www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

তথ্যের মোড়কে Corona Vairus কী এবং কেন

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারত একটি বিশাল মহামারীর শিকার । বর্তমান এই আতঙ্কে সারা বিশ্ব তথা ভারতবর্ষ কাঁপছে, শুধু তাই নয় দিনে দিনে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা ও আক্রান্তের সংখ্যা কোটি কোটি । হঠাৎ করে কি এমন রোগ এর খোঁজ মিললো যে বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়লো রাতারাতি এবং এত জন আক্রান্ত ও মৃত ? আজ মানুষ মৃত্যুকে দেখছে এই প্রথম এত বেশি । প্রতিটি দেশেই চলাচল বদ্ধ, বাজার ঘাট বন্ধ বিদেশ সফর তো অতীত । প্রত্যেকটি মানুষ গৃহবন্দি, সরকার খাদ্য জোগান দিচ্ছেন । অথচ লাফিয়ে বেড়ে চলেছে মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা । যার মধ্যে সুস্থ্য হয়ে উঠছেন খুব অল্প সংখ্যক মানুষ । বর্তমান বিশ্বে 750 কোটি মানুষ । এই করোনা ভাইরাসে গত এক মাসেই যত মানুষকে আক্রমন করেছে এবং যত মানুষ মারা গেছেন, যদি আর মাস চার, পাঁচে এই ভাইরাস না শেষ হয় তবে অনুমান করে বলা যায় পৃথিবী থেকে 10 থেকে 15 কোটি মানুষ মারা যাবে ।

এমন পরিস্থিতে আমরা অনেকেই জানি না এই "Corona Virus" টি আসলে কী ? অথচ এর নাম এবং আতঙ্কে কাঁপছে বিশ্ববাসী । এই প্রবন্ধে "Novel Corona Virus" সম্পর্কে সঠিক তথ্য নিয়ে বিস্তারিত কিছু লিখছি । আমার মনে হয় সমস্যা সমাধান করার আগে সমস্যটা কি সেটা ভালো করে জেনে নেওয়া, কারন এই মুহুর্তে আমরা অনেক গুজব শুনতে পারছি এবং অনেক ভুল ধারনা নিয়ে সচেতন হবার চেষ্টা করছি ।

"Corona Virus" মূলত ভাইরাসের একটি শ্রেনিকে বোঝায়, যেগুলো স্তন্যপায়ী প্রাণী ও পাখিদের আক্রান্ত করে । মানুষের মধ্যে এই ভাইরাসটি শ্বাসনালী তথা ফুসফুসে সংক্রমন ঘটায় । এই সংক্রমন কখোনো সাধারণ সর্দি - কাশির মতো মনে হতে পারে । কিন্তু এই সব উপসর্গ "Corona Virus" ছাড়াও অন্যান্য ক্ষতিকর Virus এর কারনে হতে পারে, যেমন --- "সার্স", "মার্স" ও "Covid - 19" । তবে মানব শরীরে সৃষ্ট "Corona Virus" সংক্রমন এড়ানোর জন্য আজ পর্যন্ত কোনো Antiviral ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি ।

"Corona Virus" শব্দটি ল্যাটিন ভাষার "Corona" থেকে নেয়া হয়েছে, যার প্রকৃত অর্থ "মুকুট" । কারন দ্বিমাত্রিক সঞ্চালন Electric অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ভাইরাসটির আবরণ থেকে গদা আকৃতির প্রোটিনের কাঁটা দেখা যায়, যা অনেকটা মুকুটের মতো । ভাইরাসটির উপরিভাগ প্রোটিন দ্বারা আবদ্ব থাকে । এই ভাইরাসটি প্রোটিন সংক্রমিত হয়ে টিস্যু নষ্ট করে দেয়, ধারনা করা হয় প্রাণীর শরীর থেকে এটি মানব শরীরে প্রবেশ করে ।

করোনা ভাইরাস 1960 সালে প্রথম আবিষ্কৃত হয় । প্রথমে এটি মুরগির মধ্যে সংক্রামক ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাস হিসেবে দেখা যায় । পরবর্তী কালে সাধারণ সর্দি কাশি হাঁচি আক্রান্ত রোগীর মধ্যে এরকম দু'টি Virus পাওয়া গেছে । এই দু'টি হল --- "মানুষ্য Corona Virus 229 E" এবং "মানুষ্য Corona Virua OC43" । এরপর বিভিন্ন কালে ভাইরাসটির আরো কিছু প্রজাতি খুঁজে পাওয়া যায় । এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য ---- 2003 সালে "SARS - COV", 2004 সালে "HCOV NL63", 2005 সালে "HKU 1", 2012 সালে "MERS - COV" এবং সর্বশেষ 2019 সালে চীনে "SARS - COV 2" পাওয়া যায় যা বর্তমানে "Novel Corona Virus" নামে পরিচিত । এগুলোর মধ্যে অধিকাংশ Virus এর কারনে শ্বাসকষ্টের মত কঠিন সমস্যা দেখা দেয় ।

Corona Virus আক্রান্ত ব্যাক্তির প্রাথমিক লক্ষণ গুলি হল ---- (১) জ্বর, (২) অবসাদ, (৩) শুষ্ক কাশি, (৪) বমি হওয়া, (৫) শ্বাসকষ্ট, (৬) গলা ব্যাথা ।

2019 সালের 31 শে Decembar চিনের "উহান" শহরে "Corona Virus" এর একটি প্রজাতির সংক্রামন দেখা দেয় । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO (World Helth Organizetion) ভাইরাসটিকে "2019 - NCOV" নামকরণ করেন । 2020 সালের 5 ই April পর্যন্ত বিশ্বে 12 লক্ষ 25 হাজার 360 জন আক্রান্ত, 66 হাজার জন মৃত এবং সুস্থ্য হয়েছেন 2 লক্ষ 52 হাজার 615 জন, এর মধ্যে আমেরিকাতে আক্রমনের সংখ্যা সবথেকে বেশি 3 লক্ষ 11 হাজার 889 জন, এরপর আছে স্পেন ও ইতালি যথাক্রমে 1 লক্ষ 30 হাজার 759 ও 1 লক্ষ 24 হাজার 632 জন । মৃতের সংখ্যা সবথেকে বেশি ইতালিতে 16 হাজার 362 জন এবং তারপর যথাক্রমে স্পেন ও আমেরিকা 12 হাজার 418 জন ও 8 হাজার 492 জন, ভারতে এ পর্যন্ত আক্রান্ত 3 হাজার 577 জন, মৃত 83 জন, সুস্থ্য হয়েছেন 275 জন ।

উহানে খুঁজে পাওয়া এই ভাইরাসটি "SARS - COV" প্রজাতি Virus এর সাথে 70% জিনগত মিল পাওয়া যায় । অনেকেই অনুমান করেছেন এই প্রজাতিটি সাপ থেকে এসেছে যদিও অনেক গবেষকগন এর বিরধীতা করেন ।

"Corona Virus" নামটির উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ থেকে হলেও "Corona" শব্দটি গ্রিক শব্দ "kopwvn korone" থেকে এসেছে যার অর্থ "মালা" বা "হার" ।
হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে সৃষ্ট জল কনার ফলে আক্রান্তর সংস্পর্শে অপর ব্যাক্তি আক্রান্ত হয়ে যায় ।

করোনা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম "Orthocorona Virinae (অর্থোকরোনা ভিরিন্যা) বা "Coronavirinae" (করোনাভিরিন্যা) "Novel Corona Virus" টি এই করোনাভিরিডি পরিবারের সদস্য ।

সকল প্রকার করোনা ভাইরাসের সর্বশেষ সাধারণ পূর্বপুরুষ এর উৎপত্তি ঘটে আনুমানিক 800 খ্রিষ্টপূর্বাব্দে । বাদুর এবং পাখির মতো উড়ন্ত গরম রক্তের মেরুদন্ডী প্রাণীরা Corona Virus জিন উৎসের বিবর্তন এবং ছড়িয়ে দেওয়ার প্রধান বাহক । বাদুরের মাধ্যমে "আলফা করোনা" ও "বেটা করোনা" Virus, পাখির মাধ্যমে "গামা করোনা" এবং "ডেল্টা করোনা" Virus ছড়ায় ।
বোভাইন করোনা ভাইরাস এবং ক্যানাইন শ্বসন যন্ত্রের করোনা ভাইরাসের শেষ পূর্বপূরুষ 1960 সালের দিকে এবং মানব করোনা ভাইরাস "OC43" 1890 এর দিকে ছড়ায় ।

ক্ষতির দিক থেকে Corona Virus অনেক বৈচিত্রময় । কিছু প্রকার আক্রান্তের 30% এর বেশি মানুষ মারা যায় । এই রোগ সাধারনত শীত কাল ও বসন্ত ঋতুর সময় দেখা যায় । করোনা ভাইরাস নিউমোনিয়াও ঘটাতে পারে ।
করোনা ভাইরাস "HCOV - 229E", "NL 63", "OC 43' এবং "HKUI" মানুষের মধ্যে ক্রমাগত ছড়াতে থাকে এবং বিশ্ব জুড়ে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের শ্বসন তন্ত্রে আক্রমন করে ।

এতএব বর্তমান পরিস্থিতিতে ভয়ের তেমন কিছু না থাকলেও আমরা গৃহবন্দি থাকার পাশাপাশি যেটা করতে পারি তা হল ----- সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা এবং ঠান্ডা যাতে না লাগে তার উপর খেয়াল রাখা । ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দিনে দশ বার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করা, চুলে স্যাম্পু করা ধোয়া পোশাক পরা এবং বাইরের কোনো মানুষের সাথে মেলামেশা না করা এবং পশু পাখির থেকে দূরে থাকা ।

ভারতবর্ষে প্রথম Corona Virus আক্রমনে মারা যান কর্নাটকের কালবুর্গিতে 76 বছরের এক বৃদ্ধ 12 মার্চ 2020 । তিনি 29 ফেব্রুয়ারী সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন, যদিও হাইদ্রাবাদ বিমান বন্দরে তাকে সেই মুহুর্তে পরীক্ষা করে কোনো লক্ষন ধরা পড়েনি । তবু বিদেশ থাকা ভারতীয় মানুষ যারা বিশ্বজুড়ে এই পরিস্থিতে দেশে ফিরছেন বা ফিরেছেন তাদের মাধ্যমেই এই Virus টি ছড়াচ্ছে বলে মনে করা হয় ।

তবে ভারতে এই রোগটি প্রবল ভাবে ছড়ানোর আগেই 11 মার্চ ভারত সরকার সমস্ত International ও National বিমান বন্দর বন্ধ করে দিয়েছেন এবং 20 শে মার্চ থেকে দেশব্যাপি "Lock Down" ঘোষণা করেছেন । তবু অনেক দেরা হয়ে গেছে, অনেক আগেই সচেতন হওয়া দরকার ছিলো এবং দেশবাসীকে সতর্ক করাও ভিষণ ভাবে দরকার ছিলো, যারা বিদেশ থেকে ফিরছেন তাদের "কোয়ারেন্টাইন" রাখা উচিত ছিলো ।

যদিও ভারতে 130 কোটি মানুষের মধ্যে খুব কম সংখ্যক মানুষ মারা গেছেন ও আক্রান্ত হয়েছেন অন্যান্য দেশের তুলনায় । তবু বলবো "Lock Down" চলা কালেও যখন মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, 2/4 মাস গৃহবন্দি থেকেও এই ভাইরাসকে আটকানো একটু কঠিন । আর যদি ভারতেও ইতালি কিংবা আমেরিকার মতো অবস্থা দাঁড়াই তবে মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন, তাদেরকে রাখার মত এত পরিমান "ভেন্টিলেটার" ভারতে নেই আর হসপিটাল ও নেই । কাজেই সেই মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা থেকে ভারতে আরো 5 গুন মানুষ আক্রান্ত হয়ে পড়বেন এবং আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে আরো 2 গুন ।
সব মিলিয়ে বলা যায় আগামী 3 থেকে 4 মাসেও যদি ভারতবর্ষ বিশেষ কোনো উপায় গ্রহন না করে এভাবেই থাকে তবে ভারতে সত্যি এক ভয়াবহ পরিস্থিতি আসতে চলেছে । যেখনে ভারতের জনঘনত্ব 382 জন প্রতি বর্গ কিমিতে, অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতেও প্রায় 10 থেকে 15 হাজার মানুষ মারা যেতে পারে ।




Mohan Das
05.04.2020




তথ্যসুত্র :
১। de Groot RJ, Baker SC, Baric R, Enjuanes L, Gorbalenya AE, Holmes KV, Perlman S, Poon L, Rottier PJ, Talbot PJ, Woo PC, Ziebuhr J (2011) ।
২। International Committee on Taxonomy of Viruses (আগস্ট 2010) ।
৩। Sexton NR, Smith EC, Blanc H, Vignuzzi M, Peersen
OB, Denison MR (আগস্ট 2016) ।
৪। Geller C, Varbanov M, Duval RE (নেভেম্বর 2012) ।
৫। "2019 Novel Coronavirus infection (Wuhan, China):
Outbreak update" । Canada.ca। ২০২০-০১-২১।
৬। "ClinicalKey" । www.clinicalkey.com। ২০১৩-০৪-২৫
তারিখ মূল থেকে সংগ্রহ করা ।
৭। "No, the Wuhan Virus Is Not a 'Snake Flu' " । Wired।
২০২০-০১-২৪ তারিখ মূল থেকে সংগ্রহ করা ।
৮। Goldsmith CS, Tatti KM, Ksiazek TG, Rollin PE, Comer JA, Lee WW, ও অন্যান্য (ফেব্রুয়ারি 2004) ।
৯। Fehr AR, Perlman S (২০১৫)। Maier HJ, Bickerton E,
Britton P, সম্পাদকগন ।
১০। Neuman BW, Adair BD, Yoshioka C, Quispe JD, Orca G, Kuhn P, ও অন্যান্য (আগস্ট 2006) ।
১১। Lai MM, Cavanagh D (১৯৯৭)। "The molecular biology of coronaviruses"। Advances in Virus Research ।
১২। Sexton NR, Smith EC, Blanc H, Vignuzzi M, Peersen OB, Denison MR (আগস্ট 2016) ।
১৩। Fehr AR, Perlman S (২০১৫)। "Coronaviruses: an
overview of their replication and pathogenesis" ।
Methods in Molecular Biology: 1–23।
১৪। "Transmission of Novel Coronavirus (2019-nCoV) | CDC" । www.cdc.gov (ইংরেজি ভাষায়) ।
১৫। Huynh J, Li S, Yount B, Smith A, Sturges L, Olsen JC, ও অন্যান্য (ডিসেম্বর 2012) ।
বিষয়শ্রেণী: প্রবন্ধ
ব্লগটি ৬১ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১০/০৪/২০২০

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • ভালো লেখা।
  • important notes
  • আব্দুল হক ১০/০৪/২০২০
    সুন্দর লিখেছেন।
  • ফয়জুল মহী ১০/০৪/২০২০
    Good post
 
Quantcast