www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

জীবন্মৃত

আষাঢ় মাস চলছে, প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে বৃষ্টি হয়। এখন সকাল সাতটা কি আটটা বাজে, রাশেদা বেগম ঘরের বাইরে খড়ের চালা দেওয়া ছাউনির নিচে বসে গভীর মনযোগের সাথে রান্না করছেন। চুলা বারবার নিভে যাচ্ছে তাই বাশের সরু চোঙ দিয়ে আগুন ধরে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অল্পক্ষণ পরে হাড়ি হতে ঢাকনা তুলে একটু ঝোল হাতে নিয়ে দেখলেন লবণ ঠিক হয়েছে কি না। মাথার উপরের ছাউনি হতে পানি পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়। চুলার অর্ধেকটা ভিজে গেছে প্রায়। এমন সময় হরহর করে বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করে উচ্চস্বরে ডাক দিলেন মকবুল।
- ও সুমনের মা তোমার রান্না শেষ হলো বুঝি
খিদেয় জ্বালা আর সহ্য করতে পারছি না।
বলেই একটা খলাই কাচাঁ মাটির বারান্দার উপর রাখলেন। ছোট-ছোট কতগুলো মাছ দিয়ে খলাইয়ের অর্ধেকটা ভরে গেছে। রাশেদা পুর্বের মত একাগ্রচিত্তে রান্না করতে লাগলেন। মকবুলের উচ্চস্বরের ডাকগুলো তার কানে প্রবেশ করেছে কিনা বলা মুশকিল। অন্তত তার চাহনি দেখে বোঝার বিন্দুমাত্র উপায় নেই। মকবুল এবার বলে উঠলো
- কি গো এমন চুপ করে আছো যে?
এতক্ষণে রাশেদা একটুখানি মাথা তুলে জবাব দিলো
- হয়েছে তো, বসো খেতে দিচ্ছি।
হঠাৎ কি জানি মনে করে স্বামীর প্রতি তীব্র আক্রোশের সাথে বলে উঠলো
- এই বৃষ্টিতে চুলা ভিজে যাচ্ছে বারবার, চুলা শুকাতে জীবনটা দিয়ে দিচ্ছি। আর এ জ্বালা সইবো কতদিন বলো? এবার একটা বিহিত না করলে রান্না করা যে মুশকিল হয়ে দাড়াচ্ছে। বলি কয়েকটা টিন কিনে যদি এবার চালাটা দিতে পারতাম। সে কপাল কি আছে আমার, পোড়া কপালের নিকুচি করি। এতক্ষণ ধরে স্ত্রীর কথাগুলো শুনে মকবুল একটা চাপা হাসি দিয়ে বললেন এবারের বর্ষাটা যাক না, বর্ষাটা একটু-আধটু কষ্ট করে কাটিয়ে দাও। পরে দেখি কতদুর করতে পারি।
- সে নাহয় দিলাম কিন্তু আজ যে বিহারির বউ টাকাটা চাইতে এসেছিলো তার কি হবে শুনি?
- আমার কি আর আলাদিনের চেরাগ আছে যে এক্ষুনি জাদু দিয়ে টাকা বানিয়ে দেব?
এ গাঁয়ের কেউ বলতে পারবে নাকি তার দু-চার টাকা মেরে খেয়েছি।
একটু রাগান্বিত স্বরে মকবুল বলে উঠলো।
- তবে টাকাটা যে সুদে-আসলে দিনে দিনে পাহাড় হয়ে উঠছে সে খেয়াল আছে?
- উঠুক গে। ওই বিহারি বড্ড ছোটলোক। চড়া সুদ নিয়েও টাকার জন্য প্রতিদিন তাড়া। আরেকবার বিহারির বউ আসলে বলে দিয়ো এ বর্ষায় টাকাটা দিতে পারবোনা। কি করতে পারে করুক। বললাম এ গাঁয়ে উড়ে এসে জুড়ে বসিনি। এ বাপ-দাদার ভিটে।
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুতপদে কলের দিকে ছুটে গেল। এদিকে রাশেদা খলাই হতে মাছগুলো বের করে তাতে চুলা হতে সংগ্রহ করা খাঁটি ছাই দিয়ে কুটতে লাগলো। মাছ কুটা প্রায় শেষ হয়ে গেছে এমন সময় ঘর হতে একটা সাত-আট বৎসরের বালক বাইরে আসলো। বারান্দার উপর এসে বললো মা আমার মিঠাইগুলো কোথায়? সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে বলে চোখের কোণে এখনো পেচুল লেগে আছে। রাশেদা বেগম তা দেখে ছেলেকে চোখমুখ ধুয়ে আসতে বললেন। চোখমুখ ধুয়ে আসলে শিকে'র উপরের মাটির হাড়িটা দেখিয়ে বললেন ওতে আছে বাবা, খাওয়া শেষ করে আবার শিকেয় তুলে রাখিস কিন্তু। আজকাল পিঁপড়া-বিড়ালের অত্যাচারে কিছু রাখা দায়। একটা আলমারি পর্যন্ত নাই। পরে মকবুল চেঁচিয়ে উঠে কিনা সেই ভয়ে আবার মাছ কুটার দিকে নজর দিয়ে তারাতারি কুটতে লাগলেন। ওদিকে ছেলেটা মায়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে শিঁকে হতে হাড়িটা বের করে একটা মিঠাই মুখে দিয়ে বললো - কি স্বাদ মা। তার চেহারার ভেতর পাকা আপেলের মত একটা আভা ভর করলো, যার ফলে ছোট্ট মুখে সমস্ত রক্ত জড়ো হয়ে রক্তিমাভা বর্ণ ধারন করলো। মিঠাই তার অতি পছন্দের জিনিষ। দরিদ্র পিতা-মাতার সন্তান বলে রসগোল্লা কি সন্দেশ খাওয়ার সৌভাগ্য হয়না সচরাচর। অতএব মিঠাই ওর কাছে যে অমৃত এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। বাবা-মায়ের অভাব অনটনের একটা সুক্ষ অথচ দৃঢ় প্রভাব যে তার মধ্যে পড়েছে ওর চেহারা দেখলে সহজেই অনুমেয় হবে। দুইবেলা ঠিকমতো খেতে পায় কিনা ঘোর সন্দেহ। অতি ভগ্ন স্বাস্থ্য। অল্পক্ষণ পরপর খুক খুক করে কাশি দেয়। তুলসি পাতা জোগাড় করে রোজ দুইবেলা রস করে খেয়েও বিশেষ কাজ হয়নি। বয়স সাত অতিক্রম করলেও স্কুলের চৌকাঠ পেরোনো হয়নি। দরিদ্র পিতার সাথে সঙ্গ দিতেই সময় কুলোয় না। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় এই ছোট্ট শিশুটির ওপর অভাবের যে তাড়না পিছু নিয়েছে তার প্রায়শ্চিত্ত করতেই স্কুলের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। অন্য শিশুরা যেখানে স্কুল শেষ করে রে রে হর্ষধ্বনি করে খেলতে যায় তখন এই শিশুটি পিতার সাথে কোনো ক্ষেত নিরানি দেয় কিংবা বড়শি কি দাড়কি দিয়ে মাছ ধরার জন্য ওত পেতে বসে থাকে। এটাই নিত্যদিনের অভ্যাস। অতি সত্বর যে এই অবস্থা বদলাবো তা বলা বাহুল্য। বিকেল বেলা কেরোশিনের শিশিটা হাতে নিয়ে মকবুল বাজারের দিকে হাটতেছিলো, পথিমধ্যে প্রাইমারীর হেডমাস্টার জয়নুদ্দিন দেখা পেয়ে মাছের ফরমায়েশ দিলো। জেলে না হওয়া সত্ত্বেও লোকজনের কাছে মাছের ফরমায়েশ পায় মকবুল। মাঝেমাঝে এই খ্যাপের টাকায় যদি নুন-তেলের পয়সা টাকা চলে তা মন্দ নয়। বাজারে পা দিয়েই বিহারির সাথে দেখা হলো মকবুলের। বিহারির কুশল জিজ্ঞাসা করা শেষ হতে না হতেই টাকার প্রসঙ্গটা উঠলো। পাশ থেকে বিহারির সাঙ্গ বলে উঠলো ভাইসাব এ ব্যাটা তো টাকা দিতে চায়না। বিহারির সাথে থেকে চাকরগুলো পর্যন্ত অন্য সুরে কথা বলা শিখে গেছে। এবার বিহারি অগ্নিমুর্তি ধারণ করে বললো টাকাটা দিতে না পারিস তাহলে নাহয় ভিটেখানা লিখে দিস। এই কথাটা বিহারি পুর্বেও বহুবার বলেছে। তাতে মকবুলের কোনো হেলদোল ঘটেনি।
- আজ্ঞে বিহারি সাব বর্ষাটা বেরোলেই টাকাটা দিয়ে দেব।
এই বলে বাড়ির দিকে হাটতে শুরু করলো। মনে মনে যে কত গালি বিহারির উদ্দেশ্যে নিক্ষিপ্ত হলো তার হিসাব নাই। এটাই একমাত্র উপায়। টাকাওয়ালাদের কিছু বলার জো নাই। পরদিন সকালে মকবুল ক্ষেতের দিকে গেল। বর্ষালি বেগুনের ক্ষেত, কি সতেজ চারাগুলো। একটুখানি বাড়তি লাভের আশায় বর্ষালি বেগুনের চাষ করেছে। এইবার ভালো বেগুন ধরলে কত টাকা আয় হবে, তা দিয়ে ঘরের টিন কেনা এসব চিন্তায় মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেল। ছেলের ডাকে কল্পনা ভাঙলো মকবুলের। ছেলেটির হাতে একটা বড় সাইজের গামলায় সার ভর্তি। গতদিনে নিরানি ও পানি দেওয়ার কাজটা শেষ হয়ে গিয়েছিলো। এখন সার দিয়ে পুরো পর্বটা চুকিয়ে ফেলার জন্য সমস্ত আয়োজন। এ যেন শুধু একখন্ড বেগুনের ক্ষেত নয়, মকবুলের একটুকরো স্বপ্ন। চারাগাছগুলো প্রতিদিন স্বপ্নের পালে একটু করে হাওয়া দিচ্ছে। এই বেগুন বিক্রি করতে পারলে তিনটা মাস অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। মাসে এত টাকা সুদ দিয়েও যদি এক বেগুনের টাকায় পুরো তিনমাস সংসার চলে এ তো চাট্টিখানি কথা নয়। অতএব এ ক্ষেতের প্রতি যে বিন্দুমাত্র অযত্ন হবে তা আশঙ্কা করা একেবারে অমূলক। দুই বাপ-বেটা মিলে সার দেওয়া শেষ করে বাড়িতে আসামাত্রই পাইকারকে দেখতে পেল। বাড়ির উঠানে যে প্রকান্ড একটা সজিনার গাছ ফলের ভারে ভাঙতে বসেছে সেই সজিনা কিনতে এসেছে। মকবুল বাড়িতে ছিলনা বিধায় পাইকার তার অপেক্ষায় ছিলো। পাইকার কেজি দশেক বায়না করতেই গাছ হতে একে একে সজিনাগুলো নামিয়ে দাঁড়িপাল্লায় দশ কেজি মেপে দেওয়া হলো। পাইকারের কাছ থেকে নগদ টাকা পেয়ে রাশেদার মুখে একটা আনন্দের রেখা স্পষ্ট হলো। এদিকে ছোট্ট ছেলেটি খুক খুক করে কাশতে লাগলো। রাশেদা পাইকারকে বিদায় দিয়ে ঘর হতে তুলসি পাতার খানিকটা রস এনে ছেলের হাতে দিয়ে বললো
বাবা এ রসটুকু এক নি:শ্বাসে খা দেখি, আজকাল তোর কাশি যে ভালো হচ্ছেনা।
তুলসিপাতার সামান্য রসটুকু খেতে বালকটির মুখমণ্ডলে কিরুপ বিকৃতি ঘটেছিলো তা বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। খাওয়া শেষ করে বারান্দার কোণে রাখা পুরোনো সাইকেলের টায়ার নিয়ে বেরিয়ে গেল। জগতের নির্মম বাস্তবতার বাইরে যে স্বল্পসময়টুকু অবশিষ্ট থাকে তাতে এই ক্ষয়ে যাওয়া টায়ারটিই একমাত্র খেলার সাথী। হঠাৎ মেঘলা আকাশ হতে তুমুল বেগে বৃষ্টি শুরু হলো। গত কদিনে বেশ ভালো বৃষ্টি হয়েছে। এরকম চললে যে বড় বন্যার একটা সমুহ সম্ভাবনা আছে তাতে দ্বিমত করার লোক দ্বিতীয়টি নেই। অতএব এই হতভাগ্য পিতা-মাতাকে যে বিষয়টা স্পর্শ করবেনা সেটা ভাবা অনর্থক। প্রবল বৃষ্টির মাঝেই একথালা চাল ভেজে তাতে তেল মাখাইতে মাখাইতে রাশেদা স্বামীর নিকট সেই কথাটাই বলছিলেন। তার গলায় চিন্তার একটা অদৃশ্য সুর বারংবার ঝংকার দিয়ে উঠতেছিলো। মকবুল কিঞ্চিৎ মাথা নাড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একমুঠো চাল ভাজা মুখে দিয়ে বললেন সে দেখা যাবে। বন্যার নিয়ন্ত্রন তো আমাদের হাতে নাই। সবই আল্লাহ পাকের ইচ্ছা। ভাবছি বেগুন ক্ষেতটার না আবার কিছু হয়।
- ওটা গেলে তো রক্ষে নাই, আল্লাহ মালুম। রাশেদা আক্ষেপের সুরে বললো। তারপর প্রসঙ্গটা পাল্টিয়ে ছেলের কাশির বিষয়টা তুললেন। ছেলেটা যে আজকাল বেশি বেশি কাশছে তা মকবুলেরও দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তুলসি পাতার রসে কাজ হচ্ছেনা তাও জানা ছিল। রাশেদা বললো ওতে বোধহয় হবেনা।
- গ্রামে নাকি এক নতুন ডাক্তারবাবু এসেছেন। ওনাকে দেখালে কেমন হয় গো? কাল নাহয় একবার ওদিকটায় গিয়ে দ্যাখো কি হয়। বউয়ের কথা শুনে মকবুল মাথা নেড়ে বললেন আচ্ছা। পরের দিন সকালে নিজের শীর্ণদেহি পুত্রকে নিয়ে ডাক্তার অভিমুখে চললেন। মিনিট দশেক হাটার পর যখন তারা ডাক্তারের চেম্বারে হাজির হলেন তখন ডাক্তারবাবু ডাক্তারখানার ভাঙা আলমারিটা মুছতে ছিলেন। এতদিন ডাক্তারখানা বন্ধ ছিলো, নতুন করে চালু করা হয়েছে তাই ধুলো জমে গিয়ে একাকার অবস্থা। আলমারিটা মোছা শেষ হলে রোগীর সমস্ত বর্ণনা শুনলেন। বর্তমান কাশির অবস্থা থেকে তুলসিপাতার রস করে খাওয়া অবধি কিছুই বাদ থাকলো না। ডাক্তার বিস্ময়ের সাথে বললেন এতদিন হয়ে গেল তবুও ডাক্তার দেখাননি কেন? মকবুলের কাছ থেকে প্রতিউত্তর না পেয়ে একটা সিরাপ বের করে দিয়ে রোজ দুবেলা করে সেবন করতে বললেন । পরে বড় কিছু ঘটে কিনা এই চিন্তা করে রোগের সময় বিবেচনায় রোগীর কফ নিয়ে রাখলেন। রোগের বয়স দুইমাস যে কতবড় অশুভ ইঙ্গিত করে তা একমাত্র ডাক্তারই বুঝতে পারলেন। এই আশঙ্কার প্রবল বেদনা নিজের মধ্যে চাপা দিয়ে ছোট্ট একটা হাসি দিলেন, বললেন সিরাপ ভালোমতো খাওয়ান। কফ নিয়ে রাখলাম, পারলে দিন দশেক বাদে এদিকটায় একবার আসবেন। এতক্ষণ ধরে নিরুদ্বেগ থাকা দরিদ্র পিতার মুখে এবার একরাশ চিন্তার ছাপ ফুটে উঠলো। ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলেন।
- বাবু রোগটা কি মারাত্নক?
- পরীক্ষা না করে আমার বলবার উপায় নাই। অযথাই চিন্তা করে কি লাভ বলুন তো?
এই দোলাচলের মধ্যে খানিকটা হতাশ হয়ে মকবুল ডাক্তারখানা ত্যাগ করলেন। এদিকে সিরাপ খাওয়া চললো নিয়ম করে। অন্যদিকে বেগুনের ক্ষেত ক্রমেই যেন সবুজ বাগানে পরিণত হলো। কি সুন্দর ফুল ধরেছে গাছগুলোয়। যে কারো হিংসে হবে একবার তাকালে। কিন্তু এর বিপরীতে আরেকটা ব্যাপার মকবুলকে যথেষ্ট চিন্তিত করে তুলছিল, বৃষ্টি। এবার যেহারে বৃষ্টি হচ্ছে তাতে করে এই ক্ষেত যে টিকবে তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবেনা। অথচ বিহারীর সুদের অঙ্কটা বহুদুর গিয়ে ঠেকেছে। বর্ষা পর্যন্ত সময় চেয়েও কুল হচ্ছেনা। বারবার টাকার তাগাদা দিয়ে জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে বিহারি। বেগুন বিক্রি ব্যতীত টাকাটা শোধ করার কোনো উপায় নাই সেটা মকবুল ভালোমতো জানতো। তাই দুঃশ্চিন্তার ভাঁজ তার কপালে ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকলো। হাতে যেটুকু সঞ্চয় অবশিষ্ট ছিলো তা প্রায় শেষ। নতুন করে টাকা ধার করতে গেলে বিহারী যে বেঁকে বসবেন এ খাঁটি কথা। বাড়িতে এসে শুনতে পেলেন বিহারির বউ তার খোঁজ করতে এসেছিলো। তবে টাকার জন্য নয়, আগামীকাল বিহারির প্রকান্ড পুকুরে জাল ফেলানো হবে তারই নেমন্তন্ন বলে গেছেন। বিরাট পুকুর, মাছ দিয়ে ভর্তি। বিহারির আয়ের বিশেষ একটা অংশ আসে এই পুকুর থেকে। এককালে এই পুকুর রহিম মন্ডলের কাছ থেকে বিহারির হাতিয়ে নেওয়ার কাহিনি পাঁড়া-গায়ের সকলেই জানে। অথচ কারো টু শব্দটি করার উপায় নাই। বিশেষত গ্রামের গরিব মানুষদের। সকলেই ঋণের বোঝায় গলা অবধি ডুবে আছে। পরদিন মকবুল জেলেদের সাথে জাল ফেলতে গেলেন। জাল ফেলা শেষ হলে বিহারির সামনে গিয়ে দাড়ালেন। হাতে কোনো পয়সা-কড়ি নাই, তার উপর ছেলেটাকে ভালো ডাক্তার দেখাতে হবে এই কথা চিন্তা করে দোটানাকে মনের মধ্যে চাপা দিয়ে বিহারির কাছে টাকা ধার চাইলেন। বিহারি বললেন - আগের টাকা শোধ করার নাম নাই আবার এসেছে টাকা নিতে, সামনে থেকে ভাগ ছোটলোকের দল। পরে নিজ চ্যালাকে ডেকে মকবুলকে বাড়ির বাইরে বের করার নির্দেশ দিলেন। মকবুল রাগে গজরাইতে গজরাইতে বাড়িতে এসে রাশেদার নিকট শুনতে পেলেন ছেলের কাশের সাথে রক্ত ঝরে পড়ছে। আজকাল সকাল-সন্ধ্যে দুবেলা করে জ্বর হচ্ছে। কাশিটাও আগের চেয়ে বেশি। এসব কথা বলতেই রাশেদার অশ্রুসজল চোখ হতে এক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। আঁচলে চোখ মুছে দুঃখিনী মাতা মিঠাইয়ের হাড়িটা বের করে সেখান থেকে দুইটা মিঠাই রোগা-পাতলা, অবসন্ন বালকটির হাতে দিলেন। এদিকে দশদিন পার হয়ে যাচ্ছে দেখে মকবুল পরের দিন ডাক্তারের কাছে ছুটে গেল। সেখানে গিয়ে যা শুনতে পেল তাতে তার কোমল হৃদয় কিসের একটা আঘাতে পাতলা কাচের ন্যায় ঝরঝর শব্দে ভেঙ্গে পড়লো। অথচ সেই শব্দ অতি নিকটবর্তী ডাক্তারের কানে পর্যন্ত পৌঁছালো না। শুধু মুখ ফুটে অস্ফুট স্বরে একটিমাত্র শব্দ উচ্চারিত হলো - যক্ষা। ডাক্তার কি বলবেন তা ভেবে না পেয়ে পৃথিবীর সকল ডাক্তারের ধর্ম যথাযথ পালন করে দরিদ্র পিতাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। এছাড়া আর উপায়ই বা কি আছে? মকবুলের অসাড় দেহ ডাক্তারখানার চৌকাঠ পেরোতে গিয়ে খানিকটা হোঁচট খেল। কোন মুখে সে ছেলের মায়ের কাছে এই কথা বলবে। পৃথিবীতে সত্য কখনো চাপা থাকেনা। অতএব এ খবর আকাশ-বাতাস মারফত মায়ের কানে গিয়ে পৌঁছালো। রাশেদা আঁচলে মুখ লুকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। সাথে আকাশ হতে ঝপঝপ করে বৃষ্টি নেমে দুখিনী মায়ের অশ্রুজলে যেন পতিত হলো। সেই যে আকাশ হতে বৃষ্টি নামলো তা টানা সাতদিন ধরে অবিরাম ধারায় বর্ষিত হয়ে অতঃপর থামলো। বৃষ্টির সাথে ছোট্ট ছেলেটির জীবনীশক্তি যেন একটু একটু করে ঝরে পড়ছিলো। যেদিন বৃষ্টি থামলো সেদিন জীবনীশক্তির পুরোটা প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেল। কফের সাথে রক্তের মাত্রাটা বাড়ন্ত হলো। চোখে-মুখে মাছি ভনভন করতে লাগলো। পাশে হতভাগ্য মাতা-পিতা বসে ছেলের মাথায় হাত বুলাতে থাকলো, সেইসাথে স্নেহের বর্ষণ যেন সবেগে ঝরে পড়লো। কিন্তু এই অল্প বয়সেই কাজ-কর্মে কিংবা ভাগ্যের বিড়ম্বনায় যেরুপ ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিলো তা আর পুরণ হওয়ার সমুহ সম্ভাবনা দেখা গেল না। এমনি করে জীবন-মৃত্যুর খেলা ছোট্ট বালকের নিকট মত্ত হয়ে উঠলো। অথচ তার ভগ্ন দেহ, দুখি মন আর বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না। যমে-মানুষে টানাটানি শেষে একটা সুরাহা হলো। একদিন যেমন এই পৃথিবীতে ফুলের ন্যায় ফুটেছিলো আজ ঠিক তেমনি করে টুপ করে ঝরে পড়লো, অতি নিঃশব্দে, সবার অন্তরালে। মায়ের একফোঁটা চোখের পানি ছেলের গালে পতিত হলো এবং তার কান্নায় চারিপাশের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। পরে মাওলানা ডেকে, জানা পড়ে কবরে চিরদিনের জন্য শুইয়ে দেয়া হলো। একখানা খেজুর কাটার ডাল আর গোটা তিনেক গোলাপজলের বোতল কবরের উপরে পড়ে থাকলো। এদিকে বন্যার পানিতে মকবুলের বেগুনক্ষেত সমস্ত ডুবে গেল। সদ্য সন্তান হারানো পিতার নিকট এই খবর অতি তুচ্ছরূপে ধরা দিলো। কিন্তু বিহারির ঋণের বোঝাটা তার উল্টোরুপ ধারণ করে পাহাড়সম হয়ে উঠলো। জীবনের সমস্ত ঋণ যেন সন্তানের বিদায়ের মধ্য দিয়ে মাটিচাপা পড়ে গিয়েছিলো। অতএব পরের দিন পিতা-মাতা চিরতরে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল।পাড়া-পড়শী সকলে তা জানতে পারলো। কিন্তু আরেকটা খবর তারা অল্পক্ষণ পরেই শুনতে পেল, বিহারির মস্ত বড় পুকুরে বিষ দেওয়া হয়েছে।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৬৪ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ০৪/১১/২০১৯

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast