www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

দৈনন্দিন আমরা

পরাজিতই হয়েছি সর্বদা। পরাজিত 'যোদ্ধা' একথা বলারও সুযোগ নেই। যুদ্ধে জয়পরাজয় চিরন্তন। আর যুদ্ধ না করলে? সে দশা হয়েছে যে! সম্মুখযুদ্ধ তো দুরের কথা জীবনে কোন জটিলতার মুখোমুখি হলেই লেজ গুটিয়ে পলায়নে চিরভাস্বর। ফলাফল, নিত্যসংগী পরাজয় আমার। সম্প্রতি জীবনযুদ্ধে আরও একটি বিশাল, বোধকরি সবচেয়ে বড় পরাজয় স্কন্ধে ভর হোল। কী লজ্জা! কী অপমান!
প্রায় শতায়ু এক বুড়ির নামে শপথ নিয়েছি সেদিন। এই ভদ্রমহিলার পূর্বপুরুষ দুইশত বছর ধরে আমার মায়ের দেহকে ক্ষতবিক্ষত করেছে হিংস্র থাবায়। ভারতবর্ষের চমৎকার অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধকে দলিতমথিত করে চারিদিকে প্রজ্বলিত করেছিল বিভেদের অনির্বাণ শিখা। সে আগুনে বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়েছে অনেক আগেই। যার দহনে আমার প্রিয় বাংলাও আজ জ্বলছে। ‘ব্রিটিশ’ যেখানে কুচক্রীজাতীয় একটা গালির নাম। সেই ব্রিটিশ কুইনের নামে ডান হাত উঁচু করে নাগরিকত্বের শপথ নিয়েছি। কানাডার নাগরিকত্ব। বলেছি, ‘লং লিভ আওয়ার কুইন।‘
না, কেউ আমাকে বাধ্য করেনি, কেউ প্ররোচিতও করেনি। এ আমার পরাজিত-পলায়নপর মানসিকতারই ঘৃণিত বাস্তবায়ন। যেন এই ছিল অবশম্ভ্যবী। আমার আরও একটি অবধারিত পরাজয়ের অগ্নিতীলক এই শপথ। পরাজয়ের এবং পলায়নের সর্বশেষ প্লাটিনামের মেডেল। না জানি ভবিষ্যতে আরও কত পরাজয় লেখা আছে জীবনে!
তবে একটা আশার কথাও আছে। দুষ্ট গরুর চেয়ে শুন্য গোয়াল ভাল। আমার সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা বাংলা মায়ের আঁচল থেকে একটি দুষ্ট কুলাংগার টুপ করে ঝরে গেল। কুলাংগারের কী হল তাতে কী আসে যায়, বাংলা মা সত্যিকারের স্বস্তি পেল এটাই বড় কথা। যদিও মায়ের কাছে সন্তানের সবচেয়ে বড় অন্যায়ও ক্ষমার যোগ্য। আমি ক্ষমা চাওয়ার মত ধৃষ্টতা দেখাতে চাই না। আমার মত কুলাংগারের সে অধিকারও নেই। শুধু বাংলা মায়ের অসীম কৃপা যদি প্রবল বর্ষণে বর্ষিত হয় আমার উপর।
কানাডা এসেছি নাগরিকত্বের শপথ নেয়ার বছর চারেক আগে, পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট হিসেবে। তারও অনেক আগে বাংলাদেশের মাদারীপুরে আমার জন্ম। ওখানেই বেড়ে ওঠা। দুরন্ত শৈশব-কৈশর পেরিয়ে যৌবনের ঊষালগ্ন - সে ঐ ছোট্ট মফস্বল শহরটিতেই। জীবন ছিল সহজ-সরল বহমান নদীর মত, জটিলতা তখনো ওখানে ছায়া ফেলে নি। আমাদের বেড়ে উঠাও ছিল তেমনি জটিলতাবিহীন। কিন্তু চলমান বাস্তবতায় জীবনটা আর শৈশবের মত নির্ঝঞ্জাট-নিস্তরঙ্গ থাকেনি। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে মহা-আলস্য গেড়ে বসেছে জীবনে এখন।
আলস্যের শেষ সীমানা কবেই লংঘিত! একটা ফুল-কোর্স ডিনার শেষ করে প্রাইম নিড হল ডেন্টাল ফ্লস এবং টুথপেস্টের উপর লবণের গুড়া ছিটিয়ে দাঁত ব্রাশ। এহেন দরকারী মুহুর্তে Sensodyne-এর প্যাকেটে চাঁপ দিলেন কিন্তু পেস্ট বের হচ্ছে না। মন খারাপের কিছু নেই। এখানেইতো খেলা শুরু। ঘাসে বসে বাদাম খেলে কখনই শেষ হয় না, হাতড়ে-পাঁতরে কিছু আছেই। টুথপেস্টও তাই, জীবনেও শেষ হয় না। চাঁপলে কিছু না কিছু বের হবেই। চেষ্টা করে দেখেন, গ্যারান্টিড। সদ্য বের করা পেস্টের দিকে তাঁকিয়ে মুচকি হাসি আমি। তারপরও প্যাকেটটা কিন্তু ফেলে দেই না, যদি আবার লাগে! ঘটনাটা আরেকটু লম্বা। শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়েছি, শরীর ভেজা। Dove-এর কৌটা উপুর করি, শ্যাম্পু বের হয় না। অনেক ঝাঁকিয়ে, পানি ভরে উল্টে-পাল্টে ঠিকই একটুখানি বের করে কাজ শেষ। পুনরায় যথাস্থানে রেখে দেয়া, যদি আবার!
বাইরে গিয়ে পেস্ট-শ্যাম্পু কিনে আনতে ভুলে গেছি বিষয়টা কিন্তু এত কঠিন না। বাজার-হাট, কেনাকাটা আমি করি না। তাইলে জীবনেও ঐ জিনিস বাসায় আসতো না, প্রত্যেকবার ভুলে যেতাম। যাহোক, বিচিত্র কারণে অন্যান্য পাবলিক প্লেসের মত আমাদের বাসায় জেন্টস আর লেডিস টয়লেট আলাদা। আর সমস্ত ইনভেন্টরি এবং সাপ্লাই লেডিস ওয়াশরুম থেকে জেন্টসের দিকে টাইম-টু-টাইম ধাবিত হয়। আলসেমি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে – ঐ বাথরুমে গিয়ে পেস্ট বা শ্যাম্পু নিয়ে আসব, আরে ধুর! চিপ্পা-চাইপ্পা চালিয়ে দেই।
দুর্ভাগ্য আর সৌভাগ্য যাই হোক জীবনটা এরকই হয়ে গেছে – সবসময় কিনারার কাছে, অ্যারোস্মিথের Livin' on the edge। আমাকে নিরন্তর ঠেলেঠুলে-চেপেচুপে মুলধারায় আসতে হয়। তবে কিনারার কাছে থাকার মজা খারাপ না। মধ্যসাগরে জলের থৈ থৈ – সব আছে কিন্তু কী যেন নেই। কিনারায় জল-মাটির মিতালী। কোন সন্দেহ নেই, বেস্ট সার্ফিং কিনারাতেই হয়?
মহাআলস্যের সাথে আবার যোগ হয়েছে বিখ্যাত ভুলোমন। আইনস্টাইন ছিলেন ভুলোমনের সেরা। সিগারেট ধরাতে যেয়ে প্রেমিকার আঙ্গুলই প্রায় ধরিয়ে ফেলেছিলেন। আর ঠিক ঐ মুহুর্তেই নাকি উনি টুপ করে আপেক্ষিকতার তত্ত্বটাও দিয়ে দিছিলেন। তবে আইনস্টাইনের আমলে কমপক্ষে দু’টা সুবিধা ছিল একথা অনশ্বীকার্য। এক - যখন তখন, যেখানে খুশি সিগারেট খাওয়া যেত। দুই - প্রেমিকার আঙ্গুলে আগুন লাগালেও তেমন অসুবিধা নাই। আর আমার? আহারে! বিড়ি-সিগারেটতো কবেই বাদ। ভুলক্রমেও যদি বউয়ের আঙ্গুলে আগুন ধরিয়েছি, বউ ছর্তা দিয়া কচ কইরা আমার আঙ্গুলই কাইটা ফালাইবো। এত সতর্কতার মধ্যেও সেদিন কেমন একটা গড়বড় হয়ে গেল!
আজকাল সবকিছুই তো রেডিমেইড। এমনকি বাচ্চাসহ বউও নাকি রেডিমেইড। তো আমি রেডিমেইড পরাটা বের করেছি ফ্রিজ থেকে, নাস্তা করব। ইলেকট্রিক হিটারে তাওয়া গরম দিয়েছি। প্যাকেট থেকে পরাটা বের করে তাওয়ায় দিয়েছি। এখন খুন্তি দিয়ে উল্টেপাল্টে দিব। কিরে! খুন্তির মাথা কেমন আটকে যাচ্ছে, আঠাআঠা লাগছে। ও! মাই! গশ! আমি করেছি কী? পরাটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছি আর প্লাস্টিক তাওয়ায় দিয়েছি। ঠিক সে মুহূর্তেই আইনেস্টাইনের মত টুপ করে একটা হাইপোথিসিস দিয়ে ফেললাম – ‘রেডিমেইড পরাটা ভাজা হবে কি হবে না তা সেই সময়ের মানসিক অবস্থার সাথে ডাইরেক্টলি প্রোপোরশনাল। এখানে লাকড়ী, গ্যাসের চুলা বা ইলেকট্রিক হিটারকে কনস্ট্যান্ট বলে ধরে নিতে হবে। আর অ্যাসাম্পশন হোল সময় চিরন্তন, কোনক্রমেই আলোর বেগের সাথে সম্পর্কিত নয়’।
প্রবাস জীবনটা চলছে এরকমই ভুলে ভুলে ভরা। অটল বিহারী বাজপেয়ীকে নিয়ে আমজনতার বরাবরই একটা আফসোস ছিল, ‘আহারে! সঠিক লোকটি ভুল জায়গায় বসেছে’। আমি নিজেরে নিয়ে ঠিক উল্টো আফসোস করি, ‘ভুল লোকটি যেন সঠিক জায়গায় বসে আছে’। কেন বললাম? আজকের সকাল, কোন কাজ নেই। আমি পাকস্থলী ভর্তি করে একেবারে গলা অব্দি নাস্তা খেয়ে উঠলাম। এক্ষণে এক কাপ চা নিয়ে বউয়ের নিজের হাতে বানানো উলের চাদরটা গায় পেচিয়ে সোফার উপর দু’পা উঠিয়ে বসেছি। হুমায়ূন আহমেদের একটা হাসির নাটক ছেড়ে দিয়ে স্বল্প চুমুকে আয়েশ করে রসিয়ে রসিয়ে চা খাচ্ছি। আরামটা এমন অবস্থায় চলে গেছে যে সামনে দিয়ে ৭০টা হুরপরী বা সরাবের নহর-ফহর বসিয়ে দিলেও, হু কেয়ারস। এমন সময় রঙ্গমঞ্চে তাঁর আগমন। ‘সোফায় পা তুলেছ কেন? পা নামিয়ে বস’। ‘একি! চায়ের কাপটা এখানে রেখেছ কেন? যাও কিচেনে রেখে এস’। হায়রে আরাম!
সঠিক কাজটি যথারীতি ভুলভাবে করায় বাড়িতে ‘নোংরা’ হিসেবে আমার খ্যাতি শুরু থেকেই। ক্যালগেরিতে মোটামুটি একটা অলিখিত নিয়ম আছে যে ভাবীরা রান্না করেন আর ভাইরা বাসন-কোসন ধোয়। আমি দৈবক্রমে এ নিয়ম থেকে মুক্ত। কারণ আমি ধোয়ার পরও যখন ঐ জিনিস দ্বিতীয়বার ধুতে হয় তাহলে আর আমার ধুয়ে লাভ কি? ব্যপারটা আমার জন্য শাপেবর! কিন্তু ভেজালটা বাঁধল একটু আগে। ফাজিল মেয়েটা তাঁর মাকে বলছে, ‘আম্মু, তুমি বলত ওয়ার্ল্ডের ডার্টিয়েস্ট পারসন কে?’ ওর মা বলে, ’আমি কীভাবে বলব?’। মেয়েটি বলে কি, ’তুমি জান না! একজন হচ্ছে তোমার হাজবেন্ড, আর আরেকজন তোমার সান’। মহা-ফাজিল! মেয়ের মাতো মহাখুশী, ‘শুনেছো, মেয়ে কী বলছে’। আমি বোবা, গভীর মনোযোগ দিয়ে আমার ১৬ পাতার বিজনেস প্লান লিখছি। এদিকে ছেলেটাও মাশআল্লাহ! বাপেরে ফেল! সকালে কম্বলের তলা থেকে বের হয় আবার রাতে টুক করে ওখানেই ঢুকে যায়। কেউ হাত না দিলে বছর খানেক ওভাবে থাকবে নিশ্চিত। আমার রেকর্ড ছিল ছেচল্লিশ দিন বিছানা না গোছানো (কয়েকমাস আগে যখন পরিবার দেশে ছিল)। আর আমার ছেলে! ওর মা না থাকলে ব্রায়ান লারার ৪০১ কবেই ভেঙ্গে দিত।
আমার এই ছেলেটার বছর বিশেক বয়স এখন। বিশ বছর আগের! সময়টা একেবারে কম না। হলি ফ্যামিলির বারান্দায় বসে আছি। একা। জ্যোৎস্না রাত। আকাশে মস্ত এক চাঁদ বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে। ডেটলের তীব্র গন্ধ বারে বারে মনে করিয়ে দিচ্ছে - আমি হাসপাতালে আছি। রাত বেশ গভীর। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। কুকুরের ঘেউ-ঘেউও শুনছি না। প্রকৃতি তাঁর মত করে সেজেছে, নতুন আগমনী বার্তা পেয়ে। থেকে থেকে শুধু ভেসে আসছে একটাই শব্দ, লেবার রুম থেকে। তীব্র ব্যথা আর কান্নার মিশ্রণে অপার্থিব লাগছে শব্দটা, অন্তত আমার কাছে। সেই সাথে তারস্বরে চিৎকার ‘ডাক্তার, আমারে সীজার করেন। ডাক্তার, আমারে সীজার করেন’। মমতাময়ী নার্স অসীম ধৈর্য নিয়ে বলেই যাচ্ছেন, ‘আপনার সব ঠিক আছে, সীজার করা লাগবে না।‘ সারা রাত ধরে দুই নারীর এই কথোপকথন শুনে যাচ্ছি। মনে হচ্ছিল অনন্ত অসীম সে মুহূর্ত! আর যেন শেষ হবে না। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমার এ মুহূর্তে আর প্রকৃতি দেখার সময় নেই। সমস্ত ইন্দ্রিয় একযোগে লেবার রুমে তাঁকিয়ে আছে। কখন মুহূর্ত আসে। অবশেষে শেহ হয় অপেক্ষার!
সেই ছেলেটি আজ কত্ত বড় হয়েছে! বাংলাদেশ থেকে একা একা ক্যালগেরি আসছে। আর ৩০ মিনিট পর ওর সাথে দেখা হবে দীর্ঘ এক মাস পর। মায়াভরা ছেলেটি আমার সারা পথ কাঁদতে কাঁদতে আসছে। সুদীর্ঘ ছয় বছর পরেও ও বলে কানাডা আমার দেশ না, আমি বাংলাদেশে ফিরে যাব। এটিই ওর শেষ মেসেজ। আমার শরীর তির তির করে কাঁপছে। এতদিন ভাবতাম, ও আমার কিছুই পায় নি। এখন মনে হচ্ছে, না। আমার মনে দেশের প্রতি যে তীব্র মমতা আছে, সেটা ওকে ছুয়েছে। ও আমার সব পেয়েছে। আমার জীবন সার্থক মনে হচ্ছে।
ছেলেটা এই শীতে আবার দেশে যেতে চাচ্ছে। ও যদি বলত এলএ যাবে হলিউড দেখতে বা ডিজনিল্যান্ড দেখতে যাবে, নিদেনপক্ষে ভেগাস যাবে – আমি একটু গাইগুই করতে পারতাম। অত্যুৎসাহে বলত ডগ-স্লেজিং করতে ইয়েলোনাইফ যাবে তাতেও আমার আপত্তি থাকতে পারত। ইউরোপে গিয়ে ইফেল টাওয়ারে যাবে, ট্রাফালগার স্কোয়ার দেখবে – আমি স্ট্রেইট না বলে দিতাম এখন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফল আর উইন্টার সেমিস্টারের মাঝে ক্রীসমাসের ব্রেক। সপ্তাহ তিনেক পড়াশুনা নেই। ছেলেটা বাংলাদেশে যেতে চায়! আমি কীভাবে না করি?
বছর খানেকও হয়নি দেশ থেকে ঘুরে এসেছে। বছর বছর কানাডা-বাংলাদেশ করা আমার কাছে গাবতলি-গুলিস্তান না। অবশ্যই সামর্থের অতীত। কিন্তু ছেলেটা দেশে যেতে চাচ্ছে যে, আমাদের দেশে। কী আশ্চর্য! বাবা হয়ে আমি না করব কেন? দুই আর দুই যোগ করলে চার হয়, সকলেই জানে। এভাবেই মনুষ্যজীবন চলে আসছে। কিন্তু নির্ভুল অংক কষে প্রমান করা যায় দুই আর দুই মিলে পাঁচও হয়। আমি চার বাদ দিয়ে পাঁচ নিয়েই না হয় থাকলাম। যাক ছেলেটা, প্রাণ ভরে ঘুরে আসুক ওখান থেকে। আবার গন্ধ নিয়ে আসুক প্রিয় দেশটার, ওর শিকড়ের। দেশের অদ্ভুত মায়া ওর সারা শরীরে জড়িয়ে থাকুক মায়ের শাড়ির আঁচলের মত।
একটা মেয়েও আছে আমাদের, এগার ক্লাসে পড়ে। মেয়েটা আমার শুধুই হাসে। কেমন বোকাবোকা অনিশ্চিতের হাসি। বিশ্বাস করতে চায়, আবার চায় না। ও বোধ হয় ভাবে হঠাৎ করেই এত বড় হয়ে গেছে। আমি রহস্য করে বলি – এই যে আমার দু’পায়ের মাঝের জায়গাটা দেখছ এখানেই তোমার পুরো শরীরটা এঁটে যেতো। ছোট্ট তুমি শুয়ে থেকেছ আমার এই দু’হাটুর উপর। শুয়ে থেকেই তুমি ঘুমিয়ে গেছো কতদিন। শরীরটা উষ্ণ-আরামে বিড়ালের মত আরো সেটিয়ে যেতো। মা আমার বড় হচ্ছে। আরো একটি পুরো বর্ষ পার করার সীমানায় রয়েছে। এখন আর আমার দু’হাটু ওকে বেড় দিতে পারে না। গায়-গতরে, মননে-শীলনে এখন আকাশপানে ছুটছে। উচ্চতায় মাকে ছাড়িয়েছে বেশ আগেই। বাবাকে মৃদু হুমকিও দিচ্ছে। প্রতিযোগিতাময় এ পৃথিবীতে অপরকে ছাড়িয়ে যাবার নেশায় ছুটছে সবাই। ব্যতিক্রম বুঝি শুধু এখানেই। সকল বাবা-মা চায় সন্তান তাঁদেরকেও ছাড়িয়ে যাক। ঠেলে এগিয়ে দেবার কী আপ্রাণ চেষ্টা! এগিয়ে যাও মা! ‘Sky is the limit for you.’
এই মেয়েটা অত্যাধিক আরামপ্রিয়, বেড়ালের মত। মোশন একেবারেই সহ্য করতে পারেনা। এদিকে 'পাখিমন' আমার কোন জায়গায় স্থির হলেই মনে হয় মাধ্যাকর্ষণ টেনে পাতালে নিয়ে যাবে। নীলাকাশে ডানা মেলে নিজেকে ভাসিয়ে দিব - মনে হয় এই করেছি পণ। বিধাতা দু'টো ডানা দেয়নি বলে সে কী আফসোস! তবে সবল দু'টো পা দিয়েছেন তিনি। আর দিয়েছেন, ঐ যে বললাম, পাখির মতই উড়ুক্কু মন। ফুসরত পেলেই বেড়িয়ে যাই যেদিকে দু'চোখ যায়। কোথাও আমার হারিয়ে যেতে নেই মানা। তবে মনে মনে না, সশরীরে। গড়পড়তা বাঙ্গালীর চেয়ে বেশ আগেই আমি দোখলা-তেখলা ছেড়ে এক হালি হয়ে গেছি। তাই ভ্রমনে বউ-ছেলের সাথে ছোট্ট মেয়েটিও থাকত আষ্ঠেপিষ্ঠে জড়িয়ে। ওর মোশন সিকনেস। ‘অ্যাভোমিন’ নামক এক ট্যাবলেটের সাথে আমাদের দোস্তি হয়ে গেল। বের হবার আগে দু'টো জিনিস অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হোত, ঐ অ্যাভোমিন ট্যাবলেট আর পলিথিনের ব্যাগ। আমরা ব্যাগ গুছাতাম আর মেয়েটি নিত এ দু'টো জিনিস। গুরুজনেরা বলেন সময় হচ্ছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় চিকিৎসক, অনেক কিছুই সয়ে যায়। ছোট্ট মেয়েটিও দিনে দিনে বড় হল। মোশনে বমির বাসনা অনেকখানি সয়ে গেল। আমরা একটু হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এখন দেখছি এ ক্ষণিকের বাঁচা। ঘটনা আবার ঘটল। বেশ বড় আকারেই ঘটল!
মেয়েটা দেশে যাচ্ছে অনেকদিন পর। লম্বা সে পথ। ক্যালগেরি-টরন্টো-দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা। অবিরাম বাংলার মুখের মত অবিরাম সে ভ্রমণ। চলছে তো চলছেই। তা চলুক, আপত্তি কিসের? কিন্তু বিপদটা বাঁধলো সেই পুরোনো জায়গায়। অভ্যাস পাল্টে যাওয়ায় এখন আর অ্যাভোমিন সাথে নাই। কিছুদুর যেয়েই শুরু হোল বমি। পৌনঃপুনিক সে বমি, দমকে দমকে আসে। আহারে! মেয়েটার কী কষ্ট! চলতে চলতে কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে গেল। বাড়ন্ত পুইলতা পানিহীনতায় নুইয়ে গেল। মা আমার এখন ঘুমাচ্ছে। গভীর সে ঘুম। বিধাতা এ ঘুম দিয়েই ওর যাবতীয় ক্লান্তি দূর করে দিবেন। সৃষ্টিকর্তা নিষ্ঠুর হতে পারেন না। তিনি তাঁর সৃষ্টিকেই সবচেয়ে বেশী ভালবাসেন। যেমন বাসেন বাবা তাঁর মেয়েকে।
বাবাদের কাছে সব মেয়েই নাকি রাজকন্যা। আমি রাজা-মহারাজা না। সম্রাট-বাদশাহ? নাহ। আমার মেয়েকে রাজকন্যা হতে হবে কোন দুঃখে? রাজকন্যা এমন কী মহার্ঘ্য বস্তু যে ওখানেই আমার কন্যার সর্বোচ্চ এবং সর্বশেষ গৌরবের আশ্রয়স্থল। আমার মেয়ে হল আমার কন্যা, পাগল বাবার পাগলী কন্যা। শীত শুরু হয়ে গেছে ক্যালগেরিতে। তাই ক্যাজুয়ালি বাইরে যেতে হলে মোটা ট্রাউজার পরি এবং বাসায় এলেই খুলে ফেলি। মাত্রই ঘরে এসেছি, ট্রাউজারটা খুলে সোফার উপরে রেখেছি। এমতাবস্থায় মেয়ের অগ্নিমুর্তি! (এমনিতে বাংলাটা চমৎকার কিন্তু এই মুর্তি ধারণ করলে অজানা কারণে ওটা বের হয় না)
‘বাবা! ডিড ইউ থিঙ্ক, ইটস ইওর ক্লোজেট? হোয়াই ডিডন্ট ইউ টেইক ইট আপস্টেয়ার্স’? একটু পরে বের হতে হবে যে মা। ‘সো হোয়াট? ইজ ইট ঠু ফার’? আমি আমতা আমতা করে বলি, ‘তুমিওতো রেখে দিয়ে আসতে পার’। ‘এক্সিউজ মি! ইউ ডিডন্ট ব্রেক ইউর লেগ’। আমি অনিচ্ছায় জিনিসটা উপরে রেখে সোফায় এসে বসি, টিভি দেখব। একটু বাদেই মেয়ে তাঁর মায়ের বানানো কম-মিষ্টি দেয়া একটু বাদামী রসগোল্লা নিয়ে উপস্থিত, ‘বাবা মিষ্টি খাও’। না মা এখন মিষ্টি খাব না। ‘দেখি হা করতো’। আস্ত এক রসগোল্লা মুখে পুরে গালে ঠাস করে এক চুমো দিয়ে দৌড়। ঠিক সেই মুহুর্তেই অনুভব করি আমার পিটুইটারি ওপেন হয়ে গেছে এবং কোন একটা কিছু নিঃসরণ করতে শুরু করেছে। আমি আবেশে অবশ হয়ে গেছি, এনেস্থেশিয়ার প্রভাবের মত।
কিছুদিন আগেও মেয়েটি আমার দুই হাটুর বিশাল ভাঁজের উষ্ণ আরামে কেমন কুঁকরে থাকত। এখন আর আমার সুবৃহৎ কোলও ওর দেহটাকে ধারণ করতে পারে না। শৈশব-কৈশর পার হয়ে মেয়েটা দ্রুতই ‘বড়’ হওয়ার দিকে ছুটছে। কিছুদিন পর ওকে সুইট সিক্সটিন ত্যাগ করতে হবে। এর কোন মানে হয়! নাসার বিজ্ঞানীরা যে কী করছে! বেল ল্যাবরেটরিরও কোন আওয়াজ নেই। একটা টাইম মেশিন বড্ড দরকার! দশটা বছর পিছিয়ে যেতে চাই, আজীবনের জন্য।
২৮ নভেম্বর। নামটা 'দিআ' রাখা হয়েছিল জন্মমুহুর্তে। আশ্চর্য! ডারউইনের বিবর্তনবাদ এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের মত সময়ের পরিক্রমায় তা কেমনে কেমনে যেন 'দিআমনি'তে সারভাইভ করেছে। ২৮ তারিখেই মেয়েটার জন্মদিবস এবং জন্মরাত - পুরো ২৪ ঘন্টাই ওর। আমি বলি, আম্মুনি আজ তো তোমার হ্যাপী বার্থডে। ও বলে, 'ইয়াহু! আই আম টার্নিং সেভেনটিন'। আমি আকাশপানে চাই, বিধাতার ডেরায় ......
'You are sixteen going on seventeen
Baby, it's time to think
Better beware, be canny and careful
Baby, you're on the blink'
(Rolf and Liesl)
মেয়েটার ফাইজালামি দিনে দিনে বাড়ছে। মাত্র এগার ক্লাশে পড়ে, ফাইজলামি ডিগ্রি ক্লাশের। ছোটবেলা থেকেই মেয়েটার সাথে খুনসুটি করা আমার একটা নেশার মত। তো সেদিন সোফায় বসে আছে। আমি পাশে গেছি একটু ঘষাঘষি করব বলে। ঝাঁঝিয়ে উঠে, ‘কোষ্ঠীর মধ্যে এসেছ কেন?’। আমি হতভম্ব! এই বাংলা শব্দ ও কোত্থেকে শিখেছে কে জানে। আমি তো এর জন্য রেসপনসিবল না। আরেকদিন ওর মা ফোন করেছে। মা-মেয়ে কথা বলা শেষ করে বাবাকে চাচ্ছে। মেয়ে বলে, ‘বাবা তোমার ফোন’। আমি বলি, ‘কে’? ফাজিল মেয়েটা বলে কি, ‘তোমার ‘এই’ ফোন করেছে’। মহা-ফজিল! অবশ্য এর রেসপনসিবিলিট আমাদের। জীবনটা কেমন ‘এই’ময় হয়ে গেছে। ঘটা করে আকিকা দেয়া নামটাও মনে হয় ভুলে যাচ্ছি।
শীতের শেষ। বসন্তকাল শুরু হয়েছে। গাছে গাছে নতুন পাতা এসেছে। আমার ছোট্ট লনের নাম না জানা গাছটিতে কলি ফুটছে। কয়েকটা চড়ুই জাতীয় পাখি মাঝেমধ্যে বসে। মেয়েটির আনন্দ দেখে কে? ওর আগ্রহের সীমা নাই। পাখিদের জন্য একটা বৈয়ামে কিছু খাবার রেখেছে, মুড়ি। আরে এরা সাহেবদের দেশের পাখি, মুড়ি খায় না। মেয়েটি চোখ বড় বড় করে আগ্রহে তাকিয়ে থাকে, আহারে! খা পাখি খা।
এহেন শীতের দেশ ক্যালগেরিতে বেশ কবছর থাকা হয়ে গেল। আশ্চর্য ‘snow’ শব্দটিই এখানে সবচেয়ে বেশী উচ্চারিত হয়। আজ snowfall হবে কি হবে না – এ আলোচনা সর্বাগ্রে। snow শব্দটির বহুব্যবহারে আগ্রহ সৃষ্টি থেকে বাংলা একাডেমির ডিকশনারি ঘাটি। আমার জন্ম থেকে যৌবনাবধি snow বলতে যা বুঝায় তা কখনো দেখিনি। ice দেখেছিলাম বরফকলে গিয়ে। বাংলাভাষার এগারশ বছরের ব্যপ্তিকাল ধরলে এর মধ্যে কোন বংঙ্গসন্তান বাংলা ভুখন্ডে snowfall দেখেননি। তাহলে snow এর প্রতিশব্দ ‘তুষার’ শব্দটি বাংলা ভাষায় এল কি করে? 'তুষার' (snow) আর 'বরফ' (ice) নিশ্চয় এক জিনিস নয়। কানাডাতে প্রায় প্রত্যেকটি বাড়ির পায়ের তলায় আরেকটি তলা বানানো হয়। অনেকটা গুদামঘরের মত। এরা বলে basement। অনেকে আবার এটাকে বসবাসের উপযোগি করে নাম দেন basement suit। বাংলা ভাষায় এর কি কোন প্রতিশব্দ আছে? বাংলা একাডেমির ডিকশনারিতে লেখা আছে, ‘ভূ-গর্ভস্থ বসবাসযোগ্য কক্ষ’। basement এর প্রতিশব্দ নেই, snow এর প্রতিশব্দ তুষার এল কী করে? কেনই বা বাবা তাঁর সন্তানের নাম তুষার রাখেন?
ছোটবেলা থেকেই দেখেছি শীতকালে টুপটুপ করে ‘শিশির’ পড়া। ঐ গানটার মত, ‘টুপটাপ ঝরছে রাতের শিশির’। কবিগুরু বলেছেন, ‘একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশিরবিন্দু’। শিশিরের ইংরেজি প্রতিশব্দ dew। শিশির আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে সর্বোতভাবে। আমরা হেমন্তে-শীতে এমনকি শরত-বসন্তেও শিশির দেখি। তাই ‘শিশির’ শব্দটির বহুল ব্যবহারের একটা যৌক্তিকতা খুজে পাওয়া যায়। দুটো দেশের শীতের চরিত্রের এ কেমন বৈপরিত্য! ওখানে পড়ে শিশির আর এখানে তুষার। একটি কবিমনকে আন্দোলিত করে। মনকে আর্দ্র করে, চিত্তে কাব্যঢেউ তোলে। আর অপরটি বিরক্তির চরম সীমায় পৌছে দেয়। ‘পবিত্র গাভী’ বা ‘পবিত্র বিষ্ঠা’ বলে গালি দিতে ইচ্ছা করে। ইংরেজি সাহিত্যে তুষারের কাব্যপ্রমান থাকলেও সাধারণের আছে এটি ঐ বিশেষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ঠান্ডা-গরম মিলিয়ে বাংলাদেশে আমাদের ছয়-ছয়টা ঋতু। অত্যন্ত দুঃখের সাথে দেখি ক্যালগেরিতে কাল বা ঋতু বলতে দুইটা। শীতকাল আর Stampede। শেষেরটার ব্যাখ্যায় না গিয়ে এভাবে বলি, শীতকাল আর না-শীতকাল। শুধুমাত্র এ দু’কালের বৈচিত্র। এখানে কবি জন্মাবে না, কারণ সে লিখবে কী? কোন শিল্প-সাহিত্য হবে না - প্রকৃতিই নাই। খালি কাজ করো আর টাকা কামাও।
সে তুলনায় আজ একটু ব্যতিক্রম। বিকাল থেকে আকাশ কাল করে মেঘের আনাগোনা। এ মেঘ আমার পরিচিত নয়। তাই বলতে পারিনা ঘন কুচকুচে কাল আষাঢ়ের বন্ধনহীন কানা মেঘ, যে কোন সময় টুপ করে ঝরে পড়বে। তাও এক পশলা বৃষ্টি হল। আমার অনেক সাধের বৃষ্টি। ঘরের লাগোয়া একটা কাঁচঘেরা কক্ষ আছে। ওখানে পা দিয়েই গা ছমছম! সেই শব্দ, হৃদয়ে বান ডাকা বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ। এ শব্দটার মধ্যে কী যেন আছে? সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। শ্রবণেন্দ্রিয় আবেশ হয়ে আছে আরো কিছুর জন্য, আকুল হয়ে হয়ে শুনতে চায় মেঘের গুড়্গুড়, বিদ্যুতের ঝলক। অভ্যাস বসে চোখ চলে যায় ইতিউতি, যদি আষাঢ়ের পাগলপারা কৈ দেখা যায়। দুর! আকাশ কুসুম ভাবনা।
বৃষ্টির দিনে দারা-পুত্র-পরিবার নিয়ে লাঞ্চ খাই চানাচুর-কাচামরিচ দিয়ে বানানো ঝালমুড়ি। 'চানাচুর' অত্যন্ত প্রিয়। এক বসায় বেশ খানিকটা খেয়ে ফেলতে পারি। এমনকি ভাতের বদলেও! যদিও সাধারণের কাছে এটা প্রাইমারি, সেকেন্ডারি এমনকি টারসিয়ারি খাবারও না বোধ হয়। তবে আমি খাই। যেমন পড়ি হুমায়ূন আহমেদ। বিজ্ঞজনেরা বলেন, এতো চানাচুর লেখা। কি আর করব! আমার চানাচুর খেতেই ভাল লাগে। খালি পড়ি না, হুমায়ূনের নাটক, সিনেমা সবই দেখি। শুধু একবার না! ফল এবং উইন্টার সেমিস্টারে মাঝে এখন প্রায় একমাসের অবসর। বড়দিন আর নিউ ইয়ারের ছুটি। কী করব? নো প্রোব, গো ইউটিইউব, সার্চ হুমায়ূন আহমেদ - ননস্টপ ম্যারাথন সেশন।
গতকাল এরকমই একটি নাটক দেখছিলাম। বৃষ্টি, উথাল-পাথাল জ্যোৎস্না, কদম ফুল, সংগীত হুমায়ূনের অসম্ভব প্রিয়। তাই তাঁর সিনেমা-নাটকে এসব থাকবেই। তো নাটকের এক পর্যায়ে বৃষ্টির রাতে পরিবারের সবাই মিলে ছাদে উঠে গেল - 'এসো করো স্নান নবধারা জলে'। আমরা বুভুক্ষুর মত দেখতে থাকি। কষ্টের একটা স্রোতধারা আমাদের শরীরের ভিতরে যথেচ্ছ বিচরণ করতে থাকে। না পাওয়ার কষ্ট। কতদিন হয়ে গেল - অর্ধদশক, বা তারো বেশী। 'আজি ঝর ঝর মুখরিত বাদর দিনে' - আমার কী করা উচিত? আমি কোথায় পাব বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল? এমন একটা দেশে থাকি, আকাশ ফুটো হয়ে কিছু না কিছু পড়ছেই। হয় বৃষ্টি, না হয় তুষার। কিন্তু কী অভাগা আমরা - সে বৃষ্টির একটি ফোটাও গায়ে মাখতে পারি না। কনকনে ঠান্ডা! একটু দিঘীর পানিতে সাতার কাটবো - উঁহু। বছরের পর বছর বুভুক্ষু বাঙ্গালী বরষার প্রথম বৃষ্টিস্নান থেকে বঞ্চিত এখানে। আমার একটি অতি প্রিয় আহ্লাদের কঠিন অপমৃত্যু! তবে কারণে-আকারণে দাওয়াত-ভুড়িভোজ এখানে নৈমিত্তিক।
শিশুতোষ বাংলা অদ্ভুদ কিন্তু! নমুনা দেই। অনেকদিন আগে, গোয়ালন্দে থাকি। বিদ্যুৎ নেই, গরমে হাস-ফাস করছি। হঠাৎ এক পশলা বাতাস চারিদিকে। আমার বাচ্চা ছেলেটি বলে উঠে, ‘কী সুন্দর বাতাস! ‘দানুন’ বাতাস!’ আরেকটা বলি। আমাদের একটা দাওয়াত আছে। তো ছেলের তাড়া, ‘বাবা তাড়াতাড়ি চল। ‘দাউত’ খেতে যেতে হবে না’। দাওয়াত বা দাউত যাই বলি না কেন ক্যালগেরিতে এর প্রচলন বেশ। উপলক্ষ থাকুক আর নাই থাকুক দাওয়াতপর্ব চিরাচরিত। এত দাওয়াত কেন? শুনে আমরা হাসি। কী যে বলেন! আমাদের বছরে মাত্র দুইদিন দাওয়াত থাকে। যেদিন বৃষ্টি হয় সেদিন আর যেদিন বৃষ্টি হয় না সেদিন।
এসব দাওয়াতপর্ব সমাধার একটা নির্দিষ্ট ফরম্যাট আছে। পেট ভরে খাওয়া, এরপর একটু হাসিতামাসা-খুনসুটি। ধীরে ধীরে হাসিনা-খালেদার অনুপ্রবেশ। তাঁরস্বরে তীব্র বাদানুবাদ। সবশেষে সর্বসম্মত কনক্লুসন – ‘দেশটা একেবারে গেছে!’ তবে সব ফোনেই তো আর অ্যান্ড্রয়েড নেই - উইন্ডোজ আছে, আইওএস আছে। তাই ভিন্নধর্মী ফরম্যাটের দাওয়াতও আছে। সেখানে নাটক-সিনেমা-সাহিত্য-সংস্কৃতি চলে আসে। গুরুগম্ভীর আলোচনা চলে। দেখা যায় সকলেই গোপনে হুমায়ূন আহমেদ পড়ে ফেলেছে। কিন্তু আসরে উনার চৌদ্দগুষ্ঠী উদ্ধার চলে, কী সব ছাইপাশ লেখে! ব্যাটা বদমাশও! মেয়ের বয়সী একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে।
হুমায়ুন আহমেদ মৃত্যুশয্যায়। ডঃ জাফর ইকবাল তাঁর পাশে। শাওনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, ‘শাওন তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি দাদাভাই-এর শেষ জীবনটা আনন্দে ভরে দিয়েছ’। এটাই আসলে উপসংহার। হুমায়ুন আহমেদের জীবনটা সাংসারিক আলু-পটল-ঝিংগে-তেতুল থেকে আলাদা। ‘বিকেলে অমুক আসবে যাওনা একটু বাসমতি চাল নিয়ে আস। শিলা পাটিগণিত বুঝে না, ওকে একটু বুঝিয়ে দেও না।‘ ইয়াসমিন হককে সাথে নিয়ে একজন ডঃ জাফর ইকবাল হওয়া যায়। কিন্তু ডঃ ত্যাগ করে একজন হুমায়ুন আহমেদের পরিপূর্ণ বিকাশ গুলতেকিনকে দিয়ে বোধ হয় সম্ভব ছিল না। শাওনের থাকা বা নাথাকাটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে শাওনের আগমনের প্রয়োজন ছিল, যা হুমায়ুনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেজায় ভুমিকা রেখেছে। হুমায়ুনে মুগ্ধ আমি! আমার দেখা-পড়ার গন্ডি এই মানুষটার সৃষ্টির মধ্যেই কমবেশি আবদ্ধ। বাংলা ভাষার এক লক্ষ শব্দ থেকে ডিকশনারি খুজে খুজে সবচেয়ে কঠিন কঠিন সব শব্দ ব্যবহার করা সাহিত্য আসলে আমার এন্টেনায় ধরে না, বুঝি না। পড়ার চেষ্টা দূরে থাক।
প্রতি বছরের মত এবারো সতের অক্টোবর চলে আসে। আজ ‘বিশ্ব গলাকাঁটা দিবস’। আরো নির্দিষ্ট করে বললে পুরুষের গলাকাটা দিবস। হ্যা, ঠিক বলছি! কী সুন্দর কইরা সাজাইয়া-গুজাইয়া আদর কইরা বসায়। তারপর হাজাম ডাইকা কপ কইরা কল্লাটা কাইটা ফালায়। এরপর কল্লাবিহীন শরীর নিয়ে সারাটা জীবন ধুঁকে ধুঁকে চলা। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যপার হচ্ছে কাঁটা কল্লাটা আবার ‘শ্ত্রু’র হাতে তুইলা দেয়। এজন্যই তো বলে, ‘বিয়ের আগে বাঘ, আর বিয়ের পরে বিলাই’। তাই সতের অক্টোবর আসলেই আমি মনমরা হয়ে যাই। নিরবে নিঃশব্দে সোফার এক কোনায় চুপটি করে বসে থাকি। আমার ছেলেমেয়ে দু’টি নিশ্চয় টের পেয়েছে।
বাচ্চা দুটি হয়েছেও মায়ের ন্যাওটা। গ্রহের মত মায়ের চারিদিকে সারাক্ষণ ঘুরতে থাকে। আর তক্কে তক্কে থাকে মাকে কেমনে হাসিখুশি রাখা যায়। মায়ের বিবাহ বার্ষিকী ছিল গতকাল (আমার তো গলাকাঁটা দিবস!)। ছেলে দেখি একটা সুদৃশ্য প্যাকেট নিয়ে বাসায় ঢুকেছে। বোধ হয় মায়ের জন্য উপহার-টুপহার এনেছে। ছেলে বড় হয়েছে, মায়ের জন্য উপহার আনতেই পারে। কিন্তু ছেলেটা প্যাকেটটা আমার হাতে দিয়ে বলে কি, ‘বাবা, আজকে তুমি এইটা আম্মুকে দিবা। আম্মু খুশী হবে’। আমি জানি না আল্লাহ মানুষকে আসলেই কী দিয়ে বানিয়েছেন। এসব ছোটছোট সুখইবা তিনি শরীরের কোন জায়গায় রাখেন। তবে বেশ টের পাচ্ছি রক্তের যে কনিকাগুলো আছে, বিশেষ করে, লাল রঙ্গেরটা বেজায় দাপাদাপি করছে। আমার এ নাতিদীর্ঘ জীবনে লোহিত কনিকাগুলি দাপাদাপি করতে করতে কেমন ক্লান্ত-নিস্তেজ হয়ে গেছে। এত সুখ বইবার ক্ষমতা বুঝি হারিয়ে ফেলছে ওরা!
ক্লান্ত-নিস্তেজ শরীরে উত্তেজনা আনয়নে জোড়ে গাড়ি চালানো মহৌষধ। গতি অতি-অবশ্যই এডিকশন। চা-কফি, পান-বিড়ি এমনকি মদ-গাঁজার চেয়েও মারাত্মক এক নেশা। অবশ্য যে নেশায় আসক্ত, তাঁর কাছে। স্টিয়ারিং হাতে থাকলে আমার ডান পা’টা কেমন জানি করে। সর্বশক্তি দিয়ে চাঁপ দিতে চায়, ঢেঁকিতে চাল ছাঁটার মত সজোরে চাঁপ। হরমোনের প্রভাব, নিশ্চয়! ভাবছি জার্মানীতে চইলা যাইব। জার্মান Autobahn আমাকে চুম্বকের মত টানে। পোস্টিং স্পিডলিমিট না থাকলে Autobahn মুক্তবিহঙ্গ, পাখি হইতেও মানা নাই। স্পিডোমিটারের দিকে তাঁকিয়ে গাড়ি চালানোর সুখ আর অন্ধকারে সুন্দরী মেয়ে দেখার রিটার্ন সমতুল্য। ‘এই রাস্তার স্পিডলিমিট কত’? নর্থ আমেরিকার এ এক মহা-সমস্যা। আপনি ভ্যাংকুভার থেকে রওনা দিয়ে হোপ পার হয়ে হাইওয়ে ৩ ধরে ওসুইয়ুস দিয়ে ক্যালগেরি আসবেন। ড্রাইভিংস্বর্গ এই রাস্তা স্পিডলিমিট দিয়ে বেঁধে দেয়া মানে টেবিলে প্রিয় খাবার বেড়ে দিয়ে বলছে, ‘খেতে পারবেন না’। যতসব, রাবিশ!
ক্রিকেট ব্যাটসম্যানকে যে কমন প্রশ্নটি করা হয়, ‘আপনার ক্যারিয়ারের হাইয়েস্ট স্কোর কত’? আচ্ছা, আমার ক্যারিয়ারের হাইয়েস্ট স্পিড কত? না, এখনো ডাবল সেঞ্চুরীই করবার পারলাম না। আহারে! বেঁচে থেকে লাভ কী? এক বড় ভাইয়ের সাথে আলাপ হচ্ছিল, এই ড্রাইভিং নিয়েই। বলে কি, ’১৯ বছর এখানে আছি, কোন ট্রাফিক টিকিট খাই নাই’। আমি বলি, ‘ভাই, আপনার জীবনতো দেখি উত্তেজনা-শুন্য। মনে হচ্ছে আপনি খালি ভেজিটেরিয়ান না, একেবারে ভিগান’।
গতি বিষয়ক ঘটনাটা ঘটেছে কিছুদিন আগে। ঐ হাইওয়ে ৩ ধরে আসছি ক্যাসেলগার টাউন ছোঁব ছোঁব। রংবেরংয়ের লাইট জ্বালিয়ে মামু খাড়াইয়া আছে। ট্রাফিক টিকিট অনেক খেয়েছি, এ পর্যন্ত। আপীল-হিয়ারিং-ফাইনময় জীবন আমার। তয় এবারেরটা সবার সেরা, অতি-উচ্চ মার্গের। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার আইনে একজন ড্রাইভারের এটাই সবচেয়ে কঠিন শাস্তি – একাধারে তিনটি অফেন্স সাইমালটেনিয়াসলি। পৌনঃপুনিক আপীল-হিয়ারিং-ফাইন শুরু হবে। সর্বশেষের ঘটনাটা আমার ছেলের। ছেলেটা মাস কয়েক আগে ড্রাইভিং শুরু করেছে, একখান গাড়িও আছে। গত দুইদিন পরপর দুইখান ছবিসহ কাগজ চইলা আইছে আমাদের বাসায়, ক্যালগেরি পুলিশ থেকে। সিসিটিভি/স্পীড ক্যামেরা যথারীতি ক্লিক ক্লিক, গতিসীমা উচ্চজনক। রক্তের দোষ নাকি!
এহেন ছেলেটি পড়াশুনায়ও বাপের মত অগা-মগা। ভালছাত্র বলতে যা বুঝায় তা আমি কোনকালেই ছিলাম না। এজন্যে বিন্দুমাত্র আক্ষেপও নেই। তবুও ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় মানব ক্রমববিবর্তনের যে ইতিহাস তাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভুমিকা বিস্তর। বিশেষ করে তথাকথিত আধুনিক এ সভ্যতার যুগে 'সভ্য' সিল পেতে হলে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে কমবেশী যেতেই হবে। খান কয়েক সইকরা কাগজ পেতেই হবে। আমি ভাবি, এসব মহান মহান প্রতিষ্ঠান কি বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ/উপরতলা-নীচতলার মানুষ তৈরী করে দিচ্ছে না। হার্ভার্ড গ্রাজুয়েট, জগাবাবুর গ্রাজুয়েট, মেট্রিক ফেল, প্রাথমিকেই ঝরে পড়া। এরপর আবার ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বা ইসলামের ইতিহাসের স্নাতক - ক্রমশ নীচের দিকে নামছে। শ্রেণীহীন সমাজে শ্রেণীবিন্যাস তৈরী হয়ে যাচ্ছে সয়ংক্রিয়ভাবে। এন্ডপ্রোডাক্ট সেই শোষক-শোষিত সম্পর্কযুক্ত সমাজ।
যাহোক, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একমাত্র পড়াশুনা ছাড়া আর বাদবাকী সকল বিষয়ে ছিল সর্বভুক তেলাপোকার মত বাছবিচারহীন অসীম আগ্রহ। যার মধ্যে তাস খেলার নেশাটা ছিল উপরের দিকেই। মা অবশ্য তাস খেলা বলতেন না, বলতেন 'তাস পিটানো'। খেলা হোক আর পিটানোই হোক তাসের আগ্রাসন ছিল ভুমিধস। বিদ্যাসাগর লাইটপোস্টে বসে পড়েছেন, আমরা তাস খেলেছি। উনার কুপির তেল শেষ হয়েছিল আর আমাদের ক্যাফেটেরিয়া বন্ধ হয়েছিল। অবিরাম অনন্ত সে খেলা। সকাল থেকে শুরু - শেষটা কখন, কে জানে? আর এক ড্রিল আর এক ড্রিল করতে করতে ক্লাসই মিস। একটা ক্লাস মিস! যা, আজকে আর ক্লাশই করব না। পরেরদিন একই রুটিন। অবশেষে ভিসি মনিরুজ্জামান মিঞাকে ধরে পরীক্ষার অনুমতি নেয়া। সে এক জীবন ছিল!
অনেকদিনবাদে, ভুল বললাম, অনেকবছরবাদে সেরাম একখান দিন কাটালাম কালকে। সকাল দশটা থেকে তাস খেলা শুরু, শেষ হয়েছে পরের দিন ভোর ছটায়। আরেক জায়গায় দাওয়াত না থাকলে বোধহয় ঐদিনও পার করে দিতাম। সবশেষে সাংঘাতিক ভাল লাগার বিষয় - কিছুই ভুলিনি, আগ্রহ বিন্দুমাত্র কমেনি, তাসের নেশাটা তাঁর মতই আছে। জয় বায়ান্ন তাস। যারা কম তাসে খেলেন তারা কিন্তু মাইন্ড কইরেন না।
বিদেশে থাকলেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে দেশ আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে। দেশের আলোচনা দেশে যাওয়া ঠিক রেগুলার কাজের একটা রূপ। যেমন আমি বঙ্গদেশে রওনা দিছি অনেকদিন পর। এখন থেকে ফেসবুকে কচকচানি, বকবকানি সব বন্ধ। আমি হলুদ পাঞ্জাবী গায় দিব না, খালি পায়েও হাটব না। তবে কাউকে দেখলেই হিমুর মত অতি-বিগলিত হাসিটা দিয়ে বলব, ‘ভাইজানের শরীরডা বালা’? অবশ্যই মৌচাক হয়ে শান্তিনগরের দিকে যাব। ঘণ্টা তিনেক ট্রাফিকে দাড়িয়ে থাকব। তারপর বিগলিত হাসি, ‘হু কেয়ারস’। যথারীতি রাস্তার পাশের ফুটপাতে দাড়িয়ে হালিম খাব আর শার্টের হাঁতা দিয়ে নাক মুছব। ভুস করে বড়লোকের ছোট গাড়ী পাশ দিয়ে চলে যাবে। যাবার সময় রাস্তায় জমে থাকা ময়লা পানি আমার গায়ে ছিটিয়েও দিয়ে যাবে। আমার শুধুই বিগলিত হাসি, ‘ব্যপার না’। পার্কে বসে প্রিয় মানুষটার সাথে কথা বলছি। হঠাৎই উঠে চলে যাবে। আমার সেই বিগলিত চেহারা, ‘নো প্রব্লেম! ইটস ওভার, ম্যান’।
গুলশান এক নম্বর থেকে ছোটলোকের একটা বড় গাড়ী পীরজঙ্গি মাজারের দিকে যেত। নাম্বারটা বোধ হয় ছয় ছিল, হ্যা ছয় নম্বর বাস। আমি নিশ্চিত ঐটাতে চড়ে বসব। কন্ডাক্টর ভাড়া চাইতে আসলে বলব স্টুডেন্ট। এরপর ওর বিস্মিত চোখের উপর ইউঅবসি-এর স্টুডেন্ট কার্ডটা তুলে ধরব। বাস থেকে নেমেই পকেটে হাত দিয়ে দেখব ওয়ালেটটা নেই। আমি বিস্মিত হব না, ‘ডোন্ট ওরি’।
আমি খুব করে চাইব ১৯৯৫ সালের নভেম্বর মাসের সেই ঘটনাটা আবার ঘটুক। ওপেক্স গ্রুপের কম্পিউটার প্রোগ্রামার। মহাখালীর নিউ ডিওএইচএস অফিস থেকে বেড় হয়ে স্কুটারে উঠেছি। হঠাৎ আরো তিনজন স্কুটারে উঠে কিসব যন্ত্রপাতি গায়ে চেপে ধরল। আমি ভয়ে কাঁপছি। এবার ওরা উঠলে আমি কিছুই বলব না। সেলফোনে পোকেমন খেলতে থাকব। ওরা সেদিনের মত আমার আংটি, সোনার চেইন খুলে নিবে। মানিব্যাগ হাতরে ৭০০ টাকা পেয়ে বলবে, ‘শালা! মাদার…! এত কম টাকা কেন?’ আমি তখন সেই বিগলিত হাসিটা দিব, ‘ভাই, সামনেই ডাচ-বাংলা ব্যাঙ্কের এটিম বুথ আছে। আপনাদের সন্তুষ্ট করার মত টাকা আমি দেব। তবে আমার একটা শর্ত আছে। আমাকে আপনার বউয়ের ছোটভাই বলেছেন, তাতে কোনই সমস্যা নাই। কিন্তু পরের যে গালিটা দিয়েছেন ওইটা উইথড্র করতে হবে। গা’টা কেমন ঘিন ঘিন করছে’।
ওরা নিশ্চয় আমার কথা মানবে না। হাতে বিশটা টাকা দিয়ে চোখের মধ্যে কি একটা মলম লাগিয়ে দিয়ে বলবে, ‘কোন কথা বলবি না, একটা রিক্সা নিয়ে সোজা চলে যাবি’। আমি ওদের কথা রাখব। একটা রিক্সা ডেকে চালকের হাতে বিশ টাকা দিয়ে বলব, ‘ভাই ওরা আমাকে বিশ টাকা দিয়েছে। টাকাটা আপনাকে দিলাম। আপনি যেদিকে মন চায় রিক্সা চালান। যখন মনে হবে বিশ টাকার রাস্তা পার হয়েছেন, আমাকে নামিয়ে দিবেন’। আমি উৎসুক চোখে রাতের ঢাকা দেখব। কোথায় যেন পড়েছিলাম, ‘মধ্যরাতের ঢাকা তুমি মায়াবী শহর’। এরি মধ্যে ঘণ্টাখানেক কেটে গেছে। হঠাৎ সম্বিত পাই, ‘কীরে! রিক্সাতো এখনো চলছে’! ‘কি ভাই, তোমার বিশ টাকা এখনো হয় নাই’, আমি বলি। রিক্সাওয়ালা বলে কি, ‘কিযে কন? বিশ টাকাতো কবেই শ্যাষ। আপনে এমুন কইরা সব দেখতাছেন। আপনারে নামাইতে মায়া লাগতাছিল’। আরে এইত আমার দেশ! এইত এই দেশের মানুষ! পাঁচ শতাংশ চোর-বাটপার দেশটা লুটেপুটে খাচ্ছে, তাতে কী? এরা তো সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৪৭৮ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ০৩/০১/২০১৮

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • আব্দুল হক ০৩/০১/২০১৮
    সত্য., সুন্দর লিখা ! ধন্যবাদ!!
 
Quantcast