www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

দিদিমনি

গল্প -- দিদিমনি

সকাল বেলায় কোনদিকে তাকানোর সময় থাকে না মলির।রাজ্যের কাজ সংসারের।যেদিকে না তাকাবে সে দিকেই অন্ধকার।সেজন্যই তাকে অনেক সময় দিতে হয় সংসারে।অনেক কাজ করতে হয়।আর এই সংসার সামলে আবার তাকে নিজের কর্মক্ষেত্রে ও ছুটতে হয়।উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাংলা দিদিমনি মালবিকা মিত্র ওরফে মলি।বাড়ির কাছেই স্কুল বলে তাও বাঁচোয়া।তাই কষ্ট হলেও সবদিক সামলাতে পারছে।নইলে দুই মেয়ে নিয়ে সংসারের ঝক্কি সামলে সবকিছু ম্যানেজ করা খুব মুশকিল।
আজ সকালে উঠেই মলির মেজাজ খারাপ।সকাল সাতটা বেজে গেল, এখনো কাজের মেয়ে টুম্পা আসেনি।কাজের মেয়ে না আসলে চোখে সর্ষে ফুল দেখে মলি।সবকিছু সামলে দশটার মধ্যে বেরোতে হবে।কাছে স্কুল হলেও রিকশায় যেতে কুড়ি মিনিট লাগে।আর সাড়ে দশটার মধ্যে স্কুলে না পৌঁছাতে পারলে বড়দির মুখ ভার।প্রেয়ারের সময় সব দিদিমনির উপস্থিত থাকা চাই এটাই নিয়ম বড়দির।কিন্তু আজ কি যে হবে!সবকিছু সামলে আজ কি যেতে পারবে!অথচ সামনেই পরীক্ষা আসছে, আজ রুটিন দেওয়া হবে।এখন কোনমতেই স্কুল কামাই করা যাবে না।এই সময় এই বিপত্তি।কি করবে ভাবতে ভাবতেই ফোন বেজে উঠল।দৌড়ে গিয়ে মোবাইল টা কানে নিতেই টুম্পার গলা--
বৌদি আমার ছেলেটার খুব জ্বর গো,কাল সারারাত ভুগেছে,আজ সকালেও নামেনি।ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।আজ আর কাজে যেতে পারব না।
শত আপত্তি সত্ত্বেও মলিকে বলতেই হয়-- ঠিক আছে টুম্পা, তুমি ছেলেকে দেখো,আজ আর আসতে হবে না।পারলে কাল এস।
মানবিকতা বলে একটা ব্যাপার আছে।এটা শত সমস্যার মধ্যেও ভোলা যায় না।কিন্তু ফোন নামিয়ে রেখে মলির আর বসে থাকার উপায় রইল না।ঘড়িতে তখন সাতটার কাঁটা দশমিনিট এগিয়ে গিয়েছে।বাসি ঘর ঝাঁট দিতে দিতেই সে মেয়েদের ওঠানোর জন্য চিৎকার করতে লাগল।মেয়েদের আটটার মধ্যে রেডি করে স্কুল বাসে তুলে দিতে হবে।এদিকে বর সমীর বেরোবে ন'টায়।তার জন্য ভাত রেডি করতে হবে।তারপর সব সামলে নিজের রেডি হওয়া।টুম্পা সকালে অনেক সামলায়।আজ একেবারে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে মলি।চা খেতে খেতেই মেয়েদের খাইয়ে টিফিন রেডি করে দিল।ওদিকে ভাত বসিয়ে দিয়েছে গ্যাসে।আজ যাহোক অল্প ঝোল ভাত করে সামাল দিতে হবে।কালকের একটু তরকারি আছে ফ্রিজে।ওই দিয়েই চলুক এবেলা।রাতে কিছু করে নিলেই হবে।
তুমি ওদের বাসে তুলে দিয়ে এস।-- সমীর কে উদ্দেশ্য করে বলল মলি।সমীরের উত্তর না পেয়ে রান্নাঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে বেডরুমের দিকে এগতেই ছোটমেয়ের কান্নার আওয়াজ--
মা দিদি আমাকে চুল আঁচড়িয়ে দিচ্ছে না।
ঘরে ঢুকেই দেখে দুই মেয়ের মধ্যে ঝামেলা লেগে গেছে।বড় মেয়েকে বলেছিল মলি বোনের ড্রেসটা পরিয়ে চুল আঁচড়ে দিতে।কিন্তু ছোট মেয়ে পাকামিতে ওস্তাদ।নিজেই ড্রেস পড়বে বলে বায়না করেছে দিদির কাছে।দিদি ও রাজী হয়ে নিজের দিকে ব্যস্ত।এর মধ্যে ছোট মেয়ের ড্রেস কোনরকমে পরা শেষ হয়েছে, কিন্তু টাই বাঁধা, চুল বাঁধা হয় নি।সে আর অপেক্ষা করতে নারাজ।দিদিকে তখনই তাকে দেখতে হবে।এদিকে দিদি তখন নিজের সাজ শেষ করতে পারেনি।ফলাফল ঝামেলার সূত্রপাত।মলি তাড়াতাড়ি গিয়ে ছোটমেয়ের ড্রেস ঠিক করতে বসল।
মা,দিদির দোষ কিন্তু, দিদি আমাকে পরিয়ে দিল না।
না মা বিশ্বাস করো বোনকে বললাম একটু থাম,আমি নিজের করেই তোকে করে দিচ্ছি।ও থামলো না।
ঠিক আছে মিষ্টু,আমি দেখছি।
বড় মেয়েকে থামিয়ে দিয়ে ছোট মেয়ের দিকে এগিয়ে গেল ।

তারপর বড় ও ছোট দুই মেয়েকে ঠিকঠাক করে তাদের ব্যাগ নিয়ে বাইরে বেরোতে বলে সমীরের কাছে পাশের ঘরে গেল মলি।

মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত সমীর তখন ল্যাপটপে অফিসের কাজে গভীরভাবে মগ্ন।কোন দিকে তার খেয়াল নেই।

আজ একটু ওদের বাসে তুলে দিয়ে এস প্লিজ।

আমার কাজ আছে মলি।অফিসের প্রোজেক্ট শেষ হয়নি।

আজ টুম্পা আসেনি-- তুমি তো দেখছ আমি কতদিকে করব!একটু যাও আজ--

নিমরাজি হয়ে মেয়েদের নিয়ে বেরিয়ে গেল সমীর।মলির খুব রাগ হয়ে গিয়েছিল।সংসারের কোন কাজেই সমীরের সাহায্য পাওয়া যায় না।তবুও সে তার রাগ খুব সহজে প্রকাশ করে না।এতে কোন লাভ হবে না।বরং পরিস্থিতি খারাপ হবে একথা বুঝে গেছে মলি।আগে খুব রেগে যেত।একটুতেই মেজাজ হারাতো।কিন্তু এখন সবদিকে ম্যানেজ করতে শিখে যাচ্ছে ক্রমশ।সময় আর অভিজ্ঞতা তাকে অনেক পরিনত করেছে।আজকাল তাই মিষ্টি কথায় কাজ সারবার চেষ্টা করে মলি।আর তার ফলাফল ও সন্তোষজনক দেখতে পায়।

ঠিক দশটায় বাড়ি থেকে কিছুতেই বেরোতে পারল না মলি।সব গুছিয়ে বাড়ির সব দরজা জানলা লাগিয়ে বেরোতে বেরোতে একটু দেরী হয়ে গিয়েছিল।তার উপর আবার পাশের ফ্ল্যাটে চাবি দিয়ে মাসিমাকে বলে আসতে হল ওনার কাজের মেয়েকে দিয়ে মৌ মিষ্টু কে স্কুল ফেরত বাস থেকে নামিয়ে আনতে।তারপর মাসিমা বিকেল পর্যন্ত সামলে নেবেন, মলি না ফেরা পর্যন্ত।অন্য দিন টুম্পা এগুলো করে।আজ খুব বুঝতে পারছে টুম্পার কত দরকার।ঘড়িতে তখন দশটা দশ।রিক্সা তখন রাস্তায় প্রায় নেই।কিছুক্ষণ পরে একটা রিকশা ধরতে পারল মলি।রিকশাচালক কে বলল একটু তাড়াতাড়ি চালাতে।নইলে আজ বড়দির রোষ থেকে তাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।

স্কুলে পৌঁছে ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখল দশটা পঁয়ত্রিশ।প্রায় দৌড়ে প্রেয়ার লাইনের কাছে গিয়ে হাঁপাতে লাগল মলি।বড়দি আড়চোখে দেখে মুখ গম্ভীর করে নিলেন।একটু হাতঘড়ির দিকেও তাকালেন মনে হল।যাকগে যা ইচ্ছে হোক।আর পারছেনা মলি।ওদিকে তখন প্রেয়ার শুরু হয়ে গিয়েছে।

প্রথম ক্লাস ছিল ক্লাস এইটের।হঠাৎ নোটিশ এল পরীক্ষার রুটিন এর ।তার সাথেই মলির বড়দির ঘরে ডাক পাবার খবর।ক্লাস শেষ করে বড়দির ঘরে যেতেই বড়দির প্রশ্নের মুখে পড়তে হল --

কি হল মালবিকা! আজ আপনার লেট?

দিদি আজ খুব মুশকিলে পড়ে গিয়েছিলাম সকালে।কাজের মেয়েটার ছেলের জ্বর।তাই কাজে আসেনি।সব সারতে গিয়ে একটু লেট হয়ে গেল।

আমার কাছে ডিসিপ্লিন আগে মালবিকা।
কারো কোন ব্যাক্তিগত সুবিধা অসুবিধার দেখার দায়িত্ব আমার নয়।চাকরি করতে এসে সংসারের দিকে তাকালে হয় না।একজন কে সুবিধা দিলে সবাই সেটা চাইবে।

আর হবে না দিদি।

মনে রাখলে খুশি হব।এবার আপনি আসুন।

দ্বিতীয় পিরিয়ডে আজ ক্লাস নেই মলির।তাই বড়দির ঘর থেকে বেরিয়ে স্টাফরুমের দিকে এগিয়ে গেল সে।সেখানে তখন ফাঁকা।বেশিরভাগ সবাই ক্লাসে গিয়েছে।দুই একজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে।অফিসঘরে ঢুকতেই নীতা ডাক দিল।--
এদিকে আয় মলি।
কাছে যেতেই তার প্রশ্নের বাণ ছুটলো।
কীরে,বড়দির ঘর থেকে বের হলি দেখলাম।কি ব্যাপার?
আজ একটু লেট হয়ে গিয়েছে তাই ...
ভদ্রমহিলা রেডি হয়েই থাকেন
তা কি বললেন?
কি আর বলবেন!দেরী কেন তাই,আমি বললাম, কাজের মেয়ে আসেনি।
শুনে ছেড়ে দিলেন!
না, শুধু কি আর ছাড়েন! কিছু বক্তৃতা ফাউ-- হেসে ফেলল মলি।
তুই হাসছিস!ভদ্রমহিলার বক্তৃতা তো নিম তেতো।তাও হাসি আসে!সত্যি তুই পারিস বটে।

কি করব বল নীতা।সবসময় মাথা গরম করলে চলে!এটাই তো জীবন।এই ভাবেই সবাই কে বেঁচে থাকতে হয়।আর তাছাড়া বড়দিকেও তো সবদিক খেয়াল রেখে সব ম্যানেজ করতে হয়।এতবড় স্কুল চালানো সহজ নয়।

ফোর্থ পিরিয়ডে ক্লাস ফাইভের ক্লাস নিচ্ছিল মলি।এই ক্লাসটা তার খুব ভালো লাগে।সব ছোট ছোট মেয়ে সব যেন ফুলের কুঁড়ি।এখনো কোন মালিন্য তাদের মলিনতা দান করতে পারে নি। ছাত্রীরাও খুব ভালবাসে তাদের বাংলার ম্যাডাম মালবিকাদিকে।মালবিকা ক্লাস নিলে তারা সবাই চুপ করে শোনে।অনেক রকম প্রশ্ন ও করে।সাধ্যমত উত্তর দেয় সে, সবাইকে হাসিমুখে।সেজন্যই সবাই তাকে এত ভালবাসে।

দিদিমনি আজ একটা কবিতা আবৃত্তি করে শোনান।খুব ভালো লাগে আপনার মুখে কবিতা।--- রিয়া বলে উঠল।মেয়েটি খুব মিষ্টি।পড়াশোনায় যথেষ্ট ভালো।অন্যসব মেয়েরাও রিয়াকে সমর্থন করল সমস্বরে।মলি তাদের অনুরোধ এড়াতে পারলো না।সে তাদের কথামতো একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতে লাগল।গোটা ক্লাস তখন চুপ।আর সেই দিকে তাকিয়ে মলির মন আনন্দে ভরে উঠল।

এই কারনেই জীবনের এত প্রতিকূলতা, এত ব্যস্ততা, এত সমস্যা সবকিছু সে হাসিমুখে সহ্য করতে পারে।সকাল থেকে সব কাজের ভার, বড়দির তিরস্কার সবকিছু ভুলে গেল মলি। নতুন এক উজ্জীবনার মন্ত্রে সে নতুনভাবে জীবনের এক নতুন লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে গেল।সত্যিই তার ছাত্রীদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের মুখে দিদিমনি ডাক শুনে মলি জীবনের এক সার্থকতার দিক খুঁজে পায়।

@ মৌমিতা পাল
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ২৭৩ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১০/০৬/২০২০

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • রমা চৌধুরী ২৬/০৬/২০২০
    বেশ ছিমছাম। দৈনিক আলাপচারিতা।
  • অভিজিৎ জানা ১৫/০৬/২০২০
    খুব ভালো হয়েছে!
  • কুমারেশ সরদার ১২/০৬/২০২০
    খুব খুব সুন্দর
  • বেশ ভালো লাগছে। ভালো থাকবেন সব সময়।
  • সঞ্জয় শর্মা ১১/০৬/২০২০
    মধ্যবিত্ত গৃহিণীর পথের পাঁচালী
  • খুবই সুখপাঠ্য।
  • ফয়জুল মহী ১০/০৬/২০২০
    অনিন্দ্য সুন্দর লেখনী
 
Quantcast