
মাগুরার শালিখা উপজেলার বুনাগাতি গ্রামের হুমায়ুন কবীরের রুটি মেকার মেশিন বিদেশে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ভারত, ভুটান, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, দুবাই, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে এই মেশিন গেছে। তার মেশিনটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিদ্যুৎ ছাড়াই এটি চলে এবং প্রতি দুই সেকেন্ডে একটি করে রুটি বানানো যায়। হুমায়ুন কবীর একজন আইটি বিশেষজ্ঞ। তবে পেশার বাইরে নতুন কিছু উদ্ভাবনের প্রতি তার ঝোঁক ছিল বরাবরই। রুটি বানানো নিয়ে মহিলাদের কষ্ট ও বিড়ম্বনার বিষয়টি তার অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। রুটি বানানোর বিদেশী মেশিন বাজারে পাওয়া যায়। কিন্তু বিদ্যুৎ চালিত এ মেশিনগুলোর দাম যেমন বেশি তেমনি বিদ্যুৎ খরচও বেশ। এ ছাড়া ওই সব মেশিনে সেদ্ধ আটার রুটি তৈরি করা যায় না। সর্বোপরি প্রায় সময় দেখা যায় রুটি তৈরির সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এ আর এক বিড়ম্বনা। হুমায়ুন কবীর জানান, এসব বিষয় বিবেচনায় এনে তিনি ২০১১ সালে এই মেশিন তৈরির কাজে হাত দেন। মাত্র তিন মাসের গবেষণায় তার সফলতা আসে। তিনি তার দেড় বছর বয়সের মেয়ে লাইবাকে দিয়ে রুটি বানানো দেখিয়ে জানান, এই মেশিনটির উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্লে-গ্রুপের অবুঝ শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধরা পর্যন্ত এই মেশিনে অতি সহজে রুটি বানাতে পারেন। রুটি তৈরি হবে কাগজের মতো পাতলা এবং আকারে বড়। মেশিনে যেকোনো শেপের আটাই দেয়া হোক না কেনো রুটি হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো গোলাকার। যারা রুটি বানাতে গেলে এবড়ো থেবড়ো করে ফেলেন তাদের সম্মান বাঁচাবে এই মেশিন। হুমায়ুন কবীর তার মেয়ের নামে মেশিনটির নামকরণ করেছেন লাইবা রুটি মেকার। এই মেশিন দিয়ে দেশী-বিদেশী অনেক ধরনের রুটি ও পরোটা তৈরি করা যায়। এর মধ্যে গমের সেদ্ধ আটার রুটি, গমের কাঁচা আটার রুটি, সেদ্ধ চালের গুঁড়ার রুটি, তালের রুটি, কালোজিরা রুটি, মাসকলাইয়ের রুটি, মিষ্টিআলুর রুটি, দিল্লিকা রুটি, বেসন রুটি, ভেজিটেবল টোস্ট রুটি, মাসরুম রুটি, ইন্ডিয়ান বাটার রুটি, খামিরি রুটি, মিছি রুটি, পালক পরোটা, পনির পরোটা, মাঠার পরোটা, মেথি পরোটা, গোবি পরোটা, ইন্ডিয়ান লাচ্চা পরোটা, এগ পরোটা, কিমা পরোটা, ক্যাপসিকাম চিজ পরোটা, ক্যাবেজ পরোটা, পিস পরোটা, লুচি ও ফুসকা প্রভৃতি তৈরি করা যায় বলে হুমায়ুন কবীর জানান। বিদ্যুৎ চালিত মেশিনের চেয়ে হুমায়ুন কবীরের মেশিনে রুটি বানানো সহজ ও সুবিধা বেশি বলে চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে তিনি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন শুরু করেছেন। মানুষের কেনার সুবিধার্থে দাম নির্ধারণ করেছেন দুই হাজার ৮০০ টাকা, চার হাজার টাকা ও পাঁচ হাজার টাকা। তিনি প্যাটেন্ট রেজিস্ট্রেশনের জন্য তার নিজের বাড়িতে একটি কারখানা স্থাপন করেছেন। সেখানে ১০ জন কারিগর নিয়মিত কাজ করছেন। হুমায়ুন কবীর জানান, এখন প্রতি মাসে ১০০টির মতো মেশিন তৈরি হলেও চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। তার ইচ্ছা কাঠের এই মেশিনটিকে সেমি মেটালে উন্নীত করে মাসে অন্তত পাঁচ হাজার মেশিন তৈরি করা। এতে এক দিকে যেমন মানুষের চাহিদা পূরণ হবে অন্য দিকে ব্যাপক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বিদেশে রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর মেশিনটি তৈরি করতে পূর্ণ মেটাল ব্যবহার করে অটোমেটিক ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন করা গেলে মেশিনের দাম ৭৫ ভাগ কমে আসবে। এতে সব মানুষের ক্রয়সাধ্য হবে। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে কারখানাটির পরিসর বাড়াতে পারছেন না। তিনি এ ব্যাপারে ব্যাংক ঋণ সুবিধার দাবি করেন। হুমায়ুন কবীর জানান, তার তৈরি মেশিনটি ইতোমধ্যে নকল করার চেষ্টা হয়েছে। তার কারিগরদের ভাগিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়ে তাদের হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। কিন্তু আশার কথা হলো তারা এখনো সফল হয়নি এবং প্রযুক্তিগত কারণে তারা সফল হবে না।
সূত্রঃ নয়াদিগন্ত
Comments (31)