www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ইসলামের ইতিহাস ও আমাদের মুখোশ

আজকের বাংলাদেশে আমরা যতটা নামাজ দেখি, ততটা নৈতিকতা দেখি না। এ যেন ইসলামের ইতিহাসের ভয়াবহ কিছু অধ্যায় আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে ফিরে আসে। রাসূল ﷺ -এর জামাতা ও তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রাঃ)-এর হত্যাকাণ্ডের ঘটনাই এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। তাঁর বাসভবনকে বিদ্রোহীরা ঘিরে রেখেছিল। তারা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, আজান দিত, আবার একইসঙ্গে খলিফার বাড়িতে পানি-খাবার পৌঁছাতে দিত না। বাইরে থেকে ধার্মিকতার ভান করলেও ভেতরে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করত। হযরত উসমান (রাঃ) চাইলে সাহাবায়ে কেরামদের দিয়ে প্রতিরোধ করাতে পারতেন, কিন্তু তিনি রক্তপাত ঠেকাতে তা অনুমতি দেননি। তিনি ঘরে বসেই কুরআন পড়ছিলেন, আর তখনই বিদ্রোহীরা ঢুকে তাঁকে হত্যা করে। তাঁর রক্ত ঝরে পড়েছিল খোলা কুরআনের আয়াতের ওপর। নামাজ পড়তে পড়তে কেউ যদি এমন অপরাধ করতে পারে, তবে বোঝা যায় নামাজ তার অন্তরে প্রবেশ করেনি।

ইতিহাসের আরেক প্রান্তে আছেন হযরত মু‘আবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)। তিনি ছিলেন রাসূল ﷺ -এর ঘনিষ্ঠ সাহাবি ও ওহী লেখক। অর্থাৎ কুরআনের সংরক্ষণে তিনি প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন। নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ্জ- সব ফরয ইবাদতে তিনি ছিলেন নিয়মিত। কিন্তু রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে ইতিহাসের বিকৃত উপস্থাপন তাঁকে বিতর্কিত করে তোলে। বিশেষ করে কিছু পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে খলনায়ক বানানোর চেষ্টা করেছে, অথচ ইসলামের নির্ভরযোগ্য ইতিহাস সে ধারণাকে সমর্থন করে না।

অন্যদিকে ইয়াজিদ ইবনে মু‘আবিয়া নামাজ পড়ত, রোজা রাখত, হজ্জ করত, যাকাত দিত- তবুও তাঁর শাসনামলেই রাসূল ﷺ - এর প্রিয় নাতি ইমাম হুসাইন (রাঃ) কারবালার ময়দানে শহীদ হলেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে, কেবল নামাজ- রোজা করলেই ঈমান পূর্ণ হয় না, যদি ন্যায়- অন্যায়ের বিচার ভুলে যাওয়া হয়। বাহ্যিক ধার্মিকতার আড়ালে ভণ্ডামি থাকলে তা ইয়াজিদের পথ ছাড়া কিছু নয়।

রাসূল ﷺ এক হাদিসে এমন একটি দলের কথা বলেছেন- যারা কুরআনের আয়াত মুখস্থ করবে, কিন্তু তা তাদের অন্তরে প্রবেশ করবে না। তারা বাহ্যিকভাবে ধার্মিকতার ভান করবে, কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে তলোয়ার তুলবে। তারা নামাজ, রোজা করবে, অথচ মুসলমানদের হত্যা করবে সহজ মনে। আজকের সমাজে তাকালেই আমরা দেখি, এই হাদিস যেন বর্তমানের জন্যও এক সতর্কবার্তা।

সমস্যা হচ্ছে, আমরা ইসলামের প্রকৃত ইতিহাস জানি না বা জানতে চাই না। বাংলাদেশের অনেক লেখক- প্রচারক ইতিহাস বিকৃত করে মানুষকে ভ্রান্ত করছে, কারণ তাদের জন্য ধর্ম জীবিকার হাতিয়ার। অথচ সঠিক ইতিহাস জানতে হলে আমাদের মধ্যপ্রাচ্যের নির্ভরযোগ্য ইসলামি আলেমদের রচনা পড়তে হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, নামাজ আমাদের কী শেখায়? নামাজ মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায়, অন্যকে আঘাত না করতে শেখায়, কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে, ধনী- গরিব সবাইকে একই কাতারে দাঁড় করায়। কিন্তু আমরা কি সেই শিক্ষা গ্রহণ করছি? আজ আমরা নামাজ পড়ি, অথচ মুখে বিষ ছড়াই। নামাজ পড়ি, অথচ অন্যকে প্রতারণা করি, গীবত করি, হেয় করি, সমাজে দাপট দেখাই। নামাজ পড়ি, অথচ চরিত্রে কোনো পরিবর্তন আসে না।

তাহলে আমাদের নামাজ কিসের জন্য? আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি লোক দেখানোর জন্য? নামাজ যদি নৈতিক পরিবর্তন না আনে, জিহ্বাকে শিষ্ট না করে, চরিত্রকে সৎ না করে, তবে তা আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার মতো নামাজ নয়। সেটা কেবল ভণ্ডামীর আড়ালে লুকানো নামাজ।

আজকের সমাজে অসংখ্য নামাজি থাকলেও কেন নৈতিক মানুষ কম? কেন নামাজ পড়েও মানুষ মিথ্যা বলে, অন্যের হক নষ্ট করে, প্রতারণা করে? এর উত্তর স্পষ্ট- আমাদের নামাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়, বরং সামাজিক পরিচয় ও ভণ্ডামীর জন্য।

অতএব, নামাজকে বাহ্যিক প্রদর্শনের হাতিয়ার না বানিয়ে আমাদের জীবনের পরিবর্তনের হাতিয়ার বানাতে হবে। অন্যথায় আমরা সেই বিদ্রোহীদের মতো হয়ে যাব, যারা নামাজ পড়েও খলিফাকে হত্যা করেছিল, বা সেই ইয়াজিদের মতো, যে নামাজ পড়েও নবীর দৌহিত্রকে শহীদ করেছিল।
বিষয়শ্রেণী: প্রবন্ধ
ব্লগটি ৮৫ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৬/০৮/২০২৫

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast