যৌথ
------
যৌথ একটা স্পষ্ট সরল ভেদবিন্দু। ক'দিন আগে কয়েকজন সিক্স সেভেনের ছাত্রী আমার কাছে ঠিকানা জানতে চেয়েছিল। আমি ঠিকানা বলে দিতেই ওদের একজন বলে উঠল - ধন্যবাদ কাকু। তারপরে এক এক করে বলব না বলব না করেও অন্য সবাই বলতে লাগল - ধন্যবাদ আঙ্কেল।
এই সহবত সহজ। অনেকেই করে। আজকাল শহরাঞ্চলের স্কুলে সবাই জানে। গ্রামেও সবাই জানে। আবার অনেকেই বলতে চায় কিন্তু ভেতরে কি যেন একটা বাধো বাধো থাকে তাই সে একা থাকলে বলতে চেয়েও বলতে পারে না। আবার এই সহবত তাৎক্ষণিক বলতে হয়, না হলে ভেবে বলতে পারত। কিন্তু আর বলা হয়ে ওঠে না। সময় পেরিয়ে যায়।
ঠিক একই রকম ভাবে রাস্তায় কোন গণ্ডগোল হলে একজন যদি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে তার দেখাদেখি অনেকেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এবং সেটাই আগুনের অক্সিজেন পাওয়ার মত ছড়িয়ে পড়ে। এই সূত্রপাত যদি আর একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবা যেত এবং সূত্রপাত বিবেচনার অধীন হত তাহলে কোন গণ্ডগোল হয়তো আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ত না। অর্থাৎ যৌথ হলেও তার সূত্রপাত এক থেকেই শুরু হয়। অনেকেই সেই একের তালে তাল মিলিয়ে অনেক হয়ে দাঁড়ায়।
যেটা সে চায় না সেটা করে ফেলে। যেটা সে করবে না ভেবেছিল তাও সে করে ফেলে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ নেশা করা। বিড়ি সিগারেট খৈনি পান মদ ভাঙ গ্যাঁজা ড্রাগ এগুলো এই যৌথ প্রবৃত্তির ফসল। বর্তমানে এ ব্যাপারে অন্যতম সংযোজন নেট কালচার। ফেসবুক হোয়াটস অ্যাপস গুগুল। কত যে এর মধ্যে ঢুকে নষ্ট হয়ে গেছে এবং নষ্ট হচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। আবার কত যে অন্যরকম যৌথ দিশায় নিজেকে খুঁজে পেয়েছে তাও অগুনতি।
তাই ধ্বংসে যৌথ হবেন না। এক থেকে অনেক হবেন না। একটু দূরে দাঁড়ান। দেখবেন এক হতোদ্যম হয়ে পড়বে। মারামারি খুন জখম রাহাজানি নেশা ভাঙ্গ করা কিংবা ধর্ষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে কখনই যৌথ হবেন না। কেউ একজন শুরু করলে আপনারা যদি বাধা দিতে না পারেন কিন্তু যৌথ হবেন না। তাহলে দেখবেন সেই অপরাধ বেশি দূর আর এগিয়ে যাবে না।
কিছু ভাল গুণ সৎ সঙ্গ ইত্যাদিও এভাবে হয়তো হয় কিন্তু তা খুবই নগণ্য। ভাল, অতি ভাল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ছে। কেন না মনুষ্য চরিত্রই হল একজনকে ডিঙিয়ে আর একজনের উপরে ওঠার প্রয়াস। কিছুতেই কেউ কাওকে জায়গা ছাড়বেই না। আপন মর্যাদায় নিতে চাইলেও ছাড়বে না। ফলে যৌথ বিবরণ সেখানে গড়মিলে ভর্তি।
চারিদিকে প্রচুর সাহায্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এমন কি আমি বা আপনি রাস্তার বৃদ্ধ লোকটি বা ভিখারিকে যে কোন সাহায্য করতেই পারি। কিন্তু একটা বাঁধো বাঁধো ঠেকে যায়। যাব, না থাক; হাত ধরব, না থাক; কিছু দেব, না থাক; অন্যায় হচ্ছে প্রতিবাদ করব, না থাক। এ রকম অবস্থান কাজ করে সবার মধ্যে। আবার পাশের কেউ এগিয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতর এগিয়ে যাওয়া এগিয়ে গেল। ফলে যৌথ অবস্থানে সেটাই ফলপ্রসূ হল।
এই তো কয়দিন আগে এক ভদ্রমহিলা জলের বালতি নিয়ে পড়ে গেলেন। আমরা পাঁচ ছজন দাঁড়িয়ে ছিলাম। তার মধ্যে থেকে এখানে কনট্রাক্টরের আণ্ডারে কাজ করতে আসা একজন লেবার সবার আগে ছুটে গেল। তুলল। আমরা গেলাম পরে। নানান বাতেলা মারলাম। কিন্তু এই সাহায্যের প্রেরণা আমার মধ্যে কতটা এল। আমার চেয়ে আরও বিবেকবান দাঁড়িয়েছিলেন তাদের মধ্যেও বা কতটা এল?
অথচ এটা যদি কোন চোর ধরার কাজ হত। যেমন আমার সামনে হয়েছিল। আগেভাগে দৌড়ে হাতের সুখ করে নিলাম। এই যৌথ যাত্রায় সকলের জীবন কি পাচ্ছে? ভাল সহবতের আঙিনায় যৌথ অবারিত কবে আকাশ হবে?
চেয়ারে বসে নেতা বলল- না, এটা অন্যায়। হতেই পারে না। এভাবে কাজ না করলে ভাল হবে কি করে? তোমরা যতই তড়পাও উনি ঠিক করেই রেখেছেন।
আবার বিচার সভার পরে সেই নেতা তার সাঙ্গোপাঙ্গদের বলে বসল - কি রে, তোরা সব ভেড়ার মত লেজ গুটিয়ে চলে এলি। এভাবে আমাদের চলবে কি করে? তোদের কি হবে কি হবে না এসব ভেবে দেখতে বলেছি?
মুখ নিচু করা সঙ্গোপাঙ্গোরা বলল - আপনিই তো না না করলেন।
- আরে চেয়ারে বসে আমি তো না না বলব। তোরা একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়লে, দু চার ঘা দিয়ে দিলে বিচার আমাদের পক্ষে চলে আসত। যত্সব গাধা গুবরেপোকার দল।
এর পর থেকে এই প্রসেস সবাই শিখে গেছে। সবার সামনে কিভাবে ন্যায় অন্যায়ের ভাল মন্দের হিসেব বদলে যায়।পাশা ওল্টাতে সবাই শিখে গেছে। যৌথ আর দলভারির অবস্থান। ন্যায় অন্যায়ের তখন দাঁড়িপাল্লা থাকে না।
তাই যৌথ রাজত্ব করে। আবার অন্য বিরোধী যৌথ জোগাড় করে, যৌথ বল বাড়ানোর চেষ্টা করে। তারপর বিরোধী রাজত্ব করলে একই কাজ করে। এইভাবে বাটন এগিয়ে যায় মেজরিটির দিকে।
উল্টোদিকে সবার একা থাকার মানসিকতা গড়ে উঠছে। এখানে একা বলতে শুধু আমার নিজের সংসার। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। তাতে নিজেরাই যখন খুব একা হয়ে পড়ে। আশেপাশে খুঁজেও যৌথ পায় না কিংবা নিজের মনের মত হল না তখন নিজের ফাঁসে নিজে আটকে। অবসাদ! অবসাদ চেপে ধরে। যৌথ অবস্থান এসব অনেক কিছু থেকে জীবন নির্মল করে দেয়। তাই শত বাধায় কোন জীবন যেন কোন মতে একাকীত্বে না ভোগে। দিনের অনেকটা সময় যদি কাওকে একা কাটাতে হয় তাহলে সে জানে কি দুর্বিষহ সে যন্ত্রণা! নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির সবাই কাজের মধ্যে আছে। কোথাও না কোথাও যৌথ অবস্থানে আছে। ঠিক আছে। কিন্তু কোন সদস্যকে যদি একা থাকতে হয় তাহলে তার অবস্থান বোঝা সবচেয়ে বেশি দরকার। একা থাকার দুর্বিষহ যদি সে সামলে উঠতে পারে ভালো না হলে অবস্থান অন্য। এ ব্যাপারে টিন এজ ভাবনা আরো বেশি করে ভাবা উচিত।
আজকাল অনেকেই ঘর বিচ্ছিন্ন। বেশিরভাগ কর্মসূত্রে। এ ওখানে যাচ্ছে ও এখানে আসছে। ফলে পরিবারতন্ত্রের মধ্যে একটা বিচ্ছিন্নতাভাব। যৌথ থাকার মানসিকতা উধাও। একটু আধটু যতটা দেখা যায় তা তাৎক্ষণিক। তাই স্কুল কলেজ বা অফিসে পাওয়া বন্ধু ঠিক কত সম্পূর্ণরূপে বন্ধু সেটাও ভাবা দরকার। কেন না সবাই যে বিচ্ছিন্ন অবস্থানের শিকার। যৌথ ভাবনা, জয় বীরু বন্ধুত্ব ভাবনা দূর অতীত না হয়ে দাঁড়ায়। আর কর্মসূত্রে বেশিরভাগ পেয়িং গেস্ট নয় ভাড়াটে। ফলে আপদে বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া যৌথ প্রতিবেশিকতা ভাবনার বিষয়।
তবে আগেই বলেছি সাহায্য কিন্তু সর্বত্র হাত বাড়িয়ে আছে। যৌথ ভাবনায় আপনাকে যেমন আত্মস্থ করতে হবে তেমনি পরিস্থিতি হঠকারিতায় এগিয়ে যাবে না, অবশ্যই বিবেচনাধীন হবে।
মন্তব্য (6)