www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

একুইটাস

- হাই, বোঁজোঁ।
আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি।
নাক বোঁচা মেয়েটি আবার বলে, হ্যালো।
এবার কিছুটা বুঝতে পারি। সাহস করে বলি, ইয়েস।
এরপরই মেয়েটি গড়গড় করে ক’টি দীর্ঘ বাক্য বলে যায়। যা বোঝার মত অনুভূতি আমার শ্রবণেন্দ্রীয় তৈরী করতে পারে নি। আমি অনেক কষ্টে একটা পুরো বাক্য মনে মনে বাংলা থেকে ইংরেজীতে অনুবাদ শেষ করেছি। বলব বলব, এর জন্য যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করছি। মেয়েটি তখন দ্বিতীয়বার পূর্বের কথার পূনরাবৃত্তি করে। আমি নার্ভাস স্বরে বলেই ফেলি, ‘মিস, তুমি কি দয়া করে কথাগুলো একটু ধীরে ধীরে বলবে?’
মেয়েটির চোখে চট করে তাচ্ছিল্য-দৃষ্টি খেলে। ইংরেজী না বুঝি, চোখের দৃষ্টিতো বুঝি। ওর ভাব দেখে মনে হয়, আমি দক্ষিণ আমেরিকার গহিন আমাজন থেকে উড়ে এসেছি। আদতে আমার ইংরেজীর দৌড় মিয়ার ব্যাটার চেয়ে খারাপ না। আইইএলটিএস দিয়ে নয় এর মধ্যে পেয়েছি সাড়ে সাত। লিসেনিং এ আবার একটু বেশীও, মানে আট। তাই আমাকে ওরাংওটাং ভাবাটা কি ঠিক হচ্ছে? আসলে চাইনিজ মেয়েটির ক্যান্টোনিজ উচ্চারণে ইংরেজী এই বেকায়দার জন্য দায়ী।
এবার মেয়েটি আস্তে আস্তে বলে, তুমি এখানে কেন এসেছ?
দীর্ঘ বাক্য বলার কষ্টকর চেষ্টা বাদ দিয়ে বলি, ট্রেনিং।
- কিসের ট্রেনিং?
- একুইটাস।
মেয়েটি ভ্রু কুঁচকে আমন্ত্রণপত্র দেখে। পাসপোর্ট উল্টেপাল্টে ভিসার পৃষ্ঠা ঘষে-মেজে টেবিলের উপর রাখে। আমার তৎক্ষণাৎ মনে হয় এই বুঝি বলবে, তোমার কাগজপত্রে গন্ডগোল আছে। তুমি ফিরতি প্লেনে দেশে ফেরত যাও। সাথে সাথেই পা অসাড় হয়ে যায়। আবার এতক্ষণ প্লেনে বসে থাকতে হবে! অবশ্য মেয়েটি আবার তার মাতৃভাষার টানে বলে, তোমার কাছে দশ হাজার ডলারের বেশী আছে?
এই পোড়ামুখী বলে কী? দশ হাজার ডলার থাকলে এই মরার দেশে কেউ আসে। মাথা নেড়ে বলি, না।
স্ট্যাম্প দিয়ে ঠাস করে সিল মেরে বলে, ওয়েলকাম টু মন্ট্রিয়াল।
আমি লাগেজের ট্রলিটা ঠেলতে ঠেলতে ইন্টারন্যাশনাল এরাইভালের দিকে এগোই। একটা খচ খচ অনুভূতি থেকেই যায়। মেয়েটিকে থ্যাংক ইউ বলা হয় নি। আমার কী দোষ। দেশে থ্যাংক ইউ, ধন্যবাদ - এসব কি চালু আছে। মনে হচ্ছে ফিরে গিয়ে ধন্যবাদটা বলে আসি। তবে পিছনে তাকিয়ে সে সম্ভাবনার আগুনে পানি ঢেলে দেই। বিশাল এয়ারপোর্টের যে জায়গা ছেড়ে এসেছি সে জায়গায় খুঁজে পোঁছানো আমার পক্ষে সম্ভব না।
মন্ট্রিয়াল নেমেছি বিকালের দিকে। পিয়েরে এলিওট ট্রুডো এয়ারপোর্টটা বেশ বড়। নেমেই কিছুক্ষণ বোকার মত তাকিয়ে ছিলাম। ইংরেজী লেখা কিছু বুঝা গেলেও ফ্রেঞ্চ বিন্দু-বিসর্গও জানি না। দু’একটা ফ্রেঞ্চ শব্দ যে শিখে আসব তারও সময় ছিল না। হঠাৎ করেই সব হয়ে গেল। দুপুরে ঢাকার বাসায় বসে আছি একদিন। সুদূর কানাডা থেকে ফোন, তোমার দরখাস্ত আমরা পেয়েছি। তোমাকে একটা আমন্ত্রণপত্র পাঠাবো। তুমি এত অল্প সময়ে ভিসা করতে পারবে?
আমি বহুকষ্টে ইংরেজীতে বলি, আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট।
- ওকে, ডু ইওর বেস্ট।
সরকারি চাকরি করি, মহা ঝক্কি। দেশের বাইরে যাবা, কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে। ডিজি মহোদয় দরখাস্ত দেখে বলেন, তুমি কানাডা গেলেতো ফিরে আসবে না। ক’দিন আগেই সহকর্মী আকরাম একই কাজ করেছে। ডিজির পিএস ছিল সে। কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ করে কানাডা ছুট।
- স্যার, আমি চলে আসব। কথা দিচ্ছি।
মন্ত্রণালয়ের রেজাইল ভাই কী এক অজানা কারণে দারুন পছন্দ করেন আমাকে। চা নাস্তা খাওয়ান। এরপর নিজে ফাইল বগলদাবা করে সচিবের সই নিয়ে আসেন। আর ট্রাভেল এজেন্ট রাজা ভাই চটজলদি গালফ এয়ারের একখান টিকিট কেটে দেন। বাহ! সব রেডি। ঢাকা এয়ারপোর্টে গিয়ে পুরাই বিষম, আপনি বিজনেস ক্লাসে চেক-ইন করেন। আহারে! স্যুট-টাই পড়া সেই লোকটাকেও ধন্যবাদ দেয়া হয়নি। ঐ যে, কালচারে নেই। অবশ্য লোকটার ধন্যবাদ না, তার চেয়ে বেশী কিছু প্রাপ্য ছিল। প্লেনের মধ্যে সোফা-জাতীয় সিটে বসেছি এই প্রথম। মেনুর দিকে হাবলার মত তাকিয়ে থাকি, কী অর্ডার করব?
মোনালিসার হাসি দিয়ে এয়ার হোস্টেজ বলে, ড্রিঙ্কস লাগবে?
- পানি। কোনমতে ঢোক গিলে বলি।
মানামা সিটিতে বার ঘন্টার স্টপ ওভার। একটু ঘুরে ফিরে দেখব। হোটেলের অটোমেটিক গ্লাসডোর থেকে বের হয়েছি। উনপঞ্চাশ ডিগ্রির গরম তাওয়া ছ্যাৎ করে গায়ে লাগল। দৌড় দিয়ে সেই যে রুমে ঢুকেছি, এয়ারপোর্ট শাটলের আগে দরজাই খুলিনি। অত্যধিক গরমের কারণে হতে পারে। আমার বিখ্যাত ভুলো মনের কারনেও হতে পারে। সমস্যা একটা করে ফেলেছি। হোটেলের ক্লোজেটে বন্ধু সাব্বিরের দেয়া চমৎকার জ্যাকেটটা রেখেই এয়ারপোর্টে চলে এসেছি। এয়ারপোর্টের ইনফরমেশন ডেস্কে গিয়ে মুখ কাচুমাচু করে বললাম, ভেজাল হয়ে গেছে একটা।
ওরা ফোনটা হাতে দিয়ে বলে, এখন তো নিয়ে আসার সময় নাই। তুমি ফোন করে দাও । হোটেল যতœ করে রেখে দিবে।
আমি টেলিফোন হাতে নিয়ে কাঁপি। ওপাশ থেকে বলেই চলেছে, হ্যালো, হ্যালো।
জগাখিচুরী করে কী বলেছিলাম আল্লাহপাকই জানেন। তবে মাস খানেক পরে দেশে ফেরত আসার পথে জ্যাকেটটা ঠিকই ফেরত পেয়েছিলাম।
বাহরাইন থেকে লন্ডন হয়ে মন্ট্রিয়াল নেমেছি কিছুক্ষণ আগে। ইমিগ্রেশন-কাস্টমস পার হয়ে এগোতে থাকি। এরাইভালের কাচের দরজা খুলে যায় আপনা আপনি। কত লোক দাঁড়িয়ে আছে স্বজনের জন্য। আমি চোখ বুলিয়ে আবার ট্রলি ঠেলে এগোতে থাকি। হঠাৎ করেই মনে হয়, আরে! নিজের নাম লেখা দেখলাম কোথাও। এয়ারপোর্টে কেউ আমার নাম বোর্ডে লিখে দাড়িয়ে থাকবে? এটা কি আমি স্বপ্নেও ভেবেছি? আবার চোখ বুলাই দর্শণার্থী-সারিতে। তাইতো, একটা বোর্ডে লেখা আছে ‘মি: আবু সাইদ’। এয়ার কানাডার লন্ডন-মন্ট্রিয়াল ফ্লাইটে আমার গতরের অনেকেই আছে। সুতরাং যে প্লাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাকে বেশ পাজল্ড মনে হল। এর মধ্যে কেউ কেউ নিজের নাম দেখে হাত তুলে মিলে যাচ্ছে ওদের সাথে। আমার কেন যেন সন্দেহ হয়, এটা আবু সাইদ নামের অন্য কেউ। তাই হাত তুলে হাই বলার সাহস হয় না আর।
দর্শণার্থী সারি পার হয়ে ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে এক কোণায় গিয়ে বসি। কী করব বুঝতে পারছি না। যাও বা সাহস করে হাত তুলে হাই বলতাম। কিন্তু প্লাকার্ড ধরা মেয়েটির ঝলসানো রূপ দেখে পয়লাতেই চুপসে গেছি। সব যাত্রীরা হাসিমুখে যে যার মত চলে যাচ্ছে। আমি কেবলার মত বসে বসে ভাবছি, কী করব। প্লাকার্ড ধরা মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। আর এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। আমি পুরো বাক্যটা কয়েকবার আউড়ে মুখস্থ-মতন করে ফেললাম। এরপর সাহস করে মেয়েটির কাছে গিয়ে গড়গড় করে বলে ফেলি, তুমি কি আবু সাইদ নামের কাউকে খুঁজছ?
মেয়েটি কী বুঝলো কে জানে। মিষ্টি হাসি দিয়ে যা বলল তার তরজমা, আমিতো ধরেই নিয়েছিলাম তুমিই সে। নাম দেখে হাত তোলনি কেন? শুধু শুধু কতগুলো সময় নষ্ট হলো।
- দুঃখিত মিস। এরপর বলতে ইচ্ছে করছিল, আমার সাহস হয়নি তাই হাত তুলিনি। কিন্তু ইংরেজিতে এটা বলার ক্ষমতা এই মুহুর্তে আমার নাই।
হালকা সোনালী রঙের ফোর্ড টেরিটরিতে উঠতে উঠতে মেয়েটি বলে, মি: সাইদ তুমি কি ফ্রাঙ্কোফোন না অ্যাংলোফোন?
আমার আবার সেই বিখ্যাত ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টি।
মানে তুমি ইংরেজী না ফ্রেঞ্চ স্পীকিং?
- বাংলা।
মেয়েটি হাসে। আহারে! কী সুন্দর হাসি। মনে মনে একটা বাক্য তৈরী করছি। মেয়েটিকে বলব, তোমার হাসি জ্যোৎ¯œা রাতের চাঁদের চেয়েও সুন্দর। তখনি সে বলে উঠে, মন্ট্রিয়াল আগে এসেছো?
নো।
তাহলে তো তোমার জন্য ভালই। নতুন একটা শহর দেখবে।
ইয়েস মিস।
এক শব্দের ঘেরাটোপে পড়ে কথা আর এগোয় না। আধা ঘন্টা মতন গাড়ি চালিয়ে আমাকে হোস্টেল টাইপের দালানের সামনে নিয়ে আসে। মি: সাইদ, তুমি লাগেজ নিয়ে ভিতরে যাও। ওরাই সব ব্যবস্থা করে দিবে।
মেয়েটি ভুস করে গাড়ি নিয়ে চলে যায়। বোধ হয় পরবর্তী যাত্রী আসছে। আর আমি চারিদিকে তাকিয়ে দেখি। বিদেশ দেখে নাক সিটকানো মানুষ আমি না। সুন্দরকে সুন্দর বলতে বাঁধা নেই আমার। ঢাকা শহরের কংক্রিট-জঙ্গল ছেড়ে এ কোথায় এসে পড়লাম। চারিদিকে ঘন সবুজ, সারি সারি গাছ। কার্পেটের মত ঘাসের মাঠ। কাছেই সেন্ট লরেন্স নদী বইছে কুল কুল করে। মন্ট্রিয়াল মূল শহর থেকে অনেকখানি দূরে ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির জন অ্যাবোট কলেজ ক্যাম্পাস এটা। এত সুন্দর সব! বছরের ছয় মাস বরফে ঢাকা থাকে এদের। তারপরও এত সবুজ কোথায় পায়?
আমায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভিতর থেকে একজন বেড়িয়ে আসে, কাম ইন ম্যান।
আশ্চর্য! এটাও মেয়ে। কামরুপ কামাখ্যায় এসে পরলাম নাকি।
মেয়েটি লাগেজ ঠেলে একটা রুমে ঢুকিয়ে দিল, কাল থেকে প্রশিক্ষণ শুরু। সকাল আটটায় রেজিস্ট্রেশন। ক্যাম্পাসের একটা ম্যাপ ধরিয়ে দিয়ে বলে, সকালে এখানে চলে আসবে। তোমাদের খাবার এই ডরমিটরিতে আছে। সময়মত ডাইনিংএ গেলেই পাবে।
আমি রুমের সৌন্দর্যেও মুগ্ধ। আমার আসলে মুগ্ধ হবার বাতিক আছে। যা দেখি তাতেই বিস্মিত হই। এই যে মেয়েটি আমাকে রুমে রেখে গেল ওকে দেখেও মুগ্ধ। ওর সারা মুখে সাদা চামড়ার উপর বাদামী ফোটা ফোটা, বিশাল শরীর - অথচ আমি তাতেও মুগ্ধ। রুমে মাঝারি সাইজের একটা খাট, টেবিল চেয়ার, এটাচড বাথরুম। আমার একার জন্য আর কী লাগে? আহ!
কাপড় ছেড়ে ডাইনিং এ খেতে গেছি। ওয়াক থু করতে করতে গলা ব্যাথা হয়ে গেল। ঝাল-মরিচ-লবনবিহীন কী সব খাবার। বউয়ের কথা মনে হলো, বউ তুমি কই? পরানটা হু হু করে উঠে। মনে হয় সব ছেড়ে ছুড়ে বউয়ের রান্না করা পাতলা ডালে হাত চুবিয়ে ভাত খাব।
প্রচন্ড খিদে পেটে। আসার সময় বউ বুদ্ধি করে চাল-ডাল দিয়ে দিয়েছে। আরও অনেক কিছু আছে, চানাচুড় মুড়িও আছে। লক্ষী বউ জানে, এই লোকটার খাওয়া নিয়ে মহা ঝামেলা। ডরমেটরির ছয়টি রুমের জন্য একটা করে কমন কিচেন আছে। আমি ডাইনিং থেকে ধার করা পেয়াজ দিয়ে চাল-ডাল-মশলাপাতি মিশিয়ে চুলায় সাজিয়ে দিয়েছি। হাড়িও ঢাকা থেকে নিয়ে এসেছি। কাঁচা মরিচের অভাবে জিহ্বা আড়ষ্ঠ। আহারে! এই জিনিস তল্লাটের আশেপাশেও নেই। মোজাম্বিক থেকে আসা জর্জ ওর কালো মুখের লাল চোখে অবাক হয়ে দেখে।
আমি গ’লে যাওয়া খিচুরী গলায় দেই আর বউয়ের জন্য কাঁদি। ছেলে-মেয়ে দু’টো কী করছে কে জানে? ঘুমাতে গিয়ে আরেক সমস্যা। রাত ভোর হয় প্রায়, ঘুমের দেখা নেই। ভোরের দিকে হালকা চোখ লাগলেও অ্যালার্মের সাথে ধরফর করে উঠি। একুশ দিনের প্রশিক্ষণে এসেছি। মানবাধিকারের উপর বিরাট প্রশিক্ষণ। মন্ট্রিয়ালের একুইটাস নামের প্রতিষ্ঠান এর আয়োজক। সারা পৃথিবী থেকে একশত বিশ জনের একটা দল আনে এরা প্রতি বছর। ধুন্ধুমার কান্ড! ষাটটির মত দেশ থেকে প্রশিক্ষণার্থী আসে, বাংলাদেশ থেকেও দুই জন। কেমনে কেমনে যেন আমি এর একজন। বাকী জন রাকিব, এশিয়া ফাউন্ডেশনে চাকরি করে। প্রচন্ড ক্যারিয়ারিস্ট ছেলে - উঠতে উঠতে পারলে আকাশে উঠে যাবে। আর আমি হচ্ছি তার উল্টো - পাতালে আছি? ঠিক আছে, ভালই তো আছি।
প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে গেছে যথারীতি সকাল আটটায়। দশটা নাগাদ আমার ঘুমের সময় হয়ে গেছে। সারাহ নামের বুড়িটি কী বলছে না বলছে, তা কে শোনে। একেতো ভাষার সমস্যা, তার উপর ঘুম। এই রসকষহীন বক্তৃতা পাঁচ মিলিগ্রামের জলপিডেম-এর কাজ করে। এতো মহা ঝামেলা দেখছি। আল্লারে ডাকি, বউরে ডাকি। কোন কাজ হয় না। সবার উপরে ঘুম সত্য, তার উপরে নাই। অথচ রাত হলে চোখে ঘুম নেই এক বিন্দু। বিরক্তির চোটে মনে হয় সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে ঢাকা চলে যাই।
কে যেন চোখে সুপার গ্লু লাগিয়ে দিয়েছে। দিনের বেলা দু’চোখের পাতা খোলা রাখতে পারি না কোনভাবেই। ঘুম ঘুম চোখেই মেয়েটিকে লক্ষ্য করেছি প্রথম দিনেই। আমাদের সেকশনে সে। মোট আটটি সেকশনে ভাগ করা হয়েছে একশ বিশ জনকে। ছ’টি ইংরেজি ভাষাভাষির আর দু’টি ফ্রেঞ্চ। এডলিরা জনি, এডা বলেই ডাকে সবাই মেয়েটিকে। আমি কিছু বলি না, তাকিয়ে থাকি শুধু। পরী দেখি। এত সুন্দর মেয়েও হয়! গ্রিক দেবীরাও যে লজ্জা পাবে। আবার ঘুমে ঢলে পরি। আলবেনিয়া থেকে এসেছে সে। ছয় ছয়টি ভাষায় অনর্গল কথা বলে।
মেয়েটির দয়া হয় কীনা কে জানে। পরের দিন আমার পাশে এসে বসে। টুকটুক কথা বলে, মানবধিকার-প্রশিক্ষণ-দেশ-পরিবার। এরপর পাশেই বসে প্রতিদিন, কথা বলে আর বলে। আমার ঘুমের আর দেখা নেই। প্রশিক্ষণকে মনে হয় ফুলের বাগান। সারাহ যা বলে তাই করি, প্রচন্ড উৎসাহে করি। এডাকে দেখাতে হবে না? একটা নাটক করতে হয় প্রশিক্ষণের প্রয়োজনে। মেয়ে শিশুদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে এরকম বিষয় নিয়ে। নাটকে এডা আমার স্ত্রী। সন্তান জন্ম দেয় সে, মেয়ে শিশু। সেই শিশুর নানা সমস্যা নিয়ে নাটক। সকলে অভিভূত অভিনয়ে। নাটক শেষে এডাকে বলি, আমরা এখানে এসেছি পনের দিন হলো, রাইট? খুবই সিরিয়াস আমার বলার ভঙ্গি।
এডা হরিণি চোখ তুলে বলে, তো কী?
- এত তাড়াতাড়ি তুমি প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলে?
হাতের ফোল্ডারটা সজোরে পিঠে মেরে বলে, ইউ নটি বয়।
বাদবাকী দিনগুলো উড়তে উড়তে চলে যায়। প্রশিক্ষণ কক্ষে, ক্যাফেটেরিয়ায়, ডাইনিং হলে কত কথা। প্রশিক্ষণ শেষে নদীর পারে বসে বসে ঘাস ছেড়া আর কথা বলা। দুই ভিন্ন সংস্কৃতির ছেলেমেয়ের বন্ধুত্ব গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে থাকে। সুখের কথা বলে সে। বলে দুঃখের কথাও। আলবেনিয়ার কথা, তার শহর তিরানার কথা। রেখে আসা বয়ফ্রেন্ডের কথা। গালা নাইটে মিউজিকের তালে তালে দু’জনের নাচ। নাচতে জানি না তাই বসে পরি মাঝে মধ্যেই। সে কি উৎসাহ মেয়েটির, এখান থেকে নড়বে না। আমার হাতটা ধরো। এখানে, হ্যা, কোমরের কাছটা ধরো। আহ! লজ্জা পাচ্ছ কেন? আমরা বন্ধু না। আমি বাঙাল, কী বলব?
পরের দিন একে একে সব বিদায় নিতে থাকে। প্রথম দিনের রূপে ঝলসানো সেই সুন্দরী বিকালে আসবে আমাকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যেতে। সকাল থেকেই ডরমিটরিতে মনমরা হয়ে বসে আছি। ইরাকের ফিরাজ লাইক ভবনটির নাম দিয়েছে আবু গারাইব কারাগার। শেষ দিনটা সত্যিই বন্দি কারাগারের মত লাগছে।
এডাকে বলেছিলাম দুপুরে বাংলাদেশী খিচুরী রান্না করে খাওয়াব। কিন্তু সে আসে নি। বিদায়ের সময় মেইন গেটের কাছে তাঁর সাথে দেখা। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। চোখ ছল ছল, কেঁদে ফেলবে নাকি। ইউরোপের মেয়েরা কাঁদতেও জানে?
সাইদ, আমি ইচ্ছে করেই তোমার খাবার খেতে যাই নি। একটু পরেই তুমি চলে যাবে তা সহ্য করতে পারছিলাম না। তুমি ভাল থেক। তোমার স্ত্রীকে আমার শুভেচ্ছা দিও। সে ভাগ্যবান, তোমার মত একটা স্বামী পেয়েছে।
জগতের সব কষ্ট সাথে নিয়ে প্লেনে উঠি আবার। দুনিয়াটা বড় রহস্যময়। কোথায় কখন কতটুকু কষ্ট লুকিয়ে আছে তা শুধু বিধাতাই জানেন।
বুক ভরা কষ্ট নিয়ে মানামার সেই হোটেলে রেখে যাওয়া জ্যাকেটখানা নিয়ে ঢাকায় ফিরি।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৩৭৫ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৫/০২/২০১৮

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • খুব সুন্দর
  • মধু মঙ্গল সিনহা ১৫/০২/২০১৮
    সুন্দর লিখা !অনেক ধন্যবাদ ,শুভেচ্ছা জানবেন .....
  • চমৎকার লেখা।
 
Quantcast