www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

বাসন্তী দিনের উন্মুক্ত জানালা

বাসন্তী দিনের উন্মুক্ত জানালা
মোঃ বুলবুল হোসেন



ফেব্রুয়ারির হালকা রোদে শহরটা যেন আজ একটু অন্যরকম। বাতাসে কেমন এক উচ্ছ্বাস, আবার কোথাও যেন লুকোনো এক অস্থিরতা। ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল কালি দিয়ে চিহ্ন দেওয়া দিন—ভ্যালেন্টাইন্স ডে।
সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেশমা নিজের চুল খুলে দিল। লম্বা কালো চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এলো। আলমারির ভেতর থেকে বের করল বাসন্তী রঙের শাড়ি। শাড়িটা পরতে পরতে মনে হলো—আজকের দিনটা যেন শুধু একটা উৎসব নয়, একটা ঘোষণা। নিজের কাছে নিজের সাহসের ঘোষণা।
রেশমা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছোটবেলা থেকে কড়া শাসনের মধ্যে বড় হয়েছে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। তাঁর কাছে ‘মেয়ের সুনাম’ শব্দটা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। মা নরম, কিন্তু বাবার সামনে নীরব।
আজ সকালে বের হওয়ার সময় বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন,
— এত সাজগোজ কিসের?
রেশমা মুচকি হেসে বলেছিল,
— ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান আছে।

বাবার চোখে সন্দেহের রেখা। কিন্তু আর কিছু বলেননি।
অন্যদিকে শহরের আরেক প্রান্তে হৃদয় দাঁড়িয়ে আছে পার্কের ফটকের সামনে। হাতে ছোট্ট একটা গোলাপ। তার বন্ধুদের কাছে আজকের দিনটা নিছক মজা, ছবি তোলা, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট। কিন্তু হৃদয়ের কাছে দিনটা অন্যরকম। সে জানে আজ তাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ভালোবাসা শুধু উচ্ছ্বাস, নাকি দায়বদ্ধতাও?

রেশমা আর হৃদয়ের পরিচয় ছয় মাস আগে। একই ক্লাসে পড়লেও কখনো খুব কথা হয়নি। একদিন লাইব্রেরিতে বই নিতে গিয়ে দু’জনের হাত একসাথে একই বইয়ের ওপর পড়ে। সেদিন থেকেই শুরু।
প্রথমে চোখাচোখি। তারপর নোট শেয়ার। তারপর ধীরে ধীরে বিকেলের আড্ডা। সম্পর্কটা কখন গভীর হলো, কেউ বুঝতে পারেনি।
পার্কের ভেতর আজ রঙের উচ্ছ্বাস। লাল, হলুদ, গোলাপি পোশাকের ভিড়। কেউ ছবি তুলছে, কেউ বেঞ্চে বসে হাত ধরে আছে। কেউবা ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে যেন অকারণ বৃষ্টির অভিনয় করছে।
রেশমা ফটক দিয়ে ঢুকতেই রিদয়ের চোখে পড়ে। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে—বাসন্তী শাড়িতে মেয়েটা যেন সত্যিই বসন্ত হয়ে এসেছে।
এত সুন্দর লাগছে তোমাকে, বলতেই পারছি না, হৃদয় বলল।
রেশমা হেসে বলল,
শুধু আজ?

হৃদয় একটু লজ্জা পেল।
না, প্রতিদিনই। তবে আজ একটু বেশি।
তারা পার্কের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগল। হালকা বাতাসে রেশমার চুল উড়ছে। মাঝে মাঝে চুল মুখে এসে পড়লে হৃদয় হাত বাড়িয়ে সরিয়ে দেয়। ছোট্ট এই স্পর্শে দু’জনের ভেতর কেমন অদ্ভুত শিহরণ জাগে।
একসময় তারা পার্কের এক কোণে বসে। চারপাশে অনেক জুটি। কেউ গাছের আড়ালে, কেউ বেঞ্চের পাশে। শহর যেন আজ নীরবে ভালোবাসার অনুমতি দিয়েছে।
রেশমা বলল,
— জানো, আমার খুব ভয় করে।
কিসের ভয়?
যদি বাবা জেনে যান? যদি সবকিছু ভেঙে যায়?
হৃদয় কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
ভালোবাসা কি ভাঙার জন্য? আমরা তো খারাপ কিছু করছি না।
রেশমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

সমাজ সবসময় এত সহজ না।
বিকেলের দিকে আকাশে হালকা মেঘ জমল। আসলে বৃষ্টি হওয়ার কথা নয়, তবু হঠাৎ কয়েক ফোঁটা পড়ল। চারদিকে হাসাহাসি। কেউ ছাতা খুলল, কেউ দৌড়ে আশ্রয় নিল।
রিদয় তার ব্যাগ থেকে ছোট ছাতা বের করল। দু’জন পাশাপাশি দাঁড়াল। ছাতার নিচে জায়গা কম। তাই কাঁধে কাঁধ লেগে থাকল।
বৃষ্টির ফোঁটা খুব বেশি না, কিন্তু মুহূর্তটা যেন সিনেমার দৃশ্য।
রেশমা বলল,
আজ যদি সময় থেমে যেত!
হৃদয় বলল,
থামবে না। কিন্তু আমরা চাইলে মনে রাখতে পারি।
একটা গোলাপ বের করে রেশমার হাতে দিল।
এটা তোমার জন্য।
রেশমা গোলাপটা হাতে নিয়ে চুপ করে তাকিয়ে রইল। তার চোখে জল চিকচিক করছে।
এত আবেগী হয়ে পড়লে কেন? হৃদয় হাসল।
কারণ কেউ আমাকে এভাবে কখনো ভাবেনি।
সন্ধ্যার দিকে তারা সিদ্ধান্ত নিল, একটু দূরের ক্যাফেতে যাবে। শহরের এক কোণে নতুন খোলা ছোট্ট ক্যাফে। ভিড় কম। আলো নরম। গান বাজছে ধীর লয়ে।

কফির কাপের ধোঁয়া উঠছে। রেশমা হঠাৎ বলল,
তুমি কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো? নাকি আজকের দিনের জন্য?
হৃদয় চমকে গেল।
তুমি এমন ভাবছ কেন?
কারণ অনেকেই তো শুধু আজকের জন্য ভালোবাসে। কাল ভুলে যায়।
হৃদয় টেবিলের ওপর হাত রেখে বলল,আমি জানি না ভবিষ্যৎ কী। কিন্তু আমি জানি, আমি তোমাকে সম্মান করি। তোমার পাশে থাকতে চাই। শুধু আজ না।
রেশমা হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরল। দু’জনের চোখে গভীরতা।

রাত নামতে শুরু করেছে। শহরের আলো জ্বলেছে। রেশমা বলল,
বাড়ি ফিরতে হবে।
হৃদয় একটু থেমে বলল,
আরেকটু থাকো।
দু’জনেই জানে সময় কম। কিন্তু মুহূর্তটা ছাড়তে মন চায় না।
শেষ পর্যন্ত তারা বের হলো। রাস্তায় বাতাস ঠান্ডা। শহরের এক নিরিবিলি ফ্ল্যাটে হৃদয়ের এক বন্ধুর বাসা—আজ খালি। হৃদয় প্রস্তাব করল সেখানে কিছুক্ষণ বসার।
রেশমা থেমে গেল। চোখে দ্বিধা।
তুমি কি আমার উপর ভরসা করো? হৃদয় নরম গলায় জিজ্ঞেস করল।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর রেশমা মাথা নেড়ে বলল, করি। তবে নিজেকেও করতে হবে।
ফ্ল্যাটে ঢুকে চারপাশে নিস্তব্ধতা। জানালা দিয়ে শহরের আলো দেখা যাচ্ছে। ভেতরে শুধু দু’জন।
রেশমা জানালার পাশে দাঁড়াল।

আজ আমি বাঁধনহারা হতে চাই, জানো?
হৃদয় পেছন থেকে কাছে এল। কিন্তু স্পর্শ করার আগে থেমে গেল।
বাঁধনহারা মানে কি সব ভেঙে ফেলা?
রেশমা চুপ।
হৃদয় বলল,
ভালোবাসা মানে শুধু শরীর না। আমি চাই তুমি যখনই কিছু দাও, তা যেন তোমার ইচ্ছায় হয়। কোনো প্রমাণের জন্য না।
রেশমার চোখে জল এসে গেল।
তুমি আলাদা।
হৃদয় হেসে বলল,
আমি শুধু ভয় পাই, যেন তোমাকে কষ্ট না দিই।
দু’জন একে অপরকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। সময় থেমে রইল কয়েক মুহূর্ত। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। শুধু হৃদস্পন্দন।
রাত গভীর হলে রেশমা বাড়ি ফিরল। দরজা খুলতেই বাবার চোখে কঠিন দৃষ্টি।
এত দেরি কেন?
রেশমা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। আজ সে মিথ্যে বলতে পারল না।
আমি একজনকে ভালোবাসি।
ঘরে নীরবতা নেমে এলো।
বাবা গর্জে উঠলেন,
কী বলছ?
রেশমা কাঁপা গলায় বলল,
আমি খারাপ কিছু করিনি। শুধু ভালোবেসেছি।
মা এগিয়ে এসে বললেন,
মেয়েকে কথা বলতে দাও।
বাবা রাগে ঘর ছেড়ে চলে গেলেন।

সেই রাতে রেশমা ঘুমাতে পারল না। জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবল আজকের দিনটা কি শুধু উৎসব ছিল? নাকি তার জীবনের মোড়?
পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে হৃদয়কে দেখে রেশমা সব বলল।
হৃদয় চুপ করে শুনল। তারপর বলল,
আমি তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করব।
কী বলছ? তিনি রাগে আগুন!
তবু যাব। যদি আমরা সত্যিই একসাথে থাকতে চাই, তাহলে লুকিয়ে নয়।
রেশমা বিস্মিত হয়ে তাকাল।
কয়েকদিন পর এক বিকেলে হৃদয় সত্যিই রেশমাদের বাড়িতে গেল। বাবা প্রথমে কথা বলতে চাননি। কিন্তু হৃদয়ের শান্ত ভঙ্গি, সম্মান আর স্পষ্ট কথা ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলে দিল।
আমি আপনার মেয়েকে সম্মান করি। পড়াশোনা শেষ করে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, তখন যদি আপনি অনুমতি দেন, আমি তাকে বিয়ে করতে চাই।
বাবা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
এখন তোমাদের বয়স কম। ভালোবাসা আর দায়িত্ব এক জিনিস না।
রিদয় বলল,
জানি। তাই তাড়াহুড়ো করব না।
সেদিন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কিন্তু একটা দরজা খুলে গেল।
কয়েক মাস কেটে গেল। সম্পর্কটা আর লুকোনো নয়। যদিও এখনো সহজ না। সমাজের কথা, আত্মীয়দের কটূক্তি—সবই আছে। তবু রেশমা বদলে গেছে। সে বুঝেছে, বাঁধনহারা মানে দায়িত্বহীনতা নয়। আর হৃদয় ও বুঝেছে, ভালোবাসা মানে শুধু একদিনের উন্মাদনা না।

পরের বছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে এলো আবার। এবার তারা পার্কে গেল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে বসে চা খেল।
রেশমা হাসতে হাসতে বলল,
মনে আছে গত বছরের কথা?
খুব।
তখন ভাবতাম ভালোবাসা মানেই উড়াল। এখন বুঝি, ভালোবাসা মানে পাশাপাশি হাঁটা।
হৃদয় বলল,
আর মাঝে মাঝে বাসন্তী শাড়ি।
রেশমা হেসে উঠল।
শহরে আবার প্রেমের জোয়ার। কেউ উচ্ছ্বাসে, কেউ গোপনে, কেউ প্রকাশ্যে। কিন্তু রেশমা আর হৃদয়ের কাছে ভ্যালেন্টাইন্স ডে এখন আর শুধু এক দিনের আবেগ না। এটা তাদের সাহসের দিন, সত্য বলার দিন, দায়িত্ব নেওয়ার দিন।
বাসন্তী রঙের মতোই তাদের ভালোবাসা উজ্জ্বল, কিন্তু কোমল। ঝড় এলে দুলে ওঠে, তবু ভাঙে না।
আর শহরের কোনো এক জানালায় দাঁড়িয়ে হয়তো আবার কোনো মেয়ে আজ বলছে
“আজ আমি বাঁধনহারা।”
কিন্তু সেই বাঁধনহারা হওয়া যদি হয় সম্মান আর সচেতনতার, তবে তবেই প্রেম সত্যিকারের বসন্ত হয়ে ফিরে আসে।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১৪৮ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২০/০২/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast