www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

গল্পের শেষটুকু

সে ছিল একটানা বৃষ্টি। বর্ষার বিষন্ন মেঘ। তার সাথে দেখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে। সাল ১৯৯৮। আমার বাড়ি মফস্বল শহরে। পরীক্ষা দিতে ঢাকায় আসা। আমার পাশেই তার সীট। পরীক্ষা চলাকালীন সারাটা সময় তাকে জালিয়ে মারলাম। চুপচাপ শান্ত স্বভাবের মেয়েটি তা মেনে নিল। পরীক্ষা শেষে বললাম চলো ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখি। আর সুযোগ যদি না হয়। মেয়েটি খুশি মনে রাজি হলো।

যতক্ষন একসাথে ছিলাম আমার বক বকানিতে বেচারি বিধ্বস্ত। বিদায় নেবার সময় দুজনের ঠিকানা বিনিময় হল। তখন মোবাইল ফোন এত সুলভ নয়। মেয়েটি বিষন্ন চোখে বলল “এখন থেকে গিয়েই তুমি সব ভুলে যাবে।” বললাম “কক্ষোনা।

ঢাকায় চান্স হলো না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় ভর্তি হলাম। হলে থাকি। বন্ধুবান্ধব, হৈ চৈ, আড্ডা মোট কথা তারুন্যের উদ্যাম জোয়াওে বিষন্ন চোখের মেয়েটি যার নাম নওমি। তাকে নিয়ে বিন্দু মাত্র ভাবার অবকাশ রইল না আমার। তার কথাই ঠিক হলো। আমি সব ভুলে গেলাম।

ছুটিতে বাড়ি এলাম। মা বললো আমার নামে একটা টিঠি এসেছে। চিঠি খুললাম। সেই মেয়েটি! ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ছিল। ভাল বিষয় পেয়েছে। হাতের লেখা এত সুন্দর যে, প্রতিটা বর্ণ আলাদা ভাবে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। ভাষার ব্যবহার এত চমৎকার যে, কে বলবে সে সায়েন্সের ছা্ত্রী। সাথে সাথে উত্তর লিখতে বসলাম।

শুরু হলো আমাদের চিঠি লেখা লেখি। তুচ্ছ কিন্তু মিষ্টি মিষ্টি সব উপহার পাঠাতাম আমরা। চাবির রিং খেলনা ভাল্লুক কিংবা রবীঠাকুরের গীতবিতাব। দিনগুলো যেন প্রজাপ্রতির ডানায় ভর করে কাটাছিল। আমার চিঠিগুলো থাখতো অর্থহীন কথায় ভরা। আজ ক্যাম্পাসে কি করলাম, ক্লাস ফাঁকি দিতে গিয়ে কোন স্যারের হাতে ধরা খেলাম, ডায়নিংয়ে কোন ছেলের সাথে ঝগড়া করলাম ইত্যাদি। আর ওর চিঠি গুলো যেন কালিদাসের মেঘদূত। যক্ষের বিহর ব্যাথা যক্ষ প্রিয়ার কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম। বাংলায় পড়তাম আমি অথচ কাব্য শোনাতো সে। বুঝলাম কাছে আসছি।

এক চিঠিতে ও লিখল তার মনের ড্রইং রুমে আমার একটা শার্ট পড়া ছবি আছে। তার খুব ইচ্ছে সেই ছবিটাতে আমার চোখের চশমাটা খুলে নেওয়ার।কিন্তু সাহসের অভাবে পারে না। উত্তরে বললাম আমার চোখের চশমাটা খুলে নিতে আর ছবিটা ড্রইং রুম থেকে তার মনের শোবার ঘওে নিয়ে আসতে। চাইলে আমার পাশে সেও থাকতে পারে। খুব ধীরে ধীরে দু’জন দ’জানার প্রেমে পড়লাম।

এক বছর হতে চললো, আমাদের দেখা হয় না। যত বারই আমি দেখা করার কথা বলি, ও শুধু পাশ কাটে। বিরক্ত হয়ে তাকে না জানিয়েই ঢাকায় এলাম। ওর বন্ধুরা জানালো আমি এসেছি শুনে ও রেগে ভোম হয়ে আছে। হলে তাকে না পেয়ে ক্লাসে গেলাম। ওর ক্লাস চলছে। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে, বুকের ভিতর ঘূর্নিঝড় চলছে। ভালবাসাবাসির প্রথম দেখা। ও কি পারবে আমার উপর রাগ করে থাকতে! অনেকক্ষন পর, বিষন্ন চোখের মেয়েটি এই প্রথম ভালবাসার চোখ নিয়ে আমার কাছে এসে বললো “চলো”।

আমি বললাম, “রাগ করোনি ?”

উত্তরে বললো, “দুঃখ সেও নেশার মত লাগে

যদি সেটা তোমার দেয়া হয়

অন্য যত দুঃখের কথা জানি

কোনটাই চাওয়ার কত নয়

তুমি আমার ভেতর বাড়ি চেনো।

তাই সহজেই প্রবেশ কর মূলে

আসে যারা সুখের স্মৃতি নিয়ে

ঘারায় তারা পথের হুলুস্থুলে।”

বললাম, “দুঃখটা কখন দিলাম ?”

বললো, “এখন। এই যে এলে, তারপর বুকে হাহাকার জাগিয়ে চলে যাবে’

বললাম, “আমার হাতটা একটু ধরো।”

বললো, “এই ঢের, আর দুঃখ দিওনা, সেদিন, যেদিন আর চলে যাবে না সেদিন না হয় ধরবো।”

দীর্ঘ নিঃশ্বাস গোপন করলাম, এতদিন এতটুকু বুঝেছি। ওর কাছ থেকে জোর করে কিছু আদায় করা যায় না

ফিরে এলাম। তার পর যথারীতি চিঠি বিনিময় কিংবা ফোনে কথা। ততদিন মোবাইল ফোন নেওয়া হয়েছে। আমি তখন অন্য এক জগতের বাসন্দা। সব কিছুই ভালো লাগে। ফুল সবচেয়ে বেশি ভাললাগে। ঠিক এই সময় বুকের পাঁজর ভাঙ্গার মত ওর একটা চিঠি এলো। “আমাকে ভুলে যাও। ভালো থেকো। আর মনে রেখো, আমি তোমাকে ঘৃণা করি।”

চিঠি হাতে আমি বজ্রাহত! অনেক চেষ্টা করলাম তার সাথে যোগাযোগ করতে। আমার অপরাধটা কী জানতে। পারলামনা। শেষ পর্যন্ত ঢাকায় এলাম। অনেক চেষ্টা করেও দেখা পেলাম না। তার হলের ঠিকানায় একটা চিঠি রেখে এলাম।

“দুঃখ সে নয় শুধুই তোমার একার

আমারো কিছু অংশ আছে তাতে

নিবির ঘন ব্যাথার মাঝেমাঝে

তুমিও মিশে আছো আমার সাথে।”

ফিরে এলাম। সে এসেছিলো বৃষ্টি হয়ে। চলে গেলো আমার আকাশটাকে চিরকালের আঁধার করে।

৯ বছর পর। পড়াশোনা শেষ করে আমি আমার শহরে একটি কলেজে জয়েন করেছি। তার দেয়া ক্ষত এখনো বুকে আছে। কিন্তু সময়ের স্রোতে ব্যথার তীব্রতা কমেছে। জীবন বয়ে যায়, আর তাই, কাল আমার বিয়ে. পারিবারিকভাবে। মেয়ে সকারী কলেজের প্রভাষক।

আজ গায়ে হলূদ ছিলো। সারা দিন খুব ধকল গেছে। রাতে ক্লান্ত শরীরে ঘুমাতে যাবো। তখন একটা ফোন এল। ও পাশের ‘হ্যালো’ শুনে বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠলো। এ কন্ঠ যে আমার চিরচেনা! আবেগ গোপন করে শান্ত গলায় বললাম, “কি চাও?”

বলল, “তোমাকে।”

বললাম, “কাল আমার বিয়ে, দয়া করে আমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করো না। তা

ছাড়া আমার হৃদয়টাও কোন হোটেল নয়। কেউ ইচ্ছেমত যাবে আর আসবে।” বলল,“ক্ষমা করে দাও, অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে।

জানালো, আমার কোন এক বন্ধু আমার সাথে তার গভীর প্রণয়ের কথা জানিয়ে তাকে সরে যেতে বলেছে। আর আমার বিষন্ন চোখের অভিমানী প্রেমিকা আমাকে এতটুকু যাচাই না করেই সরে গেছে। বুঝতে পারলাম, কে হতে পারে ? ক্যাম্পাসে বড় জালিয়েছে আমায়।

বললাম, “ভুল ভাঙ্গার প্রয়োজন নেই, শুধু তোমাকে প্রয়োজন।” আমি শুধু হাসলাম।

ও করুন গলায় বললো, “এখন শুধু করলে ভোররাতে তোমাদের ওখানে চলে আসতে পারবো ? আসবো তোমাকে নিতে?

বললাম, “পাগলামি যথেষ্ট সহ্য করেছি। আমারো একটা মন আছে, সেটার নিয়ন্ত্রন আমি নিজেই করি।” বলে লাইন কেটে দিলাম।

সারা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারলাম না। খুব ভোরে বিছানা ছাড়লাম। ভোরের মিষ্টি হাওয়ার ছাদে উঠলাম। নিচে তাকিয়ে দেখি একটা ইয়োলো ক্যাবে হেলান দিয়ে ও দাঁড়িয়ে আছে। দৌড়ে নিচে নামলাম। হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম “আমাকে বিপদে ফেলো না, প্লিজ চলে যাও।”

শান্ত চোখে ও আমার হাত ধরলো । বললো, “চলো

তার চোখে আমি কি দেখলাম জানিনা, মন্ত্রমুগ্ধের মত বললাম, “একটু দাঁড়াও আমি আসছি।”

তড়িঘড়ি উপরে এলাম। মাকে ক্ষমা চেয়ে একটা চিঠি লিখলাম। ড্রয়ার থেকে সার্টিফিকেট গুলো হ্যান্ডব্যাগে নিলাম. অনামিকা থেকে বাগদানের আংটিটা খুললাম। তারপর চিঠি আর আংটি ঘুমন্ত মায়ের মাথার পাশে রেখে এসে ওর হাত ধরলাম।

৩ বছর পর। আমাদের একটা বাবু হয়েছে। নাম রেখেছি মেঘ। মেঘ আর মেঘের মা মিলে সারাক্ষণ আমাকে অস্থির করে রাখে। এখন আমার ঘরে আর একটানা বৃষ্টি ঝড়েনা। এখানে এখন সবসময় আর রৌদ্রের লুকোচুরি খেলা।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ২৪৬ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৫/০৩/২০১৮

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast