স্বর্ণমুকুট (গোয়েন্দা গল্প-২)
দুই
মেইল পড়ে আবেগে আপ্লূত হলেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম। এই তো একটু আগে ভাবছিলেন সিলেট সফরের ব্যাপারে; ভাবছিলেন মোল্লা মাছুম ও মুহাম্মদ আলীর সাথে দেখা করার কথা। এ-যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টির কারবার! কিন্তু ততক্ষণে ভাবুক মনে ভাবনার উদ্রেক হয়েছে। এই যাওয়া তো শুধু আনন্দের জন্য যাওয়া নয়। যেতে হবে কাজের জন্য। তাছাড়া কাজের তো দুটি দিক থাকে, সফলতা-ব্যর্থতা! তার জীবনে অবশ্য ব্যর্থতা বলে কোন শব্দ নেই। জীবনের সকল কাজেই তিনি সফল হয়েছেন। আর তার এই সফলতার পিছনেও একটি বড় কারণ নিহিত আছে। সফলতা সম্পর্কে জীবনে তিনি অনেক মনিষীর গ্রন্থ অধ্যয়ন করেছেন। নোট করেছেন বিভিন্ন মনিষীর উক্তি। এই সকল অধ্যয়ন ও উক্তির সার নির্যাস বের করেছেন তিনটি। যথা: ১. পরিশ্রম করো সফল হও, ২. নিজের ও অন্যের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সফলতা অর্জন করো এবং ৩. আত্মবিশ্বাসী হয়ে পরিশ্রম করো তাতে নিশ্চয়ই সফল হবে।
যেমন: এরিস্টটল বলেন, “ব্যর্থ হওয়ার নানা উপায় আছে, কিন্তু সফল হওয়ার উপায় একটাই”। এরিস্টটল উক্ত বাণীতে সফলতার উপায় উহ্য রেখে তার গুরুত্বারোপ করেছেন। আর সেই উপায়টি হচ্ছে পরিশ্রম।
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেন, “আমাকে আমার সফলতা দ্বারা বিচার করোনা; ব্যর্থতা থেকে কতবার আমি ঘুরে দাড়িয়েছি তা দিয়ে আমাকে বিচার করো”। এর দ্বারা তিনি নিজের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সফলতা অর্জনের কথা ব্যক্ত করেছেন। আর প্রত্যেককে তার নিজের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সফলতা অর্জনের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। মার্ক জাকারবার্গ বলেছেন, “কেউ কেউ খুব স্মার্ট কিংবা দক্ষ হতে পারে, কিন্তু তারা যদি তাতে বিশ্বাস না রাখে, তাহলে তারা কঠোর পরিশ্রমে আগ্রহী হয় না”। এখানে জাকারবার্গ আত্মবিশ্বাসী হওয়ার ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করেছেন। অর্থাৎ আত্মবিশ্বাসী হলে কঠোর পরিশ্রম করা সম্ভব এবং কঠোর পরিশ্রম দ্বারা সফল হওয়া সম্ভব। হনেরি অস্টনি বলেন, “সফলতা লাভ করার গোপন কথাটি তারাই জানে, যারা ব্যর্থতা লাভ করেছে”। এখানে হনেরি অস্টিনও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সফল হওয়ার বুলি ব্যক্ত করেছেন। জন গ্যা বলেন, “সংসয় যেখানে থাকে, সাফল্য সেখানে ধীর পদক্ষেপে আসে”। আত্মবিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে এখানেও। টমাস হ্যাবি বলেন, “সফলতা কখনও অন্ধ হয় না”। এর দ্বারা টমাস হ্যাবিও পরিশ্রমের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। অর্থাৎ বলতে চেয়েছেন; পরিশ্রম ব্যতীত সফলতা লাভ করা অসম্ভব। এডমন্ড রসট্যান্ড বলেন, “একমাত্র নিশ্চুপ লোকই তার সফলতা দিয়ে তাক লাগিয়ে দিতে পারে”। এখানে এডমন্ড রসট্যান্ড একজন পরিশ্রমহীন ব্যক্তির সফল হওয়ার খবরে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার সাধারণত্ব ব্যক্ত করেছেন। ফ্রান্সিস বলেছেন; “একজনের ব্যর্থতাই অন্যের সফলতার সোপান”। এখানে ফ্রান্সিস বেকন একজনের ব্যর্থতাকে অন্যজনের সফলতার শিক্ষা হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
“যেখানে পরিশ্রম নেই সেখানে সাফল্য নেই” বলেছেন উইলিয়াম ল্যাঙ্গলেট। এসব বিজ্ঞ বচন বিশ্লেষণ করলে, করনীয় শুধু ‘পরিশ্রম’। এছাড়া আত্মবিশ্বাস ও ব্যর্থতা থেকে নেয়া শিক্ষা কোন করনীয় বিষয় নয়। কেননা আত্মবিশ্বাস মনস্তাত্ত্বিক বিষয়, যা কখনও কোন করনীয় কাজ হতে পারে না। আর ব্যর্থতা থেকে নেয়া শিক্ষা তো নেতিবাচক। কেননা যখন কোন কর্ম সম্পাদনে একজন ব্যক্তি ব্যর্থ হয়; তখন দর্শনার্থী ব্যক্তির শিক্ষা হলো; ঐ ব্যক্তি কাজটি যে পদ্ধতিতে করেছে সে পদ্ধতিতে কাজটি করা সম্ভব নয়। সুতরাং দর্শনার্থীর উচিৎ সেই পদ্ধতি পরিহার করা। আর পরিহার করা কোন কাজ না হওয়ায় সেটি নেতিবাচক। অতএব প্রমাণিত হলো; সফলতা অর্জনের জন্য একমাত্র করনীয় কাজ হলো পরিশ্রম।
এখন প্রশ্ন হলো কী পরিমাণ পরিশ্রম করলে কোন কাজে শতভাগ সফল হওয়া সম্ভব? আর এই একই প্রশ্ন একজন যুবক করেছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটলকে! এরিস্টটল সেই যুবককে বলেছিলেন পর দিন নদীর পারে দেখা করতে। সে পরদিন দেখা করেছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটলের সাথে কোন এক নদীর তীরে। তাকে নিয়ে তিনি পানিতে নামলেন। ডোব দিতে বললেন। সে তাই করলো। ডোবে থাকা যুবকের মাথায় তিনি শক্ত করে ধরে রাখলেন যাতে সে উঠতে না পারে। যুবক পানি থেকে উঠার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করছিল তার প্রাণ রক্ষার্থে। তিনিও তাকে পানির নিচে রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত যুবক সফল হয় এবং পানি থেকে উঠে নিশ্বাস গ্রহণ করে। যুবক বলল; আপনিতো আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রাণনাশ করতে যাচ্ছেন! এরিস্টটল বললেন; আমি তোমার উত্তরই দিয়েছি বৎস! তুমি যখন পানির নিচে ছিলে তখন তোমার খুবই প্রয়োজন ছিল অক্সিজেনের, যা পানির নিচে দূর্লভ। তাই তুমি চেয়েছিলে পানির উপরে উঠতে আর সর্বশক্তি ব্যয় করে পরিশ্রমও করছিলে, যার কারণে সফল হয়েছ। তেমনি ভাবে সফলতা অর্জনের জন্য পরিশ্রমে তোমার সর্বশক্তি ব্যয় করতে হবে, তবেই তুমি শতভাগ সফল হতে পারবে। যুবকটি তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে চলে যায়। আর শিক্ষা রেখে যায় পরবর্তী মানবকুলের জন্য।
এসব পাঠ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম। তাই তার পরিশ্রমের ফলশ্রুতিতে কখনও ব্যর্থতার ঘাঁটা পোহাতে হয়নি।
নিস্তব্ধ আনমনে ভাবনার জগতে ভাসছেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম। ভাবছেন কিভাবে কী করবেন! হঠাৎ স্মরণ হলো নূমান মুরসালিনের কথা। বইয়ের পোকা হিসেবে সকলে যাকে চিনে। গোয়েন্দা প্রধানের এক বছরের সিনিয়র তিনি। একই স্কুলে লেখা-পড়া উনাদের। নূমান বাবা-মা'র একমাত্র সন্তান। বাবা সাইদুর রহমান সাহেব সচিবালয়ে চাকুরী করেন আর মা রাজিয়া খানম ঢাকার একটি সরকারি মহিলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল। সাইদুর রহমান সাহেব সচিবালয়ে চাকুরী করলেও অত্যন্ত সৎ ব্যক্তি। ধর্মীয় প্রত্যেকটি বিষয় তিনি খুবই গুরুত্বের সাথে পালন করেন। মা রাজিয়া খানমও ধর্মীয় ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। পর্দার বিধানের ক্ষেত্রেও তার কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় না। তিনি তার কলেজের ছাত্রীদের পর্দা মেনে চলার ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি তো নিয়মিত ছাত্রীদের বিভিন্ন বিষয়ে নসিহতও করে থাকেন। একদা তিনি তার কলেজের ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বললেন; প্রিয় বোনেরা! তোমার পর্দা পালনের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো! আমি বলছি না তোমরা ঘরে বন্দি হয়ে যাও। আবার এটাও বলছি না যে, তোমরা অশালীন ভাবে রাস্তায় বেরিয়ে পড়। বরং প্রয়োজন সাপেক্ষে বাহিরে বেরোলে আল্লাহর হুকুম পালন করে বের হও। আল্লাহ পাক বলেন; হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্যান্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তাহলে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর তথা স্বাভাবিকভাবে কথা বল। সুরা আহযাব-৩২
এই আয়াতে আল্লাহ পাক পরপুরুষের সাথে প্রয়োজন সাপেক্ষে কথা বলার দরকার হলে কিভাবে কথা বলতে হবে তার শিক্ষা দিয়েছেন। প্রথমত আল্লাহ বলেন, তোমাদের বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা সাধারণ নারীদের মত নয়; বরং আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে রসূল-পত্নী হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছেন, যার ফলে তোমরা এক উচ্চস্থান ও মর্যাদার অধিকারিণী। তাই রসূল (সাঃ)-এর মত তোমাদেরকেও উম্মতের জন্য আদর্শবতী হতে হবে। এখানে নবী-পত্নীগণকে তাঁদের উচ্চস্থান ও মর্যাদার কথা স্মরণ করে দিয়ে তাঁদেরকে কিছু নির্দেশ দান করা হয়েছে। এ সব নির্দেশাবলীতে সম্বোধন যদিও পবিত্রা স্ত্রীগণকে করা হয়েছে, যাঁদের প্রত্যেককে ‘উম্মুল মু’মিনীন বলা হয়েছে, তবুও বর্ণনা ভঙ্গীতে প্রকাশ পাচ্ছে যে, উদ্দেশ্য সমগ্র মুসলিম নারী। সকল মুসলিম নারীদের সতর্ক করা ও তাদের মর্যাদা বোঝানোর জন্য আল্লাহ পাক এই আয়াত নাজিল করেছেন। অতএব উক্ত নির্দেশ সমগ্র মুসলিম নারীর জন্য মান্য করা ও পালন করা অত্যাবশ্যক।
দ্বিতীয় বিষয় হলো; আল্লাহ তাআলা যেরূপভাবে নারী জাতির দেহ-বৈচিত্রে পুরুষের জন্য যৌন আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন, অনুরূপভাবে তিনি নারীদের কণ্ঠস্বরেও প্রকৃতিগতভাবে মন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা, কোমলতা ও মধুরতা দিয়ে আকর্ষিত করছেন, যা পুরুষকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে থাকে। সুতরাং সেই কণ্ঠস্বর ব্যবহার করার ব্যাপারেও এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, পরপুরুষের সাথে বাক্যালাপের সময় ইচ্ছাপূর্বক এমন কণ্ঠ ব্যবহার করবে, যাতে কোমলতা ও মধুরতার পরিবর্তে সামান্য শক্ত ও কঠোরতা মিশ্রিত থাকে। যাতে ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরবিশিষ্ট লোক কণ্ঠের কোমলতার কারণে তোমাদের দিকে আকৃষ্ট না হয়ে পড়ে এবং তাদের মনে কুবাসনার সঞ্চার না হয়।
তৃতীয় বিষয় হলো; এই কর্কশতা ও কঠোরতা শুধু কণ্ঠস্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ মুখে এমন বাক্য আনবে না, যা অসঙ্গত ও সচ্চরিত্রতার পরিপন্থী। "যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো" বলে আল্লাহ তাআলা ইঙ্গিত করেছেন যে, এই নির্দেশ এবং অন্যান্য নির্দেশাবলী যা সামনে বর্ণিত হবে, তা যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্য। কারণ তারাই ভয় করে যে, যাতে তাদের আখেরাত নষ্ট হয়ে না যায়। পক্ষান্তরে যাদের হৃদয় আল্লাহর ভয়শূন্য তাদের সাথে এই নির্দেশাবলীর কোন সম্পর্ক নেই। তারা কখনোও এর পরোয়া করবে না।
মূমীন নারীদের মর্যাদা ও তাদের কথা বলার ধরন কী হওয়া উচিৎ তা বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। হে নবী পরিবার, আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।" সুরা আহযাব-৩৩
এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, নারীর আসল অবস্থানক্ষেত্র হচ্ছে তার গৃহ। কেবলমাত্র প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সে গৃহের বাইরে বের হতে পারে। [ইবন কাসীর] আয়াতের শব্দাবলী থেকেও এ অর্থ প্রকাশ হচ্ছে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস একে আরো সুস্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। রাসুল (সাঃ) বলেন, মুজাহিদ তো তখনই স্থিরচিত্তে আল্লাহর পথে লড়াই করতে পারবে যখন নিজের ঘরের দিক থেকে সে পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে, তার স্ত্রী তার গৃহস্থালী ও সন্তানদেরকে আগলে রাখবে এবং তার অবর্তমানে তার স্ত্রী কোন অঘটন ঘটাবে না, এ ব্যাপারে সে পুরোপুরি আশংকামুক্ত থাকবে। যে স্ত্রী তার স্বামীকে এ নিশ্চিন্ততা দান করবে; সে ঘরে বসেও তার জিহাদে পুরোপুরি অংশীদার হবে। অন্য একটি হাদীসে এসেছে, “নারী পৰ্দাবৃত থাকার জিনিষ। যখন সে বের হয় শয়তান তার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে এবং তখনই সে আল্লাহর রহমতের নিকটতর হয় যখন সে নিজের গৃহে অবস্থান করে।” সুতরাং তোমরা যেহেতু মেয়ে হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছ সেহেতু তোমাদের উচিৎ নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করা। এভাবে তিনি তার কলেজের ছাত্রীদের ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞাত করেন।
বিধাতা যেন মা-বাবার মনের মত করে পাঠিয়েছেন নূমান মুরসালিনকে। রাত-দিন শুধু পড়া আর পড়া। পড়া ছাড়া যেন তার কিছুই ভালো লাগেনা। এমন সন্তান কয়জনেরইবা ভাগ্যে জোটে? তাই নূমানের উপর খুবই সন্তুষ্ট তার মা বাবা। নূমানের রিডিং রুম যেন একটি লাইব্রেরি। সাইদুর রহমান সাহেবের সম্পর্ক রয়েছে রাজধানীর উল্লেখযোগ্য সবকয়টি প্রকাশনীর সাথে। নূমানের পড়ার উপযোগী কোন নতুন বই প্রকাশিত হলে পাঠিয়ে দেয়ার কথা রয়েছে প্রত্যেকটি প্রকাশনীর কতৃপক্ষের সাথে। কথা অনুযায়ী তারা বই দিয়ে বিল নিয়ে যায়। এভাবে সাইদুর রহমান সাহেব ও রাজিয়া খানমের বেতনের বেশির ভাগ টাকা ছেলের বই কিনতেই খরচ হয়ে যায়। তবু্ও তারা অখুশি নয়। সন্তুষ্ট তাদের ছেলের উপর।
গোয়েন্দা প্রধানের মনে হলো এই বিষয়ের বই নূমান ভাইয়া ছাড়া আর কারো কাছে পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই তার কাছেই খুঁজে দেখতে হবে। মোবাইল হাতে নিলেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম; কল করলেন নূমান মুরসালিনকে।
--আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ! ভাইয়া, কেমন আছেন? সালাম দিয়ে কোশল বিনিময় করলেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম।
--ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ, নিশ্চয়ই ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? সালামের জবাব দিয়ে পাল্টা কোশল জিজ্ঞেস করলেন নূমান মুরসালিন।
--জী ভাইয়া আলহামদুলিল্লাহ! ভালো আছি; বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
--কী ব্যাপার এতো রাতে! কোন জরুরি কথা মনে হচ্ছে? প্রশ্ন ছোড়লেন নূমান মুরসালিন।
--জী ভাইয়া একটি জরুরি বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি। আপনার কাছে কি জৈন্তার স্বর্ণমুকুট ব্যাপারে কোন বই আছে? পাল্টা প্রশ্ন গোয়েন্দা প্রধানের।
--কী গোয়েন্দা প্রধান! নতুন কোন মিশনে নামছ নাতো? ভনিতা করে জিজ্ঞেস করলেন নূমান মুরসালিন।
--হ্যাঁ ভাইয়া! সে জন্যই তো প্রয়োজন; বললেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম।
--বই আছে, তবে এগুলো তো বর্তমানে নিষিদ্ধ, তাই খুব সতর্কতার সাথে রাখতে হবে; বললেন নূমান মুরসালিন।
--ইনশাআল্লাহ! তাই হবে ভাইয়া। তাহলে আগামীকাল সকালেই আসছি আমি বই নিতে। ভালো কাটুক আপনার রাত। আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ; সালাম বিনিময় করে বিদায় নিলেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম।
--ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ; সালামের জবাব দিয়ে মোবাইল রেখে দিলেন নূমান মুরসালিন।
মোবাইল রেখে প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিলেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম। কারণ তার মনে হয়েছিল এই সম্পর্কে বই সংগ্রহ করা দুরূহ ব্যাপার। সেই দুঃসাধ্য কাজ যেহেতু সহজে সম্পাদিত হয়েগেছে তাহলে আর কোন বাধাই যেন তাকে ঠেকাতে পারবেনা। দেয়ালে আটকে রাখা ঘড়ির দিকে তাকালেন গোয়েন্দা প্রধান। রাত অনেক হয়েগেছে, ১২টা বেজে ৩৫ মিনিট। সাধারণত এত রাত পর্যন্ত অফিসে থাকার অভ্যাস নেই। আজ একটু ব্যতিক্রম হয়েছে বেশি কাজের চাপ থাকায়। গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদও অনেক আগে বিদায় নিয় চলে গেছেন। বাসায় নাকি তার আম্মু অসুস্থ। সব কিছু গোছগাছ করে বসা থেকে উঠে দাড়ালেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম। অফিস বন্ধ করে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। অফিস থেকে পূর্ব দিকে তার বাসার দূরত্ব মাত্র তিন থেকে চার মিনিটের পায়ে হাঁটার পথ। বাসায় প্রবেশ করে আর কোন কাজ না দুই রাকাত সালাতুল হাজত আদায় করে দ্রুত শুয়ে পড়লেন তিনি। তিনি কোন কাজ হাতে নিলে প্রথমে সালাতুল হাজত আদায় করে আল্লাহর সাহায্য কামনা করেন। এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি আজও। ঘুমের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করলেন নির্জন একটি গুহার সামনে।একজন দরবেশ গুহার ওপাশে দাড়িয়ে আছেন। কাঁধকাটা সাদা চুল আর লম্বা দাড়ি, ওষ্ঠ বেয়ে দাড়ির সাথে মিলিত হয়েছে গুম্ফ রাশি, মাথায় পাগড়ি, হাতে লাঠি আর পরিহিত সাদা জোব্বায় তাকে লাগছে একজন অসাধারণ মহা মানবের মত।
--আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ; সালাম জানালেন গোয়েন্দা প্রধান।
--ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ; সালামের উত্তরের মাধ্যমে মুখ খুললেন দরবেশ। বৎস! তুমি এক কঠিন কাজে হাত দিচ্ছো। এতদিন কাজ করেছ তুমি মানবের সাথে, তাই তুমি সফল হতে তেমন বেগ পোহাতে হয়নি। এখন দানবের কাজ হাতে নিয়েছো। সফল হতে তোমায় অনেক সঙ্কট পোহাতে হবে। কী? পারবে তো?
-- কী এমন কাজ হাতে নিয়েছি! কোন কাজের কথাইবা বলছেন উনি? এমন সব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো গোয়েন্দা প্রধানের মনে। ভাবনায় বাঁধা ফেললেন দরবেশ।
--কী বৎস? কী এতো ভাবছো? কোন কাজের কথা বলছি তাই তো? শোন! তুমি যেই স্বর্ণ মুকুটের কথা ভাবছ সেই স্বর্ণ মুকুট এখন দানব তথা জিনদের হস্তগত। এটা এখন আর কোন মানব সন্তানের হাতে নয়। তবে এটা যেহেতু মানুষের সম্পদ তাই জীনেরা এটা নিজেদের কাছে রাখতেও চায় না। কিন্তু এটা দেবে কার কাছে? যাদেরকে ওরা বিশ্বাস করে তারা নিতে চায় না। আর যারা নিতে চায় তাদেরকে ওরা বিশ্বাস করে না। আমার বিশ্বাস তুমি পারবে এই স্বর্ণ মুকুট উদ্ধার করতে। তাই কিছু পরামর্শ দিতে তোমার সাথে সাক্ষাৎ দিলাম। শোন ওহে বৎস! তুমি আগামীকাল নূমান মুরসালিনের কাছে যাচ্ছো না? স্বর্ণ মুকুট সম্পর্কিত বই আনতে? হ্যাঁ! ওর কাছে জৈন্তার সেই স্বর্ণ মুকুট সম্পর্কিত বেশ কিছু বই আছে, যেগুলো তোমাকে সে সম্পর্কে ধারণা দিবে। তবে ব্যাপার হলো তোমাকে এই বইগুলো থেকে আরো একটি বইয়ের সন্ধান বের করতে হবে, যেটি কোন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়নি। বরং অপ্রকাশিত রয়েছে সেই বইটি। তুমি সেই বইয়ের সন্ধান বের কর। তবেই তুমি স্বর্ণ মুকুট উদ্ধার করতে পারবে। নতুবা জানও খোয়া যেতে পারে বৎস! চেচিয়ে উঠলেন দরবেশ।
--এতোক্ষণে মুখ খুললেন গোয়েন্দা প্রধান; আমি কি একটি বিষয় জানতে পারি হুজুর? জিজ্ঞেস করলেন গোয়েন্দা প্রধান।
--নির্ভয়ে বলতে পারো, হে বৎস; বললেন দরবেশ।
--বইটি সম্পর্কে কিছু…… বলে থেমে গেলেন আনজুম আসলাম।
--হ্যাঁ! উনার, মানে ঐ পাহাড়ে যিনি থাকতেন তাঁর শিষ্যদের তালাশ করো………… কথা শেষ করার আগেই মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ভেসে এলো ফজরের আযান। ঘুম ভেঙে গেল গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলামের। ততক্ষণে নিজেকে আবিষ্কার করলেন বিছানায়। তাহলে স্বপ্ন ছিল? ভাবুক মনে ভাবনার উদ্রেক হলো আনজুম আসলামের।
যুগযুগ ধরে স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে গেছেন দার্শনিক ও বিজ্ঞজনেরা। এসব বক্তব্যে স্বপ্নকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দৃঢ় সংকল্প ও কল্পনার সাথে সম্পর্ক যুক্ত করেছেন তারা। কেউ কেউ বলেছেন; স্বপ্ন হলো ধারাবাহিক কতগুলো ছবি ও আবেগের সমষ্টি। মেসোপোটেমিয়ার লোকদের বিশ্বাস ছিল, আত্মার কিছু অংশ ঘুমন্ত ব্যক্তি থেকে বেরিয়ে ঘুরাঘুরি করে। আত্মার এই অংশটি প্রকৃতপক্ষে যে সব স্থানে ঘুরে বেড়ায় এবং যে সকল ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের সাথে সাক্ষাৎ করে স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যক্তি তাই অনুভব করে। এটাই তার স্বপ্ন বলে বিবেচনা করা হয়। কখনো কখনো স্বপ্নের দেবতারা স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যক্তিদের বহন করতে বলে।
প্রাচীন মিশরীয়রা তাদের স্বপ্নগুলোকে স্বপ্ন দেবতা থেকে বার্তা নিয়ে আসে বলে মনে করত। ইসলাম ধর্মে স্বপ্ন সম্পর্কে তালাশ করলে পাওয়া যায়, সর্বশেষ ঐশী বাণী আল কুরআনেও বিভিন্ন জনের স্বপ্নের বর্ণনা রয়েছে। যেমন আল কুরআনের সূরা ইউসুফের চার নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে; “যখন ইউসুফ তাঁর পিতাকে বললেন, আব্বা! আমি স্বপ্নে দেখেছি এগারটি নক্ষত্র, সূর্য এবং চন্দ্র তারা আমার উদ্দেশ্যে সেজদা করছে”।
সুরা ইউসুফের ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে; তাঁর (ইউসুফের) সাথে কারাগারে দুইজন যুবক প্রবেশ করল। তাদের একজন বলল; আমি স্বপ্নে দেখলাম যে মদ নিঙড়াচ্ছি। অপরজন বলল; আমি স্বপ্নে দেখলাম, নিজ মাথায় রুটি বহন করছি আর তথা থেকে পাখি ঠুকরিয়ে খাচ্ছে। আমাদেরকে এর ব্যাখ্যা বলুন। আমরা আপনাকে সৎকর্মশীল দেখতে পাচ্ছি। এর জবাবে ইউসুফ যা বলেছিলেন তা উক্ত সূরার ৪১ নম্বর আয়াতে বিবৃত হয়েছে। (তিনি বললেন) হে কারাগারের সঙ্গীরা! তোমাদের একজন আপন প্রভুকে মদ্যপান করাবে এবং দ্বিতীয়জনকে শুলে চড়ানো হবে। অতপর তার মস্তক থেকে পাখি আহার করবে। তোমরা যে বিষয়ে জানার আগ্রহী তার সিদ্ধান্ত হয়েগেছে।
এই সব আয়াত ছাড়াও আরো অনেক আয়াত ও হাদিসে স্বপ্নের মাধ্যমে স্রষ্টা কর্তৃক প্রদত্ত সতর্কবাণী, অগ্রীম সুসংবাদ বা দিক নির্দেশনা প্রদানের প্রমাণ পাওয়া যায়।
মুসলিম শাস্ত্রজ্ঞগণ বলেন, জগতে অস্তিত্ব লাভের লাভের পূর্বে প্রত্যেক বস্তুর একটি বিশেষ আকৃতি উপমা জগতে বিদ্যমান থাকে, তেমনি অবস্তুবাচক বিষয়াদিরও বিশেষ আকার আকৃতি বিদ্যমান থাকে। নিদ্রারত অবস্থায় মানুষের আত্মা যখন বাহ্যিক দেহের ক্রিয়াকর্ম থেকে মুক্ত হয়ে পড়ে তখন মাঝে মাঝে উপমা জগতের সাথে তার সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায় এবং সেখানকার আকার আকৃতি সে দেখতে পায়। এছাড়া এসব আকার আকৃতি অদৃশ্য জগত থেকে দেখানো হয়। মাঝে মাঝে এগুলোতেও এমন সব উপসর্গ সৃষ্টি হয়ে যায় যে, আসল সত্যের সাথে কিছু অবাস্তব কল্পনাও মিশ্রিত হয়ে পড়ে। একারণে কোন কোন স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার কোন কোন সময় উক্ত আকার আকৃতি উপসর্গ থেকে মুক্ত থাকে। তখন সেটি হয় সত্য স্বপ্ন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তারা স্বপ্নকে তিন প্রকারে বিভক্ত করেন। যথাঃ ১. সত্য স্বপ্ন, ২. কাল্পনিক স্বপ্ন ও ৩. শয়তানী স্বপ্ন। এরমধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রকার স্বপ্নের কোন বাস্তবতা নেই এবং না এর কোন ব্যাখ্যা আছে।
গোয়েন্দা প্রধানের মনে হলো এটা স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রদত্ত নির্দেশনা। বিছানা থেকে উঠে অযু করে ফজরের দু'রাকাত সুন্নত পড়লেন তিনি। এরপর বাসা থেকে বেরিয়ে পায়চারি করলেন মসজিদের দিকে। ফজরের নামাজের পর সুরা ইয়া-সিন পাঠ করতঃ কিছু সময় হাঁটা তার প্রতিদিনের রুটিন। কাক ডাকা ভোরে ব্যস্ত শহরের ফাঁকা রাস্তাগুলোতে হাঁটতে তার দারূণ লাগে। তবে কষ্ট লাগে শীতের সকালে যখন পাতলা চাদর গায়ে মুড়িয়ে রাস্তার পাশে কাউকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। তখন নিজেকে খুব বেশি অপরাধী মনে হয় গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলামের। প্রতিদিনের মত ফজরের নামাজ আদায় করে সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করতে করতে যাত্রা শুরু করলেন নূমান মুরসালিনের বাসার দিকে। নিয়ে আসলেন জৈন্তার স্বর্ণ মুকুট সম্পর্কিত তিন খানা বই। ঘরে ফিরই শুরু করলেন অধ্যয়ন। নামায আর খাবার-দাবার ছাড়া দিনের বাকি সময় কাটিয়েছেন অধ্যয়নে। মাগরিবের পূর্বে পাঠ করা শেষ হয়েছে একটি বই। তাও সবচেয়ে বড় বইটি শেষ হয়েছে প্রথমে। ছোট দুইটি বই বাকি আছে। এগুলোও রাতের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। মাগরিবের নামায আদায় করে ধিরে ধিরে অফিসে চলে গেলেন। অবশ্য এরই মধ্যে অফিসে উপস্থিত হয়েছেন গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদ। তিনি এসে কল করেছেন ইফতি হাসানকেও। কিছুক্ষণের মধ্যে আশা করা যায় ইফতি হাসানও এসে উপস্থিত হবেন। গোয়েন্দা প্রধান সালাম বিনিময় করে অফিসে প্রবেশ করলেন। নিজ কক্ষে প্রবেশ করে আসন গ্রহণ করতেই আগমন করলেন ইফতি হাসান, সাথে আছেন মোল্লা মামুন। মোল্লা মামুনের দূরসম্পর্কের ছোট ভাই জামান মাহমুদ, অত্যন্ত মেধাবী, সাহসী ও দুর্দান্ত ছেলে। আবেদনের প্রেক্ষিতে কিছু দিন আগে গোয়েন্দা টিমের সদস্য হয়েছেন জামান মাহমুদ।
--জামান মাহমুদকে কল দিয়ে আসতে বলুন; মোল্লা মামুনকে উদ্দেশ্য করে বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
মোল্লা মামুন কল দিলেন জামান মাহমুদকে। গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম, ইফতি হাসানকে বললেন হলরুমে বসার ব্যবস্থা করতে। তা করতে লাগলেন ইফতি হাসান। গোয়েন্দা প্রধান বাসা থেকে সাথে নিয়ে আসা জৈন্তার স্বর্ণ মুকুট সম্পর্কিত বই একটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। সচিব কক্ষে বসে আসেন রিফাত মাহমুদ ও মোল্লা মামুন। গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদের মনযোগ কম্পিউটারে। ডান হাতে মাউস নিয়ে অপলকে নজর নিক্ষেপ করছেন মনিটরের স্ক্রীনে। ডান হাতের আঙুলগুলো একটুখানি নড়াচড়া না করলে অপরিচিত যে কেউ মুর্তি ভেবে ভুল করত। ইফতি হাসান হল রুমে বসার ব্যবস্থা করে ফিরে এসে বসেছেন মোল্লা মামুনের কাছে। নিচু সুরে গল্প-গোজবে মেতে উঠেছেন ইফতি হাসান ও মোল্লা মামুন। এমন সময় সালাম বিনিময় করে অফিসে প্রবেশ করলেন জামান মাহমুদ। সালামের জবাব দিয়ে বসতে বললেন মোল্লা মামুন। ততক্ষণে গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদের মনযোগ কেড়েছেন জামান মাহমুদ।
--আরে জামান মাহমুদ ভাই! কেমন আছেন? উৎফুল্ল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদ।
--আলহামদুলিল্লাহ ভাইয়া! ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন তো?
--আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি! সবাই যখন উপস্থিত, তাহলে চলেন গোয়েন্দা প্রধানকে নিয়ে হল রুমে আসুন; বলে উঠে দাড়ালেন গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদ।
ইফতি হাসান উঠে দাড়ালেন, চলে গেলেন গোয়েন্দা প্রধানের কক্ষের দিকে। দরজায় দাড়িয়ে সালাম দিলেন।
আনজুম আসলাম তার কক্ষে বসে স্বর্ণমুকুট সম্পর্কিত শেষ বইটি পড়ছিলেন।
ইফতি হাসানের সালামের জবাব দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, সবাই চলে আসছেন?
--'জ্বী, সবাই চলে আসছেন' বললেন ইফতি হাসান।
--ঠিক আছে, মিলনায়তনে যান আমিও চলে আসছি; বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
কিছুটা তাড়াহুড়ো করে গোয়েন্দা প্রধান তার হাতে থাকা বইটি পড়া শেষ করলেন। এবং কিছুক্ষণের মধ্যে মিলনায়তনে প্রবেশ করলেন। বড় টেবিল ঘিরে বসার পর যেন আলোচনার গুরুত্ব আরও বেড়ে গেল।
গোয়েন্দা প্রধান জৈন্তিয়া রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী এই স্বর্ণমুকুটের বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরলেন। এবং জানালেন এটি উদ্ধার করতে অভিযানে নামতে হবে। তখন আলোচনার মোড় ঘুরল তাদের যাত্রার প্রস্তুতির দিকে। ঠিক তখনই রিফাত এক ধরনের গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “আমাদের জন্য বিশেষ একটি যান প্রস্তুত আছে- ‘র্র্যাপিড কার’।” কথাটি শুনেই সবার চোখে কৌতূহল জ্বলে উঠল।
আনজুম আসলাম একটু এগিয়ে এসে বললেন, “এটা কোনো সাধারণ গাড়ি নয়। এটি একটি মাল্টি-মোড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম। রাস্তায় চলার সময় এটি দেখতে অনেকটা আধুনিক স্পোর্টস কারের মতো লো-বডি, শক্তিশালী টায়ার, আর স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। কিন্তু এর ভেতরের প্রযুক্তিই একে আলাদা করে তোলে।”
তিনি একটু থেমে আবার বললেন, “আকাশে ওড়ার জন্য এতে আছে ভাঁজযোগ্য ডানা—গাড়ির দুই পাশে লুকানো থাকে। প্রয়োজন হলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ডানাগুলো বের হয়ে আসে। পেছনে রয়েছে শক্তিশালী জেট-সহায়ক প্রপালশন সিস্টেম—যা গাড়িটিকে ধীরে ধীরে মাটি থেকে উপরে তুলে নেয়। সম্পূর্ণ বিমানের মতো না হলেও, এটি স্বল্প উচ্চতায় উড়তে পারে এবং দ্রুত দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম।”
জামান বিস্ময়ে বলল, “মানে আমরা ট্রাফিক এড়িয়ে আকাশে উঠে যেতে পারব?”
রিফাত হেসে বলল, “ঠিক তাই, তবে সেটা খুব হিসেব করে করতে হবে।”
এরপর আনজুম পানিতে চলার ব্যবস্থার কথা বললেন। “গাড়িটির নিচের অংশ সম্পূর্ণ ওয়াটারপ্রুফ এবং নৌকার মতো গঠিত। পানিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে চাকা ভেতরে ঢুকে যায়, আর নিচে থাকা বিশেষ প্রপেলার চালু হয়। এই প্রপেলার পানির মধ্যে গাড়িটিকে সামনে এগিয়ে নেয়। একই সাথে পাশে ছোট স্ট্যাবিলাইজার বের হয়ে আসে, যাতে গাড়িটি দুলে না যায়।”
মামুন অবাক হয়ে বলল, “তাহলে এটা একসাথে গাড়ি, নৌকা আর উড়োজাহাজ!”
আনজুম মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, আর এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।”
আলোচনা আরও গভীর হলো। রিফাত বলল, “গাড়িটিতে জিপিএস ট্র্যাকিং, নাইট ভিশন ক্যামেরা, এমনকি জরুরি যোগাযোগের জন্য এনক্রিপ্টেড সিস্টেমও আছে।”
ইফতি যোগ করল, “তাহলে আমরা রাতেও নিরাপদে চলতে পারব।”
আনজুম বললেন, “কিন্তু মনে রেখো, এই গাড়ি যতই উন্নত হোক, ভুল সিদ্ধান্ত নিলে এটি বিপদের কারণও হতে পারে। কখন আকাশে উঠতে হবে, কখন পানিতে নামতে হবে—সব কিছু পরিস্থিতি বুঝে ঠিক করতে হবে।”
তিনি আরও বললেন, “এই ‘র্র্যাপিড কার’ চায়না থেকে বিশেষভাবে তৈরি করানো হয়েছে, জনাব সরাফত আলীর উদ্যোগে। তিনি আমাদের ওপর যে আস্থা রেখেছেন, সেটার মর্যাদা রাখতে হবে।”
এরপর তারা সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করল। যেমন: ঢাকা থেকে বের হয়ে প্রথমে সাধারণ গাড়ির মতো চলা হবে, তারপর প্রয়োজন হলে কোনো নদী বা জলপথ পেলে পানিতে নামা যাবে, আর জরুরি পরিস্থিতিতে আকাশপথ ব্যবহার করা হবে। জামান বলল, “এভাবে আমরা খুব দ্রুত এবং গোপনে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব।”
রিফাত বলল, “আর কেউ যদি আমাদের অনুসরণ করে, তাহলে পথ পরিবর্তন করা সহজ হবে।”
আলোচনা শেষে সবাই বুঝতে পারল—এই গাড়ি শুধু একটি যন্ত্র নয়, এটি তাদের মিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এরপর নতুন সদস্যদের প্রসঙ্গ উঠল। আনজুম জানালেন, রাজশাহী থেকে যোগ দেবে রুবেল কোরেশী- নবম শ্রেণির ছাত্র, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর বিশ্লেষণ ক্ষমতা তার শক্তি। আর চট্টগ্রাম থেকে আসবে জারা মেহজাবিন শিমু—দশম শ্রেণির ছাত্রী, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ এবং দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে।
তাদের সঙ্গে কোথায় মিলিত হবে, সেটাও নির্ধারণ করা হলো। সিলেটের কাছাকাছি একটি নির্দিষ্ট গোপন স্থানে সবাই একত্রিত হবে। রিফাত ইমেইলের খসড়া তৈরি করল- যেখানে সময়, স্থান, সতর্কতা, এবং যোগাযোগের নির্দেশনা পরিষ্কারভাবে লেখা হলো।
শেষে আনজুম আবারও বললেন, “আমাদের প্রতিটি কাজ যেন সত্যের ওপর ভিত্তি করে হয়।” তিনি স্মরণ করিয়ে দিলেন, সত্য মানুষকে সঠিক পথে নিয়ে যায়, আর আল্লাহ ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন। এই কথাগুলো যেন সবার মনে নতুন শক্তি এনে দিল।
অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো—ঈদের পরদিন বিকেলে তারা যাত্রা শুরু করবে। মিলনায়তনের আলোচনার সমাপ্তি ঘটল, কিন্তু সবার মনে শুরু হলো এক নতুন উত্তেজনা।
আনজুম আসলাম ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “প্রস্তুত হও। সামনে যে পথ, সেখানে শুধু রহস্য নয়—পরীক্ষাও আছে।”
আর সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই তারা এগিয়ে গেল- একটি অভিযানের পথে, যেখানে তাদের সবচেয়ে বড় সঙ্গী হবে তাদের বুদ্ধি, সততা, আর “র্র্যাপিড কার”-এর অসাধারণ ক্ষমতা।
মিলনায়তনের বৈঠক শেষ হওয়ার পরও সবার ভেতরে যেন উত্তেজনার ঢেউ থামছিল না। পরিকল্পনা ঠিক হয়েছে, দায়িত্ব ভাগ হয়ে গেছে, সময়ও নির্ধারিত, এখন শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। কক্ষে ফেরার আগেই আনজুম আসলাম কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখে ছিল দূরের লক্ষ্য, আর মনে ছিল দায়িত্বের ভার। তিনি ধীরে বললেন, “মনে রাখবে, আমরা শুধু একটি স্বর্ণমুকুট খুঁজতে যাচ্ছি না—আমরা সত্যকে খুঁজতে যাচ্ছি। আর সত্যের পথে বাধা আসবেই।”
পরদিন থেকেই শুরু হলো প্রস্তুতি। রিফাত মাহমুদ সব যোগাযোগ গোপন কোডে পাঠিয়ে দিল। রুবেল কোরেশী ও জারা মেহজাবিন শিমু দুজনেই উত্তর পাঠালো দ্রুত। রুবেল রাজশাহীর এক মেধাবী ছাত্র, নবম শ্রেণিতে পড়ে, প্রযুক্তি আর মানচিত্র বিশ্লেষণে পারদর্শী। অন্যদিকে শিমু, চট্টগ্রামের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী, ছোট হলেও অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর কম্পিউটার হ্যাকিংয়ে দক্ষ। প্রত্যেককে তাদের নির্দেশনা পাঠিয়ে দেয়া হল।
মেইল পড়ে আবেগে আপ্লূত হলেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম। এই তো একটু আগে ভাবছিলেন সিলেট সফরের ব্যাপারে; ভাবছিলেন মোল্লা মাছুম ও মুহাম্মদ আলীর সাথে দেখা করার কথা। এ-যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টির কারবার! কিন্তু ততক্ষণে ভাবুক মনে ভাবনার উদ্রেক হয়েছে। এই যাওয়া তো শুধু আনন্দের জন্য যাওয়া নয়। যেতে হবে কাজের জন্য। তাছাড়া কাজের তো দুটি দিক থাকে, সফলতা-ব্যর্থতা! তার জীবনে অবশ্য ব্যর্থতা বলে কোন শব্দ নেই। জীবনের সকল কাজেই তিনি সফল হয়েছেন। আর তার এই সফলতার পিছনেও একটি বড় কারণ নিহিত আছে। সফলতা সম্পর্কে জীবনে তিনি অনেক মনিষীর গ্রন্থ অধ্যয়ন করেছেন। নোট করেছেন বিভিন্ন মনিষীর উক্তি। এই সকল অধ্যয়ন ও উক্তির সার নির্যাস বের করেছেন তিনটি। যথা: ১. পরিশ্রম করো সফল হও, ২. নিজের ও অন্যের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সফলতা অর্জন করো এবং ৩. আত্মবিশ্বাসী হয়ে পরিশ্রম করো তাতে নিশ্চয়ই সফল হবে।
যেমন: এরিস্টটল বলেন, “ব্যর্থ হওয়ার নানা উপায় আছে, কিন্তু সফল হওয়ার উপায় একটাই”। এরিস্টটল উক্ত বাণীতে সফলতার উপায় উহ্য রেখে তার গুরুত্বারোপ করেছেন। আর সেই উপায়টি হচ্ছে পরিশ্রম।
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেন, “আমাকে আমার সফলতা দ্বারা বিচার করোনা; ব্যর্থতা থেকে কতবার আমি ঘুরে দাড়িয়েছি তা দিয়ে আমাকে বিচার করো”। এর দ্বারা তিনি নিজের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সফলতা অর্জনের কথা ব্যক্ত করেছেন। আর প্রত্যেককে তার নিজের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সফলতা অর্জনের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। মার্ক জাকারবার্গ বলেছেন, “কেউ কেউ খুব স্মার্ট কিংবা দক্ষ হতে পারে, কিন্তু তারা যদি তাতে বিশ্বাস না রাখে, তাহলে তারা কঠোর পরিশ্রমে আগ্রহী হয় না”। এখানে জাকারবার্গ আত্মবিশ্বাসী হওয়ার ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করেছেন। অর্থাৎ আত্মবিশ্বাসী হলে কঠোর পরিশ্রম করা সম্ভব এবং কঠোর পরিশ্রম দ্বারা সফল হওয়া সম্ভব। হনেরি অস্টনি বলেন, “সফলতা লাভ করার গোপন কথাটি তারাই জানে, যারা ব্যর্থতা লাভ করেছে”। এখানে হনেরি অস্টিনও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সফল হওয়ার বুলি ব্যক্ত করেছেন। জন গ্যা বলেন, “সংসয় যেখানে থাকে, সাফল্য সেখানে ধীর পদক্ষেপে আসে”। আত্মবিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে এখানেও। টমাস হ্যাবি বলেন, “সফলতা কখনও অন্ধ হয় না”। এর দ্বারা টমাস হ্যাবিও পরিশ্রমের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। অর্থাৎ বলতে চেয়েছেন; পরিশ্রম ব্যতীত সফলতা লাভ করা অসম্ভব। এডমন্ড রসট্যান্ড বলেন, “একমাত্র নিশ্চুপ লোকই তার সফলতা দিয়ে তাক লাগিয়ে দিতে পারে”। এখানে এডমন্ড রসট্যান্ড একজন পরিশ্রমহীন ব্যক্তির সফল হওয়ার খবরে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার সাধারণত্ব ব্যক্ত করেছেন। ফ্রান্সিস বলেছেন; “একজনের ব্যর্থতাই অন্যের সফলতার সোপান”। এখানে ফ্রান্সিস বেকন একজনের ব্যর্থতাকে অন্যজনের সফলতার শিক্ষা হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
“যেখানে পরিশ্রম নেই সেখানে সাফল্য নেই” বলেছেন উইলিয়াম ল্যাঙ্গলেট। এসব বিজ্ঞ বচন বিশ্লেষণ করলে, করনীয় শুধু ‘পরিশ্রম’। এছাড়া আত্মবিশ্বাস ও ব্যর্থতা থেকে নেয়া শিক্ষা কোন করনীয় বিষয় নয়। কেননা আত্মবিশ্বাস মনস্তাত্ত্বিক বিষয়, যা কখনও কোন করনীয় কাজ হতে পারে না। আর ব্যর্থতা থেকে নেয়া শিক্ষা তো নেতিবাচক। কেননা যখন কোন কর্ম সম্পাদনে একজন ব্যক্তি ব্যর্থ হয়; তখন দর্শনার্থী ব্যক্তির শিক্ষা হলো; ঐ ব্যক্তি কাজটি যে পদ্ধতিতে করেছে সে পদ্ধতিতে কাজটি করা সম্ভব নয়। সুতরাং দর্শনার্থীর উচিৎ সেই পদ্ধতি পরিহার করা। আর পরিহার করা কোন কাজ না হওয়ায় সেটি নেতিবাচক। অতএব প্রমাণিত হলো; সফলতা অর্জনের জন্য একমাত্র করনীয় কাজ হলো পরিশ্রম।
এখন প্রশ্ন হলো কী পরিমাণ পরিশ্রম করলে কোন কাজে শতভাগ সফল হওয়া সম্ভব? আর এই একই প্রশ্ন একজন যুবক করেছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটলকে! এরিস্টটল সেই যুবককে বলেছিলেন পর দিন নদীর পারে দেখা করতে। সে পরদিন দেখা করেছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটলের সাথে কোন এক নদীর তীরে। তাকে নিয়ে তিনি পানিতে নামলেন। ডোব দিতে বললেন। সে তাই করলো। ডোবে থাকা যুবকের মাথায় তিনি শক্ত করে ধরে রাখলেন যাতে সে উঠতে না পারে। যুবক পানি থেকে উঠার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করছিল তার প্রাণ রক্ষার্থে। তিনিও তাকে পানির নিচে রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত যুবক সফল হয় এবং পানি থেকে উঠে নিশ্বাস গ্রহণ করে। যুবক বলল; আপনিতো আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রাণনাশ করতে যাচ্ছেন! এরিস্টটল বললেন; আমি তোমার উত্তরই দিয়েছি বৎস! তুমি যখন পানির নিচে ছিলে তখন তোমার খুবই প্রয়োজন ছিল অক্সিজেনের, যা পানির নিচে দূর্লভ। তাই তুমি চেয়েছিলে পানির উপরে উঠতে আর সর্বশক্তি ব্যয় করে পরিশ্রমও করছিলে, যার কারণে সফল হয়েছ। তেমনি ভাবে সফলতা অর্জনের জন্য পরিশ্রমে তোমার সর্বশক্তি ব্যয় করতে হবে, তবেই তুমি শতভাগ সফল হতে পারবে। যুবকটি তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে চলে যায়। আর শিক্ষা রেখে যায় পরবর্তী মানবকুলের জন্য।
এসব পাঠ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম। তাই তার পরিশ্রমের ফলশ্রুতিতে কখনও ব্যর্থতার ঘাঁটা পোহাতে হয়নি।
নিস্তব্ধ আনমনে ভাবনার জগতে ভাসছেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম। ভাবছেন কিভাবে কী করবেন! হঠাৎ স্মরণ হলো নূমান মুরসালিনের কথা। বইয়ের পোকা হিসেবে সকলে যাকে চিনে। গোয়েন্দা প্রধানের এক বছরের সিনিয়র তিনি। একই স্কুলে লেখা-পড়া উনাদের। নূমান বাবা-মা'র একমাত্র সন্তান। বাবা সাইদুর রহমান সাহেব সচিবালয়ে চাকুরী করেন আর মা রাজিয়া খানম ঢাকার একটি সরকারি মহিলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল। সাইদুর রহমান সাহেব সচিবালয়ে চাকুরী করলেও অত্যন্ত সৎ ব্যক্তি। ধর্মীয় প্রত্যেকটি বিষয় তিনি খুবই গুরুত্বের সাথে পালন করেন। মা রাজিয়া খানমও ধর্মীয় ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। পর্দার বিধানের ক্ষেত্রেও তার কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় না। তিনি তার কলেজের ছাত্রীদের পর্দা মেনে চলার ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি তো নিয়মিত ছাত্রীদের বিভিন্ন বিষয়ে নসিহতও করে থাকেন। একদা তিনি তার কলেজের ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বললেন; প্রিয় বোনেরা! তোমার পর্দা পালনের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো! আমি বলছি না তোমরা ঘরে বন্দি হয়ে যাও। আবার এটাও বলছি না যে, তোমরা অশালীন ভাবে রাস্তায় বেরিয়ে পড়। বরং প্রয়োজন সাপেক্ষে বাহিরে বেরোলে আল্লাহর হুকুম পালন করে বের হও। আল্লাহ পাক বলেন; হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্যান্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তাহলে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর তথা স্বাভাবিকভাবে কথা বল। সুরা আহযাব-৩২
এই আয়াতে আল্লাহ পাক পরপুরুষের সাথে প্রয়োজন সাপেক্ষে কথা বলার দরকার হলে কিভাবে কথা বলতে হবে তার শিক্ষা দিয়েছেন। প্রথমত আল্লাহ বলেন, তোমাদের বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা সাধারণ নারীদের মত নয়; বরং আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে রসূল-পত্নী হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছেন, যার ফলে তোমরা এক উচ্চস্থান ও মর্যাদার অধিকারিণী। তাই রসূল (সাঃ)-এর মত তোমাদেরকেও উম্মতের জন্য আদর্শবতী হতে হবে। এখানে নবী-পত্নীগণকে তাঁদের উচ্চস্থান ও মর্যাদার কথা স্মরণ করে দিয়ে তাঁদেরকে কিছু নির্দেশ দান করা হয়েছে। এ সব নির্দেশাবলীতে সম্বোধন যদিও পবিত্রা স্ত্রীগণকে করা হয়েছে, যাঁদের প্রত্যেককে ‘উম্মুল মু’মিনীন বলা হয়েছে, তবুও বর্ণনা ভঙ্গীতে প্রকাশ পাচ্ছে যে, উদ্দেশ্য সমগ্র মুসলিম নারী। সকল মুসলিম নারীদের সতর্ক করা ও তাদের মর্যাদা বোঝানোর জন্য আল্লাহ পাক এই আয়াত নাজিল করেছেন। অতএব উক্ত নির্দেশ সমগ্র মুসলিম নারীর জন্য মান্য করা ও পালন করা অত্যাবশ্যক।
দ্বিতীয় বিষয় হলো; আল্লাহ তাআলা যেরূপভাবে নারী জাতির দেহ-বৈচিত্রে পুরুষের জন্য যৌন আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন, অনুরূপভাবে তিনি নারীদের কণ্ঠস্বরেও প্রকৃতিগতভাবে মন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা, কোমলতা ও মধুরতা দিয়ে আকর্ষিত করছেন, যা পুরুষকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে থাকে। সুতরাং সেই কণ্ঠস্বর ব্যবহার করার ব্যাপারেও এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, পরপুরুষের সাথে বাক্যালাপের সময় ইচ্ছাপূর্বক এমন কণ্ঠ ব্যবহার করবে, যাতে কোমলতা ও মধুরতার পরিবর্তে সামান্য শক্ত ও কঠোরতা মিশ্রিত থাকে। যাতে ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরবিশিষ্ট লোক কণ্ঠের কোমলতার কারণে তোমাদের দিকে আকৃষ্ট না হয়ে পড়ে এবং তাদের মনে কুবাসনার সঞ্চার না হয়।
তৃতীয় বিষয় হলো; এই কর্কশতা ও কঠোরতা শুধু কণ্ঠস্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ মুখে এমন বাক্য আনবে না, যা অসঙ্গত ও সচ্চরিত্রতার পরিপন্থী। "যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো" বলে আল্লাহ তাআলা ইঙ্গিত করেছেন যে, এই নির্দেশ এবং অন্যান্য নির্দেশাবলী যা সামনে বর্ণিত হবে, তা যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্য। কারণ তারাই ভয় করে যে, যাতে তাদের আখেরাত নষ্ট হয়ে না যায়। পক্ষান্তরে যাদের হৃদয় আল্লাহর ভয়শূন্য তাদের সাথে এই নির্দেশাবলীর কোন সম্পর্ক নেই। তারা কখনোও এর পরোয়া করবে না।
মূমীন নারীদের মর্যাদা ও তাদের কথা বলার ধরন কী হওয়া উচিৎ তা বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। হে নবী পরিবার, আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।" সুরা আহযাব-৩৩
এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, নারীর আসল অবস্থানক্ষেত্র হচ্ছে তার গৃহ। কেবলমাত্র প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সে গৃহের বাইরে বের হতে পারে। [ইবন কাসীর] আয়াতের শব্দাবলী থেকেও এ অর্থ প্রকাশ হচ্ছে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস একে আরো সুস্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। রাসুল (সাঃ) বলেন, মুজাহিদ তো তখনই স্থিরচিত্তে আল্লাহর পথে লড়াই করতে পারবে যখন নিজের ঘরের দিক থেকে সে পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে, তার স্ত্রী তার গৃহস্থালী ও সন্তানদেরকে আগলে রাখবে এবং তার অবর্তমানে তার স্ত্রী কোন অঘটন ঘটাবে না, এ ব্যাপারে সে পুরোপুরি আশংকামুক্ত থাকবে। যে স্ত্রী তার স্বামীকে এ নিশ্চিন্ততা দান করবে; সে ঘরে বসেও তার জিহাদে পুরোপুরি অংশীদার হবে। অন্য একটি হাদীসে এসেছে, “নারী পৰ্দাবৃত থাকার জিনিষ। যখন সে বের হয় শয়তান তার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে এবং তখনই সে আল্লাহর রহমতের নিকটতর হয় যখন সে নিজের গৃহে অবস্থান করে।” সুতরাং তোমরা যেহেতু মেয়ে হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছ সেহেতু তোমাদের উচিৎ নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করা। এভাবে তিনি তার কলেজের ছাত্রীদের ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞাত করেন।
বিধাতা যেন মা-বাবার মনের মত করে পাঠিয়েছেন নূমান মুরসালিনকে। রাত-দিন শুধু পড়া আর পড়া। পড়া ছাড়া যেন তার কিছুই ভালো লাগেনা। এমন সন্তান কয়জনেরইবা ভাগ্যে জোটে? তাই নূমানের উপর খুবই সন্তুষ্ট তার মা বাবা। নূমানের রিডিং রুম যেন একটি লাইব্রেরি। সাইদুর রহমান সাহেবের সম্পর্ক রয়েছে রাজধানীর উল্লেখযোগ্য সবকয়টি প্রকাশনীর সাথে। নূমানের পড়ার উপযোগী কোন নতুন বই প্রকাশিত হলে পাঠিয়ে দেয়ার কথা রয়েছে প্রত্যেকটি প্রকাশনীর কতৃপক্ষের সাথে। কথা অনুযায়ী তারা বই দিয়ে বিল নিয়ে যায়। এভাবে সাইদুর রহমান সাহেব ও রাজিয়া খানমের বেতনের বেশির ভাগ টাকা ছেলের বই কিনতেই খরচ হয়ে যায়। তবু্ও তারা অখুশি নয়। সন্তুষ্ট তাদের ছেলের উপর।
গোয়েন্দা প্রধানের মনে হলো এই বিষয়ের বই নূমান ভাইয়া ছাড়া আর কারো কাছে পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই তার কাছেই খুঁজে দেখতে হবে। মোবাইল হাতে নিলেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম; কল করলেন নূমান মুরসালিনকে।
--আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ! ভাইয়া, কেমন আছেন? সালাম দিয়ে কোশল বিনিময় করলেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম।
--ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ, নিশ্চয়ই ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? সালামের জবাব দিয়ে পাল্টা কোশল জিজ্ঞেস করলেন নূমান মুরসালিন।
--জী ভাইয়া আলহামদুলিল্লাহ! ভালো আছি; বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
--কী ব্যাপার এতো রাতে! কোন জরুরি কথা মনে হচ্ছে? প্রশ্ন ছোড়লেন নূমান মুরসালিন।
--জী ভাইয়া একটি জরুরি বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি। আপনার কাছে কি জৈন্তার স্বর্ণমুকুট ব্যাপারে কোন বই আছে? পাল্টা প্রশ্ন গোয়েন্দা প্রধানের।
--কী গোয়েন্দা প্রধান! নতুন কোন মিশনে নামছ নাতো? ভনিতা করে জিজ্ঞেস করলেন নূমান মুরসালিন।
--হ্যাঁ ভাইয়া! সে জন্যই তো প্রয়োজন; বললেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম।
--বই আছে, তবে এগুলো তো বর্তমানে নিষিদ্ধ, তাই খুব সতর্কতার সাথে রাখতে হবে; বললেন নূমান মুরসালিন।
--ইনশাআল্লাহ! তাই হবে ভাইয়া। তাহলে আগামীকাল সকালেই আসছি আমি বই নিতে। ভালো কাটুক আপনার রাত। আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ; সালাম বিনিময় করে বিদায় নিলেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম।
--ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ; সালামের জবাব দিয়ে মোবাইল রেখে দিলেন নূমান মুরসালিন।
মোবাইল রেখে প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিলেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম। কারণ তার মনে হয়েছিল এই সম্পর্কে বই সংগ্রহ করা দুরূহ ব্যাপার। সেই দুঃসাধ্য কাজ যেহেতু সহজে সম্পাদিত হয়েগেছে তাহলে আর কোন বাধাই যেন তাকে ঠেকাতে পারবেনা। দেয়ালে আটকে রাখা ঘড়ির দিকে তাকালেন গোয়েন্দা প্রধান। রাত অনেক হয়েগেছে, ১২টা বেজে ৩৫ মিনিট। সাধারণত এত রাত পর্যন্ত অফিসে থাকার অভ্যাস নেই। আজ একটু ব্যতিক্রম হয়েছে বেশি কাজের চাপ থাকায়। গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদও অনেক আগে বিদায় নিয় চলে গেছেন। বাসায় নাকি তার আম্মু অসুস্থ। সব কিছু গোছগাছ করে বসা থেকে উঠে দাড়ালেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম। অফিস বন্ধ করে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। অফিস থেকে পূর্ব দিকে তার বাসার দূরত্ব মাত্র তিন থেকে চার মিনিটের পায়ে হাঁটার পথ। বাসায় প্রবেশ করে আর কোন কাজ না দুই রাকাত সালাতুল হাজত আদায় করে দ্রুত শুয়ে পড়লেন তিনি। তিনি কোন কাজ হাতে নিলে প্রথমে সালাতুল হাজত আদায় করে আল্লাহর সাহায্য কামনা করেন। এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি আজও। ঘুমের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করলেন নির্জন একটি গুহার সামনে।একজন দরবেশ গুহার ওপাশে দাড়িয়ে আছেন। কাঁধকাটা সাদা চুল আর লম্বা দাড়ি, ওষ্ঠ বেয়ে দাড়ির সাথে মিলিত হয়েছে গুম্ফ রাশি, মাথায় পাগড়ি, হাতে লাঠি আর পরিহিত সাদা জোব্বায় তাকে লাগছে একজন অসাধারণ মহা মানবের মত।
--আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ; সালাম জানালেন গোয়েন্দা প্রধান।
--ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ; সালামের উত্তরের মাধ্যমে মুখ খুললেন দরবেশ। বৎস! তুমি এক কঠিন কাজে হাত দিচ্ছো। এতদিন কাজ করেছ তুমি মানবের সাথে, তাই তুমি সফল হতে তেমন বেগ পোহাতে হয়নি। এখন দানবের কাজ হাতে নিয়েছো। সফল হতে তোমায় অনেক সঙ্কট পোহাতে হবে। কী? পারবে তো?
-- কী এমন কাজ হাতে নিয়েছি! কোন কাজের কথাইবা বলছেন উনি? এমন সব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো গোয়েন্দা প্রধানের মনে। ভাবনায় বাঁধা ফেললেন দরবেশ।
--কী বৎস? কী এতো ভাবছো? কোন কাজের কথা বলছি তাই তো? শোন! তুমি যেই স্বর্ণ মুকুটের কথা ভাবছ সেই স্বর্ণ মুকুট এখন দানব তথা জিনদের হস্তগত। এটা এখন আর কোন মানব সন্তানের হাতে নয়। তবে এটা যেহেতু মানুষের সম্পদ তাই জীনেরা এটা নিজেদের কাছে রাখতেও চায় না। কিন্তু এটা দেবে কার কাছে? যাদেরকে ওরা বিশ্বাস করে তারা নিতে চায় না। আর যারা নিতে চায় তাদেরকে ওরা বিশ্বাস করে না। আমার বিশ্বাস তুমি পারবে এই স্বর্ণ মুকুট উদ্ধার করতে। তাই কিছু পরামর্শ দিতে তোমার সাথে সাক্ষাৎ দিলাম। শোন ওহে বৎস! তুমি আগামীকাল নূমান মুরসালিনের কাছে যাচ্ছো না? স্বর্ণ মুকুট সম্পর্কিত বই আনতে? হ্যাঁ! ওর কাছে জৈন্তার সেই স্বর্ণ মুকুট সম্পর্কিত বেশ কিছু বই আছে, যেগুলো তোমাকে সে সম্পর্কে ধারণা দিবে। তবে ব্যাপার হলো তোমাকে এই বইগুলো থেকে আরো একটি বইয়ের সন্ধান বের করতে হবে, যেটি কোন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়নি। বরং অপ্রকাশিত রয়েছে সেই বইটি। তুমি সেই বইয়ের সন্ধান বের কর। তবেই তুমি স্বর্ণ মুকুট উদ্ধার করতে পারবে। নতুবা জানও খোয়া যেতে পারে বৎস! চেচিয়ে উঠলেন দরবেশ।
--এতোক্ষণে মুখ খুললেন গোয়েন্দা প্রধান; আমি কি একটি বিষয় জানতে পারি হুজুর? জিজ্ঞেস করলেন গোয়েন্দা প্রধান।
--নির্ভয়ে বলতে পারো, হে বৎস; বললেন দরবেশ।
--বইটি সম্পর্কে কিছু…… বলে থেমে গেলেন আনজুম আসলাম।
--হ্যাঁ! উনার, মানে ঐ পাহাড়ে যিনি থাকতেন তাঁর শিষ্যদের তালাশ করো………… কথা শেষ করার আগেই মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ভেসে এলো ফজরের আযান। ঘুম ভেঙে গেল গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলামের। ততক্ষণে নিজেকে আবিষ্কার করলেন বিছানায়। তাহলে স্বপ্ন ছিল? ভাবুক মনে ভাবনার উদ্রেক হলো আনজুম আসলামের।
যুগযুগ ধরে স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে গেছেন দার্শনিক ও বিজ্ঞজনেরা। এসব বক্তব্যে স্বপ্নকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দৃঢ় সংকল্প ও কল্পনার সাথে সম্পর্ক যুক্ত করেছেন তারা। কেউ কেউ বলেছেন; স্বপ্ন হলো ধারাবাহিক কতগুলো ছবি ও আবেগের সমষ্টি। মেসোপোটেমিয়ার লোকদের বিশ্বাস ছিল, আত্মার কিছু অংশ ঘুমন্ত ব্যক্তি থেকে বেরিয়ে ঘুরাঘুরি করে। আত্মার এই অংশটি প্রকৃতপক্ষে যে সব স্থানে ঘুরে বেড়ায় এবং যে সকল ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের সাথে সাক্ষাৎ করে স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যক্তি তাই অনুভব করে। এটাই তার স্বপ্ন বলে বিবেচনা করা হয়। কখনো কখনো স্বপ্নের দেবতারা স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যক্তিদের বহন করতে বলে।
প্রাচীন মিশরীয়রা তাদের স্বপ্নগুলোকে স্বপ্ন দেবতা থেকে বার্তা নিয়ে আসে বলে মনে করত। ইসলাম ধর্মে স্বপ্ন সম্পর্কে তালাশ করলে পাওয়া যায়, সর্বশেষ ঐশী বাণী আল কুরআনেও বিভিন্ন জনের স্বপ্নের বর্ণনা রয়েছে। যেমন আল কুরআনের সূরা ইউসুফের চার নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে; “যখন ইউসুফ তাঁর পিতাকে বললেন, আব্বা! আমি স্বপ্নে দেখেছি এগারটি নক্ষত্র, সূর্য এবং চন্দ্র তারা আমার উদ্দেশ্যে সেজদা করছে”।
সুরা ইউসুফের ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে; তাঁর (ইউসুফের) সাথে কারাগারে দুইজন যুবক প্রবেশ করল। তাদের একজন বলল; আমি স্বপ্নে দেখলাম যে মদ নিঙড়াচ্ছি। অপরজন বলল; আমি স্বপ্নে দেখলাম, নিজ মাথায় রুটি বহন করছি আর তথা থেকে পাখি ঠুকরিয়ে খাচ্ছে। আমাদেরকে এর ব্যাখ্যা বলুন। আমরা আপনাকে সৎকর্মশীল দেখতে পাচ্ছি। এর জবাবে ইউসুফ যা বলেছিলেন তা উক্ত সূরার ৪১ নম্বর আয়াতে বিবৃত হয়েছে। (তিনি বললেন) হে কারাগারের সঙ্গীরা! তোমাদের একজন আপন প্রভুকে মদ্যপান করাবে এবং দ্বিতীয়জনকে শুলে চড়ানো হবে। অতপর তার মস্তক থেকে পাখি আহার করবে। তোমরা যে বিষয়ে জানার আগ্রহী তার সিদ্ধান্ত হয়েগেছে।
এই সব আয়াত ছাড়াও আরো অনেক আয়াত ও হাদিসে স্বপ্নের মাধ্যমে স্রষ্টা কর্তৃক প্রদত্ত সতর্কবাণী, অগ্রীম সুসংবাদ বা দিক নির্দেশনা প্রদানের প্রমাণ পাওয়া যায়।
মুসলিম শাস্ত্রজ্ঞগণ বলেন, জগতে অস্তিত্ব লাভের লাভের পূর্বে প্রত্যেক বস্তুর একটি বিশেষ আকৃতি উপমা জগতে বিদ্যমান থাকে, তেমনি অবস্তুবাচক বিষয়াদিরও বিশেষ আকার আকৃতি বিদ্যমান থাকে। নিদ্রারত অবস্থায় মানুষের আত্মা যখন বাহ্যিক দেহের ক্রিয়াকর্ম থেকে মুক্ত হয়ে পড়ে তখন মাঝে মাঝে উপমা জগতের সাথে তার সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায় এবং সেখানকার আকার আকৃতি সে দেখতে পায়। এছাড়া এসব আকার আকৃতি অদৃশ্য জগত থেকে দেখানো হয়। মাঝে মাঝে এগুলোতেও এমন সব উপসর্গ সৃষ্টি হয়ে যায় যে, আসল সত্যের সাথে কিছু অবাস্তব কল্পনাও মিশ্রিত হয়ে পড়ে। একারণে কোন কোন স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার কোন কোন সময় উক্ত আকার আকৃতি উপসর্গ থেকে মুক্ত থাকে। তখন সেটি হয় সত্য স্বপ্ন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তারা স্বপ্নকে তিন প্রকারে বিভক্ত করেন। যথাঃ ১. সত্য স্বপ্ন, ২. কাল্পনিক স্বপ্ন ও ৩. শয়তানী স্বপ্ন। এরমধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রকার স্বপ্নের কোন বাস্তবতা নেই এবং না এর কোন ব্যাখ্যা আছে।
গোয়েন্দা প্রধানের মনে হলো এটা স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রদত্ত নির্দেশনা। বিছানা থেকে উঠে অযু করে ফজরের দু'রাকাত সুন্নত পড়লেন তিনি। এরপর বাসা থেকে বেরিয়ে পায়চারি করলেন মসজিদের দিকে। ফজরের নামাজের পর সুরা ইয়া-সিন পাঠ করতঃ কিছু সময় হাঁটা তার প্রতিদিনের রুটিন। কাক ডাকা ভোরে ব্যস্ত শহরের ফাঁকা রাস্তাগুলোতে হাঁটতে তার দারূণ লাগে। তবে কষ্ট লাগে শীতের সকালে যখন পাতলা চাদর গায়ে মুড়িয়ে রাস্তার পাশে কাউকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। তখন নিজেকে খুব বেশি অপরাধী মনে হয় গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলামের। প্রতিদিনের মত ফজরের নামাজ আদায় করে সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করতে করতে যাত্রা শুরু করলেন নূমান মুরসালিনের বাসার দিকে। নিয়ে আসলেন জৈন্তার স্বর্ণ মুকুট সম্পর্কিত তিন খানা বই। ঘরে ফিরই শুরু করলেন অধ্যয়ন। নামায আর খাবার-দাবার ছাড়া দিনের বাকি সময় কাটিয়েছেন অধ্যয়নে। মাগরিবের পূর্বে পাঠ করা শেষ হয়েছে একটি বই। তাও সবচেয়ে বড় বইটি শেষ হয়েছে প্রথমে। ছোট দুইটি বই বাকি আছে। এগুলোও রাতের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। মাগরিবের নামায আদায় করে ধিরে ধিরে অফিসে চলে গেলেন। অবশ্য এরই মধ্যে অফিসে উপস্থিত হয়েছেন গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদ। তিনি এসে কল করেছেন ইফতি হাসানকেও। কিছুক্ষণের মধ্যে আশা করা যায় ইফতি হাসানও এসে উপস্থিত হবেন। গোয়েন্দা প্রধান সালাম বিনিময় করে অফিসে প্রবেশ করলেন। নিজ কক্ষে প্রবেশ করে আসন গ্রহণ করতেই আগমন করলেন ইফতি হাসান, সাথে আছেন মোল্লা মামুন। মোল্লা মামুনের দূরসম্পর্কের ছোট ভাই জামান মাহমুদ, অত্যন্ত মেধাবী, সাহসী ও দুর্দান্ত ছেলে। আবেদনের প্রেক্ষিতে কিছু দিন আগে গোয়েন্দা টিমের সদস্য হয়েছেন জামান মাহমুদ।
--জামান মাহমুদকে কল দিয়ে আসতে বলুন; মোল্লা মামুনকে উদ্দেশ্য করে বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
মোল্লা মামুন কল দিলেন জামান মাহমুদকে। গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম, ইফতি হাসানকে বললেন হলরুমে বসার ব্যবস্থা করতে। তা করতে লাগলেন ইফতি হাসান। গোয়েন্দা প্রধান বাসা থেকে সাথে নিয়ে আসা জৈন্তার স্বর্ণ মুকুট সম্পর্কিত বই একটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। সচিব কক্ষে বসে আসেন রিফাত মাহমুদ ও মোল্লা মামুন। গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদের মনযোগ কম্পিউটারে। ডান হাতে মাউস নিয়ে অপলকে নজর নিক্ষেপ করছেন মনিটরের স্ক্রীনে। ডান হাতের আঙুলগুলো একটুখানি নড়াচড়া না করলে অপরিচিত যে কেউ মুর্তি ভেবে ভুল করত। ইফতি হাসান হল রুমে বসার ব্যবস্থা করে ফিরে এসে বসেছেন মোল্লা মামুনের কাছে। নিচু সুরে গল্প-গোজবে মেতে উঠেছেন ইফতি হাসান ও মোল্লা মামুন। এমন সময় সালাম বিনিময় করে অফিসে প্রবেশ করলেন জামান মাহমুদ। সালামের জবাব দিয়ে বসতে বললেন মোল্লা মামুন। ততক্ষণে গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদের মনযোগ কেড়েছেন জামান মাহমুদ।
--আরে জামান মাহমুদ ভাই! কেমন আছেন? উৎফুল্ল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদ।
--আলহামদুলিল্লাহ ভাইয়া! ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন তো?
--আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি! সবাই যখন উপস্থিত, তাহলে চলেন গোয়েন্দা প্রধানকে নিয়ে হল রুমে আসুন; বলে উঠে দাড়ালেন গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদ।
ইফতি হাসান উঠে দাড়ালেন, চলে গেলেন গোয়েন্দা প্রধানের কক্ষের দিকে। দরজায় দাড়িয়ে সালাম দিলেন।
আনজুম আসলাম তার কক্ষে বসে স্বর্ণমুকুট সম্পর্কিত শেষ বইটি পড়ছিলেন।
ইফতি হাসানের সালামের জবাব দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, সবাই চলে আসছেন?
--'জ্বী, সবাই চলে আসছেন' বললেন ইফতি হাসান।
--ঠিক আছে, মিলনায়তনে যান আমিও চলে আসছি; বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
কিছুটা তাড়াহুড়ো করে গোয়েন্দা প্রধান তার হাতে থাকা বইটি পড়া শেষ করলেন। এবং কিছুক্ষণের মধ্যে মিলনায়তনে প্রবেশ করলেন। বড় টেবিল ঘিরে বসার পর যেন আলোচনার গুরুত্ব আরও বেড়ে গেল।
গোয়েন্দা প্রধান জৈন্তিয়া রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী এই স্বর্ণমুকুটের বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরলেন। এবং জানালেন এটি উদ্ধার করতে অভিযানে নামতে হবে। তখন আলোচনার মোড় ঘুরল তাদের যাত্রার প্রস্তুতির দিকে। ঠিক তখনই রিফাত এক ধরনের গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “আমাদের জন্য বিশেষ একটি যান প্রস্তুত আছে- ‘র্র্যাপিড কার’।” কথাটি শুনেই সবার চোখে কৌতূহল জ্বলে উঠল।
আনজুম আসলাম একটু এগিয়ে এসে বললেন, “এটা কোনো সাধারণ গাড়ি নয়। এটি একটি মাল্টি-মোড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম। রাস্তায় চলার সময় এটি দেখতে অনেকটা আধুনিক স্পোর্টস কারের মতো লো-বডি, শক্তিশালী টায়ার, আর স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। কিন্তু এর ভেতরের প্রযুক্তিই একে আলাদা করে তোলে।”
তিনি একটু থেমে আবার বললেন, “আকাশে ওড়ার জন্য এতে আছে ভাঁজযোগ্য ডানা—গাড়ির দুই পাশে লুকানো থাকে। প্রয়োজন হলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ডানাগুলো বের হয়ে আসে। পেছনে রয়েছে শক্তিশালী জেট-সহায়ক প্রপালশন সিস্টেম—যা গাড়িটিকে ধীরে ধীরে মাটি থেকে উপরে তুলে নেয়। সম্পূর্ণ বিমানের মতো না হলেও, এটি স্বল্প উচ্চতায় উড়তে পারে এবং দ্রুত দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম।”
জামান বিস্ময়ে বলল, “মানে আমরা ট্রাফিক এড়িয়ে আকাশে উঠে যেতে পারব?”
রিফাত হেসে বলল, “ঠিক তাই, তবে সেটা খুব হিসেব করে করতে হবে।”
এরপর আনজুম পানিতে চলার ব্যবস্থার কথা বললেন। “গাড়িটির নিচের অংশ সম্পূর্ণ ওয়াটারপ্রুফ এবং নৌকার মতো গঠিত। পানিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে চাকা ভেতরে ঢুকে যায়, আর নিচে থাকা বিশেষ প্রপেলার চালু হয়। এই প্রপেলার পানির মধ্যে গাড়িটিকে সামনে এগিয়ে নেয়। একই সাথে পাশে ছোট স্ট্যাবিলাইজার বের হয়ে আসে, যাতে গাড়িটি দুলে না যায়।”
মামুন অবাক হয়ে বলল, “তাহলে এটা একসাথে গাড়ি, নৌকা আর উড়োজাহাজ!”
আনজুম মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, আর এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।”
আলোচনা আরও গভীর হলো। রিফাত বলল, “গাড়িটিতে জিপিএস ট্র্যাকিং, নাইট ভিশন ক্যামেরা, এমনকি জরুরি যোগাযোগের জন্য এনক্রিপ্টেড সিস্টেমও আছে।”
ইফতি যোগ করল, “তাহলে আমরা রাতেও নিরাপদে চলতে পারব।”
আনজুম বললেন, “কিন্তু মনে রেখো, এই গাড়ি যতই উন্নত হোক, ভুল সিদ্ধান্ত নিলে এটি বিপদের কারণও হতে পারে। কখন আকাশে উঠতে হবে, কখন পানিতে নামতে হবে—সব কিছু পরিস্থিতি বুঝে ঠিক করতে হবে।”
তিনি আরও বললেন, “এই ‘র্র্যাপিড কার’ চায়না থেকে বিশেষভাবে তৈরি করানো হয়েছে, জনাব সরাফত আলীর উদ্যোগে। তিনি আমাদের ওপর যে আস্থা রেখেছেন, সেটার মর্যাদা রাখতে হবে।”
এরপর তারা সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করল। যেমন: ঢাকা থেকে বের হয়ে প্রথমে সাধারণ গাড়ির মতো চলা হবে, তারপর প্রয়োজন হলে কোনো নদী বা জলপথ পেলে পানিতে নামা যাবে, আর জরুরি পরিস্থিতিতে আকাশপথ ব্যবহার করা হবে। জামান বলল, “এভাবে আমরা খুব দ্রুত এবং গোপনে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব।”
রিফাত বলল, “আর কেউ যদি আমাদের অনুসরণ করে, তাহলে পথ পরিবর্তন করা সহজ হবে।”
আলোচনা শেষে সবাই বুঝতে পারল—এই গাড়ি শুধু একটি যন্ত্র নয়, এটি তাদের মিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এরপর নতুন সদস্যদের প্রসঙ্গ উঠল। আনজুম জানালেন, রাজশাহী থেকে যোগ দেবে রুবেল কোরেশী- নবম শ্রেণির ছাত্র, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর বিশ্লেষণ ক্ষমতা তার শক্তি। আর চট্টগ্রাম থেকে আসবে জারা মেহজাবিন শিমু—দশম শ্রেণির ছাত্রী, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ এবং দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে।
তাদের সঙ্গে কোথায় মিলিত হবে, সেটাও নির্ধারণ করা হলো। সিলেটের কাছাকাছি একটি নির্দিষ্ট গোপন স্থানে সবাই একত্রিত হবে। রিফাত ইমেইলের খসড়া তৈরি করল- যেখানে সময়, স্থান, সতর্কতা, এবং যোগাযোগের নির্দেশনা পরিষ্কারভাবে লেখা হলো।
শেষে আনজুম আবারও বললেন, “আমাদের প্রতিটি কাজ যেন সত্যের ওপর ভিত্তি করে হয়।” তিনি স্মরণ করিয়ে দিলেন, সত্য মানুষকে সঠিক পথে নিয়ে যায়, আর আল্লাহ ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন। এই কথাগুলো যেন সবার মনে নতুন শক্তি এনে দিল।
অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো—ঈদের পরদিন বিকেলে তারা যাত্রা শুরু করবে। মিলনায়তনের আলোচনার সমাপ্তি ঘটল, কিন্তু সবার মনে শুরু হলো এক নতুন উত্তেজনা।
আনজুম আসলাম ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “প্রস্তুত হও। সামনে যে পথ, সেখানে শুধু রহস্য নয়—পরীক্ষাও আছে।”
আর সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই তারা এগিয়ে গেল- একটি অভিযানের পথে, যেখানে তাদের সবচেয়ে বড় সঙ্গী হবে তাদের বুদ্ধি, সততা, আর “র্র্যাপিড কার”-এর অসাধারণ ক্ষমতা।
মিলনায়তনের বৈঠক শেষ হওয়ার পরও সবার ভেতরে যেন উত্তেজনার ঢেউ থামছিল না। পরিকল্পনা ঠিক হয়েছে, দায়িত্ব ভাগ হয়ে গেছে, সময়ও নির্ধারিত, এখন শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। কক্ষে ফেরার আগেই আনজুম আসলাম কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখে ছিল দূরের লক্ষ্য, আর মনে ছিল দায়িত্বের ভার। তিনি ধীরে বললেন, “মনে রাখবে, আমরা শুধু একটি স্বর্ণমুকুট খুঁজতে যাচ্ছি না—আমরা সত্যকে খুঁজতে যাচ্ছি। আর সত্যের পথে বাধা আসবেই।”
পরদিন থেকেই শুরু হলো প্রস্তুতি। রিফাত মাহমুদ সব যোগাযোগ গোপন কোডে পাঠিয়ে দিল। রুবেল কোরেশী ও জারা মেহজাবিন শিমু দুজনেই উত্তর পাঠালো দ্রুত। রুবেল রাজশাহীর এক মেধাবী ছাত্র, নবম শ্রেণিতে পড়ে, প্রযুক্তি আর মানচিত্র বিশ্লেষণে পারদর্শী। অন্যদিকে শিমু, চট্টগ্রামের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী, ছোট হলেও অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর কম্পিউটার হ্যাকিংয়ে দক্ষ। প্রত্যেককে তাদের নির্দেশনা পাঠিয়ে দেয়া হল।
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
জে এস এম অনিক ১৮/০৪/২০২৬অসাধারণ লেখা
-
ফয়জুল মহী ১৭/০৪/২০২৬অপূর্ব অনুভূতির কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ।
