www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

অপ্রকাশিত কিছু ব্যথা

ঘরটা ঘুট ঘুটে আধার কিছুই ঠাওর করা যাচ্ছেনা,কেমন একটা বিশ্রী গন্ধ নাকে আসছে। ফোনটা বের করে লাইট জালাতেই নীরব চিৎকার করে উঠল তুমি যদি মানুষ হও চলে যাও এখান থেকে চলে যাও। নীরবকে চেনাই যাচ্ছেনা চুল দাড়ি দিয়ে মুখ ভর্তি হয়ে গেছে,, কয়েকদিনের খাবার পড়ে থেকে ঘরটাতে বিশ্রী গন্ধ হয়ে গেছে।
আমিঃ নীরব তুই ভয় পাচ্ছিস কেনো রে ভাই,,আমিও তোর মতোই অমানুষ রে। আমার দিকে তাকা একবার।
নীরবঃকে তুই?
আমিঃআমি মৃধা রে তোর বন্ধু ভূলে গেছিস কি আমায়?
নীরবঃ চলে যা এখান থেকে,,চলে যা..

নীরবের ঘর থেকে বের হতে হতে মনে পড়ে যাচ্ছে সেই ভার্সিটি লাইফের কথা,,আমি আমার জীবনে অনেক কে দেখেছি কিন্তু নীরবের মতো এতো হাসি খুশী মানুষ খুব কম দেখেছি। ওর কাছে সাহায্য চেয়ে ফিরে গেছে এমন মানুষ খুব কম ই দেখেছি। সারাটা দিন সবাইকে হাসিতে মাতিয়ে রাখত। আর যাকে তাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস ও করতো.. যদি কেউ ধোকা দিয়ে যেতো বলতো বন্ধু এ দুনিয়া চলেই তো বিশ্বাস এর উপর দু একজন ধোকা দিয়েছে বলে কি সবাই খারাপ?
আজ বেশ অবাক লাগছে সেই ছেলে বলছে মানুষ হলে যেনো তার ঘর ছেড়ে চলে যায়। খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছে এমন কি হলো ওর জীবনে যার জন্য সেই হাসি খুশি মানুষটা আজ এমন হয়ে গেলো। এমন কি হয়েছে যার কারনে ছেলেটা আজ পাগল হলো?

আন্টির কাছে চলে গেলাম জানতে চাইলাম কেনো আজ নীরব বন্দী চার দেওয়ালে..

আন্টিঃ তোমাদের ভার্সিটি শেষ হতেই তুমি চলে গেলে এম এস সি করতে বাইরে,আর নীরব জয়েন করলো (টি এম এস এস) নামের একটা সংস্থায় এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে। ভালোই চলছিলো সব কিছু তোমার আংকেল আমি দুজনেই খুব খুশি ছিলাম ছেলেটাকে নিয়ে। কিন্তু সুখ খুব বেশী দিন সইলো না বাবা সইলো না..
(আন্টি কান্নায় ভেংগে পড়লেন)
আমি বুঝতে পারলাম আন্টির থেকে এ ঘটনা শুনতে গেলে একটু কাঠ খড় পোড়ানো লাগবে তাও সব হয়তো স্পষ্ট জানা যাবেনা এর থেকে নীরবের থেকে শোনার চেস্টা করতে হবে।
আমি আবারো নীরবের ঘরে ঢুকলাম। নীরব আগের মতোই চিল্লাতে শুরু করলো আমি সব উপেক্ষা করে নীরবের কাছে গিয়ে বসতে বসতে বললাম.
আমিঃ তুই হয়তো ক্লান্ত যার কারনে আমাকে ভূলে গেছিস,,আমি কিন্তু মানুষ নৈ পুরোটায় অমানুষ,আর ১০ টা মানুষের মতো হাসতে জানিনা কাদতে জানিনা,,আর ১০ টা মানুষের মতো সব ভূলে যেতে পারিনা..
খেয়াল করলাম নীরব আমার কথা গুলো শুনে এখন আর আগের মতো চেচামেচি করছেনা এক নজরে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চোখের কোনে দু ফোটা অশ্রু ও দেখা যাচ্ছে যা হীরার মতো চমকাচ্ছে।
আমিঃ নীরব আমি যদি তোর চুল আর দাড়ি গুলো একটু ছোট করে দেয় কোনো সমস্যা আছে..
ও কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নেড়ে শাই দিলো.
ইচ্ছা করছিলো সেই আগের মতো দুজনে একসাথে বের হই কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্তেও বের হওয়া গেলো না। তাই নাপিতকে ডেকে এনে নীরবের চুল দাড়ি পরিষ্কার করালাম।
এখন নীরবকে কিছুটা সেই আগের মতো লাগছে। শুধু সর্বদা মুখের কোনে লেগে থাকা হাসিটা নেই।
কিরে ছাদে যাবি আমার সাথে?
নীরব এবার ও মাথা নাড়ল।
আন্টিকে নীরবের ঘরটা পরিষ্কার করে দিতে বলে আমি দুটো চেয়ার আর নীরবকে দিয়ে রওনা হলাম ছাদে....

দুজনে চুপচাপ মুখোমুখি বসে আছি কেউ কোনো কথা নেই। নীরবতা ভেংগে আমিই বলতে শুরু করলাম কিরে তোর এই অবস্থা হলো কি করে?
অনেক বার জিজ্ঞাসা করার পরও নীরব কিছুই বললো না সেদিন। আমিও আর জোর করলাম না। ছাদ থেকে নামিয়ে নীরব কে খাইয়ে দিয়ে বাসায় চলে এলাম। প্রায় ৩ মাস হয়ে গেছে প্রতিদিন নীরবের বাসায় যায় ওর সাথে সময় দেই কখনো কখনো আবার ওদের বাসায় রাতে থেকেও যায় আন্টির জোরাজুরিতে। এই ৩ মাসে বেশ পরিবর্তন এসেছে নীরবের ভীতর, আগে কথা বলতোই না এখন অল্প অল্প কথা বলে চেচামেচি একদম অফ..এরপর আরাও ৩ টি মাস কেটে গেলো,,নীরব এখন পুরো সুস্থ বলা যায়।এতোদিন আমি শুধু অপেক্ষায় ছিলাম ওর এমন হবার পিছনের কাহিনী জানার জন্য..আজ তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে আবারো আমরা ছাদে মুখোমুখি দুজন কিন্তু আজ আমি শ্রোতা আর নীরব বক্তা.......

নীরবঃ তুই তো চলে গেলি,,তোকে বিদায় দিয়ে বাসায় এসে দেখি ফোনে একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এসেছে। ব্যাক করতেই একটা মেয়ে হ্যালো বলে ফোনটা কেটে দিলো। আমিও আর ফোন করার চেস্টা করিনি। তুই যেতেই আমি নিসংগতায় ভুগতে শুরু করলাম। এর মধ্যে আবারো একদিন সেই নাম্বার থেকে ফোন এলো। বেশ কিছু সময় কথা বলার পর জানতে পারলাম মেয়েটা আর কেউ নয় আমাদেরই ক্লাস মেট ছিলো নীলা।

আমিঃ আমাদের নীলা?
নীরবঃহ্যা,,আমাদের নীলা।
আমিঃ তারপর...
নীরবঃ ঐদিন বেশ কথা হলো,,,এর পর থেকেই মাঝে মাঝে আমাকে ফোন দিতো ঘন্টার পর ঘন্টা কথা হতো। এর মধ্যে আমার একটা জব হলো এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে। খবর টা জানার পর থেকে নীলা কেমন জানি আরো বেশী ক্লোজ হবার চেস্টা করতে থাকলো...একসময় হয়েও গেলো। সারা দিনে অফিসে সুজোগ পেলেই ফোন করা,, টেক্সট আদান প্রদান আবার বাসায় এসে মাঝ রাত অব্দি ফোনে কথা বলা..সব ঠিক ঠাক ই চলছিলো। হঠাৎ করেই একদিন নীলা গায়েব হয়ে গেলো ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ভাবে যোগাযোগ করার চেস্টা করে ব্যার্থ হচ্ছিলাম। ৭ দিন পর হঠাৎ একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন জানতে পারলাম নীলার বাসা থেকে নাকি ওর জন্য ছেলে দেখছে বেশ কিছু দিন ধরে। এখন ছেলে পক্ষ নেক্সট উইকে পাকা দেখা দেখতে আসবে। আমার মাথায় বাজ পড়লো। নিজেকে শক্ত করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করবার চেস্টা করতে লাগলাম। কিন্ত পারলাম না শেষ অব্দি নীলাই আমার হাজার খানেক দোষ ধোরল। আর শেষে বলে গেলো আমাকে ছাড়া যেভাবে নিজেকে সাজানো যায় সাজিয়ে নাও।
আচ্ছা তুই ই বল আমি কিভাবে সাজাতাম? ধীরে ধীরে ডিপ্রেশন ভর করলো আমার উপর। কতো দিন কতো রাত না খেয়ে খেয়ে এখানে ওখানে পড়ে রয়েছি তার মনে এতোটুকু মায়া আমার জন্য জন্মাইনি। সে তার ওয়াদা ভূলে গেছে। আমাকে শুধু বলতো আমাকে ছাড়া নাকি বাচবেনা। কিন্ত দেখ সে দিব্বি আছে,আমাকে ঠেলে দিয়ে নরকে।
আমিঃ (নীরবের গল্পটা শুনে অনেক কিছুই মনে পড়ে গেলো। আমি উঠে দাড়াতে দাড়াতে বললাম) এই তাহলে তোর গল্প?
নীরবঃ হু..মায়া বড্ড খারাপ জিনিস না রে দোস্ত?
আমিঃহু খুব খারাপ জিনিস,,এই অনিত্য সংসারে মায়া কাটাতে শেখা অবাঞ্চনিয়।
নীরবঃআচ্ছা দোস্ত তুই কি কখনো দেখেছিস রক্তের আপনজন কেউ মারা গেলে তার আপনজন সুইসাইড করে?.
আমিঃ না,,তবে মায়ার আপনজন গুলো চোখের আড়াল হলেই অনেক কে সুইসাইড করতে বা পাগল হতে দেখেছি...
নীরবঃ তবে তোর বেলায় কোনটা হয়েছে??
আমি ঃ সব বেচে থাকা বেচে থাকা না বন্ধু..
আজ উঠলাম বলেই বের হয়ে এলাম রাস্তায়
এখন সংগী আমার পিচ ঢালা এই রাস্তা,,আর গন্তব্য সে তো বরাবর এর মতোই অজানা......
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৬১ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৯/০২/২০২০

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • বাহ
  • গল্প না ঘটনা?
  • ফয়জুল মহী ০১/০৩/২০২০
    Excellent
  • চমৎকার
 
Quantcast