নির্বাচন করা হবে; অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১০ জন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বাকী ৪ প্রদেশ থেকে ৪০ জন নির্বাচন করা হবে। অপরদিকে নিম্নকক্ষের আসন বন্টন করা হবে প্রতি প্রদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনা করে। সে হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৬৫ আসনের বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানের আসন সংখ্যা হবে ১৩৫। এছাড়াও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কেউ প্রেসিডেন্ট হলে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করতে হবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে, কিংবা পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রেসিডেন্ট হলে প্রধানমন্ত্রী হবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে।

চৌধুরী মোহাম্মদ আলী বগুড়া-র এই "ওয়ান ইউনিট পলিসি" ব্যপকভাবে সমাদৃত হলেও বাস্তবায়নের কোন সুযোগ পায়নি। ১৯৫৫ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ইসকান্দর মির্জা তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করে রাষ্ট্রদূত হিসাবে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরণ করে।

১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দলের সাথে পুলিশের সহিংস ঘটনায় দুই মন্ত্রী ও ডেপুটি স্পিকার গুরুতর আহত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের সংসদের এই অস্থিতিশীলতার পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচ প্রদেশ হাতছাড়া হওয়ার হুমকির মুখে ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর মির্জা ইস্কান্দর সব গনতান্ত্রিক দল বিলুপ্ত ঘোষনা করে মার্শাল ল-এর অধ্যাদেশ জারি করে। ২৭ই অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে জেনারেল আইয়ুব খান ও ১২ সদস্যের মন্ত্রীপরিষদ মির্জা ইস্কান্দরের হাতে শপথ গ্রহণ করে। (এই ১২ সদস্যের পরিষদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক জুলফিকার আলী ভুট্টোও ছিলো)। ক্ষমতায় আসার পর আইয়ুব খান সবার আগে মির্জা ইস্কান্দরকেই লন্ডনে নির্বাসনে পাঠায়। তার যুক্তি ছিলো যে জনগন অতীতের সব কলুষ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে চায়।


আইয়ুব খান


আইয়ুব খানের শাসনামলে ১৯৫৮ থেকে নিয়ে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান নানা দিক দিয়ে উন্নতি করতে থাকে। তবে তার সবই ছিলো পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রিক। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানের জিডিপি বৃদ্ধির বাৎসরিক হার যেখানে ছিলো ৪.৪%, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিলো মাত্র ২.৬%। অথচ পুরো পাকিস্তানের বৈদেশিক রপ্তানি আয়ের মূল উৎস ছিলো পূর্ব পাকিস্তানের চা ও পাট শিল্প। ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের রপ্তানী আয়ের ৭০%-ই ছিলো পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রিক। তথাপি এই আয়ের পুরো সুবিধাই ভোগ করতো পশ্চিম পাকিস্তান। এছাড়াও বৈদেশিক যতো সাহায্য আসতো, সেগুলোর প্রায় সবটাই পশ্চিম পাকিস্তানের কাজে লাগানো হতো। তাই আইয়ুব খানের এক দশকের শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানে গমের যুগান্তকারী ফলন বৃদ্ধি ও পশ্চিম পাকিস্তানী টেক্সটাইলের বাজার অনেক সম্প্রসারিত হলেও পূর্ব পাকিস্তানের জীবনযাত্রার মান আগের মতোই নিচু স্তরে থেকে যায়।

নিচের টেবিলে পাকিস্তানের দুই অংশের  মধ্যে জনসংখ্যার ঘনত্বের সাপেক্ষে অর্থ বরাদ্ধের বৈষম্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

সালপশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্ধকৃত অর্থ (কোটি রুপির হিসাবে)পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্ধকৃত অর্থ (কোটি রুপির হিসাবে)
জনসংখ্যার অনুপাত৩৬.২৩%৬৩.৭৭%
১৯৫০-৫৫১,১২৯(৬৮.৩১%)৫২৪(৩১.৬৯%)
১৯৫৫-৬০১,৬৫৫(৭৫.৯৫%)৫২৪(২৪.০৫%)
১৯৬০-৬৫৩,৩৫৫(৭০.৫০%)১,৪০৪(২৯.৫০%)
১৯৬৫-৭০৫,১৯৫(৭০.৮২%)২,১৪১(২৯.১৮%)
মোট ব্যয়১১,৩৩৪(৭১.১৬%)৪,৫৯৩(২৮.৮৪%)

সূত্রঃ পাকিস্তানের প্ল্যানিং কমিশনের “রিপোর্টস অফ দ্যা এডভাইসরি প্যানেলস ফর দ্যা ফোর্থ ফাইভ ইয়ার প্ল্যান ১৯৭০-৭৫, ভলিউম ১ (উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত)

(সেসময় আমার বাবা করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করতো। তাঁর কাছ থেকে জেনেছি যে ইউরোপের কোন এক দেশ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অনুদান দেয়া ত্রিশোর্ধ্ব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে তখন করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে নেয়া হয়েছিলো। তাদের যুক্তি ছিলো যে এরকম উন্নত মানের বাস চলাচলের জন্য উপযুক্ত রাস্তা ঢাকায় নেই। একটা দেশের অর্ধেক যেখানে উন্নত যানবাহন ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে, তখন অপর অর্ধেক অংশে উপযুক্ত রাস্তা পর্যন্ত তৈরী করা হয়নি। এছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ জনগনের অনেকের কাছেই "বাঙ্গাল" শব্দটা ছিলো অনেকটা গালির মতো। কাউকে ছোট জাত বুঝাতে গেলে তাকে বাঙ্গাল বলা হতো।)


ইয়াহিয়া খান


পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে জেনারেল আইয়ুব খানকে ক্ষমতাচ্যুত করে তৎকালীন পাকিস্তান আর্মির প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা কুক্ষীগত করে। শুরু হয় মার্শাল ল'-এর দ্বিতীয় অধ্যায়। জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং শেখ মুজিব, দু'জনেরই এতে তীব্র আপত্তি থাকা স্বত্তেও ইয়াহিয়া খানের ১৯৭০ সালে নির্বাচন দেয়ার প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতে তারা এই সরকারকে মেনে নেয়। ততোদিনে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছে। শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগের নানাবিধ আন্দোলন ও চাপের মুখে নাজেহাল পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। তারা তাদের কমান্ডার হিসাবে সুযোগ্য কোন অফিসারকে পাঠানোর অনুরোধ জানায় কেন্দ্রে। পাকিস্তানের স্বসস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ কোন অফিসারের কাছেই তখন পূর্ব পাকিস্তানে বদলী হওয়া সুখকর কোন বিষয় ছিলো না। তাই যোগ্য কাউকে পূর্ব পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রন নিতে পাঠানো ছিলো প্রায় অসাধ্য এক ব্যপার। এদিকে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য মেজর জেনারেল মুজাফফরুদ্দিন এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল শাহাবজাদা ইয়াকুব খানের নির্দেশনায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বসস্ত্র বাহিনী শহরগুলোতে ব্যপকভাবে সামরিক মহরা প্রদর্শন করতে থাকে। কিন্তু এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠে। জেনারেলদের এই ব্যর্থতায় অসন্তুষ্ট হয়ে ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ তারিখে মুজাফফরুদ্দিন ও ইয়াকুব খানকে পূর্ব পাকিস্তানের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয় জেনারেল ইয়াহিয়া খান। পাকিস্তান নৌবাহিনীর ভাইস এডমিরাল সৈয়দ মুহাম্মদ আহসান পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছিলেন আইয়ুব খানের শাসনামলে। পূর্ব পাকিস্তান এবং এর পরিস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞ বলে ইয়াহিয়া খান এবার তাকেই পূর্ব পাকিস্তানের সার্বিক দায়িত্ব দেয়ার জন্য বেছে নেয়। ১লা সেপ্টেম্বরে তাকে পূর্ব পাকিস্তানের সম্মিলিত সামরিক জোটের কমান্ডার হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। দায়িত্ব পেয়ে সবার আগে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সব শহর থেকে সেনা প্রত্যাহার করে তাদের সীমান্তে নিযুক্ত করে দেন। এতে করে পরিস্থিতি ধিরে ধিরে ঠান্ডা হয়ে আসে। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে বলা যায় বেশ সুন্দর ও শান্ত পরিবেশের মধ্য দিয়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।


জুলফিকার আলী ভুট্টো


এই নির্বাচনে পাকিস্তানের সর্বমোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৯ আসনই ছিলো পূর্ব পাকিস্তানে। শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা দাবীর সাথে একমত হয়ে বেশিরভাগ বাঙ্গালী এককভাবে আওয়ামীলীগকে ভোট দেয়। ফলাফল হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে আওয়ামীলীগ নিরংকুশভাবে জয়লাভ করে। এতে করে আওয়ামীলীগ এককভাবে পাকিস্তানের সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামীলীগের নিকট-প্রতিদ্বন্দী “পাকিস্তান পিপলস পার্টি”-র নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর জন্য এটা ছিলো বড় এক ধাক্কা। সে স্বপ্নেও ভাবেনি যে এমনটা ঘটতে পারে। এই পরাজয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে সে তার দলের সবাইকে পরবর্তী জাতীয় অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতে মানা করে দেয়। তাকে এটাও বলতে শুনা গেছে যে তার দলের কেউ যদি এই অধিবেশনে অংশগ্রহণ করে, তাবে তার ঠ্যাং ভেঙ্গে দেয়া হবে ধরে। ভুট্টোর দলের চাপের মুখে ইয়াহিয়া খান ২৮শে ফেব্রুয়ারী ১৯৭১ তারিখে মার্চে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে। শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান দুর্বল করার জন্য পিপলস পার্টি ততোদিনে জোরালো লবিং শুরে করেছে উপরমহলে। ভুট্টোকে এও বলতে শুনা গেছে যে সে চায় বঙ্গালীরা ক্ষমতা থেকে দূরে থাকুক। তবে পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে যবার ভয়ে এক পর্যায়ে ভুট্টো মত পরিবর্তন করে দাবী করে যে দুই দলের কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে হবে। (এমনও কথিত আছে যে সিন্ধ প্রদেশের লারকানা শহরে ইয়াহিয়া খানের অজ্ঞাতে ভুট্টোর সাথে গোপন মিটিংয়ে শেখ মুজিবও ভুট্টোকে প্রেসিডেন্ট পদ দিয়ে নিজে প্রধানমন্ত্রী হতে রাজি হয়।)


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান



বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ


এদিকে জাতীয় অধিবেশন পিছিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে ৭ই মার্চের ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সরকারের সাথে অসহযোগ আন্দোলনের আহবান জানান সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের জনগনকে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগন আগে থেকেই সার্বিক অবস্থা নিয়ে ক্ষিপ্ত ছিলো। ৭ই মার্চের শেখ মুজিবুরের ভাষণ ছিলো বারুদের মাঝে আগুনের ফুলকির মতো। পুরো পূর্ব পাকিস্তানের জনগন বলা যায় বিস্ফোরিত হয়। শুরু হয় বিভিন্ন সরকারী অফিস আদালতের যাবতীয় কার্যক্রম বর্জন করা। পূর্ব পাকিস্তানে সরকার তখন জনগন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্যান্টনমেন্ট ও সরকারী কিছু অফিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

এদিকে ভুট্টো ইয়াহিয়া খানকে পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য শুরু থেকেই  চাপ দিয়ে যাচ্ছিলো। পূর্ব পাকিস্তানের এহেন গণবিরোধের মুখে ইয়াহিয়া খান পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করার জন্য তার সামরিক হর্তাকর্তাদের নিয়ে মিটিংয়ে বসে। মিটিংয়ে পূর্ব পাকিস্তানের ভাইস এডমিরাল সৈয়দ মোহাম্মদ আহসান, এয়ার কমোডর মিত্তি মাসুদ ও অল্প কিছু অফিসার বাদে বাকি সব কর্মকর্তা পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের পক্ষে সায় দেয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদস্বরূপ ভাইস এডমিরাল চাকুরী থেকে পদত্যাগ করে তার বাসস্থান করাচীতে ফিরে যায়। পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানে নিরীহ জনগনের উপর সামরিক অভিযান শুরু হলে এয়ার কমোডর মিত্তি মাসুদ পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে এই  নৃশংসতা বন্ধের জন্য চেষ্টা-তদবির শুরু করেন, এবং পরবর্তীতে ব্যর্থ হয়ে তিনিও দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।

মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রেজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী “অপারেশন সার্চলাইট” নামে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা তৈরী করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৭১-এর ২৬শে মার্চ অতর্কিত সামরিক অভিযানে পূর্ব পাকিস্তানের বড় সব শহর দখল করে পরবর্তী ১ মাসের মধ্যে সেখানকার যাবতীয় সামরিক ও রাজনৈতিক বিরোধিতাকারীদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হবে বলে ঠিক করা হয়। কিন্তু তখন তারা কল্পনাও করতে পারেনি যে পূর্ব পাকিস্তানের চাষাভূষা থেকে নিয়ে সর্বস্তরের জনগনের এক অবিস্মরণীয় বিরোধীতার মুখে পড়তে হবে তাদের। অপারেশন সার্চলাইটের মূল লক্ষ্যগুলো ছিলো নিম্নরূপঃ

১) ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেট সহ পূর্বপাকিস্তানের বড় বড় সব শহরে একই সাথে অতর্কিত আক্রমন শুরু হবে।
২) যতো বেশি সম্ভব রাজনৈতিক ও ছাত্র নেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নির্মূল করা হবে।
৩) ঢাকায় অপারেশন অবশ্যই ১০০% সফল হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল করে ফেলতে হবে।
৪) ক্যান্টনমেন্ট দখলের জন্য বেহিসাবে যতো খুশি গুলাগুলি ও খুনখারাবী করা যাবে।
৫) টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও, টেলিগ্রাফ সহ অভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সব মাধ্যম বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে।
৬) বাঙ্গালী সব সৈন্যদের নিরস্ত্র করে ফেলতে হবে। (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের যেখানেই তারা থাকুক)
৭) আওয়ামীলীগকে বিভ্রান্ত করার জন্য ইয়াহিয়া খান তখনও সংলাপ চালিয়ে যাবে, এবং এক পর্যায়ে ভুট্টো না চাইলেও আওয়ামীলীগের দাবী মেনে নেয়ার অভিনয় করবে।
অতএব, আলোচনার নামে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে হাজির হলো। এক পর্যায়ে ভুট্টোও এসে তার সাথে যোগ দেয় আলোচনায়। আলোচনার নামে প্রহসন চলতে থাকে। আর তলে তলে অস্ত্র ও সেনা এনে প্রস্তুতি চলতে থাকে বড় অভিযানের।

ভাইস এডমিরাল মোহাম্মদ আহসানের পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক কমান্ডার হিসাবে তখন লেফটেনেন্ট জেনারেল সাহাবজাদা ইয়াকুব খান দায়িত্বরত। তার নেতৃত্বে ২৫শে মার্চ মাঝরাতের পর সেনাবাহিনী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন শহরে নিরীহ জনগনের উপর বর্বর দানবের মতো ঝাপিয়ে পড়ে। শুরু হয় অপারেশন সার্চলাইটের নামে নির্বিচারে বাঙ্গালী নিধন। ২৬শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে তিনি বাংলাদেশ নামে নতুন দেশ হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে যান। স্বাধীনতার এই ঘোষণাটি ছিলো নিম্নরূপঃ

“Today Bangladesh is a sovereign and independent country. On Thursday night, West Pakistani armed forces suddenly attacked the police barracks at Razarbagh and the EPR headquarters at Pilkhana in Dhaka. Many innocent and unarmed have been killed in Dhaka city and other places of Bangladesh. Violent clashes between E.P.R. and Police on the one hand and the armed forces of Pakistan on the other, are going on. The Bengalis are fighting the enemy with great courage for an independent Bangladesh. May Allah aid us in our fight for freedom. Joy Bangla.”

চট্টগ্রামের কিছু ছাত্র টেলিগ্রাম মারফত এই ঘোষণা হাতে পেলে ড. মঞ্জুলা আনোয়ার তা বাংলায় অনুবাদ করে দেন। কিন্তু নিকটস্থ আগ্রাবাদের রেডিও পাকিস্তানের স্টেশন এটি প্রচারে অসম্মতি জানায়। পরবর্তীতে কালুরঘাট ব্রিজ পার হয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ঘোষণাটি নিয়ে গেলে সেখানকার কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমান ২৭শে মার্চ সন্ধ্যা ৭:৪৫ মিনিটে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন। পরদিন তিনি নিম্নরূপ আরও একটি বার্তা সম্প্রচার করেনঃ

“This is Shadhin Bangla Betar Kendro. I, Major Ziaur Rahman, at the direction of Bangobondhu Sheikh Mujibur Rahman, hereby declare that the independent People's Republic of Bangladesh has been established. At his direction, I have taken command as the temporary Head of the Republic. In the name of Sheikh Mujibur Rahman, I call upon all Bengalis to rise against the attack by the West Pakistani Army. We shall fight to the last to free our Motherland. By the grace of Allah, victory is ours. Joy Bangla.”


মেজর জিয়াউর রহমান


২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা স্বাক্ষরের মাধ্যমেই সমাপ্তি হয় পূর্ব পাকিস্তান অধ্যায়ের। শুরু হয় বাংলাদেশ নামক নতুন অধ্যায়। তবে এই শুরুটা ছিলো অত্যন্ত করুণ, রক্তাক্ত ও ভয়ংকর। হানাদারদের ৯ মাসের বর্বরতা, নিরীহের আর্তি, মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ, বোনের সম্ভ্রম, লক্ষ শহীদের রক্ত, সর্বোপরি সকলের আত্মত্যাগ ও একাত্মতার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের যে অবিস্মরণীয় এক অধ্যায় তৈরি করে গেছে তখনকার বীর বাঙ্গালী, তা এরকম এক ব্লগের ক্ষুদ্র পরিসরে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব না, বিশেষ করে লেখার মূল বিষয় যেখানে পূর্ব পাকিস্তান। পরবর্তীতে নতুন ব্লগে মুক্তিযুদ্ধের উপর আলাদাভাবে লেখার আশা রইলো। এছাড়া সাধারণ জনগনের দৃষ্টিভঙ্গীতে যুদ্ধপরবর্তী দেশ, দেশের সরকার ও সার্বিক পরিস্থিতি কেমন ছিলো সেটার উপরও আলোকপাতের পরিকল্পনা আছে।



রেফারেন্সঃ

http://en.wikipedia.org/wiki/East_Pakistan
http://en.wikipedia.org/wiki/Muhammad_Ali_Bogra
http://en.wikipedia.org/wiki/West_Pakistan
http://en.wikipedia.org/wiki/Six_point_movement
http://en.wikipedia.org/wiki/Operation_Searchlight
http://en.wikipedia.org/wiki/Sheikh_Mujibur_Rahman
বিষয়শ্রেণী: প্রবন্ধ
ব্লগটি ১২৫৫ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৩/০৯/২০১৩

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • তথ্যপূর্ন লেখা। সত্য মিথ্যা যাচাই করতে পারবো না। তবে লেখাটি ভালো লাগলো।
 
Quantcast