মধ্য দুপুর । সাইকেলে চেপে বাজার থেকে বাড়ি ফিরছি । সূর্যের প্রখরতা এত বেশি যে, মাঝপথে বিকট শব্দ করে টায়ার ফেটে গেল । কী আর করার , পায়ে হেঁটে যাত্রা আরম্ভ করলাম ।
বেশ হইচই শুনা যাচ্ছে সুপারি বাগানের ওপাশের রাস্তায় । কিছু লোক বেশ উৎসাহ নিয়ে ছুটে যাচ্ছে সেদিকে । আমিও তাদের সঙ্গে যোগ দিলাম । অনেক লোক ভিড় করে আছে । পরিচিত একজনকে ডেকে বললাম যে মূল ঘটনা কী । স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছে না । ভিড় ঠেলে আরেকটু আগালাম ।
এবার স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, রিকশাচালক বকুলের শার্টের কলার চেপে একজন দু'গালে বেশ জোরে জোরে চড় কষাচ্ছে আর বলছে, 'বল্ হালা, আর অন্যের জিনিষের উপর হাত দিবি । বল্ অজাতের বাইচ্ছা, বল্ ।' মাঝে মধ্যে দু-একজন পিছন থেকে লাথি তো মারছেই । চুপ করে আছে বকুল । এ সময়টায় বকুল পৃথিবীর নিরীহতম প্রাণী । আর যারা তাকে পেটাচ্ছে, তারা যে কী পরিমাণ মজা পাচ্ছে— সেটা ওদের পেটানোর মাত্রা দেখেই বুঝা যাচ্ছে । চোর পেটানোর মজাটাই আলাদা ! আর এই দৃশ্যটা দেখার মজাও কোনাংশে কম নয় !
কী চুরি করেছে বকুল ? পাশে তো একটা পাকা সুপারির টাঙা ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছি না । তবে কি এই এক টাঙা সুপারির জন্যই বকুল এখন এতগুলো লোকের মহা-আনন্দের খোরাক ? লাথি, চড়, ঘুষির পরিমাণ বেড়েই চলছে । যেভাবেই হোক, এসব চুরি-চুত্তামি উৎখাত করে সমাজটাকে পরিচ্ছন্ন রাখা চাই । কেউ বলছে কোরানের আইন অনুযায়ী হাত কেটে দিতে । কেউ বলছে চোখ খুলে ফেলতে । আবার কেউ বলছে যার জিনিষ সেই রায় দিবে ।
দশ মিনিট পর সম্পদের মালিক রইসুল আসলো । ততক্ষণে বকুলকে বেঁধে ফেলা হয়েছে । অগ্নিবর্ণ চোখে বকুলের দিকে তাকিয়ে আছে রইসুল । মনে হয় এক্ষুনি গিলে খাবে । হঠাৎ বুকের মধ্য একটা ঘুষি বসিয়ে দিলো । তারপর একটানা লাথি । এমন সময় পাকা দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে মুরব্বি কাশেম বলে উঠল, ‘আরা মিয়া, এসব কিল ঘুষি এগো কাছে পানিভাত । দরকার সোজা চোখ খুলে নেয়া । অন্যের হকের প্রতি এত লোভ অইত ক্যান ।’
না, সেদিন বকুলের চোখ খোলা হয় নি ঠিকই ; কিন্তু ন্যায় প্রতিষ্ঠার যে মহৎ প্রচেষ্টা চলেছে— সেটা শুধু বকুলের মত মানুষের উপরেই সম্ভব । কেননা, এর কিছুদিন পর মালিক রইসুল ক্ষেত-মজুর মানিকের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর সঙ্গে জোর-পূর্বক সঙ্গম করে, কোন এক শক্তির দ্বারা অক্ষত অবস্থায় ঘরে ফিরে স্ত্রীর পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে । কী সেই শক্তি, সেটা তো সজ্ঞান প্রতিটা মানুষরই জানা ।

মন্তব্য (1)