www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম (৭১-৭৭)

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম (৭১)!
সিরকা দিয়ে ভাত খেতে সেই রকম লাগতো!
আগে আমরা সিরকা দিয়ে ভাত খেতাম। খুবই ভালো লাগতো। সিরকার মজাটাই আলাদা।স্বাদই আলাদা। মনে হত, এই সিরকা দিয়ে পাতের সব ভাত খেয়ে ফেলা যাবে! এখন আর হাতের তৈরী সিরকা তেমন একটা পাওয়া যায় না। সেদিন শুনলাম, সিরকা এখন নাকি ভিনেগার হয়ে গেছে। অর্থাৎ আগে যা ছিলো সিরকা এখন তা হয়ে গেছে ভিনেগার। কবে কবে এই পরিবর্তন হয়ে গেছে, বুঝতেই পারি নাই। আগে প্রতিটি বাড়ীতে সিরকার বোতল রোদে শুকনা দেয়ার দৃশ্য দেখা যেতো। কোন বাড়ীতে সিরকার বোতল না থাকলে তাকে গ্রামের বাড়ী হিসেবে গণ্য করাই হতো না। এই সিরকা রোদে শুকা দিয়ে সিকার মধ্যে রাখা হত এবং ভাত খাওয়ার সময় সিরকা নিয়ে ভাত খাওয়া হত। সিরকা খাবারের পাতে ঢালার জন্য একটি বিশেষ কায়দা ছিলো। সিরকার বোতলের মুখের ছিপি খোলে সেই ছিপি আবার হালকাভাবে বোতলের মুখে লাগিয়ে পরে সিরকা ঢালা হত, যাতে একবারে বেশী পড়ে না যায়। সিরকা অল্প অল্প করে খেতে হয়। সিরকা আবার বেশী পড়ে গেলে খাবার নষ্ট হয়ে যেত। খেজুরের রস বা গুড়/চিনির পানির সাথে রসুনসহ নানা ধরনের মশলা ভালো করে মিশিয়ে রোদে দিয়ে (শুকিয়ে) এই সিরকা তৈরী করা হত। এই সিরকা না হলে আমাদের আগে কোনভাবে চলতোই না। এখন সেই দিন ও নেই সেই সিরকাও নেই। আগে সিরকা খেয়ে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম! আর এখন ভিনেগার!
-স্বপন রোজারিও (মাইকেল), 24.04.21

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম (৭২)!
আমাদের স্কুলের দিনগুলো!
আমাদের স্কুল জীবন ছিলো অকেটাই মধুময়। এখন পড়াশোনার জন্য যেমন চাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে, আমাদের সময় তেমন চাপ ছিলো না। তবে পড়াশোনার চাপ একেবারেই যে কম ছিলো তা ও কিন্তু নয়। আমরা কৃষকের সন্তান বিধায় আমাদের ক্ষেতে খামারে কৃষি কাজ করতে হতো। স্কুলে যাওয়ার আগে এবং স্কুল থেকে ফিরে আমাদের মাঠে ময়দানে কাজ করতে হতো। ফলে আমরা পড়াশোনা করার সময় খুব একটা পেতাম না। আবার বিভিন্ন ধরনের খেলাখুলা করতে গিয়ে লেখাপড়ার জন্য সময় একদমই থাকতো না। তারপরেও আমাদের লেখাপড়া কিন্তু চলেছে। বলতে গেলে, খুব একটা খারাপ ও চলে নি। পাশ করে গিয়েছি প্রতিটি ক্লাসেই। আমরা পরীক্ষার আগের রাতে খুব করে পড়েছি। একদিন দেখেছি, পড়তে পড়তে একেবারে সকাল হয়ে গিয়েছে। পরে কোন রকমে চোখ দুটো টান করে পরীক্ষা দিতে গিয়েছি। এর মধ্যেও কিছু আনন্দ-বেদনা ছিলো যা শুধু আমরাই বুঝতাম।

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম (৭৩)!
গ্রামের মানুষ সাধারণত: খুব সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেন। আমরাও যখন গ্রামে ছিলাম তখন খুব সকাল বেলা ঘুম থেকে ‍উঠেছি। সকাল বেলার আবহাওয়া খুবই নির্মল ও শান্ত। সকাল বেলা মানুষের মন সতেজ ও পরিস্কার থাকে। সকাল বেলা উঠে পড়াশোনা করলে মনে থাকে বেশী। ইহা সর্বাংশে সত্য। আমরা আগে সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে পড়াশোনা করতাম। যেই অংক সারাদিন মিলাতে পারতাম না, সেই অংক সকাল বেলা খুব সহজেই মিলে যেত। যেই কবিতা সারাদিন সাধনা করে মুখস্থ করতে পারতাম না, সকালে তা নিমেষেই মুখস্থ করে ফেলতাম। আশ্চর্য্য ব্যাপার! জীবনে যা দুই/একটা কবিতার অংশবিশেষ মুখস্থ করেছিলাম তা এই সকাল বেলাতেই মুখস্থ করেছি। আর সেই পড়া কাজে লাগিয়েই স্কুলের ও কলেজের বৈতরণী পার হয়েছি। আর এখন মানুষ রাতে ঘুমায় না। কি যে দিন কাল পড়েছে! সারারাত অবনত মস্তকে থেকে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটায়!

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম (৭৪)!
মাঝে মাঝে কোন্দা বাইচও দিতাম!
আমরা নামা পাড়ার মানুষ। বাড়ীর চারিদিকে ৬ মাস পানি থৈ থৈ। নৌকা আর কোন্দা ছাড়া কোন জায়গার যাওয়ার উপায় ছিলো না। আমরা বেশী সময় কোন্দা বাইতাম। কোন্দা আমাদের জনপ্রিয় জলবাহন ছিলো। কোন্দায় চড়ে কত যে গান গেয়েছি, অথচ গান শোনার কেউ ছিলো না! নিজেকেই নিজের গান শোনাতে হত। কোন্দা দিয়ে অনেক ঘাস কেটেছি গরুর জন্য। আমাদের বিলে অনেক পোটকা ঘাস হত। এই ঘাস কোন্দা দিয়ে কাটার জন্য আমরা ব্যাকুল হয়ে পড়তাম। আরো কাটতাম কচুড়ীপানা, মালঞ্চ ইত্যাদি। গরম সহ্য করতে না পেরে অনেক সময় পানিতে নেমে শরীর জুরিয়ে নিতাম। কোন্দা চালানো হয় লগ্গি আর বৈঠা দিয়ে। বেশী পানি হলে বৈঠা দিয়ে এবং কম পানি হলে লগ্গি দিয়ে কোন্দা চালানো হয়। আমরা অবসর সময় কোন্দা দিয়ে এ গ্রাম থেকে ঔ গ্রামে যেতাম। মাঝে মাঝে মনের অজান্তে কোন্দা বাইচও দিতাম। আমরা শুধু নৌকা বাইচ-এর কথা শুনেছি। কিন্তু আমরা যে মাঝে মাঝে কোন্দা বাইচও দিতাম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কোন্দা এখন প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে। দেশে পানি না থাকলে কোন্দা থাকবে কি করে??

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম (৭৫)!
আমাদের খোল!
খোল একটি বাদ্যযন্ত্র বিশেষ। অনেকটা সহজলভ্য ও স্বল্পদাম যুক্ত এই বাদ্যযন্ত্র খোল। আমাদের সময় এই খোলের খুব কদর ছিলো। আমরা গানের সাথে এই খোলই বেশী বাজাতাম। তবে সঙ্গে হারমোনিয়াম থাকলেও তা ছিলো খুব কম। হারমোনিয়ামের দাম বেশী। তাই ইহা ক্রয় করতে না পেরে আমরা খোল ক্রয় করে ইহাই বাজাতাম আর আনন্দ উপভোগ করতাম। যে কোন আচার অনুষ্ঠনে এই খোলের ব্যবহার হত। তবে ডিসেম্বর মাসে এই খোলের ব্যবহার অনেকগুন বেড়ে যেত। কারণ সামনে শুভদিন (বড়দিন)। এ সময় পাড়ায় পাড়ায় কীর্তন হয়, ধর্মপল্লীতে কীর্তন প্রতিযোগিতা হয়, জায়গায় জয়গায় নানাবিধ অনুষ্ঠান হয়। এর সবগুলোতেই খোলের বিরাট ব্যবহার রয়েছে। এই মাটির তৈরী খোল মানুষকে এতো নাচাতে পারে, তা ভাবে বুঝা যায় না। খোলের তালের যে মুর্ছনা, তা একবার যে শুনেছে, উনি তা আর জীবনে ভুলতে পারেন না। এই যন্ত্রের যে এত যাদু! তা অনুধাবন করার জন্য একবার অন্তত খোল বাজনা শোনা দরকার বলেই আমি মনে করি। জয়তু আমাদের খোল!

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম (৭৬)!

কলসি কাঁখে নারী পানি আনতে যায়!
আগে কলসি কাঁখে নিয়ে মা-বোনেরা দূর-দূরান্ত থেকে পানি আনতো। দৃশ্যটি আমার মনে এখনও ভাসে। চোখ বন্ধ করলে এখনও যেন দেখি কলসি কাঁখে নারী হাঁটছে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম কালে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে যেতো। এর ফলে অনেক টিউবওয়েলে পানি থাকতো না। ফলে এ সময় খাবার পানির একটা আকাল প্রায় লেগেই থাকতো। এই পানির সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গ্রামের মা-বোনেরা এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গিয়ে কলসি দিয়ে দল বেঁধে পানি আনতো। এটা একটা রেওয়াজে পরিনত হয়ে গিয়েছিলো। শুধু টিউবওয়েল নয়! কোন কোন নারীরা অন্য গ্রামের পুকুর থেকেও পানি সংগ্রহ করে নিয়ে আসতো। ইহা গ্রাম-বাংলার নিত্যদিনের দৃশ্য ছিলো। এই পানি আনার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এখন একটি বিষয়ের প্রচলন হয়ে গেছে গ্রাম-গঞ্জে। আর তা হল- এখন গ্রামের কোন বাড়ীতে বিয়ে-সাদী হলে অন্য বাড়ী থেকে কলসি দিয়ে বাজনা বাজিয়ে পানি আনার একটা রেওয়াজ তৈরী হয়ে গেয়ে। নিজের বাড়ীতে অনেক পানি থাকলেও বাজনা বাজিয়ে অন্য বাড়ীতে যেতে হত শুধু কলসি দিয়ে পানি আনার জন্য।

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম (৭৭)!
এই পার কর রে!
ভরা বর্ষায় আমাদের বাড়ীর চারিদিকে পানি থৈ থৈ করতো। চলাচলের বাহন ছিলো নৌকা ও কোন্দা। তবে মাঝে মাঝে কলাগাছের ভেলায়ও চড়তে হয়েছে। তবে কলাগাছের ভেলা বেশী টেকসই ছিলো না। কয়েকদিন পরেই নষ্ট হয়ে যেত। আর কলাগাছের ভেলা বেশী চলতো না। আর ধান ক্ষেতের উপর দিয়ে ভেলা চালানো খুবই কঠিন ছিলো। তাই আমাদের জনপ্রিয় জলবাহন ছিলো কোন্দা। এক কোন্দায় চড়ে ৩/৪ জন স্কুলে বা কালীগঞ্জ বা অন্য কোথাও যেতাম। কিন্তু আসার সময় যে কোন একজন কোন্দা নিয়ে চলে আসলে অন্যেরা পড়তাম ফেসাদে। আর ঘাটে এসে যখন কোন্দা না পেতাম তখন শুরু হত এই পার কর রে ডাক। আগে কোন মোবাইল ছিলো না। সুতরাং আমাদের এই পার কর রে ডাক কারো কর্ণকুহরে প্রবেশ করতো না। অবস্থা বেগতিক দেখে অনেক সময় সাঁতরে বাড়ীতে চলে যেতাম। অথবা অন্য কোন কোন্দাওয়ালাকে অনুরোধ করতাম, তিনি যেন আমাদের বাড়ীতে খবর পৌঁছে দেয় আমাদের পার করার জন্য। কথনও ডাকতে ডাকতে মুখ দিয়ে ফেনা বের করে ফেলতাম। কিন্তু কোন সাড়া-শব্দ পেতাম না। তখন মনে হত- আমরা একটি কঠিন দ্বীপের বাসিন্দা। হায়রে কঠিন দিন পার করেছি! সারাদিন ডাকার পর যখন সত্যি সত্যি কোন্দা নিয়ে আসতো পার করার জন্য তখন সব ব্যাথা-বেদনা ভুলে যেতাম।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৩২ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ৩০/০৪/২০২১

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast