www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

লাল ছিড়ল

লাল ছিড়ল ফাইকে নাচে ডাউকের উপর গুরিরেঃ
---
আব্বা ছিলেন কুমিল্লায়,ওখান থেকেই পেনশনে যান,আমরা ছিলাম রংপুরে,আমি ইন্টার,ছোটবোন এসএসসি পরীক্ষার্থী,মেঝো ভাই রংপুর মেডিকেলের স্টুডেন্ট।বড় ভাই চিটাগাঙ ভার্সিটি থেকে সবে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছে,রুবেল তখন ক্লাশ টেনে আর হিমেল ফোরে।
আমরা এসেছিলাম ময়মনসিংহ হয়ে মোহনগঞ্জ,তারপর ধর্মপাশায়।ওখানে আমার বড়খালা থাকেন।খালুজি মোহনগঞ্জ পাইলট হাই স্কুলের সহকারি প্রধান শিক্ষক।মনি মোহন দু'জনই বেশ ছোট।ধর্মপাশায় দিনকতেক থাকার পর আমরা এলাম জামালগঞ্জের নয়াহালট গ্রামে।আমার নানার বাড়ি।
নানাজি হাইস্কুল থেকে এবং নানিজি প্রাইমারি স্কুল থেকে রিটায়ার করেছেন।দু'জনেই স্ব-স্ব কার্যক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন।
গ্রামে এসেছিলাম সেই কবেকার ছোটবেলা,আর এখন বেশ বড় হয়ে গেছি।বর্ষার দিন,সারাদিন বৃষ্টি।আমরা সারাদিন মামাদের সাথে কেরাম খেলি নয়তো তাস পেটাই,সবই নানাসাহেবের অগোচরে।
আম্মা বলেছিলেন এই যে একটানা বৃষ্টি- এই বৃষ্টিকে নাইওরি বৃষ্টি বলে।
অদ্ভূত রোমাঞ্চকর বৃষ্টির দিন,সারাদিন কেউ কাঁথা সেলাই করে,কেউ পাখা বানায়।আমার নানার বাড়ির সবাই চাকরি করতেন বিধায় গৃহস্থালি কোনও ঝামেলা ওদের বাড়ি ছিলো না।
ঝমঝম ঝমঝম বৃষ্টির এমনি দিনে হাওর পাড়ি দিয়ে বাড়ির মেয়েরা নাইওর যেতো বাবার বাড়ি।হাওরের সে কি উত্তাল ঢেউ।এমন ঢেউ আমিও দেখেছি কয়েকবার,সেই ঢেউয়ের নিজস্ব ছন্দ আছে,গন্ধ আছে।
টানা বারোদিন বৃষ্টির পর বড়চাচা কেয়ারি নৌকা নিয়ে এলেন আমাদের বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য,সাথে হিরু মিয়া।
"রুবি'পা গান শুনো তো! কারি আমিরউদ্দিনের অনেক ক্যাসেট আছে আমার।"
আমিরউদ্দিনের নাম শুনি নি আমি কখনও।
বাড়ি এসে গান শুনলাম উনার।সব অপরিচিত গান,আমি তখন লতা, হেমন্ত,সাগর সেন,মাইকেল জ্যাকসন,এ্যাবা, বনিএম শুনি।গ্রামের আঞ্চলিক কথার গান আমি বুঝতাম না।
একটা গান এমন ছিলো," ভাসেও না, বুরেও না- ইটা কিতা? ইটা কোনতাও না"
গানের ফাঁকে ফাঁকে গায়ক কথার ব্যাখ্যা দিতেন।
গ্রামের হাওর দিয়ে বিয়ের নৌকা যেতো।মাইক বাজতো
" লাল ছিড়ল ফাইকে নাচে ডাউকের উপর গুরিরে,রঙ্গীলা দামান্দে লুটইন আড়শের বাবাজীর বাড়িরে" " মাতার টিকলি আনছি, মাতার উফর পিন্দাইছি, জিলমিল জিলমিল দেখরে কইন্যা কি সুন্দর সাজাইছে""লেম্বুর তলে আমার সিপাই দুলা সাজেগো লেম্বু তুলিও না"--- এসব সহ আরও কত বিয়ের গান।সারাদিন মাইক বাজিয়ে নৌকা যাচ্ছে,সামনে রঙ্গীন কাগজে সাজানো কলাগাছের গেট, তার নিচে চেয়ারে বর বসে মুখে রুমাল হাতে।
উফ্ কি ভীষম অভিজ্ঞতার ব্যাপার।
অনেক কষ্টে গানের কথা বুঝলেও গানগুলোর রচয়িতা কে জানা নেই।
লাল ছিড়ল ফাইকে নাচে ডাউকের উপর গুরিরে- ছিড়ল হয়তো চিত্রল বা চিত্র-বিচিত্র,ফাইকে হলো পাখি,ডাউকি আমাদের একটি নদীর নাম,গুরিরে হলো ঘুরছে।
আরও পরে (মাটিতে গাছ পুঁতে মাটিকে শক্ত করার যে প্রক্রিয়া তাকে এখানে বলে "বল্লি" মারা) বল্লি মারা,কল বসানোর গান শুনলাম।
লোকেরা ঘুরে ঘুরে গান করে আর বল্লি পুঁতে।
ওরাই গেয়েছিলো," লাউয়া উড়ে আকাশে হাইরকল জ্বলে বাতাসে,ফাম লাইট জ্বলেগো সুন্দর কইন্যার দেশে" " চলছে রণের ঘোড়ারে" " জলমল জলমল করে গো" চাচাজিগো আমারে করাও বিয়া"--- এই গানগুলোর মধ্য থেকে আমি "লাউয়া উড়ে আকাশে" গানটি শিখে নিয়েছিলাম,এ গানটি মূলতঃ আমি প্রথম গাই একটি স্কাউটের অনুষ্ঠানে- অনুষ্ঠানের পর অনেককে কথা লিখে দিতে হয়েছিলো।বহু বছর আমি যেখানেই স্কাউটিং এ বা কোনও ট্রেণিং এ গিয়েছি এই গানটি বার বার গাইতে হয়েছে।
পরে আমি শুনেছি গানটি এখন সারাদেশেই ভুল সুরে,ভুল কথায় স্কাউটিং এর অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়।প্রমাণ পেয়েছি দুইবার আঞ্চলিক কাব ক্যাম্পুরিতে গিয়ে,বিভিন্ন কাব বেসিক প্রশিক্ষণে গিয়ে।
এই যে গানগুলো, এগুলোর সাথে আমাদের নাড়ির সম্পর্ক রয়েছে।এরকম বহু বহু গান সুনামগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যেগুলোর রচয়িতাগণ সুপরিচিত নন।কেউ এগুলোকে সংগ্রহ করেছেন কি না তাও আমি জানি না।
শুধু বৃষ্টি এলে মুষলধারে আমি হাওরের ঢেউয়ের গন্ধ পাই আর গানগুলো কানে বাজতে থাকে," লাগাও বিবির পায়ে আলতা দেখো আয়না দরিরে"
( ধরিরে)।
--২৭/০৬/২০১৯
বিষয়শ্রেণী: প্রবন্ধ
ব্লগটি ৭৬ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৭/০৬/২০১৯

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast