www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

অণু গল্প ফেল

নীল আকাশটা ঘনকালো মেঘে থম থম করছে। কে বলবে ক দিন আগেও এ আকাশে সোনা ঝরা রোদ ছিল, সাদা সাদা মেঘ ছিল, পাখির কলতান ছিল। মনে হয় আকাশটা দুঃখের ব্যাথা নিয়ে গুমড়ে কাঁদছে। সে কান্না বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছে মাঠ, ঘাট, পথে প্রান্তরে। সৈকতের মনের আকাশেও আজ ঘন কালো মেঘ। সেখানে উচ্ছ্বাস নেই, হাসি নেই, ভালোবাসার গান নেই। প্রাণবন্ত, সজীব, সতেজ একটা ছেলে আজ নির্জীব। মা আজ ক দিন ধরে তার সাথে কথা বলছেনা, বাবার মূখ ভার, আত্মীয় স্বজনের বিদ্রুপ, সহপাঠীদের করুণ দৃষ্টি, প্রতিবেশীদের বাঁকা হাসি। সত্যি জীবন বদলাতে সময় লাগেনা। সৈকতের জীবনটাও তেমন এক ঝটকায় বদলে গেছে। একদম তেতো হয়ে গেছে কুইনাইনের মত। যে মা কোন দিন সৈকতের একটু কষ্ট সহ্য করতে পারেনা সে আজ তার সাথে কথা বলছেনা। এর চেয়ে কষ্ট, দুঃখ, যন্ত্রণা আর হতাশা কি হতে পারে? যে বাবা সৈকতকে পাগলের মত ভালোবাসে তার মূখ ভার। একটা পরীক্ষার খারাপ রেজাল্ট তার জীবনটাকে এমন করে বদলে দিবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। আচ্ছা পরীক্ষায় পাশ করাই কি একজন মানুষের পুরো স্বত্ত্বা? সৈকত ভেবে পায়না। কই যেদিন পাশের বাড়ির টুনি পানিতে পড়ে গেল সেদিনতো অনেক ভালো ছাত্ররা পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল কিন্তু কেউতো এগিয়ে আসেনি। আজকের ফেল করা ছাত্র সৈকত সেদিন পুকুরে ঝাঁপিয়ে পরে টুনিকে উদ্ধার করে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। আচ্ছা, এই কাজের কি কোন স্বীকৃতি নেই সমাজে? একদিন স্যার ক্লাস করছিলেন। হঠাৎ কলেজের একটি ক্লাসরুমে আগুন লাগল। ভালো ছাত্রগুলো মন দিয়ে ক্লাস করছিল কিন্ত আজকের ফেল করা সৈকত ঝাপিয়ে পড়ে আগুন নিভাতে। তার দেখাদেখি অনেকেই পরে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নিভে যাওয়ার পর দেখা যায় সৈকতে গায়ের বিভিন্ন স্থানে পোড়া দাগ। আচ্ছা, এই সব মানবিক গুণগুলো কি কোন দিন পরীক্ষার খাতায় যোগ হবে? হবেনা। এ সমাজ পুঁজিবাদি সমাজ। এ ধরনের সমাজে সৈকতেরা ব্যবসায়িক পণ্য। মা বাবা তাদের টাকার বিশাল একটা অংশ সৈকতের মত পণ্যের পিছনে বিনিয়োগ করে। ভবিষৎতে সুদে আসলে তা আদায় করার বাসনা নিয়ে। ফলে শৈশব থেকেই তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয় গাদা গাদা বই। বইয়ের ভারে ছোট বয়সেই মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যায় সৈকতদের। ক্লাস, কোচিং, বাসায় প্রাইভেট এসবের মাঝ দিয়ে সৈকতেরা হারিয়ে ফেলে খেলার মাঠ, গল্প করার সময়, বেড়ানোর সময়, বিনোদনের সময়। চুরি হয়ে যায় শৈশব! যে রিক্সা চালক জীবনের সব পরীক্ষায় ফেল করে রিক্সা চালিয়ে কোন রকমে সংসার চালায়, আর তার অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে কাঁধে করে হাসপাতালে নিয়ে যায়, দিনের পর দিন তার সেবা করে তাকে আমরা কিভাবে ব্যাখা করব? অপর দিকে যে ভালো ছাত্রটি জীবনের সব পরীক্ষায় প্রথম হয়ে বিলাত হতে ডিগ্রি নিয়ে সরকারের উচ্চ পদে বসে মা বাবাকে ভুলে গেল, তাদের মৃত্যুতেও জানাজা পড়াতে পর্যন্ত আসেনা তাকে আমরা কিভাবে ব্যাখা করব? যে ছেলেটি আজ ফেল করেছে কাল সে পাশ করবেনা এটার নিশ্চিয়তা কি? আজ যে ভালো ছাত্র সে হয়ত বিসিএস ক্যাডার হবে কিন্ত যে খারাপ ছাত্র সে কি না খেয়ে থাকবে? না, বরং সে ব্যবসায়ি হতে পারে, শিল্পপতি হতে পারে কিংবা পথের ধারে ঝালমুড়িও বেচতে পারে! জীবন চলে যাবে এক ভাবে না এক ভাবে। তাই একটা পরীক্ষায় ফেল মানেই সে বাতিল এমন ধারণা আদৌ পোষণ করা ঠিক না।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু একজন জেগে আছে। উপরে ফ্যানটা বন্ধ। ফ্যানের সাথে একটা লম্বা গামছা প্যাঁচানো। ছেলেটা শেষ বারের মত ফেসবুকটা অন করে। সংক্ষিপ্ত স্টাটাস " জীবন যুদ্ধে হেরে গেলাম, আর হারব না, এই শেষ। বাবা মা তোমরা ভালো থেকো। আমার সাথে কথা বলোনা, আমার দিকে তাকিওনা। প্রিয় আত্মীয় স্বজন আমায় নিয়ে ব্যঙ্গ কর যত পর। বন্ধুরা আমায় করুণা কর। আমি চলে যাচ্ছি এসবের উর্দ্ধে। তোমরা ভালো থেকো "। গামছটায় টান লাগে। খট করে শব্দ হয়। ঝুলে থাকে নিথর দেহ!

মা বাবা কাঁদছে। চিৎকার করে সৈকতের সাথে কথা বলছে। সৈকত সে কথা শোনছেনা।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৬৩৯ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৭/০৮/২০১৭

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast