www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

নৌকা প্রদীপ

নৌকা প্রদীপ
জয়শ্রী রায়

মে মাস । দিল্লিতে এ-সময় সাংঘাতিক গরম । কলকাতার সেন্ট-থমাস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সুতপা এখন দিল্লিতে । উপলক্ষ সর্ব ভারতীয় কনফারেন্স । পাহাড়গঞ্জের “হর পার্বতী” গেস্ট-হাউস তার বর্তমান আস্তানা । এই গেস্ট-হাউসের অবস্থান বেশ সুন্দর জায়গায় । নতুন দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন খুবই কাছে । অনায়াসেই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে আসা যায় । সন্ধ্যাবেলায় এক পেয়ালা চা হাতে নিয়ে গেস্ট-হাউসের ব্যালকনিতে দাঁড়ায় সুতপা । চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে সুতপা বাইরে আকাশের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল । আকাশে কালো মেঘ । হঠাৎ এক ঝলক ঝড়ো হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিল তার বিন্যস্ত চুলগুলো । উড়িয়ে দিল শাড়ির আঁচল । তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে পড়ল সুতপা । চায়ের পেয়ালা টি-টেবিলে রেখে বিছানায় এসে বসল । সুতপা আজ ভীষণ টায়ার্ড । সারাদিন যা ধকল গেছে । সামনের বছরেই তার রিটায়ারমেনট । স্কুল কতৃপক্ষ তবুও তাকে ছাড়লনা । দিল্লি কনফারেন্সে তাকে আসতেই হল । ঘরে একা একা কতক্ষণ আর বসে থাকা যায় ? সবে সন্ধ্যে সাতটা । রাতের খাবারেরও অনেক দেরি আছে । বালিশটা টেনে নিয়ে নরম বিছানায় শুয়ে পড়ল সুতপা । বাইরে হাওয়ার দাপটের সাথে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে সে চোখ দুটো বন্ধ করল । কিন্তু অ-সময়ে কি ঘুম আসে ? এ-সময়ে তার মাথায় তার জীবনের অনেক ঘটনা-প্রবাহ ভিড় জমাতে শুরু করেছে । তার বর্তমান একাকী জীবন তার কাছে মাঝে মাঝে অসহনীয় হয়ে ওঠে । সব থেকেও মনে হয় তার জীবনে কিছুই নেই । মনে পড়ে যায় স্বামী অনিমেষের কথা, পুত্র সুপ্রতিমের কথা । একমাত্র ছেলেকে সে যে কিভাবে মানুষ করেছে সেটা সে নিজে আর ঈশ্বর ছাড়া আর কেউই জানেনা । ছেলের যখন মাত্র চার বছর বয়স তখন অনিমেষের সাথে তার সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় । বিবাহ-বিচ্ছেদের পর থেকে ছেলেকে সে খুব যত্ন করে গড়ে তুলেছে, উচ্চ-শিক্ষিত করে তুলেছে । আজ তিন বছর হয়ে গেল কর্মসূত্রে সে এখন লন্ডনে । কবে যে ছেলে দেশে আসবে তা সে জানেনা । মাঝে মাঝে টেলিফোনে কথা বলা ছাড়া আর কোন যোগাযোগ নেই । ছেলেকে দেখার জন্য প্রায়ই তার প্রাণ কেঁদে ওঠে । তার নিজস্ব সংসার আর স্কুলের কর্মব্যস্ততার মধ্যেই তার জীবন যাপনের দিনগুলো সীমাবদ্ধ । কোলকাতা থেকে এতদুরে এখন অতীত তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে । বারে বারে অনিমেষের কথা মনে পড়ছে । তার সাথে বিবাহ-বিচ্ছেদ কোন মতেই তার কাছে কাম্য ছিলনা । কিন্তু তাদের উভয়ের মধ্যে মানসিক মেলবন্ধনের অভাবে এ পথে হাঁটা ছাড়া উপায়ও ছিল না । অনিমেষের আধ্যাত্মিক স্বভাবকে বাস্তব ও সংসার মুখি করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল সুতপা । কিন্তু তার সব চেষ্টা বিফলে গেল । এখন সে কোথায় কে জানে ? তার বর্তমান ঠিকানা না জানলেও সুতপা তাঁর অস্তিত্ব অনুভব করে তার নিভৃত কুঞ্জে । হঠাৎ ঘরের দরজায় নক হতেই সুতপার মাথায় ঘুরপাক খাওয়া ঘটনা-প্রবাহ অন্তরহিত হল । বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলতেই দেখল গেস্ট-হাউসের বয় তার রাতের খাবার নিয়ে হাজির । ডিনার এখনই সেরে ফেলতে হবে । কারণ আগামী কাল খুব ভোরে উঠতে হবে । নতুন দিল্লী স্টেশন থেকে দেরাদুন শতাব্দী এক্সপ্রেস ধরতে হবে । কোলকাতা থেকেই সে স্থির করে ফেলেছিল দিল্লী যখন সে যাচ্ছেই তখন আর কয়েকটা দিন যোগ করে হরিদ্বার থেকে ঘুরে আসবে । এর জন্য ট্রেনের রিজার্ভেশন এবং অতিথি-শালা বুকিং – দুটোই কোলকাতা থেকেই করে রেখেছিল । অনেক জায়গায় সে গিয়েছে কিন্তু আজ পর্যন্ত হরিদ্বারে যাওয়া হয়ে ওঠেনি । তাই তার কাছে এবারে দিল্লী আসার মুল আকর্ষণ হরিদ্বার ।

পরদিন ভোরে নিউ দিল্লী স্টেশন থেকে দেরাদুন শতাব্দি এক্সপ্রেস ধরে দুপুরেই হরিদ্বার পৌঁছে গেল সুতপা । হরিদ্বারে ‘হর-কি-পৌরি’ ঘাটের কাছেই সুদৃশ্য অতিথিশালাটি দেখে তার ভীষণ ভালো লাগল । বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন । অতিথিশালার দোতলার নির্দিষ্ট ঘরে লাগেজগুলো রেখে সুতপা বারান্দায় এসে দাঁড়ালো । সামনে তাকাতেই সে বিহ্বল হয়ে পড়ল । সামনেই খরস্রোতা গঙ্গা । তার দু’পাড়ে মন্দিরের সমারোহ । বাঁধানো ঘাটে শিকল ধরে কত মানুষ স্নান করছে । সুতপা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না । ‘হর-কি-পৌরি’-তে গঙ্গায় ডুব না দেওয়া পর্যন্ত তার শান্তি হচ্ছে না । তাড়াতাড়ি ঘরে এসে পোশাক বদলে ঘরের দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে পড়ল । ‘হর-কি-পৌরি’ ঘাটে পৌঁছে তার মনটা বেশ হাল্কা হয়ে গেল । মনে হল তার উপর দিয়ে যেন এক উদাসী ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে । খরস্রোতা গঙ্গায় শিকল ধরে কয়েকটা ডুব দিয়ে তার মন-প্রাণ জুড়িয়ে গেল । স্নান করে ঘাটে দাঁড়িয়ে স্রোতস্বিনী গঙ্গার উজানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সুতপা । অনেক দূরে পাহাড়ের সমারোহ দৃশ্যমান । মনের অনুভূতিতে তার সামনে তখন একটাই ছবি মহাদেব । মহাদেবের মাথার জটা থেকে বেরিয়ে গঙ্গা পাহাড়ের কোল বেয়ে কলকল রবে চলে আসছে ।

স্নান করে সুতপা ফিরে এল অতিথিশালায় । অতিথিশালার মাঝখানে উঠোনে বাঁধানো চত্বরে রয়েছে পাথরের বিশাল এক শিবমূর্তি । শিবমূর্তিটি বেশ সুন্দর ও নয়নাভিরাম । সামনেই বাঁধানো শিবলিঙ্গ । সিক্ত বসনে শিবমূর্তিকে প্রণাম করে চোখ মেলে সামনে তাকাতেই চমকে উঠল সুতপা । শিবমূর্তির পিছনে অতিথিশালার কার্যালয়ের সামনে বারান্দায় গেরুয়া বস্ত্র পরিহিত এক সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে । সন্ন্যাসী অপলক দৃষ্টিতে তারই দিকে তাকিয়ে আছে । কে এই সন্ন্যাসী ? চেনা অথচ অচেনা । সুতপার মনে হল আগে যেন কোথাও সে এই সন্ন্যাসীকে দেখেছে । শিবলিঙ্গকে প্রনাম করে উঠে দাঁড়ায় সুতপা । সামনের দিকে আবার লক্ষ্য করতেই সে দেখল সন্ন্যাসী ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে । কাছে আসতেই সন্ন্যাসীর চেহারা পরিস্কার দেখতে পেল সে । পুরো চেহারা অবলোকন করে চোখের দিকে তাকাতেই সুতপা কেঁপে উঠল । বয়সের ভারে চেহারার কিছুটা পরিবর্তন হলেও চোখ দেখলেই তাঁকে চেনা যায় । খোলা হাতের দিকে তাকাতেই সন্দেহের আর কোন অবশেষ রইল না । হাতের উল্কিতে লেখা “অনিমেষ” নামটা এখনও জ্বলজ্বল করছে । সন্ন্যাসী সুতপার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করতে লাগল । মুখে কোন কথা নেই । নিরীক্ষণ শেষে সন্ন্যাসী সুতপার মুখের দিকে অপলক মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল । দাঁড়ি-গোঁফের ফাঁক দিয়ে তাঁর মুখে একঝলক স্মিত হাসি দেখা গেল । দু’জনেই দু’জনকে চিনতে পেরেছে । সুতপা মন্ত্রমুগ্ধের মত দাঁড়িয়ে । সে কোনদিন কল্পনাও করেনি যে অনিমেষের সাথে আবার তার দেখা হবে । হরিদ্বারের এই পুণ্য ভূমিতে অনিমেষ তার জন্য অপেক্ষায় থাকবে এটা তার মাথায় কোনদিনও আসেনি । ঈশ্বরের কাছে মানুষ সত্যিই একটা খেলনা বলে মনে হয় । মানুষের অগোচরে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরই ঠিক করে রাখেন তার জীবন-পঞ্জি ।

সুতপা যে কতক্ষণ এভাবে বিমোহিত চিত্তে সন্ন্যাসীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে তা তার হিসাবের বাইরে । এবার সন্ন্যাসীর কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল আবেগময় অস্ফুট আওয়াজ – “ সু – সুতপা ! তুমি ?” সেই চেনা কণ্ঠস্বর কতদিন পর কানে এল সুতপার । তার চোখদুটো জলে ভরে গেল । দু’ফোঁটা অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ল হরিদ্বারের পুণ্যভূমিতে । সাক্ষী রইল শিবমূর্তি । সুতপা এবার সন্ন্যাসীর চোখে চোখ রাখল – “ এতদিন পরেও চিনতে পেরেছ অনিমেষ !” স্মিত হেসে সন্ন্যাসী বলল – “চেনা চোখকে কি ভোলা যায় ? কিন্তু তুমি এখানে ?” চোখের জল সংবরণ করার চেষ্টা করতে করতে সুতপা বলল – “হয়তঃ ঈশ্বর তোমার সাথে দেখা করানোর জন্য এই পুণ্যভূমিকেই আদর্শ স্থল বলে মনে করেছেন, আর তার জন্যই তিনি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন”। সিক্ত বসনে সুতপা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে । বেলাও অনেক হয়ে গেছে । বস্ত্র বদল করে খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন তার । সন্ন্যাসী তাই কথা আর না বাড়িয়ে শুধু বলল – “ঠিক আছে, পরে কথা হবে । এখন খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ্রাম নাও । সন্ধ্যায় ‘হর-কি-পৌরি’-তে সাক্ষাৎ হবে”।

দুপুরের খাবার খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে সুতপা যখন ‘হর-কি-পৌরি’-তে উপস্থিত হল তখন সবে সন্ধ্যা হচ্ছে । স্রোতস্বিনী গঙ্গার পাড়ের মন্দিরগুলো আলোক মালায় সেজে উঠেছে । ভক্তবৃন্দের ভাসানো নৌকা-প্রদীপগুলো হাওয়া উপেক্ষা করে জ্বলতে জ্বলতে গঙ্গার জলে ডুবতে ডুবতে চলতে শুরু করেছে । সন্ধ্যাবেলার এ-রকম দৃশ্য জীবনে কখনও দেখেনি সুতপা । উদাসী মন নিয়ে সে দাঁড়িয়ে রইল । হঠাৎ সেই গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীর ডাকে সম্বিত ফিরে পেল সুতপা । ওদিকে গঙ্গার পাড়ে মুল মন্দিরের সামনে গঙ্গা-আরতি শুরু হয়ে গেল । সন্ন্যাসী ধীরে ধীরে সাঁকো পেরিয়ে গঙ্গার অপর পাড়ে যেতে লাগল । সুতপাও সন্ন্যাসীকে অনুসরণ করল । অপর প্রান্ত থেকে গঙ্গা-আরতি দেখতে বেশ সুন্দর লাগে । ঘাটে প্রচুর জন-সমাগম । অনেকে ক্যামেরায় আবার অনেকে ভিডিওতে ছবি তুলছে । সুতপা আর সন্ন্যাসী অনিমেষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে । একদৃষ্টিতে গঙ্গা-আরতি দেখতে লাগল । গঙ্গা-আরতি দেখে সুতপার মন ভরে গেল । আরতি শেষ হলে তারা দু’জনে গঙ্গার স্রোতে নৌকা-প্রদীপ ভাসাল । হাওয়ার মধ্যে জ্বলতে জ্বলতে নৌকা-প্রদীপ ভেসে চলল । তাদের দু’জনের দৃষ্টিই তখন নিবদ্ধ ভাসমান নৌকা-প্রদীপে ।

‘হর-কি-পৌরি’-তে কতক্ষন যে তারা এভাবে দাঁড়িয়ে আছে তা খেয়ালই করেনি সুতপা । আরতি অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে । ঘাট এখন ফাঁকা । সুতপা আর অনিমেষ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে । আকাশের পূর্ণ-চাঁদের জোছনা তাদের উপর এসে পরেছে । অনিমেষ সুতপার সিঁথির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে । চাঁদের স্বচ্ছ আলোয় সুতপার সিঁথিতে একবিন্দু সিঁদুর চিকচিক করছে । সুতপা অনিমেষের চোখে চোখ রেখে বলল – “কি দেখছ অনিমেষ ? আমি তোমাকে এখনও ভুলিনি । তোমার স্মৃতিকে এখনও মুছতে পারিনি”। গেরুয়াধারী অনিমেষের মুখ দিয়ে কোন কথা বেরোলো না । সন্ন্যাসীর চোখ দিয়ে শুধু দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার গেরুয়া বসনে । সুতপা বলল – “ সামনের বছর এই মে মাসে আমার রিটায়ারমেনট । তোমার কাছে আমার ঠাই হবে তো অনিমেষ”? সন্ন্যাসী অনিমেষ স্রোতস্বিনী গঙ্গার দিকে তাকিয়ে শুধু বলল – “প্রতীক্ষায় থাকলাম”। খরস্রোতা গঙ্গা আপনমনে ‘হর-কি-পৌরি’-কে সাক্ষী রেখে আপন ধারায় বয়ে চলল ।।

*************
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১৩৯৪ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ০৯/০২/২০১৫

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • দেবর্ষি সিংহ ০৩/১০/২০১৫
    Besh
  • মোবারক হোসেন ০৪/০৭/২০১৫
    হইয়াও হইলোনা শেষ। র্সাথকতা পেয়েছে।ধন্যবাদ।
  • জাহিদুর রহমান ১১/০২/২০১৫
    সুন্দর ।
    শুভেচ্ছা লেখককে।
  • ১০/০২/২০১৫
    সুন্দর ।
    মুগ্ধতা রেখে গেলাম ।
  • চমতকার গল্প
  • সবুজ আহমেদ কক্স ১০/০২/২০১৫
    valo laglo gplpo ta
  • নাবিক ১০/০২/২০১৫
    গল্পটি বেশ লিখেছেন। খুউব ভালো লাগলো... :-) :-) :-)
 
Quantcast