জানুয়ারির কনকনে ঠান্ডায় ক্যাম্পাসের শিশির ভেজা রাস্তায় কুয়াশার সকালবেলায় সবেমাত্র ক্যাম্পাসে নবীন শিক্ষার্থীদের আনাগোনা বেড়েছে। মতিহারের সবুজ চত্বরে চাঞ্চল্যতায় অপরিচিত মুখগুলো যেন জ্বলজ্বল করছে। তরুন কচি কচি মুখগুলো মৃদু মৃদু ভয়ের শিহরণে দেখা যায় চায়ের টঙের দোকান গুলোয়। উচ্ছ্বাসে উদ্বলিত পুড়ুয়া স্বভাবের কচি কচি মুখগুলো দেখা যায় ফোটো কপির দোকান গুলোয়। তারা যখন দল বেঁধে হাটছে মনে হয় আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নের সীমানায় পৌঁছতে আর একটু বাকি। আমারও মনে পড়ে এমনি দিনে আমার পদচারণ হয়েছে মতিহারের সবুজ চত্বরে বছর তিনেক আগে। চলছে র্যাগিং ভয়াবহতা আর অন্যদিকে প্রশাসনের র্যাগিং এ নজরদারিতা। আমাদের সময় এতোটা ছিল না হালকা টুকটাক সৌহার্দ বিনিময়মূলক র্যাগিং হতো তাও অতিরিক্ত পর্যায়ের না। মনে আছে বান্ধবীর দুঃসাহসিকতার কথা। বান্ধবীর সাথে মজা নিতে যায় ইমিডিয়েড ভাই নিজেই লজ্জায় লাল হয়ে যায়।তবে সে সময় গুলো ছিল আনন্দময় নতুন বন্ধু বানানো।আমি তো প্রথম দিনেই সবার সাথে ফেসবুক ফ্রেন্ড হয়ে যাই। সময়টা যেন চলছে নবীনদের উন্মাদনায়। নবীণবরণ অনুষ্ঠানের রেশেই ক্যাম্পাস টা পেয়েছে উৎসব মুখরতা। বেশ জম্পেশ চলছে সবকিছুই। সংগঠনের কার্য এজেন্ডা,সাহিত্য চর্চা, গান বাজনা, রাজনৈতিক চর্চার আসর সবাই মেতেছে নতুন সদস্য সংগ্রহের লড়াইয়ে। রিক্রুটমেন্টের বুধ,ক্লাস প্রোমোশন, পোস্টার, ব্যানারে ব্যানারে ছেয়ে গেছে পুরোটা ক্যাম্পাস। যে যাক পাচ্ছে নিজের সংগঠণ আস্তায় টানছে।
যত দিন যাচ্ছে কাসের চাপ বাড়ছে। বসন্তের আমেজে পুরো ক্যাম্পাস বাসন্তী আর হলুদে ছেয়ে গেছে। নতুন পুরাতনে একাকার অবস্থা। ক্যাম্পাসে এর আগে কখনো বসন্তে বিশেষ একটা কিছু করা হয় নাই। হয় সারাটা দিন ঘুমিয়েই কেটেছে। নয়তো ফেসবুকের নানান রকম স্ট্যাটাস কিংবা মেসেঞ্জারে মোবাইলে টুকাটুকি কিংবা ইউটিউবেই কেটে গেছে। ওই সন্ধ্যেবেলা কোথায় কোন কন্সার্ট। সেখানে যাওয়া এই আরকি। এবার কেন যেন মনে হলো আর সবাই বসন্তটা উদযাপন করছে ক্যাম্পাস জীবন ফুরাতে চললো একটু না হয় উপভোগ করে যাই স্মৃতির পাতাটায় হোক দুই একটা রঙ্গিন ছবি। রাজুকে বললাম,"রাজু চল এবার বসন্তটা একটু নতুন ভাবে করি। জীবনে কি আছে? ছাত্র জীবনে রঙ রহস্যের দুই একটা ছাঁপই যদি না থাকলো তবে কেমন সে ছাত্র জীবন? আজ সময় আছে কাল হয়তো কোন চাকরী কিংবা কোন পেশা নিযুক্ত হয়ে যাবো।তখন হয়তো সময় হয়ে উঠলো না। তাই সময় থাকতে কয়েকটা স্মৃতি হয়েই নাহয় থাকুক। " দুই জনের গড়ন প্রায় একই। চিকন লিকলিকে শরীরে কয়টি হাড়, শিরা উপশিরা রয়েছে গুনে দেওয়া যায়, পার্থক্য যদি বলা যায় আমি(সাঞ্জু)বকবক করতেই থাকি রাজু নিশ্চুপ নীরব মানুষ। ছোট খাট মানুষ দুইটা ক্যাম্পাসের টঙের দোকান, শহীদ মিনার, সাবাস বাংলা, জোহা চত্বর,হবিবুর মাঠ, টুকিটাকি, স্টেশন বাজার বিনোদপুর গভীর রাতের চায়ের আড্ডা প্রায় সব জায়গায় একই সাথে দেখা যায়। অনেকে তো টুইন্স(জমজ) বলেই ডাকে। ক্যাম্পাসের কোথাও দুইজনের একজনকে একা দেখলে তো বলেই ফেলে আর এক জন কোথায়? অধিকাংশ সময় এক সাথেই কেটে যায়। সারাটা দিনে কত রকম, কতো স্বপ্ন কতো কল্প কথা যে হতো তার অন্ত নেই। হঠাৎ হয়তো রাজু বলে উঠতো, আচ্ছা সাঞ্জু বলতো জীবন? আমি হতবম্ব! হঠাৎ এই কথা! প্রত্যুত্তরে বলতাম," আমার কাছে জীবন হলো আমার সাথে যা ঘটছে,যা ঘটতে চলেছে যা ঘটবে মেনে নিয়ে মানিয়ে নিয়ে যে চলি তাই জীবন।আমি যেমন সুখকর মুহুর্ত গুলো আনন্দময় করে উপভোগ করি ঠিক তেমনি দুঃখময় সময় গুলোও উপভোগ করতে হবে। এটাই হলো জীবন। জীবন মানে পালিয়ে যাওয়া নয়। জীবন হলো যাহাই ঘটুক না কেন তা মোকাবেলা করতে হবে। আমার কাছে এটাই হলো জীবন।"রাজু নীরব থাকতে ভালবাসে আর আমার দাপিয়ে বেড়ানো। তবে সময় গুলো এক সাথেই কেটে যায়।স্বপ্ন নিয়েও কথা হয়। নিজের স্বপ্ন বাবা মায়ের স্বপ্ন চায়ের চুমুকে কতো আবেগের কথাই না হয়ে যায়। বিমর্ষতা কোন ক্রমেই যেন পেয়ে না বসে সেখানেই যেন তীব্র প্রতিবাদে চাঞ্চল্যতা বহুগুণ বেড়ে যায়। স্বপ্নের মধ্যে হয়তো ভিন্নতা দেখা দেয় তবুও স্বপ্ন নিয়ে কথা হয়। গভীর রাতে যখন চায়ের চুমুকে বলতে থাকি বেশ চমকপ্রদই লাগে।
এবারের বসন্ত টা বেশ ভালই গেল।এক কালারের দুইটা পাঞ্জাবি। সকাল বেলা বেড়ুনো, ফোটো সেশন,চারুকলার পিঠা উৎসব, কারুকার্য, জলছবি, চারুকলার বাঙ্গালিয়ানা ধাঁচের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এবারের ১লা ফাল্গুন টা অন্য রকমের এক অনুভুতি। এরই মাঝে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস মাঝের সময় টা কিভাবে যে ছোঁ মেরে চলে গেল বুঝতে পারার আগেই যেন বয়ে চলে গেল। গত বার্ষিক পরীক্ষায় তেমন জুত করতে পারি নাই। রেজাল্ট খানিক টা খারাপই হবে তাই শুরু থেকেই জোড়ে সরে লেগে থাকতে চাই। সেভাবে শুরুও করেছি। রাজুকে বলি রাজু এবার একটু মনোযোগী হতে হবে। এর আগে ব্যাগ কাঁধে ক্লাসে খুব কমই যাওয়া হয়েছে। বই খাতা কলম ছাড়া চোখ কচলাতে কচলাতে তাড়াহুড়ো করে প্যান্ট আর টি-শার্ট গায়ে চড়িয়ে বেসিনে কোন রকমে মুখ ধুয়ে পকেটে পেস্ট ব্রাশ সহ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই কতবার যে ক্লাসে গিয়ে বন্ধু বান্ধবীর কাছে কলম পৃষ্ঠা ছিঁড়ে নিয়ে ক্লাস করেছি তার হিসেব নেই। এবার একটু অন্য রকম ক্যাম্পাসে পুরনো হয়ে গেছি। গ্রাজুয়েশন শেষ করতে হবে। একাডেমীক রেজাল্ট ভাল হয় নাই। স্বপ্ন ভান্ডার নিয়ে ক্যাম্পাসে পদার্পন করেছি তার কিছুই করা হয় নাই।
এবার কাঁধে ব্যাগ খাতা কলম বই পড়ায় সবে মাত্র মনোযোগী হতে মনোনিবেশ করবো ভাবছি।ঠিক এই সময়েই ভয়াল থাবা বিশ্বময় ছেয়ে গেল। প্রথম প্রথম বুঝে উঠতে পারি নাই এই ভয়াল থাবাই যে কাল হয়ে যাবে।পরে দেখি এটাই জীবন হুমকি হয়ে দাঁড়ালো। প্রথম প্রথম সচেতন নাগরিক হিসেবে টুকটাক সমাজ সচেতনতার কাজে নিজেকে জড়াইলাম।পড়ে দেখি "পেটের ক্ষুধার কাছে সবকিছুই ফ্যাকাশে রূপ নেয়।" যখন বিরতিটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে শুরু করলো ভাবলাম বিকল্প ব্যবস্থা খুজে নিতে হবে। শুরুও করেছিলাম কোথায় কিভাবে কেমন করে যেন দমকা হাওয়া এসে সে স্বপ্নের রাস্তায়ও অন্ধকার নামিয়ে দিল।পৌছে দিল সেই শূণ্যের কোঠায়। আবার এগুতে হবে সেই শূণ্য থেকে। তবে যে সময় গেছে সে তো গেছেই তাকে তো আর ফিরে পাওয়া হবে না।
ক্যাম্পাসের সহপাঠী, সংগঠনের সহকর্মী বড় ভাই বন্ধু সকাল ৮.৩০ টায় শুরু অবিরাম চলা রাত ১২/১ টা সময় গুলো যে কিভাবে কেটে যেত বুঝে ওঠার আগেই যেন গ্রাজুয়েশন শেষের দিকে পৌছে দিয়েছে। এইতো সেদিন ছোট্ট একটা কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে মতিহারের এই সবুজ চত্বরে পদার্পন করলাম। তাতেই কিভাবে যেন চারটা বছর পেরিয়ে গেল। স্কাল আসে সন্ধ্যা নামে সময় বয়ে যায়।
Comments (11)