www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

পরিবর্তন

লতিফার নিবাস দক্ষিণ বঙ্গের তিয়াসী গ্রামে।
বয়সের তুলনায় একটু বেশীই বাড়ন্ত সে। আঠার পার হয়ে উনিশ ছুঁই ছুঁই। অথচ কে বলবে তা? বছর পঁচিশের পূর্ণ যুবতী লাগে। গায়ের রং ভাল - ভাগ্যিস মায়ের ফর্সা আভা পেয়েছে। অথচ বাপের কালো রং ছোট ভাইয়ের শরীরে গেছে। আর কোন ভাইবোন নেই ওদের। লতিফার মুখশ্রী গোলাকার, ভরাট গাল - চোখদু’টো ফুটে বেড়িয়ে আছে। লম্বা কালো চুল, রুক্ষ না তেমন। মেয়েটি পুরোপুরি মায়ের মতন দেখতে। বাপের একটা জিনিসই পেয়েছে - বাড়ন্ত শরীর। কামলা-খাটা বাপের পরিশ্রমী শক্তপোক্ত শরীর। লতিফাও খাটতে পারে বেজায়। একদমে মনখানেক ধান ঢেকিতে ছেঁটে ফেলতে পারে অনায়াসেই। তাই হাত-পায়ের পেশীগুলো ঠিক শাশ্বত মেয়েলি-পেলব না - একটু কঠিন, দৃঢ়।
ছোটবেলা থেকে দৌড়াদৌড়ি, খেলাধুলা আর গাছগাছালির ডালে-পাতায় চরে বেড়ানো লতিফার কঠিন না হয়ে উপায় আছে? তিয়াসীর লোকজন তাই বলে, ‘আবু মিয়ার বড়ডাই আসলে পোলা, মাইয়া হইল গিয়া ছোডডা।’ বাড়ির পূবপাশের আমগাছে এখন লতিফা। ডালে বসে আছে পা ছড়িয়ে। নীচে ছোট ভাই আজগর আর পাশের বাড়ির পারুল। লতিফার প্রাণের সই পারুল - ওরা একসাথেই থাকে সারাক্ষণ। আজগর আর পারুলের গাছে উঠে বড় আমটা পেড়ে আনার মত সাহস নাই। তাই কাকুতি-মিনতি নীচ থেকে, ‘ঐডা দে। ঐ যে কোণার ডালের বড় আমডা, আমারে দে।’
লতিফা হাসে, খিক খিক। একটা ঝিনুক ঘষে মাঝখানে ছিদ্র বানিয়ে ধারাল করে নিয়েছে। আমের খোসা ওটা দিয়ে অনায়াসে ছিলে ফেলা যায়। বড় আমটাই ছিলছে ও। ছোট ছোট দু’টো ছুড়ে দিয়েছে নীচের দিকে। আজগর মুখ ফুলায় একটু, ‘বড় আমডা আমারে দিবার কইছিলাম।’ লতিফা কিছু বলে না। এই আমগাছটা ওর খুব পছন্দের। আরো কয়েকটা আমগাছ আছে তবে এই একটাই কাঁচা মিঠাইল্যা। আম কাঁচা কিন্তু খেতে বেজায় মিষ্টি। খাওয়ার সময় লবন-মরিচ কিছুই লাগে না। প্রথমে খোসা ছিলে ফেল - এরপর পিস পিস করে কাট আর খাও। আহ!
লতিফা এ’বছর কলেজ শুরু করেছে। দু’বারের চেষ্টায় মেট্রিকটা হয়েছে ওর। এখন দু’পাশে বেনী দুলিয়ে, বইখাতা বুকে জড়িয়ে হেলতে দুলতে কলেজে যায়। আর গ্রামের ছেলেরা সতৃষ্ণে তাকায়। বুড়ো-হাবড়ারাও এর বাইরে নয়। প্রথমদিকে উঠতি যুবকেরা দু’চারটা মন্তব্য করত, ‘কী দারুন দেখতে!’ বা ‘তোমার লাইগা মরতে পারি’ এরকম টাইপের। একদিন রেগে গিয়ে ওদেরই একজন, জামালকে ধরে ইচ্ছেমত প্যাদানী দিয়েছে পায়ের স্যান্ডেল খুলে। সেই থেকে আর অশালীন মন্তব্য করে না কেউ প্রকাশ্যে - তবে সপ্রশংস দৃষ্টি এবং প্রায় নিঃশব্দ-শিস ঠিকই টের পায় ও। মেজাজ খারাপ হলেও এখন কিছু বলে না আর।
তবুও একজনের দৃষ্টি উপেক্ষা করতে পারে না লতিফা। উত্তর পাড়ার বাতেন। দুই ক্লাশ উপরে পড়ে। লতিফার মেট্রিক দিতে দিতেই বাতেন কলেজ শেষ করে ফেলেছে। বছর দেড়েক আগের কথা। লতিফা তখন নিয়ম করে স্কুলে যায়। মানুষের মুগ্ধ দৃষ্টি আর শিস-টিসে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। হঠাৎই চোখ যায় দেবদারু গাছের আড়ালে - একটি ছেলে কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। পাত্তা দেয় না লতিফা। এমন কতজনেই তো তাকায়। তবুও এক ঝলক দেখে আবার। দৃষ্টিটা যেন সকলের চেয়ে আলাদা, বড় অদ্ভুত সে চাহনি। পুরো শরীর কেঁপে উঠে লতিফার, মুহূর্তেই। ক্লাসেও ভেসে উঠে ঐ চোখ, মাঝে মাঝে। ছোড়া-তীর যেন গেঁথে গেছে লতিফার কোমল হৃদয়ে।
পরের দিন দুরু দুরু বুকে এগোয়, দেবদারুর দিকে। আড়চোখে দেখে - সেই জায়গায় ঠিক সেই রকম ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, ব্যাকুল করা দৃষ্টি। ধীর পদক্ষেপে জায়গাটা পার হয় লতিফা। স্পষ্ট-অনুভবে ছেলেটির বিস্ময়ভরা চাহনি। অন্যমনষ্ক লাগে লতিফার। রাতে ঘুম হয় না ভাল, ছেড়া ছেড়া। কখন ভোর হবে, আবার যাবে ওখানে। ভয়ংকর জেদি আর সাহসী লতিফা। কিন্তু কেমন যেন মিইয়ে গেছে এখন। একটা শূন্যতা হৃদয়জুড়ে।
পরের দিন আবার দেখে। এবার নিজেই পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় ছেলেটির দিকে। আহ! কী ভয়ংকর মর্মভেদী! পলক ফেরাতে পারে না, যেন চুম্বকের মতে আটকে গেছে। চট করে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় ছেলেটি। লতিফা আহত হয় একটু। সারাদিন মন খারাপ থাকে আবার কখন দেখবে। এমন দেখাদেখি চলতে থাকে কিছুদিন। বান্ধবী পারুলের মাধ্যমে একটা চিঠি পায় একদিন। একপাতা ভরা কী সব লেখা! লতিফা বুঝে না তেমন। কিন্তু ভাললাগায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। দু’কলম লিখেও দেয় পারুলের কাছে। চিঠি আদান-প্রদান চলতে থাকে।
লতিফাই সাহসী হয় একদিন। স্কুলে যাবার পথে এগিয়ে যায় দেবদারু গাছের দিকে। সাহস করে বলে, ‘আপনি আমার লগে কথা কন না ক্যান?’
‘তুমি কেমন আছ, লতিফা?’ থতমত বাতেন ঘোর লাগার মত বলে।
‘আমি ভাল আছি। আপনি এমন গম্ভীর হয়ে থাকেন ক্যান?’
‘কই নাতো। আসলে তোমাকে দেখলে আমার কথা হারিয়ে যায়।’
‘এইসব রাহেন। আমি স্কুলে যাইতাছি এখন। কাইল থিকা এইখানে আমার সাথে কথা কইবেন।’ স্বপ্নের মত কাটে দিনগুলি লতিফার।
বাজানই খবরটা আনে একদিন। কামলা দিতে গিয়েছিল মহাজনের বাড়িতে। মহাজনের ধান কাটা হয়েছে ক্ষেতের। এখন এই ধান সিদ্ধ করা, শুকানো - কত কাজ! এরপর ধান ভাংগিয়ে চাল করে মহাজনের গুদামে ভরে কাজ শেষ। রোজপ্রতি মাইনে, খাওয়া ফ্রি। মহাজন ঢাকা গিয়েছিল ক’দিন আগে। এসেই কাজের তদারকি শুরু করে। লতিফার বাপের পাশে গিয়ে দাড়ায় একসময়। ‘আবু মিয়া, তোমার মেয়ে তো ডাঙ্গর হইছে।’ মহাজন কাশে খুক খুক।
‘জি মহাজন। এই অঘ্রানেই উনিশে পড়ব।’ আবু মিয়ার মুখে গর্বের হাসি।
‘মেয়েরে বিয়া দিবা না? টাকা পয়সা তো তেমন কিছু নাই। তোমারে একটা বুদ্ধি দেই, মেয়েরে একটা কামে ঢুকাইয়া দাও। কিছু টাকা আনলে তোমার সুবিধা হইব।’
‘কী কন মহাজন? লতিফা কী কাম করব?’ আবু মিয়া হাসে।
‘আরে মিয়া যুগ পাল্টাইয়া গেছে। এখন মহিলা-পুরুষ সবাই কাম করে।’
‘হুনছি বিদেশে এ’গুলান হয়। ঢাকা শহরেও নাকি জামাই-বউ দু’জনে কাম করে এহন।’
‘ঠিকই হুনছ। তাই কইছিলাম তোমার মেয়ে বড় হইছে। মাশআল্লাহ! লেখাপড়াও কিছু জানে। ওরে কামে দিবা নাকি বল?’
‘কী কামের কথা কইতেছেন মহাজন?’
‘বিদেশের কথা কইলা না? হেই বিদেশে কাম।’ মহাজন কানের কাছে ফিসফিস করে বলে।
‘বিদেশে!’ আবু মিয়া আকাশ থেকে পড়ে যেন। ‘লতিফা বিদেশে কাম করব? কন কী মহাজন?’
‘তাইলে আর কী কইছি। আরব দেশের নাম হুনছ না? হেই আরব দেশে কাম করব। চিন্তা কইরা দেখ, কী বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার! তোমার মাইয়া নবীর দেশে কাম করব।’
‘আরব দেশে!’
‘তিন বছর কাম করব। এরপর দেশে ফিরা আইব লক্ষ লক্ষ টাকা লইয়া। তোমার মেয়েরে তহন ধুমধাম কইরা বিয়া দিবা।’
‘কী কাম কবর আরব দেশে? লতিফাতো কিছুই জানে না।’
‘হেইডা কোন ব্যপার না। হেরা সব শিখাই লইব। কাম তেমন কিছু না - এই ধর ঘরবাড়ি পরিস্কার রাখা, কাপড় ধোয়া, টেবিলে খাবার দেয়া - এই সব আর কী। ঐ হানে আবার সব মেশিনে করে। তাই খালি মেশিনে দিব আর বইসা বইসা খেজুড় খাইব।’
‘আমার মাইয়া বাড়িতে কাম করব মহাজন?’
‘আরে মিয়া এইডা ঢাকা শহরের মত কামের বিডির কাম না। আরব দেশের বড় লোকের বাসায় কাম। হেগো অনেক টাকা। তাই কাজকর্ম কিছুই করে না। বাইরের থিকা মানুষ আইনা কামে লাগায়। আমাগো আশেপাশের অনেক গ্রাম থিকাই গেছে।’
‘লতিফার মায়ের লগে কথা কইয়া দেহি। মাইয়া ছাড়া থাকবার পারব কী না?’
‘যাও, কথা বইলা আমারে জানাবা। আমার ছোড শালা এই কামের এজেন্ট। ঢাকা শহরে বিরাট অফিস তার। তোমারে কোন টাকা-পয়সা দিতে হইব না। খরচের টাকা ওরা মাসে মাসে বেতন থিকা কাইটা লইব।’
‘কোন টাহা-পয়সা লাগব না?’
‘এক পয়সাও না। আবার কাম শেষে তোমার মাইয়া ব্যাংক-ভর্তি টাকা লইয়া ফেরত আসব।’
সকলের সাথে বেজায় কেঁদে কেটে গ্রামের সীমানা ছাড়ে লতিফা। সবচেয়ে কষ্ট লেগেছে বাতেনকে ছেড়ে আসতে। একেবারে শেষ পর্যন্ত বাতেন ওর হাত ধরে ছিল। বিদায়ের এমন কষ্টঘন মুহূর্তে কেউ কিছু বলেনি এসব নিয়ে। ছেলেটি কাঁদছিল নিঃশব্দে। লতিফার অন্তর মায়ায় ভরে গেছে। জোর দিয়ে বলেছে, ‘দেহেন, মাত্র তিন বছর। এর বাদেতো চইলাই আসব।’
‘তুমি ভাল থেকে লতিফা। তোমার প্রতীক্ষায় থাকব সারাজীবন।’ বাতেন অস্ফুট স্বরে বলে।
এখান থেকে মহাজন ওকে ঢাকা নিয়ে যাবে। আর ঢাকা থেকে শ্যালকের লোজকন সৌদী আরব পাঠিয়ে দিবে। বেতন মাসে দুই হাজার সৌদি রিয়াল। মাসে মাসে দু’শ রিয়াল এজেন্ট কম্পানি নিয়ে নিবে। আর বাকীটা বাংলাদেশে যে একাউন্ট খোলা হয়েছে ওখানে সরাসরি জমা হবে। জেদ্দা শহরের আল-সাফা এলাকার একটা বাড়িতে ওর কাজের জায়গা। বাড়িটা বেশ বড়, প্রাসাদের মত দেখতে। কতগুলো রুম আছে লতিফা এখনো জানে না। সব রুমে যাবার অনুমতি নাই ওর।
গ্রাম থেকে ঢাকায় আগে কয়েকবার এসেছে, কিন্তু বিমানে এই প্রথম। উত্তেজনায় কাঁপছিল লতিফা। জেদ্দা নেমে সোজা এই বাড়িতে। বাড়ির লোকজন কারা বুঝতে পারছে না এখনো। তবে ম্যানেজার টাইপের একজন আছে - রুস্তম নাম, বাঙ্গালী। রুস্তম ভাই ডাকতে বলেছেন। উনিই এয়ারপোর্ট থেকে লতিফাকে এখানে এনেছেন। কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন একটা একটা করে।
লতিফার ঘুম পাচ্ছে। ক্ষুধার কথাটা বলবে কী না সাহস পাচ্ছে না। প্লেনে খাবার দিয়েছিল অবশ্য। কিন্তু ঠিকমত খেতে পারে নি, কী সব খাবার! আবার চামচ দিয়ে খেতে হয়!
‘কাজ তেমন বেশী না। ভোর সকালে উঠে পুরা বাড়ি মব করবা। মব মানে ধোয়ামোছা, বুঝছ। মব-বাকেট ব্যবহার শিখিয়ে দেব। টেবিলে নাস্তা সাজাবা এরপর। খাওয়া হয়ে গেলে টেবিল পরিস্কার করে কিচেনে রেখে দিবা। এই যে, এইসব জায়গা থিকা সব কাপড় নিয়া লন্ড্রির ঝুড়িতে রাখবা এরপর। লন্ড্রিম্যান এসে নিয়ে যাবে একদিন পরপর।’ একটু থামে রুস্তম।
‘এরপর?’ লতিফা জিজ্ঞেস করে।
‘দুপুরের খানা টেবিলে দিবা। খাওয়া শেষ হলে টেবিল পরিস্কার করে তোমার এক ঘন্টার বিরতি। ফার্নিচারগুলা ঝাড়বা বিরতির পর। বিকালে যতগুলো ফুলের টব আছে সবগুলোতে পরিমানমত পানি দিবা। এরপর রাতে সকলের খাবার শেষে তোমার ছুটি। আরাম করে ঘুম। সকালে আবার সেই। কাজে ফাকি দিবা না, ঠিক আছে?’ চোখ মুখ শক্ত করে রুস্তম বলে।
বড় বড় করে মাথা নাড়ে লতিফা। কী বুঝছে কে জানে? বুক ভেঙ্গে কান্না আসছে, দমকে দমকে উঠছে বুকের পাঁজড়। মা’র কথা, বাজান, আজগর আর বাতেনের মুখ চরকির মত ঘুরতে থাকে ওর সামনে। কষ্টের মধ্যেই একটা জিনিস ধক করে উঠে লতিফার মনে। ওর বয়স কম তাও বুঝতে পারে পুরোপুরি। মেয়ে হয়ে জন্মেছে পুরুষের চোখের ভাষা দপ করেই ধরতে পারে।
বাসায় ঠিক কতজন আছে, না জানলেও বুঝতে পারছে বিশ পঁচিশ জনের কম হবে না। সবচেয়ে বুড়ো একজনই - শেখ সালেহ কামেল। তার ক’জন স্ত্রী কে জানে? তবে এ বাড়িতেই থাকে তিনজন। বুড়োর ছেলেমেয়ে অনেক তবে মেয়েরা এখানে থাকে না। আর ছেলেদের মধ্যে দু’জন এ বাড়িতে থাকে। এই দু’জনের বেশ ক’জন স্ত্রী আর ছেলেমেয়েও এখানে থাকে। কোলের বাচ্চা থেকে পনের-ষোল বছর বয়স হবে ওদের। বুড়োটা এখনো শক্ত-সামর্থ বেশ। চলাচল করতে পারে নির্বিঘ্নে। বিরাট ধনী! অনেকগুলা ব্যবসা, বাপ-ছেলেরা মিলে চালায়।
বাড়িতে কাজ করার মানুষ সব মিলিয়ে ছয়জন। একজন বাবুর্চি ভারতীয় আর তার সহকারী ফিলিপিনো। প্রচুর রান্না হয়, প্রতিদিন। আরো দু’জন বাঙ্গালী মেয়ে আছে যারা শুধু বাচ্চাদের দেখাশোনা করে। এর বাইরে আর একজন ফিলিপিনো মেয়ে আছে, নাম ম্যারিতাস। ওর কাজ শুধু বুড়োটার ফাইফরমাশ খাটা। রুস্তমের কাজ হচ্ছে সকলের দেখভাল করা। একসময় বাবুর্চির হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেছিল এখানে, সাত বছর আগে। এখন ম্যানেজার হয়েছে, বিশ্বস্ত ভীষণ।
রুস্তম ভাই বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, ‘এটা বড় সাহেবের ঘর। না ডাকলে এ ঘরের ভিতরে ঢুকবে না।’
তখনই বুকের ধকটা টের পায় লতিফা, বুড়োর চাহনি দেখে। মানুষটা রাজ-রাজাদের মত বিরাট একটা খাটে বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া, আর ফিলিপিনো মেয়েটা শরীর টিপে দিচ্ছে। হঠাৎই লতিফার সাথে চোখাচোখি হয়। খোদা! এ কেমন দৃষ্টি? মোটা ভ্রুর নীচে কুতকুতে চোখ দু’টো বড় করে তাকিয়ে আছে সরাসরি লতিফার দিকে। এ দৃষ্টি আগে কথনো দেখেনি ও। কেমন জলন্ত চোখ দু’টি, পলক পড়ছে না। লতিফার পুরো শরীর গিলে খাচ্ছে। ধক করে উঠে বুকের ভিতর, ‘ইয়া আল্লাহ! এ কোথায় তুমি আমারে আনলা?’
প্রচন্ড ভয়ের মধ্যে দুপুর পার করে লতিফা। কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ রুমের বেডে শুয়েছে। বিভিন্ন ধকল আর নিত্য নতুন-সবের উত্তেজনায় শরীর ভীষণ ক্লান্ত। ঘুমিয়ে পড়ে একসময়। ঘুমের মধ্যেই রুস্তম ভাই ঘরে ঢোকে, ‘লতিফা উঠ, বিকালের কাজগুলো শুরু করতে হবে।’
কয়েকদিন এভাবেই যায়। কাজকর্ম বুঝতে শুরু করে লতিফা। একদিন পরপর লন্ড্রিম্যান আসে ময়লা কাপড় নিয়ে যেতে। মানুষটা বাঙ্গালী, আসিফ নাম। যুবক বয়সী, পঁচিশ বছরের বেশী হবে না। টুকটাক কথাও হয় লতিফার সাথে।
যা হোক, দুপুরে খেয়ে বিছানায় গা এলিয়েছে একদিন। তন্দ্রামত এসেছে মাত্র, রুস্তম আসে। অনিচ্ছায় উঠে দাঁড়ায় লতিফা। টলতে টলতে রুস্তম ভাইয়ের পিছনে পিছনে চলে। একসময় সেই ঘরটার সামনে এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘ভিতরে যাও। ম্যারিতাস আছে, ও বুঝিয়ে দিবে।’
‘কী করতে হবে, রুস্তম ভাই?’ সাহসী লতিফা ভয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
‘আমি ঠিক জানি না।’ বলে ঠেলে ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে চলে যায় রুস্তম।
ইংরেজি বুঝে না তেমন লতিফা। তবু পরিস্কার বুঝতে পারে ম্যারিতাস কী বলছে। বুড়োর গা টিপে দিতে হবে। অসাড় পায়ে বিছানার কাছে যায়। মরার মত দাঁড়িয়ে থাকে। ম্যারিতাসই ধরে বিছানায় বসিয়ে দেয় ওকে। এরপর আর কিছু জানে না ও। মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ে জানোয়ারটা। পুরো সময়টুকু ম্যারিতাসকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সাহায্য করার জন্য। মাঝে মাঝেই চোখ সরিয়ে ফেলে ম্যারিতাস। বড় মায়া হয় বাংলাদেশী এই মেয়েটির জন্য। একসময় লতিফার বিধ্বস্ত-নিঃশেষিত দেহটাকে রুমে নিয়ে আসে। স¯েœহে বলে, ‘ঘুমিয়ে নাও একটু। ঘুমালে শরীর ভাল লাগবে।’
কিছু বলে না লতিফা। বোবা হয়ে গেছে সম্পূর্ণ। চোখের কোণা শুস্ক। থেকে থেকে গ্রামের সকলের মুখ ভেসে উঠে। বাতেনের মুখটা ভেসে উঠতে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়, ‘তোমার লতিফা মরে গেছে, বাতেন।’ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে এরপর। চোখের জল প্রপাতের ধারায় পড়তে থাকে। তারপরও সবকিছু ছাপিয়ে একসময় ঘুমে ঢলে পড়ে লতিফা। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল জানে না ও। রুস্তম ভাইয়ের ডাকে ধরফর করে উঠে।
‘লতিফা উঠ, রাতের খাবার দিতে হবে।’
‘রুস্তম ভাই’ বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে লতিফা।
রুস্তম শান্তনা দেয়, ‘মুখ বুজে সহ্য করে যাও। গ্রামে তোমার পরিবার কত টাকা পাচ্ছে তুমি জান? তাদের জন্যে হলেও এটুকু সহ্য করতেই হবে, তাই না?’
‘রুস্তম ভাই, আমার সব শেষ!’ বলে ডুকরে কাঁদতে থাকে লতিফা।
‘আহা! কান্না থামাও। এখন রেডি হও, কাজ করতে হবে না?’ রুস্তম তাড়া দেয়। ঘৃণার দৃষ্টিতে রুস্তমকে দেখে লতিফা। মনে হয় এরে খুন করলে একটু শান্তি পেত।
রাতের খাবারটা পরিবারের সবাই একসাথে খায়। তাই সকলে বসেছে বিরাট টেবিলের চারপাশে। ক্লান্ত-অবসন্ন লতিফার হাত থেকে একটা ডিশ পড়ে যায় আচমকা। সাথে সাথে বুড়ো শকুনের তিন ছেলের একজন উঠে এসে দড়াম করে চড় বসিয়ে দেয় গালে। ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যায় লতিফা। রুস্তম আর বাবুর্চী এসে পরিস্থিতি সামলে নেয়। লতিফা অসহায় চোখে দেখে এই লোকটির চাহনিতেও সেই কামুক দৃষ্টি। তবে বাকী দুই ছেলেকে এরকম বলে মনে হয় না। আশ্চর্যের ব্যাপার! সকলেই কেমন নির্লিপ্ততায় খেয়ে নিচ্ছে। মারের ঘটনা হরহামেশাই ঘটে এখানে বোধ হয়। তাই কারো কোন মাথা ব্যথা নেই।
চোখে রাজ্যের হতাশা আর ক্ষোভ নিয়ে ঘুমাতে যায় লতিফা। কিছুটা বুদ্ধিতো ওর আছে। ও জানে আজকের ঘটনা আবার হবে। ভাবতেই ডুকরে কেঁদে উঠে আবার। বাসার বাইরের গেট তালাবদ্ধা দেখেছে ও। কোনভাবে পালানো যাবে না। কী যে হবে? পরের দিন সকালে বুড়োর সেই ছেলে একটা রুমে ওকে একা পেয়ে চেপে ধরে। হাতে চাকু নিয়ে বলে, ‘শব্দ করলে খুন করে ফেলবে।’
লতিফা বাঁধা দিবার চেষ্টা করে অনেক। কিন্তু যা করার করে নেয় হারামজাদা। লতিফা রুমে চলে আসে, আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। শরীরের উপর ঘেন্না ধরে যায়, আত্মহত্যার পথ খোঁজে। আবার মা-বাবা-বাতেনের চেহারাটা ভেসে উঠে। মরে গেলে এদেরকে আর দেখতে পাবে না। কী করবে ও এখন? এখানে চড়-থাপ্পর মাঝে মাঝেই খায়। কিন্ত অসম্ভব ঘৃণ্য ঘটনাটা ঘটে কাল রাতে। ক্লান্ত লতিফা ঘুমিয়ে আছে। হঠাৎ নিঃশ্বাস বন্ধের চাপে ঘুম ভেঙ্গে যায়। লাইট জ্বালানো ঘরের, বুড়োর দুই নাতি এসেছে। একজন লতিফাকে চেপে ধরেছে আর আরেকজন চেষ্টা করছে আনাড়ী হাতে। অসহ্য ঘৃনায় লতিফা কাঁদতেও ভুলে গেছে তখন।
কীভাবে এ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, উপায় খুঁজতে থাকে। রুস্তমকে বলেছে কয়েকবার, কোন লাভ হয় না। হঠাৎ আসিফের কথা মনে হয়। লন্ড্রিম্যান, দুই দিন পর পর আসে কাপড় নিতে। ‘কেমন আছেন?’ টাইপের কথা হয় মাঝে মাঝে। লতিফা বুঝতে পারে ছেলেটি ওর দিকে তাকায় প্রশংসার দৃষ্টিতে।
বিদেশ বিভূঁইয়ে এই নরকসম পরিবেশে আসিফকেই একটু নিরাশার আশা হিসেবে দেখে লতিফা। আবডালে নিয়ে গিয়ে দু’চার কথা শুরু করে।
‘লতিফা, আজকে কেমন আছ?’ আসিফ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে।
‘আমি ভালা নাই। আপনে আমারে বাঁচান দয়া কইরা।’ লতিফা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে।
‘কেন, কী হয়েছে?’
‘আপনে অন্য কোন সময় আইতে পারবেন? দুপুরের টাইমে। তহন আমাগো রুমে বইসা আপনারে কষ্টের কথাগুলান কইতাম।’ লতিফা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে।
‘ঠিক আছে। পরেরবার আমি দুপুরে আসব।’
লতিফা কথাগুলো গুছিয়ে নেয়, কী বলবে। বললে কী হবে তা ও জানে না। কিন্তু কষ্টের কথা কাউকে না বললে ও পাগল হয়ে যাবে। ঠিক সময়ে আসিফ আসে। অলক্ষ্যে লতিফাদের রুমে ঢুকে যায়। কেউ নেই এখন। লতিফা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে।
‘আরে! কাঁদছ কেন? সুস্থির হও। আগে বল কী হয়েছে?’
অনেক কষ্টে কান্না থামায় লতিফা। আসিফের মায়া পড়ে যায়। সুন্দর দেখতে মেয়েটি। অদ্ভুত ভাল লাগায় ছেয়ে যায় মন। লতিফা আদ্যোপান্ত সব বলে। ছোট দুইটার কুকীর্তিও বাদ রাখে না। পুনরায় কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘অত্যাচার এহনো চলতাছে। আপনে আমারে বাঁচান।’
আসিফ স্তব্ধ হয়ে যায়। এই পরিবারের প্রতি ঘৃণায় শরীর কেঁপে উঠে। লতিফার দিকে তাকায়। ওকেও কী ঘৃণা করছে এখন? একটু হতাশ হয়। আহারে! মেয়েটিকে ভাল লাগতে শুরু করেছিল। উঠে যাবার জন্য চেয়ার ছাড়ে প্রায়। লতিফা কেঁদেই যাচ্ছে। হঠাৎই মাথার মধ্যে চলে আসে, মেয়েটার দোষ কী? গ্রামের সহজ সরল একটা মেয়ে ভাগ্যচক্রে এখানে এসে পড়েছে। মনুষ্যত্ব জেগে উঠে আসিফের। মেয়েটিকে উদ্ধার করতে হবে এই নরক থেকে। কিন্তু কীভাবে? পুলিশের কাছে গিয়ে কোন লাভ হবে না। পুলিশ গুরুত্বই দিবে না। কারণ, কোন প্রমাণ ওদের কাছে নেই। আর এ সমাজ পুরুষতান্ত্রিক। তাই সবকিছু ওদের পক্ষেই যাবে।
একটা কাজ করলে কেমন হয়? এখান থেকে মেয়েটিকে বের করে বাংলাদেশ হাই কমিশনের জেদ্দাস্ত কনস্যুলেটে নিয়ে যেতে পারে। ওখানে সব খুলে বললে ওরা নিশ্চয় সাহায্য করবে। নিদেনপক্ষে দেশে পাঠিয়ে দিবে। তাতে মেয়েটি এই দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। আরব বুড়োটা তেমন একটা খোঁজাখুঁজি করবে বলে মনে হয় না। কারণ, এদের কুকুর্মের কথা নিজেরা অন্তত জানে। তাই এ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবে না তেমন। এরপর যা হবার হবে, এত চিন্তা করার দরকার নাই। লতিফাকে বলে, ‘পরশুদিন আমি আসব। তুমি সবকিছু গুছিয়ে রাখবে। একটা বোরকা পড়ে তৈরি থাকবে।’
নির্দিষ্ট সময়ে বোরকা গায়ে চাপিয়ে যৎসামান্য কিছু নিয়ে আসিফের সাথে বের হয় লতিফা। ইতোমধ্যে আসিফ লন্ড্রির ঝুড়িগুলো ট্রাকে উঠিয়ে নিয়েছে। বের হবার সময় ফিসফিস করে বলে, ‘সবাই এখন ঘুমাচ্ছে। বুড়োটাও ঘুমাচ্ছে নিশ্চয়। মনে হচ্ছে, একটা থান ইটের বাড়ি দিয়ে ওর মাথাটা ফাঁটিয়ে দিয়ে যাই।’
‘দাঁড়ান এইহানে।’ হঠাৎ লতিফা থমকে যায় একটা দরজা পার হতে গিয়ে। বারান্দা থেকে ছোট্ট ফুলের টবটা উঠিয়ে আনে। দরজায় নক করে - টক টক টক। রুস্তমই দরজা খুলে। ফুলের টবটা সোজা রুস্তমের মুখ বরাবর ছুড়ে মেরে চলে আসে লতিফা। তীব্র ঘৃণাভরে বলে শুধু, ‘তুই একটা জানোয়ার!’
লন্ড্রির ট্রাক রেডিই ছিল। আসিফ সোজা গিয়ে উপস্থিত হয় বাংলাদেশ হাই কমিশনের জেদ্দা অফিসে। পথে আসিফ বলে, ‘তুমি যে ফুলদানি ছুড়ে মারলে রুস্তমকে, ঐ বেটা যদি বলে দেয়?’
মুখ ঝামটা দেয় লতিফা, ‘কইবে না। কাউরে কইতে পারব না। ঐ হারামজাদা কুকুরের চাইতেও খারাপ। কেউ জিগাইলে কইবে পইড়া গিয়া ব্যথা পাইছে বা এই রহম কিছু।’
আসিফ অবাক হয়ে দেখে লতিফাকে, লতিফার এই পরিবর্তনকে। অনেক বেশী পরিণত মনে হয় মেয়েটিকে। যেন অন্য এক লতিফা, এ ক’দিনে অনেক পরিপক্কতা অর্জন করে ফেলেছে। কান্নার রেশ নেই কোন, সারা মুখে বিচ্ছুরিত ঘৃণা, সাথে মুক্তির আনন্দ।
সব শুনে বাংলাদেশ হাই কমিশন ত্বরিত অনেকগুলো পদক্ষেপ নেয়। লতিফাকে কমিশনের রিয়াদ অফিসের সেফ হোমে নিয়ে যায়। মানসিক-শারীরিক সব ধরনের সেবা দেয়া হয়। সৌদি শ্রম আদালতে নারী নির্যাতনের মামলা করে কমিশন। লতিফার পুরো জবানবন্দি আরবীতে অনুবাদ করে রেকর্ড করা হয়। এরপর তা আদালতে দাখিল করে। আদালতের কাঠগড়ায় দাড়িয়েও পুরো ঘটনা দোভাষীর মাধ্যমে আদ্যপান্ত বলে যায় লতিফা। অবশ্য, ফুলদানি ছুড়ে মারার ঘটনাটি বাদ দিয়ে।
আদালত দু’পক্ষের বক্তব্য শুনে রায় ঘোষণা করে। লতিফাকে পুরো তিন বছরের বেতন অগ্রিম দেবার আদেশ দেয়া হয়। সাথে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অতিরিক্ত পঞ্চাশ হাজার ডলার। কমিশনের সমস্ত আইনি খরচ বহন করতে হবে। আদেশে আরো বলা হয়, লতিফাকে সসম্মানে দেশে ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া, অত্যাচারীদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডও প্রদান করে আদালত। সবশেষে, রুস্তুমের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করা হয়। সৌদি নাগরিক না বলে বাংলাদেশের আদালতে বিচারের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-জেদ্দা ফ্লাইটের প্রথম শ্রেণীর কেবিনে বসে আছে লতিফা। দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে আর ভাবতে চায় না ও। মনকে প্রবোধ দেয়, ওটা একটা দুঃস্বপ্ন ছিল। সেসব পিছনে ফেলে নতুন করে জীবন শুরু করবে এখন। এ ক’দিনে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে ওর জীবনে। বর্ধিত সাহস আর সদ্য-পাওয়া বিপুল অর্থ ওর জীবন পথের পাথেয়। আসার সময় কত আড়ষ্টতা ছিল প্লেনে! আজ ফেরার সময় লতিফা মাথা উচিয়ে দৃঢ় অথচ সাবলীল কণ্ঠে বিমান বালাকে ডাকে, ‘আমারে একটা অরেঞ্জ জুস দেন।’
নিজের গলার স্বরে নিজেই অবাক হয়।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৪২১ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৩/১২/২০১৭

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • গোলাম মুস্তাফা ৩০/১২/২০১৭
    সংলাপ খুব ভাল
  • মর্মান্তিক।।
  • প্রত্যেকটা মেয়েই যদি লতিফার মতো হত?আসিফদের মতো সাহায্যকারি পাওয়া যায় না বেশিরভাগ সময়ে..
 
Quantcast