www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

স্বপ্ন জয়া

দুচোখে আকাশ জয়ের প্রবল ইচ্ছা নিয়ে শহরে পড়তে আসা কোন একটা মেয়ের জীবন আঠারেতেই এভাবে পরিবর্তিত হবে তা সম্পূর্ণ কল্পনার বাইরে ছিল অষ্টাদশী তিথির। বিকেল বেলা পায়েচারি করা যার অনেক দিনের অভ্যাস, সে আজ বারান্দায় একটা বই হাতে নিয়ে তার একটা নতুন অঙ্কুরিত স্বপ্নের জলাঞ্জলীর কথা লিখছিল আকাশের বুকে। অনার্স ২য় বর্ষে পড়ুয়া তিথির শহুরে জীবন কাটছিলো নতুনত্বকে জানার কৌতূহলে। কিন্তু আজ তার মন খুবই খারাপ। পূরনের আগেই ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্নটা পাথরের মত চাপা দিয়ে আছে তার বুকে। না পাওয়ার একটা কষ্ট তার মনটাকে বিষন্ন করে রেখেছে। ফেসবুকে পরিচিত হওয়া কোন ছেলে তার জীবনের অংশ হয়ে উঠবে সেটা সে কখনোই ধারনা করে নাই।

অপুর সাথে তার পরিচয় ফেসবুকে। অপুকে তার ভীষন ভালো লাগে। তার সাথে কথা বলার জন্য উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতো তিথি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গতকালই প্রথম দেখা করার কথা ছিল অপুর সাথে। তিথির সাথে দেখা করার আশায় অপু এসেও ছিল রজনীগন্ধা হাতে নিয়ে। তিথির পছন্দের ফুল হাতে নিয়ে শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পাশে অনেক্ষন বসে ছিল, কিন্তু এক বুক কষ্ট নিয়ে সেদিন ফুল গুলো জলে ফেলে দিয়ে বাড়ি ফিরেছিল সে। তারপর থেকে কোন যোগাযোগ করেনি তিথির সাথে।
তিথিও দেখা করার প্রস্তুতি নিয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ করে বাবা অসুস্থ হয়ে পরায় তিথির দ্রুত বাড়ি যেতে হয়েছে। ব্যস্ততায় ফোনটা ফেলে যাওয়ার জন্য না আসার কারনটা জানাতে পারেনি অপুকে।

আজ সকালে সে বাড়ি থেকে এসেছে। বাবাও মোটামুটি সুস্থ। কিন্তু অপুর জন্য মনটা খারাপ হয়ে আছে তার। রুমে এসে কারো সাথে কোন কথা বলেনি সে, শুধু চুপচাপ বইয়ে মুখ গুজে বসেছিল। অপুকে হারানোর ভয় কাজ করছিল সারাক্ষন।

বিকালে বারান্দায় বসে এক মনে অপুর কথা চিন্তা করছিল আকাশের দিকে তাকিয়ে। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না সে। একটা ভয়ংকর অপরাধবোধ থেকেই অপুকে ফোন করতে মন সায় দিচ্ছিল না তার।

"কিন্তু এভাবে তো বসে থাকা যায় না। যেভাবেই হোক সব কথা জানাতেই হবে অপুকে, সে নিশ্চই বুঝবে। ", একটা নিঃশ্বাস নিয়ে মনে মনে বলল। সে মনকে স্থির করে অপুকে ফোন দিল। কিছুক্ষন কথা হল অপুর সাথে। তারপর ফোনটা কেটে যুদ্ধে জয়ী উল্লাসিত সৈনিকের মত দৌড়ে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পরল।
"হ্যা, আমি পেরেছি। আমি পেরেছি আমার ভাঙ্গা স্বপ্ন জোড়া লাগাবার প্রথম শর্ত পূরণ করতে।", হাস্যজ্জ্বল কন্ঠে বলল সে।

হ্যা, অপু আবার আসতে রাজী হয়েছে অনেক অনুরোধের পর। তিথির কান্না জড়িত কন্ঠে উচ্চারিত অনুরোধ গুলোকে ফিরিয়ে দিতে পারেনি সে। সেও তো তিথিকে ভালোবাসে। আর এই অস্পর্শ ভালোবাসা এভাবে বলিদান দিয়ে একটা বিষন্ন স্মৃতি নিয়ে সারা জীবন বেঁচে থাকার তো কোন মানে হয় না। তাই হয়তো রাজী হল অপু। তিথি সেই আগের জায়গায় দেখা করার কথা বললেও সেখানে যেতে চাইল না অপু। তাই কথা হল তিথির কলেজের সামনেই আসবে সে। যেখানেই হোক, অপু আসছে! এতেই তিথির মনে যেন স্বর্গ্য জয়ের আনন্দ বিরাজ করছিলো। অপুকে দেখার আকাঙ্ক্ষা তিথিকে ঘুমাতে দিলো না রাতে।

সকাল থেকে কলেজ গেটে দাড়িয়ে আছে তিথি। আজ কোন ভাবেই পরিকল্পনাটা নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। সকাল এগারটা নাগাদ অপু কলেজের সামনে এসে পৌছাল। গেটের সামনেই সে একটি মেয়েকে আবিস্কার করল অন্য মনষ্ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মেয়েটিকে চিনতে ভুল হল না অপুর। আজ সে খালি হাতেই এসেছে। তিথি যেন লক্ষ্যই করল না অপুকে। অপুর ডাকে তার ধ্যান ভঙ্গ হল, চমকিত হয়েই অপুর দিকে তাকাল, মনে হল অপু তার পূর্ব পরিচিত কেউ একজন। তারা যেন দুজন দুজনকে বহুদিন ধরে চেনে। পরক্ষনে তিথি মাথা নিচু করে বলল," কখন এসেছ?"
"এই মাত্র, কেমন আছ?" হেসে জবাব দিল অপু।
তিথিকে দেখেই যেন তার সকল অভিমান ভেঙ্গে গেল।
দুজনে নিশ্চুপ হয়ে আপন মনে পাশাপাশি হাটছে রাস্তা দিয়ে। চেনা শহরটাও আজ যেন খুবই অচেনা লাগছে তাদের। শহরের প্রতিটি ধূলিকনা আজ তাদের মিলনের সাক্ষী।

নিরবতা ভেঙ্গে তিথি বলল," সে দিনের জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। আসলে বাবা হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায়........................."
"থাক না। মিছে মিছে অতীতের কথা স্বরন করে এই আনন্দময় মুহূর্তটাকে নষ্ট করার ইচ্ছা আমার নেই। সেদিন তুমি আসলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না হরানোটা কত কষ্টের। আর সেই কষ্টের পুনরাবৃত্তি আমি চাই না। সেদিনের সূর্য অস্ত গিয়েইছিল আজকে নতুন করে উঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে।", তিথির কথা কেড়ে নিয়ে বলল অপু।
অপুর অলক্ষ্যেই মিটমিট করে হেসে, " চল কোথাও গিয়ে বসি।"
"তাহলে চল নদীর পাড়েই যাই", অপু বলল।

নদীর পাড়ের এই জায়গায় বহুবার এসেছে তিথি। জায়গাটা তার ভালোই লাগে। কিন্তু আজ সব কিছু অন্য রকম লাগছে তার। আজ বোধহয় পাখীগুলো বেশীই ডাকছে, বাতাসটা গাছগুলোকে বেশীই নাচাচ্ছে আর নদীর ঢেউ গুলো বেশীই উত্তাল।
হঠাৎই সে লক্ষ্য করল অপু দ্রুত নদীতে নেমে যাচ্ছে। সযত্নে একটা টগর ফুল ছিড়ে উপরে উঠে আসল সে। অপু দুহাতে ফুলটা তিথির সামনে ধরে আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বলল, " ভালোবাসি "
তিথি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। এ ভালোবাসা যেন তারই প্রাপ্য। আনন্দ অশ্রু ঝরতে লাগল তার দুচোখ বেয়ে।
হয়তো আজ থেকেই কোন অচেনা নতুন পথের অজানা গন্তব্যে পা রাখল দুজনে। এই পথকে সুগম ও দীর্ঘস্থায়ী করা এখন দুজনেরই লক্ষ্য। পরমআত্মার ইচ্ছাও যেন এটাই।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ২৪৫ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২২/০৩/২০১৮

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast