www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

স্বর্ণমুকুট (গোয়েন্দা গল্প)

পর্ব- এক

নিজ আসনে হেলান দিয়ে বসে আছেন কিশোর গোয়েন্দা আনজুম আসলাম। তিনি সেচ্ছাসেবী কিশোর গোয়েন্দা দল 'অন্বেষের' গোয়েন্দা প্রধান। পরিপাটি করে টেবিলে রাখা আছে একটি পানির জগ। পাশেই উপুড় করে রাখা একটি চকচকে কাচের গ্লাস। গোয়েন্দা প্রধানের সোজা সামনে টেবিলের উপর একটি ল্যাপটপ। আর হাতে একটি বই। খুব মনযোগ সহকারে বইতে চোখ বুলাচ্ছেন গোয়েন্দা প্রধান। বাম পাশে বিশাল একটি বুক সেলফ, যাতে রয়েছে অগণিত গোয়েন্দা তথ্য সংক্রান্ত বই। পিছনে ও ডান পাশে আছে আরো দুটি বুক সেলফ, যাতে রয়েছে বিভিন্ন বিষয়ের বইভান্ডার। টেবিলের সামনে ও ডানে আছে বেশ কিছু ফাঁকা জায়গা যেখানে পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে একাধিক চেয়ার। সামনের টেবিলটি তৈরি করা হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে। উপরের ছাউনির নিচে বুক সেলফের মত তৈরি করা হয়েছে একটি বক্স। এতে রয়েছে গোয়েন্দা প্রধানের শ্রেণিবই। ডান পাশের বুক সেলফ ঘেঁষে রয়েছে পাশের কক্ষের সাথে একটি সংযোগ দরজা। অবশ্য টেবিলের সামনের বুক সেলফের পাশে আরেকটি দরজা আছে যা সরাসরি বাহিরের দিকে। তবে এটা বেশি সময় বন্ধই থাকে। চার কক্ষ বিশিষ্ট এই ফ্ল্যাটটির এই কক্ষটি গোয়েন্দা প্রধানের জন্য নির্ধারিত। পাশের কক্ষ গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদের এবং সচিব কক্ষ সংশ্লিষ্ট একটি ছোট কামরা আছে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সংরক্ষণের জন্য। এছাড়া ফ্ল্যাটের পূর্ব পাশের সবচেয়ে বড় কামরাটি 'হল রুম' বা মিলনায়তন হিসেবে ব্যবহার করে গোয়েন্দারা। রাজধানীর প্রাণ কেন্দ্রের বিজয় নগরে অবস্থিত এই ফ্ল্যাটটি সেচ্ছাসেবী গোয়েন্দা সংগঠন অন্বেষকে দান করেছেন সরাফত আলী সাহেব। বিপুল পরিমাণ সম্পদের অধিকারী সরাফত আলী সাহেব ছিলেন একজন রহস্য মানব। রহস্যের সন্ধানে বিলিয়েছেন উনার জীবনের এক বড় অংশ। শেষ জীবন পর্যন্ত খুজেছেন আরো একজন রহস্য মানবকে। আর তার সেই জীবনভর খুঁজে বেড়ানো মানুষটাকে যেন উদ্ভাবন করেছেন আনজুম আসলামের মাঝে। আনজুম আসলাম তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েন। রাজধানীর একটি নাম করা স্কুলের ফাস্ট বয় তিনি।তখন থেকেই তার রহস্য উদঘাটনের প্রতি টান। রাতভর রহস্য উদঘাটনে কাটিয়ে দিতেন আনজুম আসলাম। নির্ঘুম রাত কাটিয়েও তার কামাই হতোনা স্কুল। তখন থেকেই তার দায়িত্ব বোধ ছিল একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের মত। মা-বাবার একমাত্র সন্তান আনজুম আসলাম সপ্তম শ্রেণীতে পড়াকালে হারান তার মা'কে এবং একই বছর ফাইনাল পরীক্ষার আগ মূহুর্তে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ইহধাম ত্যাগ করেন তার আদুরে বাবা। বাবার রেখে যাওয়া একমাত্র সম্পদ বিজয় নগরের তিনতলা বিশিষ্ট একটি প্রাসাদ। যার ২য় ও ৩য় তলায় বাড়াটিয়ারা থাকেন আর নিচ তলায় থাকেন আনজুম আসলাম। আনজুম আসলামের একাকিত্ম যেন তার রহস্যের খুঁজে যেথায় সেথায় যাওয়ার স্বাধীনতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। বেশ কয়েকটি রহস্যের খুঁজ করে, পুলিশ ও প্রশাসনিক বাহিনীর সহায়তার মাধ্যমে সেচ্ছাসেবী গোয়েন্দা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন আনজুম আসলাম। আর এই সব সাহসী কাজে তার সহযোগিতা করেছেন সহপাঠী ইফতি হাসান, রিফাত মাহমুদ ও মোল্লা মামুন।
সরাফত আলী সাহেব তাদের সাহসীকতা ও রহস্যের উদঘাটনের প্রতি আগ্রহ দেখে তাদেরকে একটি সেচ্ছাসেবী গোয়েন্দা সংগঠন করার পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী গঠন করা হয় 'অন্বেষ গোয়েন্দা সংঘ'। যেই সংগঠনটি একটি সেচ্ছাসেবী গোয়েন্দা সংগঠন এবং এর মৌলিক স্লোগান হলো " চলি পিপীলিকার মত"। স্লোগানের একটি সুন্দর ব্যাখ্যাও আছে তাদের। তা হলো, পিপীলিকা দলবদ্ধ ভাবে চলতে ভালবাসে। তাই এটা হচ্ছে ঐক্যের প্রতিক। তাছাড়া তাদের মাঝে নেতৃত্বের ও আনুগত্যের গুণাবলিও পাওয়া যায়। নেতৃত্বের গুণাবলির উদাহরণ সরূপ বলা যায়, তার জাতিকে যে কোন বিপদ থেকে রক্ষা করা। আর এটি পিপীলিকার গুণাবলির মধ্যে একটি অন্যতম গুণ। যেমন হযরত সোলায়মান (আঃ) যখন একটি উপত্যকা দিয়ে তার বাহিনী নিয়ে অতিক্রম করছিলেন তখন পিপীলিকার সর্দার তার স্বজাতিকে সতর্ক করে ভাষণ দিয়ে ছিল। যে ভাষণটি মহান স্রষ্টা আল কুরআনের সূরা নমলের ১৮ নম্বর আয়াতে বর্ণনা করেছেন। এভাবে, "যখন তারা পিপীলিকা অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌছল, তখন এক পিপীলিকা (পিপীলিকার সর্দার) বলল, হে পিপীলিকার দল; তোমরা তোমাদের গৃহে প্রবেশ করো! অন্যতায় সোলায়মান ও তার বাহিনী অজ্ঞাতসারে তোমাদের পিষ্ঠ করে ফেলবে।" ---(সূরা নমল-১৮)
সুতরাং এর দ্বারা পিপীলিকার নেতৃত্বগুণের প্রমান পাওয়া যায়। এছাড়া পিপীলিকার আনুগত্য ও ঐক্যের গুণাগুণ সর্বজন স্বীকৃত। উদাহরণ সরূপ বলা যায়, একটি পিপীলিকা যখন কোথাও যাত্রা শুরু করে তখন পিছনের পিপীলিকাগুলো তার হুবহু পদাঙ্ক অনুসরণ করে। সারি বেধে চলে পিপীলিকার দল৷ যা আনুগত্যের অনুপম দৃষ্টান্ত। ঐক্যের ক্ষেত্রে তো তারা পানিতে ভেসে বেড়ায় একে অপরের সহযোগী হয়ে।যখন বিরাট বন্যায় পানিতে তলিয়ে যায় পিপীলিকার বাসগৃহগুলো, তখন তাদেরকে জড়ো হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ভাসতে দেখা যায় পানির উপর। তাই ঐক্য, নেতৃত্ব ও আনুগত্য এই তিনটি গুনের বহিঃপ্রকাশ করেছেন তাদের মৌলিক স্লোগানে। এছাড়াও পিপীলিকার আরেকটি গুণ আছে যেটি আসল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। যথা, পিপীলিকা যেদিকেই বিচরণ করে কোন না কোন কিছু অন্বেষণ করে। আর কিছু খুঁজে পেলেই স্বজাতির কাছে তার খবর পৌঁছে দেয়। এজন্য এটিই তাদের মৌলিক স্লোগানের মূখ্য প্রতিপাদ্য বিষয়।

অফিসে বসে গোয়েন্দা প্রধান লর্ড ম্যাক্সের 'সার্চ অব ম্যাইসটারি' বইটি পড়ছিলেন। হঠাৎ কী যেন মনে হলো! বইটি হাত থেকে রেখে চেয়ারে পূর্ণ হেলান দিলেন। চোখ বোজে চিন্তার জগতে চলে গেলেন গোয়েন্দা প্রধান। ছেলেগুলো দারুণ বুদ্ধিমান! হ্যাঁ; সিলেটের মুহাম্মদ আলী ও মোল্লা মাছুমের কথা ভাবছেন তিনি। সেদিন ছিল ছুটির দিন। আর ছুটির দিনে প্রায়ই অফিসে আড্ডা দেয় গোয়েন্দারা। সেদিনও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সবাই অফিসে আসছে; চলছে হুলস্থুল আড্ডা। গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদের দায়িত্ব অফিস ম্যানেজমেন্ট। তাই অফিসে এসেই একবার মেইল চেক করা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অভ্যাস অনুযায়ী সেদিন অফিসে প্রবেশ করে প্রথমে মেইল চেক করেছিলেন রিফাত মাহমুদ। নতুন একটি মেইল এসেছে। তা অপেন করলেন তিনি। কী আশ্চর্য! এটা আবার কী?
-আশ্চর্যজনক একটি মেইল এসেছে; রিফাত মাহমুদ জানালেন গোয়েন্দা প্রধানকে।
-একটি প্রিন্ট কপি পাঠিয়ে দিন; বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
রিফাত মাহমুদ মেইলের একটি প্রিন্ট কপি বের করে পৌঁছে দিলেন গোয়েন্দা প্রধানের টেবিলে। প্রিন্ট কপির উপর চোখ বুলালেন গোয়েন্দা প্রধান।

বরাবর
গোয়েন্দা প্রধান,
অন্বেষ গোয়েন্দা সংঘ,
১৬-বিজয়নগর, ঢাকা, বাংলাদেশ।

🐜🐜🐜🐜🐜
🐜🐜🐜 + 🐜🐜
🐜🐜🐜🐜🐜

বিনীত নিবেদক
মোল্লা মাছুম ও মুহাম্মদ আলী
সিলেট।

শুরুতে আবেদনপত্রের আঙ্গিকে সম্মোধন! পেইজের মধ্যখানের বাম দিকে একদল পিপীলিকার ছবি, এরপর একটি যোগ (+) চিহ্ন, আর যোগ চিহ্নের ডানে দুটি পিপীলিকা এবং সর্বশেষ আবেদনপত্রের আঙ্গিকে আবেদনকারীর নাম। এ যেন এক সাংস্কৃতিক ভাষায় লেখা আবেদনপত্র।
গোয়েন্দা প্রধান মূহুর্তে বুঝে গেলেন ওরা গোয়েন্দা দলে যোগ দিতে চায়। মন থেকে তাদের বুদ্ধির প্রশংসা করলেন। গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদকে আহবান করবেন; এমন সময় তিনি এসে দরজায় হাজির। হাতে আরো দুটি কাগজ।
-আপনাকে ডাকতেই যাচ্ছিলাম; কী এতে দেখি; বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
-এতে মোল্লা মাছুম ও মুহাম্মদ আলীর জীবন বৃত্তান্ত; বললেন গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদ।

মোল্লা মাছুম। সিলেট শহরের একটি নামীদামী স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বাবা অবসরে আছেন। বড় মাস্টার্স পাশ করে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। মেজো ভাই একটি কোম্পানিতে চাকুরী করেন। বড় বোনকে বিয়ে দেয়া হয়েছে তাই তিনি তার পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। ছোট বোন ও মোল্লা মাছুম তারা দুজন থাকে বাবা-মা'র সাথে। মোল্লা মাছুমের খুব শখ গোয়েন্দা হওয়ার। তাই সে আবেদন করেছে অন্বেষ গোয়েন্দা সংঘে; যাতে তাকে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

মুহাম্মদ আলী। সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার জৈন্তিয়া কেন্দ্রীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। যা প্রাচীনকালে জৈন্তিয়া রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। রহস্যের খুঁজে বন্ধুদের সাথে ঘোরে বেড়ানো তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। তাই তো তার এ আবেদন।

বসে বসে তাদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভাবছিলেন গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলাম। ভাবছিলেন কতইনা ট্যালেন্ট হবে বালকদ্বয়! ওদের সাথে দেখা করতে একবার সিলেট সফর করা প্রয়োজন। ভাবনায় বাধা ফেলল কলিং বেল।পাশের কক্ষ থেকে গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদ অনুমতি চাচ্ছেন ভিতরে প্রবেশ করার।অনুমতি দিলেন গোয়েন্দা প্রধান।
-আসুন! ভিতরে আসুন; বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
-আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ; বলে হাতে বেশ কয়েক কপি কাগজসহ ভিতরে প্রবেশ করলেন গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদ।
-সালামের উত্তর দিলেন গোয়েন্দা প্রধান। কী এতে? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন রিফাত মাহমুদের দিকে।
-সিলেট থেকে আসা একটি মেইলের কপি; উত্তর দিলেন গোয়েন্দা সচিব রিফাত মাহমুদ।
সব ভাবনার অবসান ঘটিয়ে মেইলের কপিগুলো হাতে নিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন তাতে....

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ!
প্রিয় গোয়েন্দা প্রধান ভাইয়া,
আশা করি গোয়েন্দা পরিবার নিয়ে ভালো আছেন। আমরাও সিলেটের গোয়েন্দা পরিবার নিয়ে ভালো আছি। আলহামদুলিল্লাহ! জানি ভাইয়া আপনি পড়া লেখা নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন। তথাপি আপনাকে বিরক্ত করছি। অবশ্য অহেতুক কোন কারনে নয়। একটি জরুরি বিষয় অবগত করার জন্য আজ আমার এই লেখা।

প্রিয় ভাইয়া,
জৈন্তিয়া রাজ্যে সম্পর্কে নিশ্চয় আপনি অবগত আছেন। জৈন্তা আসামের একটি প্রাচীন রাজ্য। বর্তমান সিলেট জেলার জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার কিছু অংশসহ ভারতের আসাম রাজ্যের অংশ বিশেষ নিয় গঠিত ছিল প্রাচীন জৈন্তা রাজ্য। অতি প্রাচীন কালে জৈন্তিয়া এলাকার সমতল ভূমির অবস্থান ছিল পানির নিচে। যা বিশাল জলজ অঞ্চলের অংশ ছিল বলে ঐতিহাসিকগণের ধারণা। একারণেই প্রাচীন কাল থেকে স্বাধীন থাকার গৌরব লাভ করে। সপ্তম বা অষ্টম শতাব্দির দিকে জৈন্তিয়া রাজ্য কামরূপ রাজ্যের শাসনাধীন হয়। ঐ বছরই জৈন্তিয়া চন্দ্র এবং বর্মন বংশের অধীনে আসে। বর্মনদের পতনের পর জৈন্তিয়া রাজ্য পুনরায় কিছু সময়ের জন্য দেব বংশের আওতায় আসে। পরবর্তীতে ইতিহাস খুজলে দেখা যায়, সমগ্র ভারত উপমহাদেশ যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পদানত তখন সম্রাট নিজামের এলাহাবাদ ছাড়া একমাত্র জৈন্তিয়া রাজ্যই ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতার প্রতিক রূপে
“সিংহ চিহ্ন সম্বলিত” পতাকা পতপত করে উড়তো এ রাজ্যের বুকে। আর এ রাজ্যের অধিবাসীরাই বুক ফুলিয়ে সাহসের সাথে বলতে পারত আমরা স্বাধীন। প্রাচীন কালে জৈন্তিয়া রাজ্যকে বলা হতো নারী রাজ্য। এনারী রাজ্যের সঠিক বিস্তার জানা যায়নি। তবে জৈন্তিয়া পাহাড়কে কেন্দ্র করে ছিল এ নারী রাজ্যের অবস্থান। খাসিয়া রাজ বংশের সময় ষোড়শ শতক থেকে বারপুঞ্জি জৈন্তিয়া পাহাড়, সিলেটের উত্তরাঞ্চলের সমতল ভূমি এবং আসামের গোভা ও ডিমারুয়া অঞ্চল নিয়ে জৈন্তারাজ্যের অবস্থান। এ রাজ্যের উত্তরে অহম (কামরূপ), পূর্বে কাছাড়, দক্ষিণে ত্রিপুরা ও গৌড় রাজ্য এবং পশ্চিমে লাউড় ও কামতা রাজ্যের অবস্থান ছিল। প্রাচীনকালে জৈন্তিয়া রাজ্যকে নারী রাজ্য বলার একটি কারণ ছিল এই যে, প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে জৈন্তিয়া রাজ্যের অধিশ্বরী বীর রমনী ছিলেন প্রমিলা। তিনি রূপ-লাবণ্যে ছিলেন অনন্য। তার নামানুসারে এই রাজ্যকে প্রমিলা রাজ্যও বলা হত। কথিত আছে প্রমিলার রূপ-লাবণ্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন মহাবীর অর্জুন। পাগল প্রায় অর্জুন প্রমিলাকে বিয়ে করতে যে কোন কিছু বলি দিতে ছিলেন প্রস্তুত। শেষ পর্যন্ত তার বীরত্বের জন্য পাওয়া স্বর্ণ মুকুটটি দান করেছিলেন প্রমিলাকে। পরবর্তীতে এই স্বর্ণ মুকুটটি রাজ মুকুট না হলেও রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত থাকত প্রত্যেক রাজার কাছে। কেউ এটাকে ভাঙানোর বা অন্য কোন কাজে লাগানোর প্রয়োজন অনুভব করেন নি। জৈন্তিয়া রাজ্যের সর্বশেষ স্বাধীন রাজা রাজেন্দ্র সিংহ বা ইন্দ্র সিং ১৮৩২ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে ক্ষমতা লাভ করলে ধারাবাহিক ভাবে সেই স্বর্ণ মুকুটটি তার হস্তগত হয়। তখন ব্রিটিশ সরকার কঠোর কুদৃষ্টি নিক্ষেপ করে জৈন্তিয়া রাজ্যের প্রতি। প্রথম দুই বছর ভাল ভাবে রাজ্য চালাতে পারলেও তার শাসনামলের ৩য় বছর তিনি নিশ্চিত হয়ে ছিলেন যে, রাজ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব নাও হতে পারে। তখন ঐ স্বর্ণ মুকুটটি রাজা ইন্দ্র সিং ১৮৩৪ সালের নভেম্বর মাসে একজন ধর্মগুরুর হাতে হস্তান্তর করেন। এর কিছু দিন পরই রাজা ইন্দ্র সিং ব্রিটিশ সরকারের হাতে বন্দী হন। কৌশলে ব্রিটিশ সরকার রাজা ইন্দ্র সিংকে গ্রেফতার করে সিলেট দেওয়ান মুরারী চাঁদের বাড়িতে নিয়ে যায়। ১৮৩৫ সালে ঐ বাড়িতেই বন্দী থাকাবস্থায় রাজা ইন্দ্র সিং মৃত্যু বরণ করেন। এ দিকে রাজা ইন্দ্র সিং প্রদত্ত স্বর্ণ মুকুট যে ধর্মগুরুর হাতে হস্তান্তর করেছিলেন তার নাম সম্পর্কে অনুসন্ধান করলে জানা যায় তার নাম ছিল ‘মুনযির’। তিনি তার জীবনকাল পর্যন্ত এটাকে সংরক্ষণ করেছেন। তিনি মৃত্যুর আগে তার একান্ত শিষ্য কুরযাকে আমানত সরূপ সেই স্বর্ণ মুকুট প্রদান করেন এবং বলেন; এটা যেন ধারাবাহিক ভাবে পরবর্তী স্বাধীন রাষ্ট্র প্রধানের হাতে হস্তান্তর হয়। আরো জানা যায়, কুরযার শিষ্য শুধু মানব সন্তান ছিলেন না বরং অনেক জ্বীন বা দানবও ছিলেন কুরযার শিষ্য। কুরযার সবচেয়ে বিশ্বস্ত শিষ্য ছিলেন কুাদামা নামক একজন জ্বীন। যিনি পূর্ণ সময় কুরযার কাছে কাটাতেন এবং তার কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করতেন। কুরযা তার জীবনের অন্তিম সময়ে সেই স্বর্ণ মুকুটটি কুদামার হাতে দিয়ে যান। এরপর থেকে আর সেই স্বর্ণ মুকুটের সন্ধান পাওয়া যায় নি। লোক মুখে শুনা যায়, কুদামার সর্বশেষ অবস্থান বর্তমান সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুরের আশেপাশে ছিল। ১৯৫৫ সালে হরিপুরে গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায় এবং ১৯৫৬ সালে সেখানে একটি বৈদেশিক কোম্পানি গ্যাস তোলার মেশিন স্থাপন করে। কথিত আছে ঐ স্থানে একজন ফকির বসবাস করতেন। তিনি ঐ কোম্পানির এমডিকে কী যেন উপদেশ দিয়ে ছিলেন। কিন্তু এমডি ফকিরের কথায় গুরুত্ব দেননি এবং নিজের ইচ্ছা মতই মেশিনারি স্থাপন করেন ফলে সেখান থেকে গ্যাস তোলা সম্ভব হয় নি। সকল মেশিনারি অথই গহীনে চলে যায়। অদ্যাবধি সেখান থেকে গ্যাস উঠতে আছে যা কোন কাজে আসছে না। যেখানে গর্ত করে মেশিনারি মাটির গহীনে চলে গেছে সেখানের গভীরতাও আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি। মেশিনারি তলিয়ে যাওয়ার পর একদিন ঐ ফকির বলে ছিলেন; “বুঝলেনা তুমি দেশের ক্ষতি করলে, আর কি পাওয়া যাবে সেই স্বর্ণ মুকুট”?
এরপর থেকে এই ফকিরের আর কোন সন্ধান পাওয়া যায় নি। অনেকে মনে করেন প্রমিলার সেই স্বর্ণ মুকুটটি এখানে তলিয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে হরিপুরের সেই স্থানটি দর্শনার্থীদের কাছে "উৎলার পার" নামে পরিচিত। কেউ কেউ 'জ্বলাটিলা' বলেও সম্মোধন করেন। ১৯৫৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত হরিপুরের অন্যান্য স্থান থেকে ৭টি গ্যাসক্ষেত্র প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হলেও উৎলার পারে আর কোন গ্যাসক্ষেত্র স্থাপন করা সম্ভব হয় নি। যদিও প্রতিদিন অনেক টাকার গ্যাস বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে।

প্রাণ প্রিয় ভাইয়া,
সম্প্রতি শুনা যাচ্ছে একদল স্বার্থান্বেষী এই স্বর্ণ মুকুটটি উদ্ধারের অপচেষ্টায় লিপ্ত। উল্লেখ্য: যদি এই কুচক্রী মহল স্বর্ণ মুকুট উদ্ধার করে ফেলে তাহলে রাষ্ট্র এর কোন অংশ বিশেষও ভাগিদার হবে না।
অতএব,
ভাইয়া আমার আকুল আবেদন এই যে, ইতিপূর্বে উক্ত স্বর্ণ মুকুট সম্পর্কিত অনেক পুস্তক রচিত হয়েছে, যে পুস্তকগুলো সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে স্বর্ণ মুকুটের সুরক্ষার জন্য। এসব পুস্তক সংগ্রহ করত: মুকুট সম্পর্কে অবগত হয়ে তা অনুসন্ধানের ব্যবস্থা করে বাদিত করবেন। সর্বশেষ আগামী ঈদের ছুটিতে গোয়েন্দা পরিবার নিয়ে সিলেট ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি।
ওয়াস-সালাম
আপনার স্নেহধন্য
মোল্লা মাছুম
অন্বেষ গোয়েন্দা সংঘ
সিলেট।
বিষয়শ্রেণী: অন্যান্য
ব্লগটি ১২৬ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৫/০৪/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast