www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

কবি শিকদারের দিনকাল

বাস থেকে নেমেই চায়ের দোকান পেয়ে যায় শিকদার । বেশ কিছুদূর হেঁটে যেতে হবে। তাই চা পানি খেয়ে নিতে চায়। একবার এক পত্রিকার সম্পাদক তাকে ঘণ্টা তিনেক বসিয়ে রেখেছিলেন। চা তো দূরে থাক পানি খাবার অফারও দেয়নি। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে আর ঝুঁকি নেয়না। পাশ করার পর চাকুরির চেষ্টা করেছিল। শখানেক সিভি বিভিন্ন জায়গায় জমা দিয়েছিল। দুই একটা প্রস্তাবও এসেছিল। বেতন কম। ঢাকার বাইরে কাজ করতে হবে। তাই যায়নি । এখন কাব্যচর্চায় সময় কাটে । যদিও জানে এই লাইনে তেমন ভবিষ্যৎ নেই।কবিতা লিখে সে জীবন চালাতে পারবেনা। কেউ নতুন কবির কবিতা পড়তে চায়না। আর কবিতাই বা ক’জন পড়ে ? স্কুল কলেজের পাঠ্যসূচিতে যেসব কবিতা থাকে তাও তো তেমন কেউ পড়েনা । নোট পড়ে উত্তর লেখে। কিন্তু অন্য কোন গুণ তার আর নেই। সে শুধু কবিতাই লিখতে পারে। এই জিনিসটা তার ভেতরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে। দুই একটা প্রাইভেট আর কোচিং এ ক্লাস নেয় শিকদার । বিয়ে করেনি। নিজেরই খরচ মেটে না আবার বিয়ে। মেসে থাকে সে । চলে যায় কোনরকমে । সকালে নাস্তা করা হয়নি শিকদারের। দুটা বিস্কিট খেয়ে চা খেয়ে বেড়িয়ে পড়ে । কতদিন ভাল করে নাস্তা খাওয়া হয়না। পরাটা গোশত ভাজি খেতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু খুব হিসেব করে খরচ করতে হয়। বেশ কিছুদূর হেঁটে চলে আসে প্রকাশকের অফিসের কাছে। সস্তা চিরুনি দিয়ে চুল ঠিক করে নেয়। প্রকাশকের রুমে প্রবেশ করে। ভালভাবে তাকায়। ইনিই প্রকাশক এটা ভাবতে খুব কষ্ট হয়। বেশ আমুদে চেহারা। খোর খোর চেহারা। পান সিগারেট একসাথে খাচ্ছেন। জীবনে ভালমন্দ ভালই খেয়েছেন তার শরীরই বলে দিচ্ছে। বসতে বলেন শিকদারকে । তারপর ফোনে মনোযোগ দেন। ওপাশে যে কথা বলছে তিনি যে একজন নারী বুঝতে কষ্ট হয়না শিকদারের । আর তিনি যে ভদ্রলোকের! স্ত্রী নন তাও বুঝতে পারে। আলাপের বিষয় এখানে প্রকাশ অপ্রাসঙ্গিক। শিকদার আধুনিক কবি। তাও তার কিছুটা লজ্জা লাগে।আলাপ শেষ করে মদখোরের মত বলেন, “কবিতা এনেছেন । কই দেখি”। কিছুক্ষণ চোখ বোলান । গম্ভীর হবার চেষ্টা করেন। বোদ্ধার মত ভান করেন। বলেন, “ ভালই হয়েছে ।তবে অশ্লীলতা কম। এখনকার পাঠক । হে হে বুঝতেই পারছেন। এগুলো না থাকলে পড়তেই চায়না। আরও কিছু এই ধরণের কবিতা নিয়ে আসেন দেখি কি করা যায়” ।শিকদারের খুব ঘৃণা হয়। রাগ উঠে যায় । “থাক ছাপাতে হবেনা” বলে বের হয়ে আসে। এ ধরণের অভিজ্ঞতা নতুন নয়। তবে আজ বেশী খারাপ লাগে। বের হয়েই সিগারেট ধরায়। হাঁটতে থাকে। সত্যিই কি পাঠকরা এমন হয়ে যাচ্ছে ? দৈনিক গুলোর সাপ্তাহিক সাহিত্য পাতায় বেশ কিছু কবিতা পাঠিয়েছিল শিকদার। একটি বাদে আর ছাপা হয়নি। পরিচিত কবির কবিতা ছাড়া নতুন কবির তেমন কবিতা সেখানে দেখতে পায়নি শিকদার। আবার বাস ধরে। ঝুলতে ঝুলতে মেসে চলে আসে। দুপুরের খাবার সেদিন খুব বিস্বাদ লাগে। মেসের খাবার। অন্যদিন তাও কোনমতে খেয়ে নেয়। আজ খুব কষ্ট হয় । খেতেই পারেনা। জীবনানন্দ দাশের কবিতা তার খুব পছন্দ। “সেরা জীবনানন্দ” পড়তে থাকে। কবিতার মধ্যে ডুবে যায় । কই কোন অশ্লীলতা তো নেই। প্রকৃতির কি নিখুঁত বর্ণনা। পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যায় শিকদার। ঢাকা শহরে তার দুই একজন বন্ধু আছে। কেউ কবি নয় কবিতাও পছন্দ করেনা তারা। চাকুরি করে বলে শিকদারকে সময় দিতে পারেনা । শুক্রবার ছুটি। সেদিন তারা বেহুঁশের মত ঘুমায়। কবিদের আসরে যেতেও ভাল লাগেনা। সেখানে শুধু পরচর্চা আর নিজেকে বড় করার অপচেষ্টা । কয়েকটা মেয়েও ইদানিং যোগ দিয়েছে এই আসরে । তারা কবিতা পড়েনা । শুধু লিখতে চায়। গভীরতা নেই। অথচ তাদের কবিতা ছাপা হয়। সেটা নিয়ে ভাব গভীর আলোচনা হয়। তাদের দুই একজন আবার সিগারেটও খায়। পোস্ট মরডানিজমের শেষ সীমায় নিয়ে যেতে চায় নিজেকে। এসব আসর তার ভাল লাগেনা। প্রাইভেট পড়িয়ে বাসায় আসে প্রতিদিনের মতো । দেখে চিঠি এসেছে কুরিয়ারে। খুলেই খুশী হয়। তার কবিতা ছাপাতে চাচ্ছে এক প্রকাশক। শেষের দিকে এসে মন খারাপ হয় । অর্ধেক খরচ তার দিতে হবে। সেই কবিতা লিখবে। খরচ কেন তাকে দিতে হবে? ভেবে উত্তর পায়না। আশা নিরাশায় পরিণত হয়। খুব ইচ্ছে করে বই ছাপাতে। তার লেখা কেউ মুগ্ধ হয়ে পড়ছে ভাবতে ভালই লাগে। নিজেকে সবার থেকে অন্যরকম মনে হয়।পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ে শিকদার । পরদিন সকালে আবার কোচিং এ যায় । ক্লাস শুরুর আগে আড্ডা দেয় । পেপার পড়ে । সেদিনও পেপার পড়তে বসে। বিজ্ঞাপন পাতায় দেখে বই ছাপার বিজ্ঞাপন। কোন টাকা লাগবেনা। তবে পাণ্ডুলিপি তারা একজন বিখ্যাত লেখককে দিয়ে দেখিয়ে নেবে। যদি তার পছন্দ হয় তবেই ছাপা হবে। ঠিকানা নিয়ে আসে শফিক। পাণ্ডুলিপির ফটোকপি করে। যদি না ছাপায় তাহলে তো সব যাবে। তারপর আবার চলতে থাকে জীবন। পাণ্ডুলিপির কথা ভুলে যায় শিকদার। একদিন সকালে কুরিয়ারে চিঠি আসে। খুলে অবাক হয়ে যায় শিকদার । তার কবিতার বই ছাপা হবে।কোন টাকা লাগবেনা। উল্টা কিছু টাকা পাবে। চোখে পানি চলে আসে। কতদিন এমন আনন্দের কান্না আসেনি শিকদারের। বুকের ভেতর কেমন জানি লাগে। সবকিছু শূন্য মনে হয়।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৬৫৬ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৩/০৫/২০১৭

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast