www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

সরল ছেলের সরল কথা

মানুষ সামাজিক জীব। আর প্রতিটি মানুষ বাঁচে কোন না কোন স্বপ্ন নিয়ে । বেড়ে ওঠে এই সমাজে, এই সংসারে। ঠিক তেমনি আমিও বেড়ে উঠিয়াছি এই সমাজে। আমি গ্রামের আঁকা-বাঁকা, সরল-সোজা পথে চলা একদম সর্ব সাধারণ মানুষ।


জন্ম থেকে মুখে অক্ষর জ্ঞানের বুলি ফোটার পর থেকে পারিবারিক শিক্ষা লাভ করি। তারপর নির্ধারিত বয়স সীমায় শিশু শ্রেণি তে ভর্তি হয় অর্থাৎ দুই হাজার আট সালে। তখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে দুই হাজার নয় সাল থেকে তের সাল পর্যন্ত প্রাথমিক এবং চৌদ্দ সাল থেকে আঠার সাল পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তর কেটে যায়। এই দুটো ইস্কুল আমাদের গ্রামের স্কুল। একটি নাম মুনসেফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং আরেকটি নাম মুনসেফপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় আমি এই দুটো স্কুলে পড়াশোনা করি। আমি নিজেও জানিনা কিভাবে আমার মাঝ থেকে এই পনের বছর বা সাড়ে পনের বছর কেটে যায়। তবে কি বন্ধুদের সাথে আড্ডায় কেটে যায়? না, আমার তেমন কোনো বন্ধু-বান্ধবী ছিল না, এক কথায় বলতে গেলেই চলে কোন বন্ধু-বান্ধবী ছিল না! তবে হ্যাঁ একেবারে যে বন্ধু ছিল না সেটা বলা ভুল। বন্ধু ছিল সেটা মাধ্যমিক পর্যায়ে কিন্তু হাতে গোনা কয়েকজন। তাঁর মধ্যে সবচেয়ে কাছের বন্ধু এবং আমার বেস্ট বন্ধু মুস্তাকিন। তাও আবার অষ্টম শ্রেণী থেকে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। অর্থাৎ আমি কোন বন্ধুদের সাথে সময় দেওয়ার মতো সময় পাইনি। আমার সময়টা কেটেছে পড়াশোনা করে আর বাবা-মায়ের শাসনে। আমার মধ্যে 'আমি কে' এই শব্দটি আমি কখনো চিনতে পারিনি। স্বাধীনতা কি স্বাধীনতা কাকে বলে সেটার উত্তর পেয়েছি আমি আমার মন থেকে।


আমি ছোট্ট থেকে কখনো স্বাধীনতা পায়নি বা পাওয়ার চেষ্টাও করিনি। আমার জীবনের ধারাবাহিক নিয়ম এমন ছিল যে, সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করে অজু করে নামাজ পড়ে পড়তে বসতাম। স্কুলের সময় হলে খাওয়া দাওয়া করে স্কুলে চলে যেতাম। আবার স্কুল ছুটি হলে বাড়ি এসে গোসল করে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সম্পন্ন করে ঘুমিয়ে যেতাম। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির আঙ্গিনায় ঘুরতে না ঘুরতেই সন্ধ্যা হয়ে যেত। আবারো নামাজ-কালাম পড়ে পড়তে বসতাম এবং পড়া শেষ করে রাতের খাবার সম্পন্ন করে দাঁত ব্রাশ করে ঘুমিয়ে পড়তাম। এই হল আমার প্রতিদিনকার ধারাবাহিক কার্যক্রম। এই কার্যক্রম আমার জীবনে ধারাবাহিক নিয়ম হলেও এই নিয়মের প্রবর্তক হলেন আমার বাবা-মা।


এই জীবন থেকে অনেক কিছু বাদ পড়েছে যেমন খেলাধুলো, বন্ধুদের সাথে থাকা, আরো অনেক কিছু। তবে আর যাই হোক না কেন এই স্বল্প কষ্টের মাঝে দেরিতে হলেও 'আমি কে' শব্দটি বুঝেছি এবং জীবনকে বুঝেছি। এর মাধ্যমে হয়তো সৃষ্টিকর্তা এই আমি আমার জীবনকে বুঝিয়েছে। যাই হোক এতে আমার কোন কষ্ট নেই। বিনোদনের মাধ্যম শুধু খেলাধুলা তা কিন্তু নয়, হতে পারে অন্য কোন কিছু। যেমন আমি বিকেলে আঙ্গিনায় তারপর মাঠে ঘুরেছি, পারিবারিক কিছু কাজে সহয়তা করেছি। এর মাধ্যমেই আমি আমার বিনোদনকে খুঁজেছি এবং তা পেয়েছিও।


হয়তো আমার জীবনের এই ধারাবাহিক নিয়মের কারণে সমাজে আর দশটি খারাপ, বখাটে ছেলেদের মতো হয়নি। আমি চির ঋণী আমার পিতা-মাতার কাছে। এমনিতে সন্তান কখনো পিতা-মাতার ঋণ শোধ করতে পারে না, তারপরেও ঋণের পর ঋণ। যাই হোক আমি আমার এই ঋণ শোধ করার চেষ্টা করব। এই ঋণ কেউ শোধ করতে পারে না, কিন্তু চেষ্টার কমতি কেন রাখব?


যাইহোক এখন আমার বয়স সাড়ে পনের অথবা ষোল বছর হবে। সবেমাত্র মাধ্যমিক স্তর পেরিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয় অর্থাৎ কলেজে। কলেজে ভর্তি হয়ে আমি বেশ খুশি। ইতিমধ্য কলেজে ক্লাস শুরু হয়েছে। ১লা জুলাই দুই হাজার ঊনিশ তারিখ থেকে আমাদের কলেজে ক্লাস শুরু হয়। কলেজে আমি প্রথম থেকেই যত দিন কলেজে এসেছি সব দিন সব ক্লাস করি। একদিন-দুইদিন করে কলেজে সাত থেকে আট দিন কেটে যায়। এরপর নয়-দশ দিনের মাথায় আমি এক মেয়ে দেখতে পাই। তবে কি এই নয়-দশ দিনে একটি মেয়েও দেখিনি? হ্যাঁ, অনেক মেয়েই দেখেছি। যতটা না এই কলেজে ছেলে দেখেছি তার চেয়েও বেশি মেয়ে দেখেছি। কারণ এই কলেজটি প্রায় গ্রামের মধ্য। আমাদের কলেজের নাম রূপদিয়া শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়। এই কলেজটি রূপদিয়া বাজার থেকে একটু ভিতরে, তবে বেশি দূরে না। বাজার থেকে পায়ে হেঁটে কলেজে যেতে মিনিট দশেক সময় লাগে। যাইহোক এই কলেজের পার্শ্ববর্তী তেমন কলেজ নেই, আর যা আছে তা দূরে। আমাদের কলেজে আসতে যে টাকা লাগে তার চেয়েও দ্বিগুণ টাকা বেশি লাগে ঐ সব কলেজে যেতে। আর তার চেয়েও বড় কথা মেয়েরা বেশি দূরে যেতে পছন্দ করে না। এই পরিপেক্ষিতে বেশিরভাগ মেয়েরা আমাদের কলেজে আসে। আর ছেলেরা তো কেউ এখানে কেউ ওখানে চলে যায়। যাই হোক এই কারণেই হয়তো আমাদের কলেজে মেয়েরা একটু বেশি। এই কয়দিনে আমি অনেক মেয়েই দেখেছি কিন্তু সেই মেয়ের মত আর একটি মেয়েও আমি দেখিনি। আমি এটাই বুঝাতে চেয়েছি।


প্রতিনিয়ত অনেক মেয়েই আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যাই, আবার কেউ কেউ আমার সাথে কথা বলে আমিও কথার উত্তর দি। কিন্তু এতে আমার রাগ হয়। মানে আমার এমন হয়েছে যে, সন্দেশ খাওয়ার পরে গুড় যেমন মিঠে লাগে না, ঠিক ওই মেয়ে দেখার পরে আর অন্য কোন মেয়ে ভালো লাগে না! আমার পছন্দের সেই মেয়েটি সেও আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যায়, কিন্তু কথা বলে না আর আমিও সাহস করে কথা বলতে পারি না।


আর আমার সাহসের কথা বলতে গেলে, সে এক বিরাট কাহিনী। একমাত্র এই সাহস না থাকার জন্য আমি অনেক মেয়ের প্রেম থেকে বঞ্চিত হয়েছি। অর্থাৎ প্রেম করার মতো মেয়েদের হাতের মুঠোয় পেয়েও হাত মুঠ করতে পারিনি বিধায় মেয়েদের সাথে প্রেম করতে পারিনি। একটি কথা সকলের জানা, 'মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না'। তাই কিছু কিছু মেয়ে আছে যাদের চোখ, মুখ দেখলে বুঝা যায় যে তার কি ভাব। সে ক্ষেত্রে আমিও বুঝতে পারি কোন মেয়ে কি রকম, কোন মেয়েকে প্রস্তাব দিলে একসেপ্ট করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি ঘটলো এই বুকের সাহস আমাকে প্রেম করতে দিল না।


ঠিক তেমনি আমাদের কলেজে আমার সেই পছন্দের মেয়েকে প্রস্তাব দিলেই হয়তো কাজ হয়ে যাবে। এমনিতে কলেজে নয়-দশ দিন পার হয়ে গেছে। এবার পছন্দের সেই মেয়েকে প্রস্তাব দেওয়ার পালা। আজ না কাল, কাল না পশু এমনি করে তিন-চার দিন কেটে গেল তবুও প্রেমের প্রস্তাব দিতে পারলাম না। এটাই হয়তো আমার বড় ব্যর্থতা। যাই হোক এতে করে কলেজে আস্তে আস্তে মোট পনের দিন কেটে গেলো তবুও কোন ফলাফল দেখাতে পারলাম না। এতে শুধু আমি চেষ্টা করিনি এতে আমার বন্ধু মুস্তাকিন, রাকিব, জুবায়ের, রকি কে দিয়েও চেষ্টা করেছি যাতে ওই মেয়েটি আমার হয় কি না। আমার বন্ধু গুলো আমাকে তেমন ফলাফল দেখাতে পারেনি, তার পরেও আমার পাশে থেকে আমাকে সাপোর্ট করে গেছে। এভাবে আরো কয়েক দিন কেটে গেল কিন্তু আমি তাকে বলতে পারলাম না যে তোমাকে ভালোবাসি। আমি যদি একবার বলি যে তোমাকে ভালোবাসি তবে আমি শিওর সে আমার প্রস্তাবে হয়ে যাবে রাজি।


এরকম স্বাভাবিক ভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। এর মধ্যে আমি একদিন কলেজে যাইনি। আমি যে দিন কলেজে যাই নি সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার আঠার তারিখ অর্থাৎ কলেজের আঠার দিন। সেদিন আবার আমি আমার এক জরুরী কাজের জন্য যশোরে যায়। সেখানে কাজ সেরে গাড়িতে এসে রূপদিয়া নামি। রূপদিয়া থেকে আমাদের মুনসেফপুর গ্রামে আসতে ইজিবাইক অথবা ভ্যানে আসতে হয়। আমি যথারীতি ইজিবাইকে উঠে বসি এবং তার কিছুক্ষণ পূর্বে কলেজ ছুটি হয় সে ক্ষেত্রে দেখি দুইজন বান্ধবী আমার ওই ইজিবাইকে উঠে একজনের নাম ফাতেমা আরেক জনের নাম আফসানা। এই দুইজনের মধ্যে আমার এই ব্যাপারে আফসানা জানে সে আমাকে বলল, ভাই তুই কলেজে যাস নি কেন আজ? আমি বললাম, আমার এক জরুরী কাজে যশোরে গিয়েছিলাম তাই আজ আর কলেজে যাওয়া হলো না। এবার সে আমাকে বলল, তোর সেই পছন্দের মানুষ কলেজ থেকে টিসি নিয়ে চলে গেছে। আমার তো বিশ্বাস হচ্ছে না সে কেন কলেজ ছেড়ে চলে যাবে। আফসানা আমাকে বলল, মনে কিছু করিস না ভাই কলেজে তো আরো অনেক মেয়ে আছে। আমি আবার মনে মনে বলতেছি কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা! তখন আমার মাথার মধ্যে ঘুরছিল আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা যে কেন আমার সাথে এমন হলো? এভাবে ইজিবাইকে আস্তে আস্তে বাড়ি চলে এলাম। এবার অনেক কষ্টে শুক্রবারের দিন এবং শনিবারের সকাল পর্যন্ত কাটলো। শনিবারে আমি যথারীতি কলেজে চলে গেলাম এবং মনে মনে খুঁজতে থাকলাম তিন-চারটা ক্লাস হয়ে যাচ্ছে তবুও তার দেখা পেলাম না। এরপর অধৈর্যের পরে আমার কয়েকজন পরিচিত বন্ধুবান্ধবের কাছে শুনলাম সে কি কাল টিসি নিয়ে চলে গেছে? সবাই বলল হ্যাঁ। এবার আমি একা একা নিরালায় ভাবতে থাকলাম আমি যদি বৃহস্পতিবার এ কলেজে আসতাম তবে কিছু না হলেও নিতান্ত তার ফোন নাম্বারটা নিতে পারতাম। এমনকি মেয়ের নাম টা যে কি তাও সঠিক জানিনা তবে তার বাড়ি কচুয়া একটুখানি আমি শিওর। তারপরে আমি নিজেকে মন থেকে সান্ত্বনা দিলাম, 'জীবনের একটি ব্যর্থতা মানে এই নয় যে জীবনকে থমকে দাঁড়ানো'।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৭১ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৫/০২/২০২০

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • ফয়জুল মহী ১৫/০২/২০২০
    অনুপম, শুভ কামনা অহর্নিশি। ♥♥।
  • আত্মকথা!
  • ভালো
 
Quantcast