www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ধূসর আয়না ( প্রথম পর্ব) মল্লিকা রায় ।

উপন্যাস / ধূসর আয়না
( প্রথম পর্ব) মল্লিকা রায় ।


প্রথম দেখেই চমকে উঠেছিল অতসী , কে ও? ওর অতীত? ফেলে আসা অপূর্ণতা ? নাকি ওর অন্তরাত্মা! লিখতে শুরু করা থেকে কত যে উৎপাত ,কত হিংসা, প্রতিহিংসার বৈচিত্র্যে ওর দেহ মন ছাড়খার হয়েছে তার হিসেব রাখেনি। যখন পাবার ছিল পায়নি কিছুই, অসম্পূর্ণ এক জ্বলন্ত প্রহর হয়ে টিকে ছিল কোনমতে। সেদিন যা অসম্ভব, জটিল ছিল আজ কেন যে জলের মত সহজ হয়ে বিনষ্ট করতে চাইছে ওর অস্তিত্ব নিজেই বুঝতে পারে না। অথচ তখন বড় প্রয়োজন ছিল কিছু উদারচেতা মানুষের। কেন হয়নি ও যেমন নিজেই জানে না তেমন জানেনা হঠাৎ করে আজ সেই পরিস্থিতি গুলোরই চরম লক্ষ্য বস্তু কেন হল। এক আধটু লেখার শখ্ বরাবরই ওকে ভাবনা চিন্তায় একটু পৃথক করেছে। পৃথক করেছে যাবতীয় অপ্রচলিত, গতানুগতিক সংস্কার থেকে। ঠাকুরমার প্রসাদী সিন্নির কাঁচা দুধের মিশ্রণ যে বিষাক্ত সে অপব্যাখ্যা আপাতত মুলতুবি থেকেছে, মুলতুবি থেকেছে বেড়োনোর সময় হাঁচি, চরম শত্রুতায় একান্ত স্বজনকে হাপিস করে দেওয়া বা গুম করে দেওয়াকে শত্রুপক্ষের ভাগ্য বলে গুণকীর্তনের কচকচি অধ্যায়ও। ব্যখ্যা মেলেনি বলে কত বিষয়ের যে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে সে আর বলে শেষ করা যাবে না। একেক সময় ওর নিজের কাছেই উত্তর মেলে না কোন। ও সবার মত না কি সবাই সবার মত ওই শুধু ব্যতিক্রম। তাহলে কেন পড়ার টেবিলে চমকে উঠেছিল একরত্তি ছাত্রের চোখ মারা দেখে। এটাও কি নিয়মের পর্যায় পরে? হয়তো!! একটা লোকের ভাঙাচোরা মুখে ও শুনেছিল, কেউ নিয়ম তৈরী করে না। মানুষই মানুষের সৃষ্টি ও ধ্বংসের কারণ,বস্তুত যেখান থেকে সভ্যতার উৎপত্তি ধ্বংসও ও একই বিষয়ে কেন্দ্রীভূত। একটা একে ফরটি এইট তৈরী করতে মানুষের যতটা কৌতূহল একটা ভালো অভ্যাস তৈরী করতে ততটাই অনীহা। অতসীর ভাগ্য জুড়ে আজ শুধুই বিড়ম্বনা। একটা বাস্তবের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেকগুলো কারণ এসে হুরমুড়িয়ে পরে তাদের কতযে প্রকার চমকে চমকে উঠতে হয়। যে অাদর্শে অনুপ্রাণিত শরীর মন হঠাৎ করে এক ঝটকায় তার বিকৃত উপাদান সামনে দাঁড় করায়। ধ্বসে যায় অস্তিত্ব, বিশ্বাস সব। পেছন থেকে অস্তিত্ব চেপে ধরে খাদ্য কেলেঙ্কারির কালো হাত। এই এক নান্টু দা, বোঝা যায় না লোকটাকে, তখন নান্টু দা'র ফিগার নিয়ে, ফিটনেস নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় মহিলা মিটিংয়ে কত যে রসের কাহিনী। কত উন্মাদনা। তখন ভদ্রলোককে বেশ লাগত মুখচোরা হলেও অতসীর কেমন একটা প্রচ্ছন্ন কৌতূহল ছিল, কত্ত পুরোনো সেসব কথা তারপর কত জল কোথায় গড়াল, নদীটদী সব ভুলভ্রান্তি মিটিয়ে মিলে মিশে গেল । এখন তা অতীত প্রায়। হাত ঘড়িটায় সবুজ টেপ লাগিয়েছিল,দুদিন হল খুঁজে পাচ্ছে না কে যে ঝেড়ে দিল, দু'দন্ড চোখ ফেরানোর উপায় নেই কুকো পাখির মত মুখিয়ে আছে কিছু সুযোগসন্ধানী ঝোপ বুঝেই কোপ মারার ধান্দায়, এদের কাছে ধান্দা হল সবচাইতে বড় ভাগ্য। চোখ বুঁজে টিপ লেগে গেল তো ব্যস । কি যে বলা যায় এদের বুঝে পায়না অতসী। জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে অনেককিছু বোঝা হয়নি, অনেককে জানা হয়নি চেনা হয়নি ঠিকমতো। সেইসময় যাকে বেশী ভাল লাগত বা ভাল মনে হত আজ যেন তারই অত্যন্ত জঘন্য রূপ দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করছে সবথেকে বেশী। তাহলে অস্তিত্ব কি? শুধুই একদলা ভোগ? সৃষ্টি কর্তা সৃষ্টির পাশাপাশি রেখেছিলেন অসীম পৃথিবীর কর্মভার সাথে কতগুলি ইন্দ্রিয় , যা ইদানীংশুধু ভোগসুখে ব্যবহৃত হচ্ছে । তবে সৃষ্টিকর্তা সেঁটে দিয়েছিলেন তার সাথে টিঁকে থাকার কার্য কারণ। মানুষ কিভাবে টিঁকিয়ে রাখবে নিজের অস্তিত্ব? প্রচন্ড আওয়াজ করে বাসটির ব্রেক কষায় সিট থেকে ছিটকে গেল কিছু যাত্রী। অতসীর মাথার ডান দিকটা মনে হল ভারী কিছু দিয়ে কেউ আঘাত করল যেন। এক যাত্রী ভদ্রলোক তাকে ধরে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলেন। মাথার ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে বসে পরে সিটে, কনডাক্টর জানায় একদল বাছুরকে বাঁচাতেই নাকি এই অনাসৃষ্টি। অতসী কৃতজ্ঞতা জানায় ভদ্রলোককে, জানেন আপনার মত মানুষ এখনও আছেন বলেই আমাদের ভরসা নিঃশেষ হয়ে যায় নি, আরে না না যে কেউই এগিয়ে আসতো ভদ্রলোকের নিরাসক্ত উত্তর। তাহলে তো পৃথিবীতে মানুষ কত ভাল ভাবে মিলে মিশে থাকতে পারতো বলুন তো? কি যে বলেন! ভদ্রলোক কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলেন মনে হল। কেন, আপনি মানেন না? এই যে এত ভোগসুখের আয়োজনে ঢালাও চাহিদা সামাল দিতে সৃষ্টি হচ্ছে কৃত্তিম মানুষ একপ্রকার মানুষের ইমেজ হৃদয় অনুভূতি শুণ্য। এদের কাজ হল সমাজে একনায়কতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করা যাদের কাজ হল সমাজকে পেছিয়ে নিয়ে চলা ,পুরোনো ধ্যান ধারণা, রীতি নীতি আকড়ে রেখে মানুষের সৃষ্টি শীলতা ক্রমশঃ বিনষ্ট করা সাথে সাথে অর্থ নীতির একচেটিয়া কুক্ষিগত করে আপাত নিরীহ মানুষকে সমাজ থেকে বঞ্চিত করা। মানেন আপনি? মানলেও বলার ক্ষমতা নেই। অতসীর মুখের দিকে চাইলেন ভদ্রলোক। হতাশ হল অতসী ভেবেছিল বাসের ভেতর একটা ফাটাফাটি রকমের বিতর্কের সৃষ্টি হবে। গত কয়েকদিন যাবৎ মেজাজটা অসহ্য তেতে রয়েছে নানা কারণে ঠিকঠাক স্পট পাচ্ছে না পেলেই একহাত নেওয়া যেত অন্তত এই ম্লেচ্ছ সমাজটাকে কষিয়ে মারা যেত লাথি। অবাক লাগে আজকাল পুরুষ গুলো কেমন ম্যাদা প্রকৃতির কোন আদর্শ নেই, নেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মানসিকতা নিতান্ত সৌজন্য বোধটুকও পাওয়া যায় না আজকাল হল কি সমাজটার?পুরুষের পৌরুষত্ব সেঁধিয়ে গেল নারী গর্ভে ? নাহ্ আর ভাবতে অসহ্য লাগছে ওর। সমাজের ভোগের জোঁয়ারে গা ভাসাতে পারার সাথে মনুষ্যত্ব হীনতার কি যোগ রয়েছে ভাবতেই থাকে, দৃষ্টি কোথায় নিবন্ধ হয় কেজানে। হঠাৎ আবার সেই আগন্তুক। বাসের পা 'দানিতে পা রেখেও নেমে গেলেন আচমকা। কে, কেও? খুব মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করছে অতসীকে। পিছিয়ে পরা লোকটির মুখ হাতাতে থাকে স্মৃতির গভীরে। কাউকেই মনে করতে পারছে না এই মুহূর্তে । জীবনের অধ্যায় থেকে মুছে গেছে বহু সম্পর্ক বহু মানুষ বহু অতীত তাকে আর মনেও করতে চায় না ও। কিন্তু ওই ভদ্রলোক তাকে ওভাবে লক্ষ্য করছিল কেন ? মুখচ্ছবির কোন একাংশে একটু চোখ আটকে গিয়েছিল মুহূর্তের জন্য, ঠোটের কোনে সিগরেট চেপে ধোঁওয়া ছাড়ার ভঙ্গী ও সেলফোনে কথা বলার সময় ঈষৎ মুখ টিপে হাসার ভঙ্গী যেন কোথায়, কার সাথে সম্পূর্ণ মিলে যাচ্ছে অথচ অস্তিত্বটা প্রকট হচ্ছে না কিছুতেই। ভদ্রলোক যে ওর পিছু নিয়েছে সে ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন বাসে ওঠবার কিছু পরেই একই ঘটনা যদিও খুব একটা আমল দেয় নি অতসী আবার তার পুনরাবৃত্তি। ভদ্রলোক কি তাকে কিছু বলতে চায়? কি সেটা? সামনেই ওর স্টপেজ নেমে যেতে হবে, শাড়ীর ভাজ ঠিকঠাক করে স্টেডি হয়ে উঠে দাঁড়ায় ও। পাশের মেয়েটি ঠেলেঠুলে বসে পড়ে সিটটায়, ঘেঁমে নেয়ে একসা রুমালে মুছতে মুছতে হেসে বলে প্লিজ্ ডোন্ট মাইন্ড ম্যম। আরে না না বাসে ট্রেনে সিট পাওয়া আর এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া দুটোই আজ দারুণ দামী। একযাক্টলি ম্যম। লাফিয়ে উঠল মেয়েটি একদম আমার মুখের কথাটা টেনে বার করেছেন ম্যম তরিঘরি করে স্টপেজে নেমে যায় অতসী। অটোস্ট্যন্ডের দিকে এগোতেই সেই লোকটা চোখে সানগ্লাস চোখাচোখি হতেই ডান হাতের একটা আঙুল দেখিয়ে অদ্ভুত ইশারা করে। মাথায় আগুন জ্বলে যায় মুহূর্তে কারণ ইঙ্গিতটা যে কদর্য ও নোংরা সেটা নিতান্ত শিশু ও বোঝে ।কি বলতে চায় লোকটি? অবশ্যই নোংরা ইঙ্গিত বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনদিকে না তাকিয়ে হনহন করে এগোতে থাকে অতসী। হুট করে মনে পড়ে যায় বছর পাঁচ আগের এক টুকড়ো অধ্যায়। খুব খারাপ অবস্থায় মৃগাঙ্ককে নার্সিং হোমে এডমিট করতে হয় ডাক্তারের এডভাইস অনুসারে, ওর মাথার রোগটা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায়। তখন নার্সিং হোমের লম্বা চওড়া ফর্দ হাতে নিয়ে মেডিসিনের দোকানে প্রায় কান্নায়় ভেঙে পরেছিল অতসী ঠিক এই ভদ্রলোকের সহায়তায় ও সেবার হাতে পেয়েছিল ওষুধগুলো। একটি পয়সাও নেননি ভদ্রলোক। পরে অনেকবার অতসী টাকা দিতে গেলেও উনি সে টাকা নিতে চান নি। সেবার খুব কষ্ট করে মৃগাঙ্ককে সুস্থ করে বাড়ী ফেরাতে পেরেছে ও। বিয়ের পরের মাসেই ধরা পরেছিল ভয়ংকর পারকিনসন স্নায়ু রোগ যা রুগীর বোধশক্তি, আচরণে প্রভাব ফেলে রুগীকে শিশুতুল্য আচরণে প্রভাবিত করে। দীর্ঘ আঠারো বছরের এই গারমেন্ট কোম্পানি আর মৃগাঙ্কর মানসিক/শারিরীক প্রতিবন্ধকতা এই ওর একমাত্র জীবন। পাশে অসুস্থা বৃদ্ধা মা। বাড়ীতে আরেক অদ্ভুত পৃথিবী ওর জন্য হাঁ করে থাকে ঢোকা মাত্রই শুরু হয় আরেক অভিনয়ে মৃগাঙ্কের অদ্ভুত সব চাহিদা পুরণ। কখনও নাইন ভোল্টেড বন্দুক কখনো সুইজারল্যান্ডের কিটি ডল কখনো রাবরি,কখনো আদর। তারপর মায়ের অভিযোগ নালিশ,কান্না কাটি কত কি। যত বলি বিশ্বাস করো আমার কোন কষ্ট দুঃখ নেই, হয়ও না, আমি তোমাদের নিয়ে ভীষণ ভালো আছি সুখে আছি মাগো, তত মায়ের কান্না। হ্যাঁ মা একটুখানি ভুলে গিয়েছি,ভুলে গিয়েছি এর বাইরেও যে অন্য কোন জগৎ আছে। কখন যে রাত 10 টা বেজে যায় বোঝা হয়না কোনদিন। বাবার হাতে কেনা দেওয়াল ঘড়িটা তেমনই আছে। পাশে দাদুর সাথে সূর্যের ছবিটা প্রতিদিন শুতে যাবার আগে দৃষ্টি ও মনকে স্থির করে জন্মদিনে দাদু নাতির কেক নিয়ে খুনসুটি। উফ্ মনে পড়লেই ফিক করে হেসে ফেলে অতসী । পাশের ঘরে মায়ের মশারী ঠিকমতো গোঁজা হয়েছে কিনা আলোর সুইচ অফ করেছে কিনা সব দেখে শুনে তারপর নিজের ক্লান্তি বিছানায় এলিয়ে দেওয়া কোনদিন দু'চোখের পাতায় ঘুমের ক্লান্তি কোনদিন সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে না পারার অসহ্য পরিস্থিতি। এইভাবে একটি একটি দিন ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে বাদ পরে গেছে, বাদ পরে গেছে জীবনের বহু সুখ দুঃখ হাসি কান্না। অন্ধকার রাত মৃগাঙ্ক ঘুমোচ্ছে অঘোরে ,ওপাশে মা। দুজনেই এখন ওর অবলম্বন। সূর্য মাসির কাছে খুব সুখে আছে, মায়ের কথা হয়তো আর ও তেমন করে ভাবেই না। অতসীও চায়না তার এই দুর্ভাগ্যের সাথে ছেলেকে জড়াতে, থাকনা আরাম আয়েসে। বিকল্প সবকিছু পেলে কে আর মায়ের কথা মনে রাখে, বিশেষ করে সুখে থাকলে। বছরে ছুটিছাটায় মাসীর সাথে বেড়িয়ে যায়, বাবার ঘরে ঢোকেনা। ক্লাশ এইট হল চুপ করে দুরে দাঁড়িয়ে থাকে তারপর মাসীর হাত ধরে বাড়ী যাবার বায়না করতে শুরু করে, কেজানে হয়তো একটু দেরীতে বুঝবে। মা অনেক বুঝিয়েছে দেখবি ছেলে তোর পর হয়ে যাবে এরপর তোকে আর চিনতেও পারবে না। তখন রাগ করত মায়ের ওপর ক্রমে যত দিন গেছে আর একটুও রাগ হয়নি বরং আড়ালে চোখ মুছে বলেছে, থাকনা মা টুসকি কি আমাদের কেউ না? পেটের না হলেও ও তো তোমারই সন্তান। আমার আপনার। ও কি কোন ক্ষতি করতে পারে? দু'চোখ যেন বাঁধ মানতে চায় না আজ সত্যি তো টুসকি সেবার খোঁটা দিয়ে বলেছিলেন, আর বলিস না মেজো তুই তো নিজেই বাস করিস নরকের মধ্যে এরমধ্যে ছেলেটার ভবিষ্যৎটা শেষ করবি না কি? ভাবিস না আমার ছেলেপুলে হয়নি বলে তোর ছেলে নিচ্ছি। ও তো আমার কাছে দিব্যি আছেরে তোর কথা তো বলেই না। বলবেই বা কি এই আমি, এই আমি কি ওকে কম যত্নে রেখেচি, কোনদিন তোকে বলেচি ওর খরচের কতা? বল বলিচি? না রে তা তুই কোনদিন বলিস নি আপন মনে বিড়বিড় করতে থাকে অতসী। ঘড়িতে রাত বারোটার আওয়াজ। বিছানায় এলানো দেহ,কত ছন্দ, কথা জমাট হয়ে আছে, সেগুলি প্রকাশের সময় হচ্ছে না কিছুতেই, যাক্ রোববার বসা যাবে, সামান্য ঘুম এল অতঃপর।


(ক্রমশঃ)


উপন্যাস / ধূসর আয়না
2 য় পর্ব । মল্লিকা রায় ।


সেই আয়নাটা আজ যার উপর দুই দশকের অন্ধকার দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকটা, বিয়ের সময় কাকু শখ্ করে বাইরের মিস্ত্রী আনিয়ে তৈরী করে দিয়েছিলেন একমাত্র ভাইঝির জন্য। কিন্তু সেই বিয়ের পর দু'মাসের মাথায় হঠাৎ করে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ভদ্রলোক। কিছুদিন খুব শখ্ ছিল, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার সে খুব সাময়িক হলেও পরম শান্তির,সুখের । আজ সেটা ধূসর কাপড়ে ঢাকা এককোণে। খুব একটা বেশী কারুর প্রয়োজন লাগে না । সকালের প্রথম রোদটা ওর সর্বাঙ্গে এসে পরে তারপর ধীরে মলিনতা গ্রাস করে ওর গ্লাস জুড়ে চলে যাওয়া সময়ের বলিরেখাগুলো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে মুখ ফেরায় একরাশ নিরাশায়। পাশেই সূর্যের ছবি সমস্ত ক্লান্তি দুর করে । ভোররাতের দিকে ঘুম ভেঙে যায় মৈত্রীর ডাকে। খুব সকালে আসে ও। ততক্ষণে ফুল তুলে ঠাকুর ঘর পরিষ্কার করে স্নান সেরে মায়ের হাতের চা রেডি। "কিরে অতু আজ তো ঝুড়িতে গোটা তিন আলু পরে আছে কি কাটবো রে"? "ওহ মা গতকাল বাজার বন্ধ ছিল জানো মা ওই মদন মিত্তিরকে কারা যেন তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করেছে তাই"। "ওতো লেগেই আছে আজ এটা তো কাল সেটা তো কি হবে বল"? হবে না মুন্না ভায়ের আমলে কত কি যে দেখতে হবে কে জানে। আজ আনবো তুমি যা যা বলেছ সব। আজ একটু চালিয়ে নাও না মা প্লিজ। বাধ্য হয়ে উঠে মা ডালের কৌটো হাতরাতে থাকে। মটর ডাল অতু খুব প্রিয় তাতে পাট শাক দিলে চেটেপুটে ওই সবটা মেরে দেয়, মৃগাঙ্কও খায় তবে ওর সামনে কারুকে বসে থাকতে হবে ওর সাথে কথা বলতে হবে গল্প করতে না হলেই ওর রাগ হবে,সে অনেক ঝামেলা সেটা মৈত্রী ভাল বোঝে। সকাল থেকে সন্ধ্যা ছ'টা পর্যন্ত এটা ওর ডিউটি। ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে ওঠে না অতসী। কোনমতে স্নান, খাওয়া সেরে রাস্তায়। তার ভেতর মৃগাঙ্কের বিছানা, টিফিন, সেভিং, ইত্যাদি গুছিয়ে দেওয়া ছাড়াও প্রতিদিনকার ওর শরীর মনের চাহিদায় বিদ্ধস্ত অতসী হেঁটেই চলে হেঁটেই চলে অগনিত সময়ের পথ বেয়ে ,ভাত বেড়ে দেন মা সেই মা হাত ভরা গহনার টুং টাং সিঁথি টানা সিঁদুর মুখে প্রশস্তির হাসি আজ তার মলিণ বেশ চোখের নিচে কালি কষ্ট হয় অতসীর। তবু শত মলিণতার মধ্যেও মায়ের গন্ধ খুব আপনার খুব কাছের। প্রতিরোজ ভাত মুখে তোলার আগে দুহাতে মাকে জড়িয়ে মুখ গুঁজে জোরে শ্বাস নেয় ও,বোঝার চেষ্টা করে মায়ের শোকের পরিমাণ যার চিহ্ন চেখে, মুখে ছড়িয়ে রয়েছে অশ্রুধারায়, মুখের প্রতিটি অংশে সেই অসীম ধৈর্য্যের পরিচয়।মাগো তুমি কত্ত ভাল, মাথায় হাত রাখেন মা। ধ্যুর পাগলী চোখ মোছ, রোজই কি তোর এমন মনে হয়? শোন কাল কিন্তু রবিবার মনে আছে তো তোর দেওর ভাজ আসবে? জানি তুই ভুলে যাবি মনে করে একটু মিষ্টি নিস কিন্তু। কাল তো প্রচুর কাজ । ওহ মা ভাল কথা মনে করেছ। মৈত্রীকে বোল অসুবিধা হলে আমায় যেন ফোন করে। বিয়ের পর ঐ এক দেওর ভাজ আজও সম্পর্কটা টিকিয়ে রেখেছে কোনমতে। ওঘর থেকে চিৎকার শোনা যায় ক্ষেপে গেছে মৃগাঙ্ক। টেবিল থেকে উঠে কোনমতে দৌড়ে দেখে গোছানো কাপড় জামা সব টেনে ফেলে দিচ্ছে ওয়ার্ডরোব থেকে ।মৈত্রীকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চেঁচিয়ে ওঠে, কিরে তুই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? গোঙাতে থাকে মৃগাঙ্ক ,যাচ্ছেতাই অবস্থা আমি সবকটাকে দেখে নেব। কাছে এসে হাত ধরে অতসী ,কি হল অমন করছ কেন? তুমি জানোনা আমায় পয়সা কামাতে হয়? যে কাজটা তুমি করতে আজ সেটা আমাকে করতে হচ্ছে? নাহলে এইযে রোজ এত মিষ্টি খাবার আসত কি? অমন করে চেঁচিয়ে বাজে কথা বলছ কেন? তুমি তো ভাল ছেলে সবাই বলে। চুপটি করে থাক কেমন? মৈত্রী কাপড়চোপড় গুলো গুছিয়ে রাখ আমি চললাম, মাকে খেয়াল রাখিস। আসছি মা কোনমতে পোষাক সামলে পথে পা বাড়ায় মায়ের আদরের অতু। সেই বাস সেই অটো সেই মানুষজন ,আরেক পৃথিবী ।
আজ কিন্তু দারুণ লাগছে। চমকে পেছন ফিরতেই রমেন দা, আরে তুমি! ইস বুড়ো হয়ে গেছ,কই বুড়ো এইতো কালো চুল। হা হা সেই একগাল পাগল করা হাসি,কত মেয়ে যে ফেঁসেছে। সে সময় ওই মধুর হাসি নিয়ে কত কবিতা যে লিখেছে অতসী। দু'একটা তো আজও মনে আছে, " কেমন করে হাসো " "তুমি সুন্দর "! কিভাল যে লাগত, উফ্ কতদিন তোমায় দেখিনি বলতো, কি করছিলে এতদিন? আমার কথা ভুলেছিলে বুঝি? আরে দাঁড়াও দাঁড়াও একটা একটা করে বলি? তার চেয়ে বরং বাসে বসে বলব দাঁড়াও আগে দেখি তুমি কতটা বুড়িয়েছ। হুম চুলে পাঁক ধরেছে। মৃগাঙ্ক বুঝি তেমন আদর টাদর করে না? আরে আমাকে ডাকবে তো, ঝগড়াঝাঁটি সব মিটিয়ে দিতাম। জানো অতসী তোমার বরটা কিন্তু খাসা। ঠিক যেমন যেমন তুমি চাইতে গম্ভীর, কম কথা বলে, বেশ সমঝদার বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে। তাছাড়া তোমার মত একজনকে পেয়ে কে না সুখী হবে বল? একনাগারে কথাগুলো বলে ওর মুখের দিকে চাইতেই থতমত খান রমেন ওর মুখ থমথমে কেন ? কিহল তুমি বোর হচ্ছ? প্রচণ্ড শব্দে বাস থামলে দুজনে উঠে পড়ে সামনেই সিট পেয়ে যায়। হাতে রুমাল অতসী ফ্যলফ্যল করে চেয়ে ডেকে ওঠে, রমেন দা। তারপরই অসহ্ দমফাটা হাসিতে উচ্ছসিত হয়ে ওঠে, " একদম সত্যি রমেন দা, পুরোটাই সত্যি। আমি খুব সুখী । সে তুমি বুঝবে না বল তোমার খবর বল। এখানে হঠাৎ করে কোথা থেকে "? "কেন তুমি জানো না আমার শালীর বাড়ী এখানে ? ওহ্ তুমি তো কিছুই জানো না। আমার মেজ শালী ওই নতুন যে পিকাসো শপিংমলটা নতুন হয়েছে ওখানে রিসেন্ট ফ্ল্যাট নিয়েছে তা প্রায় মাস ছয়েক হল। ওহ বুঝেছি, তুমি কবে এসেছ? গতকাল। তো আমায় পেছন থেকে চিনলে কি করে? কেন খুব একটা অসুবিধা হয়নি কিছুটা আন্দাজ কিছুটা মনের জোর।বৌদি মানে তোমার বৌ, তেমন সুন্দরই আছে ?আরো সুন্দর হয়েছে, তখন তো কেমন প্যাংলা মতন ছিল এখন চৌকস, ধারালো। আমার ছেলের অন্নপ্রাশনে কি তুমি ছিলে? কন্ডাকটর টাকা চাইলে দুটি টিকিট কেটে পকেটে রাখে রমেন। কি একটা ভাবতে থাকে অতসী কোথাও যেন একটা অমিল রয়ে গেছে বোঝা যাচ্ছে না। রমেন দা হুট করে পেছন থেকে, এখানে শালীর বাড়ী একা ,সব চেনা জানা অথচ, কেমন একটা হেঁয়ালী মনে হয় অতসীর । আমার উঠতে হবে, ঘোর কাটে যেন। ওহ্ হ্যাঁ কবে আসছ বল? তোমার বাড়ী? হ্যাঁ। চলে আসব যেদিন মন টানবে। একটা ফোন করে এস কিন্তু। সিওর। নেমে যায় রমেন নাম না জানা এক স্টপেজে। কন্ডাকটরকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারে স্টপেজটির নাম মাদুরাই। হাত নেড়ে মিলিয়ে যায় মানুষের ভীড়ে । পাশে কে একজন বলে ওঠে, দিদি আপনার ফোন বাজছে। তড়িঘড়ি করে ফোন বার করে রিসিভ করতেই, মায়ের উৎকন্ঠা ভেসে আসে।" অতু মৃগাঙ্ক বড় বাড়াবাড়ি করছে রে, সব ছুড়ে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। আমি কি করব বুঝতে পারছি নারে"। ঠিক আছে তুমি মৈত্রীকে ফোনটা ধরতে বল প্লিজ। হ্যাঁলো মৈত্রী ওঘরে আমার কেবিনে হলুদ যে মাঝারি সাইজের পিল্ রাখা আছে, দুটো নিয়ে ওকে খাইয়ে দে। কি? নামটা হল পিরাকিন পারমাইট থার্টিন। স্টপেজ এসে পরলে তারাহড়ো করে নেমে যায় অতসী। অনেকটা কাজ জমে গেছে আজ গতকাল কিছুটা আপডেটিং বাকী ছিল। গলা শুকিয়ে কাঠ ঠান্ডা জল মুখে দিতেই পরম শান্তি। ফোন কলিং রমেন দা। হুম বুঝেছি। কি বুঝলে? বুঝলাম তুমি একটা যা তা। কেন কি এমন অন্যায় করলাম আমি? খুব জোড়ে গ্রামাফোন বাজছে, হেমন্তের,, তুমি এলে অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এল " হুউম বেশ বুঝতে পারছি। কি বুঝতে পারছ? এই যে তুমি শালীর নেশায় আচ্ছন্ন। ধ্যুৎ তুমি কিচ্ছু বোঝনি। বেশ বুঝিনি, কি করছ বল। এই যে তোমায় দেখছি। হুম ভাল হচ্ছে না কিন্তু রমেন দা। আমার আজ অনেক কাজ জানো। তাছাড়া এতদিন পরে মানুষ কি আর আগের মত থাকে? মানুষের কথা কে ভাবে জানিনা আমি তোমার কথা ভাবছি। বেশ ভাবো আমি এবারে কাজে ডুবে যাবো। ওকে টা টা। ভাবা যায় না রমেন দা যে এখনও ওকে এভাবে মনে রাখবে । মনের ভেতর কে যেন পিয়ানো বাজিয়ে দিল টুং। অস্তিত্ব ছাড়িয়ে সে বাজনা ছড়িয়ে পরল তন্ত্রীর সবকটি তারে। সেই রমেন দা যার পাশে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাবার হয়ে যেত গল্প করতে করতে,কবিতা পড়তে পড়তে, আজও সেই খাতা সযত্নে রাখা রয়েছে । মনে পড়ে যাচ্ছে নতুন কবিতার ভাষা, ছন্দ। কিন্তু গরমিল হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে শুণ্যে। মাত্র দুটো লাইন মনের ভেতর পিয়ানোয় গুনগুন সুর তুলেও অব্যক্ত থেকে যাচ্ছে কিছুতেই ধরা দিচ্ছে না কাব্যে। একসাথে কোচিং সেরে বাড়ী ফিরতে রাত দশটা বেজে যেত সঙ্গে বাবার বকুনি। এই সেই রমেন দা। ঘড়িতে সময় বারোটা। মেশিনের ঘ্যঁসর ঘ্যঁসর আওয়াজে মন দিয়ে কাজ করা কঠীন ব্যাপার। আসলে প্রত্যন্ত এলাকার এই কুড়ি বাই দশ কারখানার ঘরটি নিতান্ত আলো বাতাসহীন গুমোট পরিবেশেরমধ্যে ,কর্মচারীদের মাইনে প্রয়োজনের চেয়ে বেশ কম, কঠীন পরিশ্রমের পর সামান্য মাসমাইনেয় শ্রমিকদের মুখে হাসি নেই। নেই কোন ছুটিছাটা, অতিরিক্ত পাওনা ।বছরের এক আধ দিনে নিজেরাই একত্রে গান নাচ, মৌজ মস্তি করে, আনন্দ স্ফূর্তি করে। আনন্দ বলতে এই যা। এই নিয়েই ওদের কান্না হাসির দৈনন্দিন জীবন। সকলেই প্রায় বসতির অধিবাসী পরিশ্রমী। মহিলাদের মধ্যে অনেকেই দেহ ব্যবসায় লিপ্ত। লেখাপড়া জানেনা বললেই চলে। অসুখ বিসুখে ওঝা বদ্যি, মন্ত্র তন্ত্র, ঝাঁড় ফুক্, শেকড় বাকড়েই রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থা । এসবে ওদের অগাধ আস্থা। প্রায় প্রত্যেকের হাতে, গলায় নানা ধরণের মালা, তাবিজ কবচ ওদের অহেতুক আধিদৈবিক বা আদিভৌতিক অতিপ্রাকৃত অপশক্তি থেকে নিরাপদে রেখেছে। গ্রামের শেষ প্রান্তে মা কৃপালীর পুজা মন্দির,এক তান্ত্রিক বাবা আছেন মন্ত্র তন্ত্র জানেন। গ্রামে রোগ ব্যাধি হলে ওরা প্রথমে ওই বাবার পায়ে রুগীকে সমর্পণ করে সুস্থ করে দেবার প্রার্থনা জানায়। নেশা ভাঙ খেয়ে বাবা প্রথমে মা চন্ডীর পূজা করেন তারপর রুগীর গায়ে মাখিয়ে দেন মায়ের পুজোর মন্ত্রপূত তেল সিন্দুর। তারপর চলে মন্ত্রপাঠ। লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠে রুগী তন্ত্রের জেরে। এভাবেই ওরা অভ্যস্ত বহু যুগ ধরে। এই পরিবেশ মানিয়ে নিতে আজও বেশ কষ্ট হয় অতসীর। তবু কাজ তার চাপ কমিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখে । ও বুঝে গেছে নীরবে নিজের কাজ করে যেতে হবে মুখ খুললেই বিপদ, যেখানে একতৃতীয়াংশ মানুষ ভুল আয়োজনে ব্যস্ত, ব্যস্ত ভুল কার্যকলাপে সেখানে একটা নিতান্ত ক্ষুদ্র মানুষীর পক্ষে কিভাবে বদল আনা সম্ভব। প্রথম প্রথম বেশ রিএ্যক্ট করে ফেলত পরে অবশ্য বুঝে নিয়েছে নাহ্ নিজেকে খেলো করে লাভ নেই। এই হল ওর নৈমিত্তিক জীবন। এভাবেই প্রাত্যহিক যাওয়া আসা অপূর্ণের মধ্যে পূর্ণতার অস্তিত্বে ভাস্বর হয়ে আছে অতসীর মানুষী জীবন। ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা অতিক্রম করলেই বাড়ী ফেরার তোরজোর শুরু হয়ে যায়। সব ঠিকঠাক করে বেড়োতে ওর প্রায় ছ'টা বেজে যায়। তারপর বেশীরভাগ দিনেই অফিস ফেরত বাজার করে কাঁচা সব্জী, ফল ইত্যাদি কিনে আনতে হয়, সঙ্গে মায়ের পুজার ফুল। ওখান থেকে খুব কমই বাজার করে, বেশীরভাগ সময়েই নিজের স্টপেজে নেমে হেঁটে বাজার যায়। একটু দেরী হলেও প্রায়ই দেখেশুনে ভাল টাটকা সব্জী, মাছ কিনে বাড়ী ফেরে অতসী। আজও ব্যতিক্রম। বেশ গরম পরেছে। ব্যাগ টেনে বাড়ী পর্যন্ত আনতে ঘাম ছুটে যায় ওর। বেশী কষ্ট হয় অফিস থেকে বাজার করে বাসে সিট না পেলে। কোনদিন উঠেই সিট পেয়ে যায় কোনদিন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর আবার কোনদিন শেষ সময়ে এসে। মাঝপথে এসে মনে পড়ে যায় মিষ্টি নেওয়া হয়নি তো, অগত্যা পুনরায় পেছিয়ে এসে মিষ্টির দোকান থেকে মায়ের পছন্দসই আইটেম গুলো কিনে নিয়ে সোজা অটো স্ট্যন্ড। ঘড়িতে প্রায় আটটা, মৈত্রী চলে যায় সাতটায়। প্রতিদিনের মত পূজা পাঠ শেষে মা অপেক্ষা করে অতুর জন্য। যত রাতই হোক না কেন ফ্রেশ হয়ে এককাপ মায়ের হাতের আদা চায়ের নেশাই আলাদা। না পেলে জীবন বৃথা। যে সে স্বাদ পায়নি আমি বলব সে চরম ভাগ্যহত। মা বিকেলে বেড়োণ সামনের আশ্রমে অনেকে আসেন সমবয়সীরা পূজা পাঠ কীর্তণ হয়, প্রসাদ বিতরণ শেষে ফেরেন সন্ধ্যায়, তারপর বসেন ঠাকুরঘরে আহ্নিকে। মাসে ছয়টিউপবাস, চারটি বারের ও বড় ঠাকুরের পূজা উপবাস বাবদ মাসে মায়ের খরচাও নেহাত কম নয়। এছাড়া প্রতিদিনের ফুল বেলপাতা তো আছেই। আর একটা বদ অভ্যেস তো আছেই পান, সাথে চুন, সুপুড়ি, খয়ের। শখ করে কখনো ও নিজেই কিনে দেয় খুশবু মিঠা মশলা। খরচা খুব। সবার জন্য কিনে সবার মুখে হাসি ফুটিয়ে নিজে মুখে মেখে নেয় পাঁচ টাকার বোরোলীন আর ছ'টাকার পাউডার ব্যস্ সঙ্গে সস্তা স্যন্ডেল আর সেপটিপিনে হাতল জুড়া সাইডব্যাগ। অনুষ্ঠানে বা পূজা আচ্ছার সময় পুরোণো কাপড়ে রিভাইব দিয়ে একটু আয়রণ করে নিয়েই দিব্য চলে যায়। বাড়ী ফিরে গেটে হাত ছুঁয়ে গলা ছেড়ে হাঁক দেয়, " মাগো একটু ধরো ব্যগটা প্লিজ আর পারছি না কষ্ট হচ্ছে খুব "। মা আসেন ছুটে বাড়িয়ে দিয়ে দু'টো হাত, যেন পৃথিবীর সমস্ত মন্দির থেকে স্বর্গীয় সুধা শান্তি,সুখ এনে ছড়িয়ে দেন পৃথিবীর সমস্ত সন্তানদের মঙ্গল কামনায়। গুটি গুটি পেছনে এসে হাত বাড়ায় মৃগাঙ্ক , " এত দেরী কেন? আমার বুঝি খিদে পায় না " ?


(ক্রমশঃ)
উপন্যাস / ধূসর আয়না
মল্লিকা রায় ।
পর্ব তিন


গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতেই এলাকার নাগরিক সমিতির কিছু নারী পুরুষ অতসীর সাথে দেখা করতে আসে, " দিদি আগামী কাল মিটিং আছে, বিনোদ মিস্ত্রীর বৌটাকে বাঁচাতে হবে গো " । " কেন আবার কি হল? " " কি আবার হবে ? ওর মরদটা তো আরেকটা মেয়েছেলে এনে তুলেছে, নিকে না কি করে। ওকে এখন পাড়ার কুমতলবি লোক দিয়ে মার খাওয়াচ্ছে, ডায়েন বলে চুল টুল কেটে মেরে বিশ্রী হাল করেছে । এই যে ওর বাপ এসেছে তোমার সঙ্গে দেখা করতে। হাউমাউ করে লুটিয়ে পড়েন এক শীর্ণকায় ভদ্রলোক, দিদি, আমার মেয়েটারে বাঁচায়ে দাও তুমি ভগবান "।
সে কি এত মানুষ থাকতে? আমরা কেউ ধারে কাছে ছিলাম না। সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরে দেখি এই হাল। " বেশ আমিই করব। কাল দশটায় সবাইকে আসতে বল " । ঠিক আছে দিদি। টুকটাক মধ্যস্ততা করতে করতে কবে যে পাঁচজনে ওকে শালিশী দিদির আসনে প্রতিষ্ঠা করেছে সে ওর নিজেরই অজানা। আজ সত্যিই ওর নিরপেক্ষ বিচারকে সকলে সমীহ করে। কত আর্তি জীবনের । টিকে থাকার, টিকিয়ে রাখার অস্তিত্ব ঘিরে জীবনের সংগ্রাম। কেউ রাজী নয় এক পাও বৃত্ত থেকে সরে দাঁড়াতে, আমরা সকলেই এই আবর্তে পরে নিষ্পেষিত হচ্ছি, হাঁফিয়ে উঠছি, ছটফট করছি কিন্তু মরে যাচ্ছি না, সকলেই নিজের জায়গাটুক টিকিয়ে রাখার দ্বন্দে সামিল। মৃত্যু যতই সত্যি হোক প্রত্যেকের কাছে সে অনাদৃত, বিভীষিকা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষ উচ্চারণ করে জীবনের । বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে রাখার। মৃত্যু হল বিলুপ্তি, শেষ, অন্ত। তার পরে আর কিছু নেই ফাঁকা। জীবনেরই সব, মৃত্যুর কিচ্ছু না। অতএব জীবনের আহ্বান সত্যি। ধমক দেন মা, কি অত ভাবছিস? মৃগাঙ্ক ডাকছে। আসছি মা। ওঘরে মৃগাঙ্ক অস্থির হয়ে ওঠে ঘড়ির বাঁধাধরা সময়ে অতসীকে দেখতে না পেলে আগুন জ্বলে যায় মাথায়। এও এক জীবনের নিরবচ্ছিন্ন অংশ অবহেলা করার উপায় নেই। আসলে আমরা সবসময়ই অন্তরাত্মা ও বহিরাত্মা এই দুইয়ের চাপে অহরহ বিদ্ধস্ত। বহিরাত্মার অসংখ্য দোসর ভোগের, কামের, নামের এরা আন্তরিক খুব সর্বদা ছায়ার পাশে পাশে ঘোরে দ্বন্দ বাধায় অন্তরে তখন ঘোর তুফানে তরীর মতো অসহায় মাঝিকে দক্ষ হাতে চেপে ধরতে হয় প্রকৃত হাল নইলে সলিলসমাধি নিশ্চিত। এসব কিছুই অস্বীকারের উপায় নেই, উপায় নেই প্রবল আসক্তি থেকে মুখ ঘোরানো। আসলে বাস্তবটা সকলের কাছে সমান সংজ্ঞা নিয়ে আসে না। মানুষ চরিত্র ভেদে তাকে গুছিয়ে নেয় । আমার কাছে যা সত্য অবধারিত অন্যের কাছে তা নিরর্থক হতেই পারে এবং হয়ও। অসংখ্য প্রশ্নের কাছে কৈবল্য সেজে বসে আছি নঞর্থক সমাজের কাছে, পেছনে চালের ঘর থেকে প্রতিনিয়ত মায়ের যে শাপদ্ধনী ভেসে আসে ", রাঢ়ী হ' রাঢ়ী হ' রাঢ়ী হ' সেকি মেয়েটির মৃত্যু চেয়ে নাকি মোদো স্বামীর অকথ্য অত্যাচারের বিরুদ্ধে অকথিত যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ পাড়ায় খবর রাখে না কেউ । পরক্ষনেই কাজের বাড়ীর কচি নধরপানা ছেলেটি সুযোগ বুঝে হাত দেয় কোমড়ের বিভাজনে, খাঁমচে ধরে তলপেট, চাপা গলায় ফিসফিসিয়ে বলে, চ' ওঠ্। এসব কখনো খবর হয় না,খবর হয় না অসংখ্য জ্বালা, যন্ত্রণা যা প্রতিনিয়ত সমাজের একাংশের মাথার আকাশটাকে ঢেকে দিচ্ছে অপ্রচ্ছন্ন চাদরে। যে মেয়েটি ধর্ষিতা হবার পূর্বে অসংখ্য মিনতি জানিয়েছিল, " বিশ্বাস করুন কাজটা আমার বেঁচে থাকবার জন্য ভীষণ প্রয়োজন " নিস্তব্ধতা ভেদ করে ওর কানে এসেছিল একটি জোটবদ্ধ উল্লাসের শব্দ। পরদিন নর্দমায় পড়েছিল ওর বেঁহুশ শরীর ,তাকেও সমাজ স্রোতে ফেরাতে হয়েছে অতসীর। আসলে ভেতর থেকে ওকে দুমরে মুচরে শেষ করে দেওয়া হয়েছে খোলসের মধ্যে একটি অস্তিত্বে। উহ লাগছে। মৃগাঙ্কের চুলে ব্রাশ করছিল। একটা দীর্ঘ নিশ্বাসের হলকা মাথায় এসে লাগল মৃগাঙ্কের। মা ডাকছেন চল খেয়ে নি। চল। তুমি বোস মা খাবারটা বরং আমি বেড়ে দি, দু'হাত জড়িয়ে ধরে মায়ের। ইস মা তুমি প্রেসারটা দেখেছ? চোখে মুখে কালি পরে কি হাল করেছ বলো তো। আমি না তোমায় বলেছি রান্নার একটি মেয়ে ঠিক করে দিচ্ছি তুমি কথা শোন না কেন মা? দুর পাগলী কোথায় আবার কালি দেখলি? আমি খুব ভাল আছি রে মা, মাথায় হাত রাখেন। তোর বাবা মারা যাওয়ার পর এভাবেই তো জীবনটা কেটে গেল রে অতু আর তো ক'টা দিন, কিচ্ছু হবে না দেখিস । তুইও কি নিজের খেয়াল রাখিস? আগের মত আর আছিস তুই? যেন আমার মা।
ভাল ভাল শাড়ী গয়নাগুলো কবে পরবি শুনি? ছুটির দিনে কোথায় দু'জনে মিলে সেজে গুঁজে বেড়িয়ে আসবি ,আনন্দ করবি তা না একটা ছুটির দিনে এখানে মিটিং, ওখানে মিটিং ভাল লাগে না রে বিশ্বাস কর একদম ভালো লাগে না।
যাবো যাবো মা দেখো ঠিক সময় মত বেড়িয়ে পরব। আচ্ছা মৃগাঙ্ক পুজোর সময় কোথাও বেড়িয়ে পরলে কেমন হয়? হু ভালো। কোথায় যাওয়া যায় বলতো? তুমিই বলনা। বেশ আমি সব ঠিকঠাক করে রাখব মা। কি খুশী তো মৃগাঙ্কের দিকে চেয়ে। মাকে বল। টেবিল ছেড়ে উঠে যায় মৃগাঙ্ক শোবার ঘরে। এই এক রোগ ওর ওকে এটেন্ড না করলে সঙ্গে সঙ্গে রিএক্ট। আর এই এক্ট রিএক্টের খামখেয়ালে জীবনটা তিক্ত হয়ে পরেছে ওর। কেবলই আপোসের সংগ্রাম সর্বত্র,সর্বক্ষণ। আসলে আপোস মানুষকে শান্তি দিলেও শক্তি দেয় না, একপ্রকার হীনমন্যতায় নিষ্ক্রিয় করে রাখে । ওর নিজের জীবন নিয়ে কম উপহাস করে না লোকে, আড়ালে কখনও সামনেই শালীনতার মাত্রা অতিক্রম করে ,জীবনের এই একান্ত দুর্বলতার স্থাণ নিয়ে চিরকালই চলে মানুষের চরম বিদ্রূপ। আসলে এও একপ্রকার চরিত্র, একপ্রকার বিনোদন মূলক আত্মতৃপ্তি। হ্যঁরে অতু চায়ে চুমুক দিয়ে কি একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলি পাড়ার লোকগুলো এসে পরায় কি কথা রে? ওহ্ মা তোমাকে তো বলাই হয়নি, তুমি জান আজ আমার কার সাথে দেখা হয়েছে? "কে রে টুসকি "? আরে রমেন দা । ওই সেই ছেলেটা যে তোকে বিয়ে করবে বলে কথা দিয়ে তোর প্রিয় বান্ধবীকে বিয়ে করে বসল? ঠিক ধরেছ মা। আজ হঠাৎ জানো মা, হঠাৎ করেই সেই রমেন দা । এখানে ওই পিকাসো শপিংমলের কাছে ওর শালী ফ্ল্যাট কিনেছে, গতকাল বাড়ী ফেরার পথে দেখা হয়ে গেল অফিস বেরিয়ে বাস রাস্তায়। আমাদের বাড়ীতে আসবে বলেছে, আমার কথা কিছুই জানে না, বলিনি। কি আর বলব মা এখন তো কিছুটা ভাল আছে কখন যে কি মূর্তি ধারণ করবে বোঝা মুশকিল। ঘ়ড়িতে দশটা, বাজারের আনাজ পাতি মাছ, মিষ্টি সব গুছিয়ে রেখেছে মা। হ্যাঁরে কাল তো ওরা আসছে তুই না থাকলে... আরে সেতো দশটার পরে, তার মধ্যে অনেকটা গুছিয়ে দিতে পারবো তোমায়। অনেক রাত হল মা তুমি যাও আমি টেবিল পরিষ্কার করে দিচ্ছি। সব ঠিকঠাক করে মায়ের মশারী টাঙিয়ে সুইচ অফ করে তবে নিজের ঘরে। ব্যাগটা তেমনই পরে আছে টেবিলে, ফোনটাও বার করা হয়নি, অঘোরে ঘুমুচ্ছে মৃগাঙ্ক, ইস রমেন দার দশটা মিসড্ কল। ব্যগের ভেতর পুজোর ফুল নামিয়ে ওঘরে টেবিলে রাখে। বাইরের কাপড়চোপড় গুছিয়ে একপাশে রাখে। ওয়ার্ডরোব খুলে দেখে মৃগাঙ্ক রাতের ওষুধ খায় নি । ভুল হয়ে গেছে রাতে ওষুধটা ওই দেয়। মশারী টা আবার কোথায় গেল, একি ! কেটে টুকড়ো টুকড়ো করে রেখেছে, এ তো মৃগাঙ্কের কাজ। কি হবে এবার, অল আউট জ্বেলে কাজ চালাতে হবে। মুখ ঝুঁকে কপালে হাত রাখে, মৃগাঙ্ক ওঠো ওষুধ গুলো খেয়ে নাও প্লিজ। " না কালকে খাবো "। "কাল খেলে হবে না সোনা এটা এখনের খাবার জন্যে "'/ " উঠে বসে মুহূর্তে হাত থেকে গ্লাস কেড়ে নিয়ে গজগজ করতে করতে ছুড়ে মারে অতসীর মুখে , " হারামজাদী ভেবেছিস আমি কিছু বুঝি না, না? শালিশী করার নামে, অফিসের নামে কার সাথে পিড়ীত মারাতে যাস বল "? এসব চামড়া, মস্তিষ্ক, রক্তে প্রবাহিত হয়ে ওর নার্ভকে করে তুলেছে ইস্পাতের মত কঠীন । এখন আর মন খারাপ করে না। চোখের ডান পাশটা সামান্য কেটে রক্ত ঝড়ছে। বেসিনে ভাল করে ধুয়ে তুলোয় সামান্য Merbromin solution লাগিয়ে দরজা খুলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে অনেক্ষণ। কার বাড়ী থেকে রবীন্দ্র সংগীতের মন কেমন করা সুর ভেসে আসছে। একগুচ্ছ ঠান্ডা বাতাসের হলকা চোখে মুখে আলতো বুলিয়ে যায় স্নেহের পরশ। পৃথিবীর বুকে এখন মানুষের অস্তিত্ব শিশু রুপে নিদ্রামগ্ন। পরম যত্নে নিজ সৃষ্টিকে টেনে নিয়েছেন বুকের মধ্যস্থলে। কারুর কোন ক্লেদ, গ্লানি কিচ্ছু নেই। পৃথিবীর এখন ভার্যা রুপে অবস্থান। রাত দু'টো রাস্তাঘাটে সারমেয়র জন্মলীলা জানান দিচ্ছে স্বর্গ নরকের সহাবস্থান । দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে মৃগাঙ্কর কাঁধে হাত রাখে, " ঘুমুলে? বেশ ওষুধটা কালই খেয়ো বরং "। বাসে দু'কলি মাথায় এসেছিল সব গুলিয়ে গেছে, মনে আসছে না কিছুতেই। বহুদিন কিছু লেখা হয়না সময়াভাবে। রবিবার কিছুটা সময় পেলেও পাড়ায় শালিশীর হিরিক লেগে যায়, তাছাড়া এর তার বাড়ী তো আছেই। আসলে প্রত্যন্ত দরিদ্র এলাকাটিতে বিশ পঁচিশটি অবস্থাপন্ন পরিবারের বাস যারা নিজেদের ঘরের বাইরেটা নিয়ে বেশী একটা ভাবেন না উঁকি ঝুঁকি মারা ছাড়া এ ছাড়া কাজের লোক মানেইতো বিশ্ব খবরের এজেন্ট । আশেপাশের দরিদ্র, খেটে খাওয়া মানুষজন প্রতিনিয়ত সমস্যা নিয়ে বেঁচে থাকেন কখনও ঘরের কখনও বাইরের আর সেসবই প্রায় সমাধানের দায়িত্ব এসে পরে অতসীর ঘাড়ে। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা এই সমস্ত মানুষজন রাজনীতির এক অদ্ভুত ঢাল্ প্রতিবার ভোটে মিটিং মিছিলে মাঠে ময়দানে এরাই নেতা মন্ত্রীর জয়ের ধারা বহন করে চলেছে কখনো দু'টাকা কেজি চালে কখনও একটি সাইকেলে কখনও আবার কাজ পাবার তাগিদে রাজনীতির রং এদের যতটা বেশী আকর্ষণ না করে ততটা আকর্ষণ করে বিনিময় প্রথা। কার্যত এদের নিয়ে রাজ্য রাজনীতি যতটা ব্যস্ত রংয়ের খেলায় ততটাই অনীহা ওদের বাস্তব জীবনের প্রাপ্য, চাহিদা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে । এদের পারিবারিক জীবন ভয়ংকর সংস্কারে পরিপূর্ণ জীবনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত এরা এই সংস্কার আঁকড়ে বেঁচে থাকে, রোগ, ব্যাধি ইত্যাদি এদের কাছে দেবতার অভিশাপ, নানান লোকাচার তান্ত্রিকতা প্রভৃতি উপাচারে চলে এসব রোগ নামক অপশক্তি তাড়ানোর প্রক্রিয়া। এছাড়া অবস্থাপন্ন পরিবার গুলিও প্রবলভাবে কু-উপাচারে বিশ্বাসী। আসলে মানুষ যতই শিক্ষিত যতই আধুনিক হোক ,বেশ বাস কথা বার্তায় বহুবিধ চৌকস হলেও দৈন্য রয়ে গেছে অন্তরে, সেখানে মিল হয়নি সেকাল একালে। তাই কিছুতেই এক করা যায় না বহিঃপ্রকাশ ও অান্তরিক কার্পণ্য , বহুবিধ প্রকাশ ও সৃষ্টির আড়ালে আজও দেখি পক্ষপাতিত্বের গোপন হাত। দেখি রাজ নজরানা পেয়ে কেমন স্তিমিত প্রতিবাদী আওয়াজ। আসলে সৃষ্টির পূজারী হলেও একধরণের কুচক্র সর্বদাই সক্রিয় থাকে মস্তিষ্কে যার প্রভাবে সৃষ্টিকর্তাও বাদ যান না আত্মম্ভরি কার্যকারণ থেকে, নিজেকে পয়গম্বর ভেবে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন অন্যান্য সৃষ্টিকে আর এটাই হল সবচেয়ে লজ্জার। প্রবাদ আছে মূর্খের ভুল সাতখুন মাফ কিন্তু জ্ঞানীদের ভুল দেশের দশের অপমান। আজ আমরাই করে চলেছি সেই চরমতম ভুল কখনো হিংস্রতায় কখনো দম্ভে, গর্বে, আত্মপ্রচারে প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে আমরা লিপ্ত একে অন্যের প্রতিপক্ষের ভূমিকায় । এই কি প্রগতি? এই কি উন্নতি? তবে সংস্কৃতির অর্থ কি শুধুমাত্র এক একটি গোষ্ঠী এক একটি দল, কিছু পত্রিকা কিছু মন ভোলানো কথা, গল্প, গান শুনিয়ে স্টেজ থেকে অবতরণ ? তারপর তুমি কে আমি কে। তোমার থেকে আমি বড় আমার থেকে ও। অতএব সংস্কৃতি, প্রগতি সবটাই আমার, ওর ,তুমি কে হে। রাত্রি গভীর সবাই ঘুমোচ্ছে, দু'চোখের পাতা এক করতে পারছে না ও, পাশে মৃগাঙ্ক জীবনের অর্ধাংশ, অথচ বৃহৎ এক শুণ্যস্থাণ, মস্তবড়ো ফাঁকির জায়গাটা নিখুঁত বঞ্চণা দিয়ে সাজানো। আসলে পৃথিবীতে দুই ধরণের চরিত্র ভোগের আর ত্যাগের, মাঝামাঝি বলে কিছু হয় না। ভোগী কখনও ত্যাগী হতে পারে না ,ভোগেই তার সার্থকতা তার জীবনসফল। এক খোলস ছেড়ে অন্য খোলসে অভিযোজন। ভোগীর বিশ্বাস একেশ্বরবাদে, প্রভুত্বকেন্দ্রে। তিনি নিজেই সর্বেস্বর তাই অন্য কোন সৃষ্টি তার কাছে প্রাধান্য পায় না। অতসীর জীবন এই প্রান্তে ঠিক নোঙরহীন নৌকোর মতো সমুদ্রে ভাসমান,পেছিয়ে আসবার উপায় নেই, উপায় নেই শরীর মন আলগা মিথ্যের আবরণে ঢেকে জনসমুখে হাজির করা, প্রয়োজনও তেমন হয় না। চলতে চলতে, ভুলতে ভুলতে সময় বলেছে আসলে সবটাই ফাঁকা। এই ফাঁপা অংশে সময় জুড়তে জুড়তে একসময় মানুষটাই মিথ্যে হয়ে যায় মিথ্যে হয়ে যায় প্রকৃত সাজবদল। সাজঘরের আয়নায় কত রংয়ের সাজে অচেনা হয়ে যায় প্রকৃত মানুষ, চার দেওয়াল খবর রাখে তার প্রতিটি অধ্যায়। প্রতিটি প্রহরের মূল্য লেখা থাকে এই ধাতব কাঁচে, জীবনের ওঠা পড়া, সুখ দুঃখ, সকাল বিকেলের প্রায় সবটা প্রতিফলন ছড়িয়ে পরে শরীর মনে। হিসেব মেলাতে বসে পাওয়া না পাওয়ার ধূসর সময়গুলির। ডান চোখের পাশটা চিনচিন করে ওঠে, হয়তো জানান দেয় সময়টার প্রতিদান আঘাতের, রক্ত ঝড়ার। দু'চোখের পাতা ভারী হয়ে ওঠে। রাত প্রায় শেষ প্রহর।


( ক্রমশঃ)
ধূসর আয়না / পর্ব চার
মল্লিকা রায়


আজ রবিবার। খুব সকাল সকাল উঠেছে অতসী, মা বাগানে। বারান্দায় কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে শেষ রাত্রির স্বপ্নটাকে ভাবতে চেষ্টা করে। ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় শরীর মনে শ্রান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দেয়। অসংখ্য ফুল ফুটেছে বাগানে নানান বর্ণ গন্ধের । পায়ে পায়ে মায়ের কাছে চলে আসে ঠিক ছেলেবেলার মতো, যেমন করে বাবা প্রজাপতি ধরে আনতে বলতেন, গঙ্গা ফরিংয়ের পেছনে সুতো বেধে ঘুড়ি বানিয়ে মজা করা, পুকুরে পাটকেল ছুড়ে ব্যঙের মাথা টিপ করা কত কি খেলা বাবার সাথে। সেই সময়ের বাগান, তখন অবশ্য চর্চা ছিল, যত্ন ছিল এখন যেটার খুব অভাব। ছেলেটার কথা চিন্তা করলে ভারাক্রান্ত হয়ে যায় মনটা বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে। রাস্তা ঘাটে মা ছেলে পাশাপাশি দেখলেই হু হু করে ওঠে ভেতরটা । গভীর ভাবে বুকে চেপে ভালবাসতে ইচ্ছে হয়,সেই ছোট্ট বেলাটা কবে কখন যে লুকিয়ে চলে গেছে মনেই নেই। ভোর পাঁচটা। এই পরিবেশটা দারুণ উপভোগ করে অতসী। কোনদিন আনমনে বেড়িয়ে পরে পায়চারীতে কখনও ছাঁতে, জুড়িয়ে যায় দেহ মনের সমস্ত ক্লান্তি। ঘরে ফিরে ফোনে রিং করতেই দিদি, " কি রে মেজ? হঠাৎ করে কি মনে করে"? মনটা খারাপ হয়ে গেল রে দিদি ভোর রাতের একটা দুঃস্বপ্নে বাবুকে নিয়ে। " তো চলে আয় না আজ তো ছুটির দিন "। না আমার কোন ছুটি নেই গো দিদি , আজ খুব জরুরী কাজ। হুম বুজেছি ওই পাড়ায় নায়েবগিরি না করলে তোর তো আবার চলে না। ঠিকাচে ঘুম থেকে উটলে বলবোখন ফোন করতে। হ্যন্ডসেট টেবিলে রেখে বাথরুমে ঢোকে ,ফ্রেশ হয়ে চা চাপায় ওভেনে। ছুটিছাটায় এ কাজটা ওই করে। মৈত্রী ঢুকল বেশ সাজুগুজু করে, " গুড মর্নিং দিদি "হ্যাঁ চা নে। মৃগাঙ্ক উঠেছে ,ছেলের ছবি খুব মনোযোগ সহকারে দেখছে। কিছু বিস্কিট , স্ন্যকস চা'সহ টেবিলে রাখে অতসী। ফ্রেশ হয়ে চায়ের কাপে হাত লাগায় মৃগাঙ্ক অতসীর দিকে চেয়ে একগাল হাসি। " কি ব্যাপার হঠাৎ হাসি কেন "? বাবুর কথা মনে হল হঠাৎ করে। এবারে ছেলেটাকে নিয়ে এস। " আরে তুমি কি পাগল হলে? ছেলেটার পড়াশোনা, দেখভাল্ করবে কে? আমি থাকি না বাড়ি, মায়ের বয়স হয়েছে। তুমি অসুস্থ "। বাজে কথা বোল না তো আমি খুব পারব দেখাশোনা করতে। হুহ্ তুমি চুপ করো, তোমায় কে দেখে তার ঠিক নেই তুমি কি দেখা শোনা করবে, উত্তেজিত অতসী। " কেন অমন বলছ কেন? তুমিই বা কি রাজ্য উদ্ধার কর "? "সেসব বোঝার ক্ষমতা তোমার কোনদিন ছিল না আর হবেও না বুঝেছ "। ওঘরে ঢুকেছে মৃগাঙ্ক । টেবিলে হ্যান্ডসেটে রিং বাজছে। কে বাবু? কেমন আছিস বাবা? ভালো আছি মা, তুমি ভালো আছো তো? আছি বাবা খুব ভালো আছি। বাবার সাথে কথা বলবি? " না না মা ভয় করে "/ বেশ কবে আসবি বাবু? সামনে তো তোর জন্মদিন, একটু পায়েস করব তোর জন্য আসবি তো বাবু? " কেমন করে আসবো বলো ঐদিন মাসী তো অনেককিছু রান্না করে, বন্ধুদের বলে"/ ও তাহলে থাক বাবা তোমার আর আসতে হবে না। হ্যন্ডসেট নামিয়ে রাখে টেবিলে। কে রে বাবু? কেমন আছে রে? ভালো আছে মা, কাল ভোর রাতে খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল জানো তাই একটু কথা বললাম। " বেশ করেছিস ছেলের সাথে কথা বলবি না তো কি, এই নে প্রসাদটা। মৃগাঙ্ক উঠেছে রে, যা এই প্রসাদটা ওকে দিয়ে আয়। একটু পরে মা এইমাত্র রাগ করে উঠে গেল। মায়ের মুখে মৃদু হাসি, মেয়েটাকে ভালো দেখলে, হাসতে দেখলে জুড়িয়ে যায় বুকের ভেতরটা। জামাইটা যদি সুস্থ হত! গভীর দীর্ঘ শ্বাস বেড়িয়ে আসে হতাশার। ময়দা মাখছে মৈত্রী, পরটা তরকারি জলখাবারের।সবজির ঝুড়ি বটি নিয়ে তরকারি কাটতে বসে অতসী। মাছটা বের করে রাখ মৈত্রী কাপড়চোপড় গুলো যেটা কাঁচবি ওপাশে রাখা আছে যেগুলো আয়রণ হবে সেগুলো চেয়ারে রেখেছি। আজ সিঁড়িটা পরিষ্কার করিস বুঝলি বেশ নোংরা হয়েছে। পাঁচিলের ওপাশে মানুষ সমান জঙ্গল গজিয়েছে পরিষ্কারের প্রয়োজন, এইসময় সাপ, কোপের উৎপাত হওয়া স্বাভাবিক, সাবধান। মিটিংয়ে দেখা হলে বলে দেব। " দিদি বাইরে কারা ডাকছে দেখোতো "/ বল আসছে টিফিন শেষ করে কোনরকম কাপড় জড়িয়ে, মা আসছি বলে বেড়িয়ে যায় অতসী। রাস্তায় রমেন দার কলিং। "কোথায়"? আমি রাস্তায়, মানে পাড়ার মিটিংয়ে চলেছি। " কোথায় চলেছ "? "মিটিং",কেন কার মিটিং কিসের মিটিং, আজ তোমার ওখানে যাব আসছি কিন্তু "!সেটা পরে বলব। আজ আমায় পাবে না ভীষণ ব্যস্ত। তাছাড়া আমি দিদির ওখানে যাচ্ছি বিকেলে, কাল অফিস করে ফিরব। তুমি কিন্তু শুধু শুধু জেদ করছ। কেটে দিয়েছে ফোন রমেন দা । আসলে পুরোনো সম্পর্কের লিঙ্ক তেমন মজবুত হয় নি বলে তেমন টান নেই। ঘরভর্তি প্রায় বিশ ত্রিশজন নারী পুরুষ রঞ্জনা দির ঘরে ঘিরে বসেছে। রঞ্জনা এ গ্রামের পঞ্চায়েতের স্ত্রী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বামীর এই কাজটি ইনি নিজ দায়িত্বে করেন তবে ভাল বক্তা নয় বলে পঞ্চায়েত থেকে অতসীকেই প্রধান ওকালতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ ব্যপারে ভদ্রমহিলার বেশ আপত্তি ছিল বা আছে। তবে বর্তমানে পুলিশের কাজগুলো উনি সামলান। আরো কয়েকজন মহিলা আছেন যারা আড়ালে অতসীর এই মোড়লগিরির বেশ রসিয়ে রঙ্গ ব্যঙ্গ করে। এককোনে জবুথবু হয়ে বসে আছে মেয়েটি পড়ণে নোংরা ছেড়া সস্তা কাপড় ,গায়ে হাতে মুখে প্রহারের ক্ষত, পাশে অথর্ব পিতা। পরিবারের সব সদস্যদের ডেকে পাঠানো হয় নতুন বৌ ছাড়া সকলে উপস্থিত। মেয়েটিকে অত্যাচারের কারণ জানতে চাওয়া হলে জানা যায়, মেয়েটির বাবা দোকান করে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও আজপর্যন্ত কথা রাখে নি। তাই টাকা নিয়ে মহিলা পুনরায় ছেলের বিয়ে দেন এবং কিছু সুপারি জোগার করে মেয়েটিকে ডায়েন রটিয়ে কেটে নেওয়া হয় চুল, কাপড়চোপড়। এমনকি ছেলেটির মা বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সাথে অসহায় মেয়েটিকে ডায়েন বলে দাবী করে পরিবারের সকলেই গলা মেলায় তার মন্তব্যে। এবার উঠে দাঁড়ায় অতসী, "আচ্ছা আমি যদি আপনাকে বলি আপনি মানুষ নন, খুনী এবং প্রমাণ সহ কমকরে দশ বছরের জেল জরিমানা হতে পারে জানেন আপনার"? আমতা আমতা করেন মহিলা, " কেন ছাহাব উওর বাপ তো কতা দিল, না দিলি তো মোর ছওল কুন খানে যাবে বল ,কাম কাজ নাহি বাবু মরদ বিটা খাট্যে মরি গেল"।" তো তা বলে এ বিটি কি দোষ করল বল না কেনে তু তো মায়েছিলার জাত আছিস বটে বেপারটা বুঝিস লাই ? তুর ত মরদ বিটা আছে উও বেটি কুন খানে যাবেক বল, লিজে ত ছ্যল লিয়ে পুর্তি মারাইচিস উও বিটি কুতা যাবেক বল "!" উ তো আমি জানে না তো বাবুরা লেন না কেনে উও ডায়েন টার দাও "/ এ সামাল যা বেশী বলবিক তো সোজা গারদ পুরে দেব মা কসম। তেড়ে গেল রহিম ভায়। " শোন তোমরা আমাদের বিচার হল গিয়ে মেয়েটাকে ওর নিজের ঘর দিতে হবে, ওর ভাত কাপড় সব দায় ওর মরদের যদি ও নিজে থেকে বাপের কাছে যেতে চায় যাবে জোর করা চলবে না, এছাড়া যতদিন এখানে থাকবে কেউ কিছু বলতে পারবে না, ও ওর মত থাকুক ওরা ওদের মত। কি বল তোমরা রাজী তো? হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক ঠিক সকলেই উচ্ছসিত। তবে টিপছাপ নাও লেখাপড়া করে। এটাই ফাইন্যাল। কি রঞ্জনা কিছু বল। " সবই ঠিক আছে হ্যাঁ ! এটাই ফাইন্যাল "। যাও ইবার কতাটা মাইন্যো তোমরা। একে একে ঘর ফাঁকা হয়। নাহ্ দিদি খুব ভালো বলিচে গো। তুমরাও শুন্যো রাখো না কেনে। আশেপাশের লোকের মিশ্র প্রতিক্রিয়া। চা জলযোগসহ ছুটির দিনটা বেশ ভালোই কাটে অতসীর। রঞ্জনা ওর সাথে পায়চারী করে অনেকটা এগিয়ে দেয়, কথা হয় অনেক। বাড়ীতে একদিন আসবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নেয় রঞ্জনা। বেলা প্রায় বারোটা ছাড়িয়েছে । বাড়ির সামনে আসতেই টের পাওয়া গেল আগন্তুকেরা হাজির। তরিঘড়ি ঘরে ঢুকেই মুখোমুখি হল এককালের প্রায় সহপাঠী দেবরের। নিজের নয় খুড়তুতো দেবর। বড় মিঠা সম্পর্ক ছিল উভয়ের, বহুদিন পরে আজ সামনাসামনি ।' কেমন আছো বল'? " যেমন দেখছ "! " ইস কি হাল করেছ শরীরের ,ঘনিষ্ঠ হয় অতসীর কিছু বলতে গেলে মুখ চেপে চাপা গলায় বলে, " চুপ "। হাত ছাড়িয়ে নেয় অতসী, "কেন অযথা মায়া বাড়াও ঠাকুরপো, এ মিথ্যাের কোন মানে হয় বল? হুট্ করে কখন তোমার মন হল চলে এলে এছাড়া কোন দায় কি তোমার ছিল না বল? আমার এসব আর ভালো লাগে না বিশ্বাস করো তাছাড়া মনের টান যেখানে নেই সেখানে কি লাভ মিথ্যের মুখোশ সাজাতে "? ওহ্ আমি ভুল করেছি বৌদি, তোমায় একলা ছেড়ে দেওয়া আমার উচিত হয় নি। তোমার পাশে থাকা উচিত ছিল"। "ছাড়ো তো ওসব কথা আসলে তোমরা সকলে মিলেএকটা মিথ্যেকে সত্যি করতে চেয়েছিলে আমি সেটা মেনে নিতে পারিনি বলেই তোমরা আমায় ভিটে ছাড়া কুল ছাড়া করে ছেড়েছ " / " তাতে আমার দোষটা কোথায় "? কেন বুঝতে পারো না? যাক্ ছাড়ো ওসব কথা সীমা কোথায়? ঢিপ করে প্রণাম ঠুকে বসে সীমা বড় জায়ের পায়ে। কত বড় হল মেয়ে? " সবে ক্লাশ সিক্স",আনলে না কেন দেখতে পেতাম । ও তো বোধহয় বাবানের থেকে বছর দু'য়েকের ছোট হবে তাই না মা? " হবে হয়তো আমার মনে নেই, যাক্ ভাল কথা ও ঘরে দ্যাখ তো তোর বর্ কি জানি বলছিলো "! "যাচ্ছি"। মৃগাঙ্কের ঘরে ঢুকে মৈত্রীকে পাঠিয়ে দেয় মায়ের কাছে। দরজা আলগা ভেজিয়ে পেছন থেকে মৃগাঙ্কের গলা ধরে শৈশবের মতো বিছানায় লুটিয়ে দেয় নিজেদের। মৃগাঙ্ক কিছু বলতে চাইলে চেপে ধরে ওর মুখ। রেস্ট প্লিজ্। আসলে প্রতিটি মানুষের মনে কিছু মুহূর্ত থাকে কারুর সুপ্ত কারুর জাগ্রত,পরিবেশ পরিস্থিতি মানুষকে চালিত করে কখন কোথায় কিভাবে সে নিজেকে দাঁড় করাবে। পরিবেশ খুব বিরোধিতা না করলে মানুষও নড়ে চরে দু'কলি গেয়ে ওঠে নিতান্ত আবেগে। অতি বড় খুনীও দানী হয়ে ওঠে ভাবাবেগে। এটাই মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্র তারপর গোল টেবিল বৈঠকে জমিয়ে খাওয়া দাওয়া আড্ডা ইয়ার্কি, অনেকদিন পর সকলে একত্রে। মৃগাঙ্কের পছন্দের ডিশ লাউ চিংড়ি তৈরী করেছে মা বেশ হাসি হাসি মুখ ওর, বহুকাল পরে ওর মুখে হাসি দেখল পরিবারবর্গ। মা মেয়েকে আড়ালে ডেকে ফিসফিস করে কি জানতে চাইলেন পাঠক বলতে পারবে না জানি। আমার মতে বোধহয় বলতে চাইছিলেন এবারের ট্রিটমেন্ট টায় খুব কাজ হয়েছে মনে হয় কি বল!


( ক্রমশঃ)
ধূসর আয়না / পর্ব পাঁচ
মল্লিকা রায়


প্রায় তিন হাজার টাকার বেলুনে সাজানো হয়েছে বাড়ির সামনের বিশাল গেট , অভ্যাগতের অভ্যর্থনার সাজানো লন্ প্রস্তুত , বাড়িটা সেজে উঠেছে অসংখ্য রঙীণ আলোতে, এমন একটা উচ্ছল আনন্দের দিন রবিকে কোনওদিন দিতে পারত না অতসী । বস্তুত জীবনের জোড়া তালিগুলোতে তাপ্পি মারতে মারতে এই ছোট খাটো আনন্দ খুশি গুলো নিয়ে ভাববার সময়ই হয়নি। কোথা দিয়ে কেটে গেছে এসব সুন্দর দিনের রোশনাই টেরই পায়নি অতসী , আগের দিন চলে আসতে বলেছিল দিদি ,তা আর হল না হাঁচি হতেই মায়ের ফিরিস্তি সকালে বেড়োস নি বাঁধা পরেছে পূজো, স্নান সেরে তারপর বেড়োবি। ডান চোখটা জলে ভরে গেলে বা৺ হাতে চেপে ধরতেই ফের মায়ের বকুনি , দু'চোখে হাত দে দিলিতো আজ আবার সারা দিনটা বিগরে ! বিরক্তি বেরিয়ে আসে ,উফ্ মা , তুমিও ? "দেখলি তো টিকটিকি ঠিক ঠিক বলছে "। মা হাজার বিরক্তিতে গটগট করে ঢুকলেন স্নান ঘরে । মৃগাঙ্ক অনেকটা সুস্থ আজ , ছেলের জন্ম দিনে যাবে কত তার আয়োজন। মৈত্রীর আজ ছুটি। সকালে সামান্য কিছু ব্রেকফাস্ট করে বেড়োনোর কথা , পূজোয় বসলে মা'র আবার আধাঘন্টার কমে হয় না । প্রথমে সিদ্ধীদাতার পরে ধম্মদাতার পূজো। " উরিব্বাস এতকিছু সামলাতে হয় তোকে ? আমি তো অবাক হচ্ছি রে অতসী , তোকে আমার খুব ভালো লেগেছে একদিন চলে আয় আমার ফ্ল্যাটে , এখন আমি দিল্লিতে শিফট করেছি ,একজন বিশ্বস্ত মহিলা দরকার ,তুই হাত, পা ঝাড়া আছিস আয় না আমার ওখানে , কাল পরশু এখানে থাকব পরের দিন ফ্লাইট তুই চাইলে"। "সেটা এখনি সম্ভব না রে , মূগাঙ্ক ,মা রয়েছে,চমৎকার সুযোগের সদ্বব্যবহার , আরেক অভিজ্ঞতা হুমড়ি খেয়ে জমে অভিজ্ঞতার ঘরে । এবারে চোদ্দতে পরল সূর্য , ঠোঁটের পরে সরু রেখা শরীরে পৌরুষ বাসা বাঁধতে লেগেছে । চোখে,মুখে তার দিপ্ত প্রভাব । স্বভাব সুলভ কায়দা কানুন বেশ ভাল মতই রপ্ত হয়েছে ইদানিং। গাড়ি এসে ঢুকল লনের সামনে । প্রায় কাছের দূরের তিন ভাগ অতিথি, স্বজন উপস্থিত । এক বয়স্ক ভদ্রলোককে ঢিপ করে প্রণাম করল অতসী , সম্পর্কে দিদির শ্বশুর ।মৃগাঙ্ক হাত জোড় করে প্রণাম জানায় বৃদ্ধকে। মা ততক্ষণে দিদির ঘরে আলাপে মগ্ন। চার জোড়া চোখ যার জন্য অস্থির সেই পরম কাঙ্কিথ মানসপ্রতিম তার দেখা নেই কেন ? অজস্র মানুষের আড়ালে তার শৈশব কি স্থগিত রেখে গেল অতীতের কাছে ? এখনও তো ভালো ভাবে পূর্ণই হল না ভেতর বাহিরের আত্মিক লেনদেন ।তৈরী হলনা উভয়ের হৃদয়ের উষ্ণতা এখনি ? মৃগাঙ্ককে নিয়ে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করে সোনার কথা ," আর বলিস নে ছোট , কতকরে বল্লুম মা,বাবা আসবেন কোতাও যাসনি ,তা কে কার কতা শোনে বল ? গেচে বন্ধুদের সঙ্গে নন্দনে না কোতায় মুভি দেকতে বলল রাত হবে ,তুই বল দিকিনি ছোট , ঘর ভর্তি লোকজন আমি কি জবাব দি "? তরাক করে উঠে দা৺ড়িয়ে পরে অতসী চোখে, মুখে আজন্ম বিস্ময় ," বলিস কি ? এই বয়সে মুভি ? তুমি যেতে দিলে কেন দিদি ? কত শখ ওকে আমি মনের মতো করে মানুষ করব , দেখছি আমার সমস্ত স্বপ্ন তুমি নস্যাৎ করে দিলে দিদি ,এখন আমি মুখ দেখাই কি করে ? এ তুমি ঠিক করলে না দিদি আমার একমাত্র ও শেষ স্বপ্ন নিয়ে তুমি চরম ছিনিমিনি খেললে দিদি । ভেবে ছিলাম তোমার কাছেই ও ভালো ভাবে মানুষ হবে এখন দেখছি ভুল, ভুল ভেবেছিলাম " । এক প্রতিবেশী এসে দুই হাত জড়িয়ে ধরে অতসীর , দিদি শান্ত হন অত বেশী চিন্তা করলে কষ্ট পাবেন । এ সবই উপর ওয়ালার ইচ্ছে দিদি । একজন অল্পবয়সী যুবক ক্যমেরায় কেক কাটা থেকে শুরু করে বন্ধুদের সাথে প্রায় একরাশ ছবি দেখায় অতসীকে, ভাল করে মুখে র দিকে চেয়ে অতসী আলতো করে গালে আদর করে ", কত বড় হয়েছিস রে সেই এত্তটুকুন দেখেছিলাম , কোন ইয়ার "? অনার্সে থার্ড ইয়ার ,পায়ে হাত রাখে মেজ মাসীর একমাত্র ছেলে। মৃগাঙ্ক মন খারাপ করে বসে আছে, নিস্তব্ধ অতসী একঘর মানুষ যেন ওদের দিকে ইট,পাথর, বিদ্বেষ,ঘৃণা ছুড়ছে , হাসিতে ফেটে পরছে ঘর তীব্র ব্যঙ্গোক্তি ছুরির ফলার মত এসে বি৺ধছে ওদের অন্তরে। দীর্ঘ ক্ষণ ধরে বাইরের লনে মামাতুতো দিদির সঙ্গে গল্প ,আড্ডার সবটাই প্রায় প্রহসনে পরিণত হল। দিদির বর নামলেন , ঠোঁটে চুরুট ,দামী রিবন ব্যন্ডে মোড়া শরীরের দামী শ্যুট। খুব একটা পছন্দ করেন না সাধারণ অতসীকে ।এককালে যখন আটচালা ঘরটায় দিদি রাত দিন হা পিত্যেশ করত ,তখন ভালোবাসা উথলে উঠত ওর । তখন অতসী আর বৃদ্ধা মা । এক সকালে মা নিঃস্ব হয়ে গেল ,বাবার শেষ সম্বলটুক চলে গেল ওই ভদ্রলোকের হাতে ।তারপরই আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি অবস্থা ফিরে গিয়েছিল দিদির । আর মায়ের হাত ধরে অতসী সরাসরি কাজের দরজায় দরজায় । সবটাই ঐ ধূসর আয়নাটার মতোই আষ্টে পৃষ্টে ঘিরে রেখেছে ওকে , মুখের, মনের চাদরটা সরিয়ে দুঃখগুলোকে পুষে রাখতে হয় আয়নার জমা ময়লা ,ধূলোর মতো ,মাঝে মধ্যে জলের হলকা ছিটিয়ে তকতকে জেল্লার সমুখে একগাল হাসি ছড়িয়ে দিয়ে জোড়ে কিল্ মারতে হয় অচ্ছুৎ ভাগ্যটাকে আর ঝড়ঝড় কেঁদে ফেলে বলতে হয় নে ,নে আমায় এবার তুই গ্রাস করে নে। দিদি,কাকু,পিসী কত মধুর সম্পর্ক,কত আপনার কতো ভরসার ।বিপদে আপদে ,খড়া,বন্যায় প্রতিকূলে। তাদেরও নিলি? তারও বছর দুই বাদে বিয়ের পিড়ি । " কিরে তোরা খেতে যাবি না "? চমক ভাঙে দিদি। " তোমরা খেয়ে নাও আমার ভালো লাগছে না গো "/ " দ্যাক ছোট ও বড় হচ্চে ,বুজতে শিকচে এক আদটু তো আনন্দ ফুত্তি করবেই এতে এত চিন্তার কি হল আমি তো বুজে পাই না বাপু , নে ওঠ এবার লোকজন কি ভাবচে বল দিকিনি "? বেজায় চটেছে মৃগাঙ্ক , " আমি বাড়ী যাব এক্ষুনি " / জামাইবাবু বন্ধু বান্ধব আপ্যায়নে ব্যস্ত , নিজের সন্তান হয় নি বলে সূর্যকে সে পরম আপনার বলে টেনে নিয়েছে বুকে এর মধ্যে যে সত্যিই কোন দ্বৈততা নেই তা অতসী প্রমাণ করে নিয়েছে ।এটুক বুক ঠুকে প্রমাণ করতে হয়নি সূর্যের সুখের জন্য , ভালোর জন্য রাতদিন এক করেছে ওরা দুইজন । সুদৃশ্য দু'টি ডিশে খাবার সাজিয়ে এক ডোনার , প্লিজ স্যার "। অগত্যা । একদিকে ভোগের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে পরিবেশ অন্যত্র ভোগ থেকে উঠে আসছে স্বেচ্ছাচার , অপরিনামদর্শী একদল নীতি নিষ্ঠ হীন অদ্ভুত সামাজিক জীব। মধ্যের যা৺তাকলে পরে ন্যায়, নীতির জটিলতার গভীর পা৺কে তলিয়ে যাচ্ছি ক্রমাগত। পাশে এক তরুণ তরুণী ঘণিষ্ট প্রেমালাপে মত্ত , " হ্যালো বয় প্লিজ দুটো এক্সট্রা ফিশফ্রাই , " এ্যই মুটিয়ে যাচ্ছ কিন্তু " মেয়েটি ছেলে টির হাত চেপে ধরেছে এদিক ওদিক দেখছে ,চোখে চোখ পরে যায় অতসীর । " প্লিজ আন্টি , ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যন্ড "। খুব সেজেছে দিদি দামি শাড়ি ,গয়নায় ঝলমল করছে রুপ ঐশ্বর্য ,হেলে দুলে আনন্দে দিদি আজ দেবদূত । ঘুমিয়ে পড়েছে মা , আরো কত জাগবে ? গুষ্টির ঘা৺নি টানতে টানতে মা তো একটু নিশ্চিন্ত হতে চাইতেই পারে তার মধ্যে কোন অপরাধ থাকার কথাও নয় । কিন্তু জাড্যের দড়ি কষাকষিতে রস নিংড়ে নিতে আমরা ছাড়ব কেন ? সম্পর্ক তো সূক্ষ সুতোয় ঝুলে থাকে অলক্ষে , তাকে রসিয়ে, জারিয়ে , পুড়িয়ে তবেই না মোক্ষ লাভ। গড়গড়িয়ে চলেছে মানবতার লাইন একে একে সকাল থেকে রাত্রি ঘু৺টি সেজে আমরা তৈরী ,ছক্কা ফেলব নতুবা খেলা পন্ড। দু'হাত, পা মাথায় তুলে যদি নাচতেই না পারলাম তবে আর ভোগ কিসের ? নাচতে নাচতে কারো উনোন ভাঙলে তার দায় আমার নয়। আমি শুধু রসটি খাবো বাকি যা খোসা,বাকল দাঁত, চুল ওসবের ষষ্টি পূজো হোক দু'টাকা চাঁদা বরং বেশি দেব । মৃগাঙ্ককে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেল দিদি খুব যত্ন করে । জানে ওর রোগ চারা দিয়ে উঠলে অপমানের একশেষ। তাই মালিশ আর কি । পাশের সার সার গাড়ির মধ্যে ওকে স্পেশাল কফি খাওয়াচ্ছে দিদি। মুখ ঝুঁকিয়ে কি গোপন তথ্য আবিষ্কার করতে চাইছে কে জানে উথলে উঠছে দিদি মৃগাঙ্কের বুকের ওপর ।এমন করে মনের কথা শুনতে চাওয়ার দৃশ্য এইপ্রথম , নব্য কিশোরের মতো মাথার চুলে হাত বোলানো ছাড়া কিই বা করবে মৃগাঙ্ক । গড়গড়া ফুঁকতে ফুকতে সেখানে এখন বালিয়াড়ির চড়ামরিচীকা দেখা ছাড়া মুক্তি তো দেখি না ।অন্তসার শূণ্য বিনিময়ে হৃদয়ের আর্তি না থাকলে তাতে বিবমিসা রোগ তৈরী হয় আর কয়েক কোটি বীজানু । যাই হোক সময়টা সন্ধে, চা পানের বিরতির। দারুণ দারুণ আইটেম তৈরী হয়েছে , মেন্যু কার্ড দেখে বোঝা গেল । সবকিছুই আছে অথচ কিছুই নেই। সমস্ত কিছুর ভেতর দিয়ে শুধু কান্নার আওয়াজ কানে আসছে অতসীর , কোলশূণ্য ,হৃদয়শূণ্য হবার আওয়াজ। পৃথিবীর কোথাও একফোটা প্রাণের অস্তিত্ব খুজে পায় না অতসী। মায়ের কথা মনে পড়ে যায়, " ছেলে কিন্তু তোর পর হয়ে যাবে রে অতু "/ ঘাড়ে হাতের স্পর্শ, মায়ের সাথে মুখোমুখি। " "ঘুমিয়ে পড়েছিলুম রে ", খেয়েছ তো প্রশ্ন অতসীর। হ্যাঁ ওই টুসকিই ডেকে খাইয়েছে। বাবুটার সঙ্গে দেখা হল না কি যে খারাপ লাগছে। আর কি হবে মা চল ফেরা যাক। দাড়া আর কিছুক্ষণ দেখে, আর কি দেখবে মা, আর দেখার আছেটাই বা কি ? বুঝছ না আজকের দিনে ও আমাদের আশীর্বাদ নেবার প্রয়োজন বোধ করল না । তুই শান্ত হ' অতু । একটু চুপ কর । ক্রমশ ফাঁকা হতে থাকে মঞ্চ ,একে একে কুশীলবেরা বিদায় নিতে থাকেন ,চলে দ্বিতীয় প্রহরের প্রস্তুতি । ঘচাং করে ব্রেক কষে একটি লাল আলট্রার প্রবেশ। ওরা এল বোধহয় মা এগুলো । আট দশজন বন্ধু বান্ধবী সহ গাড়ি থেকে অবতরণ প্রিন্সের। আশে পাশে অপেক্ষমান বাবা, মা ,স্বজনদের উৎসাহউপেক্ষা করে উঠে যায় উপরতলায় দিদি কিছু বলতে গেলে ," দারুণ টায়ার্ড মা ,কাল শুনব " দরজা লকের শব্দে সচকিত হয় কিছু পাংশু মুখ।


( ক্রমশ )
ধূসর আয়না / পর্ব ছয়
মল্লিকা রায়


"বিশ্বাস করো আমি তোমায় খুঁজেছিলাম ,চাকরী পাবার পর তোমার বাড়ী গিয়ে আমি পরিশ্রান্ত হয়ে পরি ,তুমি তখন অনেক দূরে , আসলে কলেজ জীবনের পর তুমি আমায় ভুল বুঝলে বাধ্য হয়েই..........." "মিথ্যে কথাগুলো আর কত বলবে রমেন ,যে মুহূর্তে তোমার আর বন্যার ঘণিষ্ঠতার কথা আমার কানে এসেছে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি ,সরে গেছি তোমার কাছ থেকে আর তার পরে একপ্রকার বাধ্য হয়েই বিয়ের সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললাম মায়ের পিড়াপীড়িতে , এর একটি অক্ষরও মিথ্যে বা বানানো নয় তা তুমি ভাল করেই জানো * তোমার বাড়ীতে প্রথম যেদিন গেলাম তোমার মা আমার রাশি,জন্মছক,চুল,রং নিয়ে প্রচন্ড কটাক্ষ করায় আমার খুব খারাপ লেগেছিল , যেন আমার কনে দেখা চলছে* আসলে কি জানো, মেয়েদের নিয়ে গতে বাধা ছকে যাহোক কিছু একটা ভেবে নিতে তোমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছ , জানিনা এটা শিক্ষা বা সংস্কার কোন পর্যায়ের মধ্যে পরে কিন্তু অসুবিধা এখানেই যে সমস্তকিছু বাছবিচার ব্যবহারিক জীবনে যা'র ন্যুনতম প্রয়োগ নেই এ মিথ্যে বর্জণের অসুবিধা কোথায় ? আজ ছুটির দিন সন্ধ্যের স্নিগ্ধ সুগন্ধে স্বপ্নিল ,মায়ের সন্ধ্যারতির পর্বে মুখর পরিবেশ,পরপর দু'দিন ছুটি থাকায় অনেকটা ক্লান্তির লাঘব হয়েছে , সারা দিন বহু কাজের মধ্যেও মৃগাঙ্কের যত্ন আত্তির কোন কার্পণ্য করেনি অতসী *তার মধ্যে রমেন' ,রমেন দা বলতে অভ্যস্ত ব্যক্তিটির আহ্বান ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে ওর নারী হৃদয়কে কোন এক কোনে যেন আলতো যত্নে সংরক্ষিত , হাওয়া দিলেই সবকটা স্মৃতি ওলোট পালট হয়ে যায় অজান্তেই , কেন হয় এর কোন ব্যখ্যা হয়না ! জীবনের অনেক কিছুরই কোন মানে হয় না , কোন অর্থ হয় না সম্পর্কের অথচ এমন কিছু আত্মিক টান থাকে যা উপেক্ষা করা যায় না , সময়ের ভেতরে বৃত্ত, বৃত্তের ভেতর নিবিড় খোলসে পূর্ণ তার অস্তিত্ব , কতভাবে ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে চলতে গিয়ে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা যে হয় তার ইয়ত্তা হয়না *তখন কতই বা বয়স ,পৃথিবী একটি রঙীণ গোলকের আঁতস, রন্ধ্রে রন্ধ্রে রহস্যের মাদকে মথিত এক পূর্ণ দৈর্ঘের প্রেক্ষাচিত্র ,সেই দৃষ্টিভঙ্গীর সংজ্ঞাগুলো আজ নিতান্তই অপ্রকৃত ও অলীক মনে হয় , কত সহজে একে অপরকে চেনাজানার চারিতা ,আজ সত্যিই হাস্যকর মনে হয় * আজ দুপুর গড়াতেই চলে এসেছে রমেন ,অনেক জমানো কথা নিয়ে , ব্যথা নিয়ে ,ঝড় ঝঞ্ঝা তুফান নিয়ে ! "মোটেই অপ্রাসঙ্গিক নয় , তুমি কি ভাব এই তোমার আমার দেখা হওয়ার মধ্যে কোন কারণ নেই? তুমি কি জানো ওপরওলার ইচ্ছে না হলে এভাবে আমাদের দ্যাখা হওয়া সম্ভব হত না ",এসে থেকেই প্রশ্নবানে জর্জরিত রমেনের ধুরন্ধর চালের কাছে অতসী জ্বলে উঠেছে বারবার , কেন জানি মন থেকে মেনে বা মানিয়ে নেবার যায়গাটুকে আজ দুস্তর ব্যবধান ,সেদিন যা সহজ ছিল আজ তা সবচাইতে কঠীন বাস্তব ! "অবশ্যই ! ইচ্ছে আছে বই কি রমেন তবে কি জানো সেদিনের রমেন দা আর আজকের রমেন এক ব্যক্তি হলেও মাঝখানের সময় জুড়ে যে শূণ্যস্থাণ তার প্রভাব মেটাবে কেমন করে ? সময় মানুষকে পরিণতই করে না শিক্ষাও দেয় ,তাছাড়া রমেন আমাদের দু'জনের মাঝখানে আজ ঘিরে রয়েছে অজস্র সত্তা এরা তো কোন অপরাধ করেনি '', হাসছে রমেন তির্যক হাসি , কি আশ্চর্য অতসী দ্যাখো আমরা যুগযুগ ধরে একে অপরকে চিনি জানি বাসি অথচ আজও কাছে না এসে কতটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে তুমি আমায় সন্দেহে বিঁধছ আসলে এও একপ্রকার গ্রহের প্রভাব তুমি মানো বা নাই মানো ! " কথায় কথায় তোমার তিথি নক্ষত্র এসব মায়ের কু অভ্যাসগুলো যোগ করার পুরোণো নিয়ম থেকে এবারে বেরোতে হবে , কিসের দ্বিধা এই তোমার হাত জাপটে ধরেছি পারলে ছাড়াও ,বল কিসের এত দ্বিধা ,সংকোচ ''? অনেকটা রাত দু' টি মানুষের হৃদস্পন্দন ঘিরে রহস্যের অন্তর্জাল , কাছে আসা বা না আসা খুব বড় কথা নয়, সম্পর্ক হল এমনই এক আপাত জটিল সূক্ষবোধ যার অস্তিত্ব/অনস্তিত্ব ঘিরে ব্যক্তির প্রকাশ , বিস্তার , প্রভাব নির্ভর করে, আবার ভাঙ্গা গড়া ঘিরে সম্পর্কের জটিল যাঁতাকলে পিষে তলিয়ে যায় কত ঘর ,সংসার অনাথ হয় শিশু !প্রতিদিন বাসের জানলায়,কাগজের পাতায় তার ভীতিপ্রদ ভেসে ওঠা অজস্র বিদ্ধস্ত ছবি যেন এই ভয়াবহতার জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকার নিরপরাধ অস্তিত্ব বহন করে চলেছে ,ভাবলেই শিউরে ওঠে বুক , পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের পৃথক অধিকার যেমন আছে তেমনই রয়েছে তার সংযোজনিক ব্যুহ ,আর তার বাইরের চক্রান্তে ছিনিয়ে নেওয়া !এর পরিবর্তে সমর্পণের ভাষায় যা আসে তাতেই মনে হয় নিরাপদ , শান্তির , তৃপ্তির ! পরস্পরের এই দায়টুক মেনে নিলেই অনির্বচনীয় মাধুর্যে ভরে যায় প্রত্যেকের জীবন ! অথচ এই ছোট্ট অস্তিত্বের মাঝখানে কি অজস্র জটিল ঘূর্ণাবর্তের বেড়াজালে নিষ্পেষিত মানুষ ক্ষয় লয় বিলীন হয়ে চলেছে অহরহ , মৃত্যু ঘটে চলেছে অস্তিত্বের তার খবরে কে কতটা বিচলিত হয় ! রমেন অতসী খুব কাছে আজ অথচ কোন উদ্দীপনা নেই ,নেই আইসক্রীম গালে চেপে ধরে মজা দেখানোর খুনসুটি , বছর বছর ব্যবধান বাড়তে বাড়তে আজ তা প্রাচীরে পরিণত , শুধু আছে অপরিসীম দ্বন্দ , বিদ্বেষ ,ঘৃণার এক অকথিত ইতিহাস যা ওকে পাথরে পরিণত করেছে ! রমেন খুব ভালবাসে অতসীকে এ কথা ঠিক তবে নির্ভেজাল সহজ সরলতার মাঝখানে কিছুটা চালাকির প্রবণতা ধরা পরে যায় সহযেই, ''জানো আমি তোমায় এভাবে জড়িয়ে থাকতে পারি সারাটা জীবন , তাও কি বিশ্বাস করবে না তুমি... .........''চল এবার নিচে নামি , '' না আগে কথা দাও ''বেশ দিলাম ! মা ডাকছেন ,''চল মায়ের হাতের চা ",তুমি জানলে কিভাবে ? মনে নেই সেদিন যে বললে ? ওহ বলেছি বুঝি ? বেশ কিছুক্ষণ ধরেই অতসী ওকে বাড়ী ফিরতে বলছে ,আসলে কি একটা গোপন করতে চাইছে , বোঝা যাচ্ছে না কিছুতেই,টেবিলে মায়ের হাতের চা , স্ন্যকস্ ! এই সময়টা মায়ের প্রার্থণা সভায় যাওয়ার ! '' কি খবর ভাল আছো তো বাবা , তুমি বোস আমি একটু আসছি '', মাথা নাড়ে রমেন , অস্থির হয়ে ওঠে অতসী এক ঢোকে প্রায় সবটা চা শেষ করে উঠে দাঁড়ায় ,'' ''চল তোমায় পৌঁছে দিই '', বেশ চল , কথা বাড়ায় না রমেন , এ ঘর সে ঘর কি একটা দেখবার স্পৃহা ,'' আহা তাড়া করছ কেন'' ? ''না এমনি '', তুমি বেড়োলে আমি টয়লেট যাব প্লিজ্ '' ওকে ওকে বাই '', খুব জোড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পরে অতসীর তার সাথে আশঙ্কা এ রাত কি দুঃসহ বার্তা বয়ে আনবে কে জানে , ওর প্রশ্বাস জুড়ে ঘরের রুদ্ধশ্বাসে কেবল অতসীর প্রচ্ছায়া ,আপকামিং মেন্টরটিকে মনে ধরেছে কিনা প্রশ্ন করলে মৃদু হেসে মুখ ঘুড়িয়ে নেয় ,কে জানে কেন ,অল ওভার মেসেজটা ও দারুণ করে ,ওষুধগুলো টাইম টু টাইম তবু .....বেশ কাটলো সময়টা ঠিক কতকাল মনে করা যাচ্ছে না এই মুহূর্তে , একটা যুগ ও তার অবক্ষয়ের ধংসাবশেষ ছাড়া নাড়াচারা করার মত আর কিছুই অবশিষ্ট নেই ! থাকলেও তেমন হৃদয়াত্মক হয়তো নয় , গেট লক্ করে পা টিপে মৃগাঙ্কের ঘরে ঢোকে অতসী ,অন্ধকার ঘরে চুপচাপ বসে মৃগাঙ্ক , আয়া আজ আসেনি ছুটি ,মেজাজ বিগরে আছে কিছুটা যাক্ রমেন কিছু টের পায়নি তাহলে ! আলো জ্বালে অতসী,''অন্ধকারে বসে আছো কেন ?তোমার চা মৃগাঙ্ক ! নিরুত্তর ! এ কি বিকেলের ওষুধগুলো সব পড়ে আছে খাওনি কেন ? নিরুত্তর ! '' এ কি কান্না করছ কেন '' ? '' আমাদের বাবুটা.... ...কাছে এসে মাথায় হাত রাখে অতসী ,'' কি হয়েছে অত ভাবছো কেন আমি তো আছি '', আচমকা ঝটকায় টাল খেয়ে পড়ে যায় অতসী ,'' না ,আমায় ছোবে না খবরদার বলছি , কোন ওষুধ আমি খাব না কিচ্ছু খাব না এই মুহূর্তে চলে যাব বাড়ী ছেড়ে ভেবেছ আমি কিছু বুঝি না , না '' ? উঠে দাঁড়িয়ে ওর চোখে চোখ রেখে ,'' গায়ে কেন হাত তুললে তুমি ? জবাব দাও, কেন হাত তুললে , তোমায় যত্ন করে খাইয়ে সেবা করে কি প্রতিদান দিচ্ছ আমায় ,লজ্জা করেনা সংসারের ভরণ পোষণ জোগার করতে যে মেয়েমানুষকে রাস্তায় এনে দাঁড় করিয়েছ আবার বড় বড় কথা বলছ, গায়েও হাত তুলছ ব্যাপারটা কি সাপের পাঁচ পা' দেখেছ বুঝি ? বেইমান যাও বেড়িয়ে যাও দূর হয়ে যাও চোখেের সামনে থেকে পাষন্ড কোথাকার '' , বিছানায় উপুর হয়ে কাঁদতে থাকে অতসী ! শোকে ,দুঃখে বিদ্ধস্ত মানুষীর পাশে কেবল জলের আবর্তন , ছাপিয়ে ভাসিয়ে নিচ্ছে অস্তিত্বের সবটা ,ভাঙছে অথচ নিঃশব্দ ,কি পাষন্ড নিস্তব্ধতা ঘিরে কঠোর অবস্থাণ , অন্যের বিচার করতে যাওয়া অতসীর আজ বিচার হবে কোথায় ? থমথমে ঘর ! মা ঢুকল , অতু প্রসাদটা নে মা তোর বরকে দে ঠাকুরমশায়ের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে এলাম , ধীরে ঘরে ঢুকে অতসীকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখে সম্ভাব্য ঘটনায় বিচলিত হয় , ''আমি জানতাম , কি দরকার বাপু গাল বাড়িয়ে মার খাবার'' ? '' কি বলতে চাও মা ? এই আমি আর কত সহ্য করব ,কেনই বা করব বলতে পার ''? '' সহ্য করতে হবেই তোকে , সন্ধ্যে পেরিয়ে গেল বলি ভদ্র লোকের বাড়ীর একটা আচার বিচার আছে তো না কি '', '' কি বলছ তুমি মা ? এই পড়ন্ত বয়সে এসেও এত নিষেধ ? কেন ,কিসের জন্যে ''? আমি জানিনা বাপু তবে আন্দাজ করে ঠাকুরমশায়কে বলেছি , উনি একটা শেকড়ের নাম লিখে দিয়েছেন শুক্রবার সন্ধ্যায় উপোস করে তাবিচ করে ডান হাতে বেঁধে দিলে ও একদম ঠান্ডা হয়ে যাবে দেখবি ,'' কাগজের পুটলিতে কি একটা গুঁজে দিল মা ! এদিক সেদিক দেখে কানের কাছে মুখ এনে '', হ্যঁরে অতু তেনাকে দেখছি না তো কোথায় গেল রে ''? '' কোথায় আবার যাবে , দেখ ছাতে বসে আছে হয়তো , একদম ডাকবে না , আসবে নিজের ইচ্ছায় খাবে ওষুধ খাবে সব করবে কিচ্ছু করে দেব না , দেখি কি করতে পারে ও '', নে ওঠ কাঁদিস না মা , আমার খুব কষ্ট হয় বিশ্বাস কর ,উঠে দাঁড়ায় মায়ের কাঁধে ভর করে ,মা, রুগ্ন মা , নিঃস্ব মা অথচ কি অসম শক্তি, ভরসার জায়গাটুকের কোন বিকল্প হয়নি ,হাউ হাউ ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে মায়ের গলা জড়িয়ে ,মাও কাঁদে মেয়েও কাঁদে সাক্ষী থাকে শুধু চার দেওয়ালের ইট, কাঠ, পাথরের কংক্রীট ! রাত গড়িয়ে দুই প্রহর বাইরে সারমেয়কূলের অবাধ বিচরণ ,মাঝে মাঝে চৌকিদারের ,'' জাগতে রহো '' হুঁশিয়ারীর লাঠির গোত্তা জানান দিচ্ছে , হম হে ! আচমকা ঘুমটা ভেঙে গেলে সোফার ওপর মৃগাঙ্ককে দেখে আশ্বস্থ হয় অতসী , টয়লেট যাবার পথে টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া ,বোঝা গেল রাগ কমেনি , রাগ ভাঙাক মৈত্রী আগামী কাল ! অন্য যে কোন দিন কাছে এসে যত্ন করে খাইয়েছে ওকে আজ যেন দিনটায় অন্যরকম খুশবু মিশেছে , মোটেই সহ্য করা যাচ্ছে না ওর পাগলপনা ! আধো অন্ধকারে মুখটা ময়াল সাপের মত হয়ে উঠছে ওর মাথায় শিং , শরীরটা নেকড়ের , ধীরে জেগে উঠছে আরেক অস্তিত্ব ! ধ্যৎ এত কুতসিৎ লাগছে কেন ,কে ও ? ও কি মৃগাঙ্ক ?


( ক্রমশঃ)

উপন্যাস // ধূসর আয়না (পর্ব সাত )
মল্লিকা রায়।


অাজ আর কোন শোক নেই অতসীর,নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে মুক্ত পৃথিবীতে ,কোন কিছুই তাকে অার স্পর্শ করতে পারে না । মানুষের মাঝে খুঁজে পেয়েছে অনাবিল ভালোবাসা ,স্নেহ ,প্রেম যা ওর হৃদয় ভান্ডারকে ভরিয়ে দিয়েছে সমস্ত না পাওয়ার শূণ্যস্থাণগুলো, বস্তুতই মানুষ নিজেকে সুখী,সমৃদ্ধ দেখতে বেশী পছন্দ করে তাই তার চাওয়া পাওয়া ঘিরে অন্তর জগতে চলতে থাকে এক প্রকার সংঘাত ,দ্বন্দ সমস্ত ঐহিক জগৎ ছাড়িয়ে আরেক অন্তরজগতের শূণ্যতাকে ঘিরে তার ক্রিয়া কলাপ , অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার প্রস্তুতি ,প্রয়াস ! যে যুগটা থেকে আমরা যদিও সরে এসেছি অনেকটা দূরে কিন্তু বেরিয়ে আসতে পারিনি তার প্রভাব থেকে জৈবীক কোন এক শৃঙ্খল আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে তার ছত্রছায়া , তাই অহরহ মানুষকে চালিয়ে যেতে হয় লড়াই কখনো প্রচ্ছন্ন কখনও সমুখে ! যে কারণে অতসী আজ বিদ্ধস্ত হয়ে পড়েছে সমস্ত অস্তিত্বটুক ঘিরে অথচ এমনটা হবার সঙ্গত কোন কারণ খুঁজে পায়নি ও , মানুষের সভায় যুক্তি তর্কে মেতে থাকা অতসী , নিজের ভুলটা সগর্বে স্বীকার করে নেবার সততা , পাশের বন্ধুটির ভুল ধরিয়ে মুখে হাসি ফিরিয়ে দেবার ক্ষমতা বরাবরই সকলের কাছে প্রিয় করে তোলা অতসীর চার দেওয়াল কেন ওকে স্বস্তি দিল না ভাবতে অবাক লাগে ! বন্ধুরা বলে মানুষ নির্বাচন অর্থাৎ সঙ্গ মানুষকে সম্পূর্ণ ধ্বংস অথবা খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে এই নির্বাচন সঠিক না হলে মানুষের অস্তিত্বের প্রকাশ তো দূরস্ত ঠাঁই হয়না নরকেও ! ঠিক এমনই পরিস্থিতির শিকার অতসী ! মৃগাঙ্ক ওর জীবনে কি অমঙ্গল ঘনিয়ে নিয়ে এসেছে বুঝতে পারে না ও ! ওর সমস্ত ন্যায় অন্যায়গুলো মেনে নিয়ে বুকের সান্নিধ্যে টেনে নিয়ে সমস্ত জীবনটা অন্যায়ভাবে একপ্রকার নষ্ট করে দেবার এই ধরণটা সহ্য হয়নি স্বজন বন্ধুদের তাই নানা পরামর্শেও যখন ও অবিচলিত পাশ কেটে সরে গেছে অনেকেই ! কেন যে কোনভাবেই নিজেকে জড়াতে পারেনি অন্য কারো জীবনে বুঝতে পারে না ও যখনই মন বিদ্রোহ করেছে মৃগাঙ্কের করুণ মুখটা ওকে টেনে নিয়েছে গভীর আকর্ষণে বিপরীতে পেয়েছে লাঞ্ছণা উপেক্ষা কারণ বরাবরই ওর স্বভাবের উগ্রতা ,চরিত্রের স্খালনে মুখ লুকিয়ে নিঃস্ব হয়েছে অতসী সে খবর রেখেছে বন্ধুরা! তীব্র ভর্তসণা করেছে ওকে তথাপি কোন পরিবর্তনকে ও মেনে নিতে পারেনি , এটা কি সত্যিই ভালোবাসা না কি গভীর আকর্ষণ আজও পরিষ্কার নয় ওর কাছে ! বিয়ের বছর তিনেক সুস্থ ,স্বাভাবিক থাকা মানুষটা আমূল পরিবর্তন হয়ে গেল কিভাবে সে সদুত্তরে গিয়ে আজ আর কোন লাভ নেই , কেনই বা বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন নারীরা ওর ওই সরলতাকেই ঢাল বানিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে ওর ব্যক্তিজীবন আজ তা জলের মত স্বচ্ছ প্রশ্ন এই আজ একপ্রকার অথর্ব হয়ে পরা মানুষটাকে ওদের আর প্রয়োজন নেই ,বাহ্ রে সভ্যতা ! ঘনঘোর বর্ষায় কাজে আসেনি অনেকেই , কেউ ভিজে কেউ অন্যের ছাতায় সঙ্গী হয়ে যদিও বা এসেছে কাজে মন নেই অনেকেরই , কিন্তু প্রাত্যহিক লেজার বোর্ড,স্টাফদের এটেন্ডেন্স , প্রোডাকশন ডিটেইল ম্যনেজারকে দিয়ে সই করিয়ে তবেই ওর ছুটি, অগত্যা কড়া হতেই হয় ! মনটা ভালো নেই মধ্যে মধ্যেই নৃশংস হয়ে ওঠে মৃগাঙ্ক , স্নায়ু রোগের এটাই নাকি প্রধান ও মারাত্মক লক্ষণ , অনেকসময় রুগী ণিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মরিয়া হয়ে ওঠে খুন যখমে , যদিও তার বোধশক্তি তখন কাজ করে শিশুসুলভ ডাক্তারের এই উপদেশ মেনে চলতে নিয়মিত মানসিক অনুশীলণের প্রয়োজন ,সুস্হ, স্বাভাবিক চিন্তা ভাবনা করা ভালো বই পড়া , চর্চা করা কিন্তু এর প্রায় সবকটিতেই অনীহা মৃগাঙ্কের অতএব ওষুধ নির্ভর জীবন আর মৈত্রীর শুশ্রুসা এভাবেই বেঁচে আছে ওর সাংসারিক জীবন ! নৈমিত্তিক জীবনের ধাঁচে মুড়ে অস্তিত্বটাকে সকলের উপযোগী করে তোলার অপর নাম হয়তো জীবন এক তৃতীয়াংশ মানুষের কাছে, বাকি একাংশ হয়তো কষ্টে সৃষ্টে টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে তার অস্তিত্ব ! আবার এই দুই অস্তিত্বের মধ্যে পরে খাবি খেয়ে অতঃপর গন্তব্যহীন স্রোতে গা ভাসাচ্ছে কিছু লোক ! আসলে এই সকল মানসিকতার মধ্যেই কাজ করে একপ্রকার সংস্কার ! জীবনের উঠা পরার প্রতি ধাপে চলে সংস্কারের কারসাজি ! যে যেভাবেই চলুক না কেন মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের মুষ্ঠিতে তৈরী থাকে ভাগ্য , যারা প্রতিষ্ঠা খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছতে সক্ষম হয় বাকীরা রাডারলেস শীপের মত ছুটতে থাকে দিক নির্ণয়ের হদিশ ছাড়াই ! বৃষ্টি থেমে ঝরঝরে আকাশ হাতের সামনে কাগজ,কলম দু' লাইনের পর আর মনে আসছে না , অক্ষর আর ছন্দ মিলে চলছে ছোঁওয়া ছুঁয়ি খেলা , দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে জমিয়ে একটা কবিতা লেখা যাচ্ছে না কোনমতে ! টিফিন আওয়ার্সে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সবাই , হাত ,মুখ ধুয়ে পাশের ঘরের টেবিলে মায়ের হাতের রুটি ,বেগুণ ভাজা দু' পিস মিষ্টির টিফিন বক্স খুলে বসে ! অদূরে দাঁড়ানো মেয়েটি চুপচাপ দাঁড়িয়ে , কাছে ডাকে অতসী ,'' কি ব্যাপার তুমি কিছু খাচ্ছ না কেন '' ? '' এক মুষ্ঠি চাল চেয়ে পাই নি দি '' আরে কিছু বলবে তো এই নাও একটি রুটি নিয়ে বাক্স শুদ্ধু মেয়েটির হাতে তুলে দেয় অতসী ! একে একে জড়ো হয় পলু কাল্টুদের গ্রুপটির জনা পাঁচেক ,'' এইবার আমাদের মাইনে না বাড়ালে হবে না '', '' সে তো আমি জানি , কম তো বলনি তোমরা , তাছাড়া আলো ,পাখার যা অবস্থা মেঘ করলে অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না '' , সামনের সপ্তাহে তো মিটিং আছে , দ্যাখো কি করে আমিও থাকবো ! হাড় জিরজিরে লোকগুলির অসহায় অবস্থা দেখলে কষ্ট হয় অতসীর ,কিছু অল্প বয়সী মেয়ে মরদ ফষ্টি নষ্টিতে ব্যস্ত ! বন্দোবস্ত এভাবেই চলে আসছে ক্রমাগত ! অতসী জানে শ্রমিকদের দেওয়া কথা মালিকপক্ষ কোনদিনই পালন করেন না , নীচু শ্রেণীদের ডিম্যন্ড এন্ড সাপ্লাই এই দুয়ের মধ্যে ঢুকে যায় অসংখ্য চুক্তির অসংখ্য মাথা , মাথা থেকে মাথায় চলে এর বাহিত ধারাবাহিকতা , পৃথিবীর সবচাইতে সহজ কাজ হল এই শ্রেণীকে শোষণ সাহেবদের নীল চাষ থেকে এই প্রজন্মের ধারায় পার্থক্য ঘটেনি একচুলও ! শোষণের ধরণটা যা বদলেছে ! ''আমাদের এ দেশ পূণ্যের দেশ ,মনিষীদের দেশ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মনিষীর জন্ম ও ধর্মপ্রচারের মাহাত্ম্য আজ জাঁকিয়ে বসেছে আমাদের ঘাঁড়ে এর সুফল বা কুফল যাই মিলুক না কেন আমরা বিচ্ছিন্ন হতে হতে প্রায় সেঁধিয়ে চলেছি ক্ষুদ্র আবর্তে , কারখানার বয়োজ্যেষ্ট চৌকিদার দামোদর কাকার বক্তব্যের সমর্থণ করে অতসী , একদম সত্যি কাকা ! একসময়ের স্বাধীনতা সংগ্রামী দামোদর শেঠ অবসরের পর স্বেচ্ছায় এই চৌকিদারের কাজটি করে চলেছেন শরীর মন সচল রাখতে ! বয়োবৃদ্ধ লোকটির জ্ঞাণভান্ডার যাচাই না করলে বোঝা যায় না ! খুব স্নেহ করেন অতসীকে ডিউটির পর ঘর বন্ধ করা ,আলো পাখার সুইচ অফ করা লক্ করা সব দায়িত্বগুলি পালন করে চলেছেন অত্যন্ত নিঁখুতভাবে ! সবটাই অভ্যাস দিদি ,জীবনের অসময়গুলো স্বেচ্ছ্বাচার খুব অযথা অন্যদের নাক নিয়ে টানাটানি , কেন বাপু এ হল যার যার নিজস্ব সমস্যা সেখানে ভাগ বসানো কেন ? হাসে অতসী '', কাকু তোমার এই সুন্দর সুন্দর কথাগুলো শুনতে না পেলে খুব মন খারাপ হয়ে যায় আমার , জীবনের এত ঝঞ্ঝায় এত উদ্যম তোমার আসে কোথা থেকে ,তোমায় দেখে আমি সাহস পাই ! শ্রাবণ মাসের আকাশ মেঘে ঢাকা প্রায়শই কখনো হালকা কখনো ভারী বৃষ্টিতে প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালী চরিত্রের চিত্রপট মন ছাপিয়ে গভীরে কি যেন খুঁজতে ব্যস্ত ! কি ? অনেক বকাঝকার পর কর্মব্যস্ত পরিবেশ মাঝে মধ্যে ওদের সাথে হালকা ঠাট্টা ইয়ার্কি কিছুটা সহজ করে তুলেছে পরিবেশকে ! এছাড়া মজার মজার শ্লোক গাইতে গাইতে কাজ করার সময়টা কেটে যায় বেশ , সারাদিন আজ কোন ফোন আসেনি বা করাও হয়নি ! মায়ের শরীরটা ভাল নেই সকাল থেকেই মাথা ব্যথা তা সত্তেও রোজকার জীবন থেকে ফেরানো যায় না মাকে ! ফোন করলে ওপাশে ফোন ধরে মা ,'' মাথা ব্যথাটা কমেনি রে একটু ওষুধ আনিস মা '', আনবখোন আর কিছু লাগবে কি ? না আজ আর কিছু আনিস না হ্যাঁরে তোর চোখটা ফোলা কমেছে রে গতকাল বেশ ফুলেছিল লালও ছিল ? ব্যথা না কমলে ওষুধ নিয়ে নিস কিন্তু ''! হ্যাঁ ব্যথা কমে গেছে কোন ওষুধ লাগবে না মা ! ঠিক হয়ে যাবে এমনিই ! প্রায় দু একদিন অন্তর ফোন আসে রমেনের আজ একবারও না ! রিং করতে গিয়েও থেমে যায় অতসী ! থাক ! ভীষণ ভাবপ্রবণ ও আবেগী আসলে ধনী বাপের একমাত্র সন্তান রমেনকে কেউ রাগ,শোক,দুঃখ পেতে বা করতে দেখেনি কোনদিন,সদা সর্বদা হাস্য বদনের রসিকতায় যেন নৃত্যরত প্রতিমূর্তি ,ঠাট্টা ইয়ার্কি ছাড়া কোন কিছুরই যেন গভীরতা নেই ওর কাছে ! তখন অবশ্য সময়টা ছিল স্বপ্নের নেশায় মশগুল আর পাঁচটা মেয়ের মতই নিতান্ত সাধারণ ,নতূনত্ব ছিল না ভাবনায় ও কার্যে ! সবটাই আজ সুদূর অতীত ! সমস্ত পরিকল্পনার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে কালের সময় ! যে যার পথ খুঁজে নিয়ে বিচ্ছিন্ন হতে হতে ক্রমশঃ দৃষ্টির বাইরের অজানায় দু' জনে দু' দিকে ! এই অসময়ে হঠাৎ করে আবার জীবন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে দু' জনকে মুখোমুখি , পরীক্ষায় না কি প্রাপ্তির যোগে বুঝে উঠতে পারে না অতসী কিন্তু মাঝে গভীর গিরিখাদ , কিভাবে সম্ভব হবে পারস্পরিক ঘণত্ব ,গভীর চিন্তায় মা সহ অতসী নিজেই !


( ক্রমশঃ)
উপন্যাস // ধূসর আয়না (পর্ব আট )
মল্লিকা রায়


'' আমার ডিশ থেকে ডিমটা তোল প্লিজ ,ওটা তনুর ডিশে দাওনা মা , ও ডিম খেতে খুব ভালবাসে , গত দু'দিন ধরে রঞ্জণা গোম হয়ে রয়েছে , ছোট্ট বেলা থেকে একমাত্র ছেলের ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর মাধ্যমিক সেরে টেকনিক্যল কোর্স কমপ্লিট হতে না হতেই বিয়ে করে বউ এনে হাজির ! পাড়ায় বেশ সম্পন্ন ও প্রভাবশালী পরিবার গোকুল মিত্তিরের দু' দিন ধরে কোন সাড়া শব্দ নেই ,ওপরের ঘরে ঘাড় গুঁজে পড়ে আছেন ! শত হলেও পঞ্চায়েত প্রধাণ হিসেবে যথেষ্ট সুনাম ওনার প্রভাব বৃদ্ধি করেছে ,ফুলে ফেঁপে উঠেছে মহাজনী কারবার , গরীব গুর্বোর জমি, বাড়ী বন্ধক রেখে চড়া সুদের আবাদে রাতারাতি বেনামা হয়ে গেছে কত ঘর সংসার ! একমাত্র ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন ছিল অনেক বিষেশত যৌতুকের টাকাসহ রাজকন্যা পুত্রবধূ ! বছর তিরিশ আগে বাপ মায়ের হাত ধরে নুতন বৌ নিয়ে এ গ্রামে আসা ,স্কুল শিক্ষক বাবার কষ্টের উপার্জণে কোনরকম টিনের ছাদের একচালা ঘর , কোম্পানীর মাসমাইনে ভালই ছিল , ছেলেটা পেটে আসতেই বন্ধ হল কোম্পানী , শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বাবা !ব্যস অন্ধকার নেমে এল চারজনের পরিবারে ,ছোটখাটো ব্যবসাপাতির মধ্য দিয়ে চলতে চলতে শেষে সুদের ব্যবসা ফাঁপিয়ে দিল রাতারাতি ! ঝুলি ভরতে লাগল ব্যপক সম্মাণে !অতঃপর ইলেকশনে পঞ্চায়েত প্রধান ! সে কি চাট্টিখানি কথা ? কত কাঠ খড় পুড়িয়ে , নিন্দা মন্দের পাঠ চুকিয়ে এই পরিস্থিতিতে আসা ! এই তো সেদিন ডিস্ট্রিক কমিটির মিটিংয়ে স্থির হলো আগামী বছর এম এল এর মনোনয়ন পেয়ে যাবেন , গ্রামে কিছু শৌচালয় , শিশু উদ্যান, গরীবদের বস্ত্র , কম্বল বিতরণ ,বই বিতরণ ইত্যাদি কর্মসূচিগুলি সবে সূচীবদ্ধ করা হল ! মিটিংয়ে সকলে ব্যপক করতালি দিয়ে সমর্থন জানালো ! শেষে ফুল ,মিষ্টি যোগে অভ্যর্থণাও জানানো হলো আর আজ কিনা........ মাথার ওপর বাজারের ঢাউস থলেটা পরতেই বিরক্তিতে চেঁচিয়ে উঠলেন মিত্তির বাবু '', বলি আমায় কি মনে করেছ তোমরা ? যখন যা খুশী তাই করাবে ' ? তবে কি আমি যাব বাজার ? শকের বৌ মা এয়েচেন যাও মুড়োটা , মাছটা বেঁছে আনোগে যাও , তোমার জমিদার পুত্তুর তো আবার বাজার যান না ,বৌমা এনেচেন সেবা করার জন্যি , কত্ত সুক বলোতো , সেই যে উপ্রে উটেচেন একটি বারের জন্যিও নিচে নামেননি বাপু ,যে ছেলে মায়ের অসুকে ফিরেও তাকায় না সে কি না বৌয়ের খাবারের থালা ,জল নিয়ে মুখের কাচে মনে হয় খাইয়েও দিচ্চে গো , ও গো এ কি সব্বোনাশ হল গো আমাদের এখন আমি কোতায় যাব কারে বলব গো '' ?'' শুরু হল তোমার নাকে কান্না ? বলি চুপ ! চুপ কর কতাটা পাঁচ কান কোরনি বাপু , কেউ যেন জানতি না পারে আগাম হপ্তায় দিন ক্ষণ দেখে রেজিস্টারী করে লোকজন নেমন্তন্ন করে ম্যনেজ করে নেব খন ,চেঁচামেচি যেন কোরনি বাপু '',ব্যগ হাতে বেড়োন গোকূল মিত্তির ! বেড়োতেই পাশের বাড়ীর মদনা ,'' চলেন দাদা আজ এক সঙ্গে বাজার যাই '' শালা রং মিস্ত্রী বলে কিনা একসঙ্গে...'' হ্যাঁরে মতলবটা কি বল দিকিনি ,'' ''কি আবার হাজার বিশেক মালকড়ি চাই কত্তা বর্ষার আগে ঘরের চাল ছাইতে হবে গো'', '' তোর বৌয়ের বিচা হারটা নিয়ে আসিস পাঁচের বেশী হবে না ,'' দয়া করেন কত্তা , উপোস দিয়ে শুকয়ে মরতি হবে বাল ,বাচ্চা নিয়ে '', ''তবে দলিলখান আনিস রেতের বেলায় '',! আসলে পাড়ার কেউ মাথা গলাতে সাহস করেনা গোকূল মিত্তিরের ব্যপারে ! অন্যরকম ভেবেছিল গোকূল ! কোনভাবে যাচাই করার মতলব, ইয়ে হচ্ছে গিয়ে আমি এট্টু চুলটা, দাঁড়িটা কাটব কি না দেরী হবে খানেক , রাতে আসিস কিন্তু'' 'আচ্ছা কত্তা'' চলে যায় মদনা ! গ্রামের বাজার বেশ খানিকটা হাঁটা পথ ,পাঁকা হয়নি এখনও সাইকেল,ভ্যন অথবা পা' গাড়ীই সম্বল ! হপ্তায় দু' দিন হাট বসে ! গেরস্থালী মেয়ে বৌদের শাঁখা,সিঁদুর চুড়ি , হার কাপড় চোপড় থেকে মাছ তরকারী জল চৌকি সমস্ত কিছু পাওয়া যায় এখানে ! অবিশ্যি মিত্তির বাবুর গাড়ী সবসময়ই রেডি , আস পাশের দৃষ্টিগুলো কেমন যেন সন্দেহজনক ঠেকে ! চতুর্দিকে ফিসির ফিসির ! দা'ঠাকুর বাজার পয্যিন্তি ? ''কেন কিছু খবর আচে বুঝি''? আইজ্ঞে হ' দা ঠাকুর .......'' হবেখন একন যা দিকিনি এই তোর থলে আর টাকা ভাল মাছ সবজি ফল নিয়ে আয় আমি চুল ,দাঁড়ির সাইজ পার্লারে ঢুকি পাঁচশো টাকার নোটটি পড়ে গেলে নিচ থেকে তুলে নেয় ছেত্রী ! '' এই শোন বুঝে শুনে খরচ করবি বুঝলি , কাগজে হিসেব লিখে আনবি ''!হে হে হাসে ছেত্রী, এ আর নতুন কি কতার মদ্যি দা' ঠাকুরের ব্যঙ্গ ! "ওদিকে পাটরানী বেলা ন'টা পর্যন্ত শোবার ঘরে , এমনতরো শুনিনি বাপু নতুন বৌ ভোর রাতে উটে সিনান করে ,ঘর সংসারের কাজে হাত লাগাবে তা না , ধুমসো পানা গতর নিয়ে পেরেম দেখাচ্চে , বলি অ ভালমানুষের মেয়ে , বেলা গড়িয়ে দুপুর হল ঘরে শ্বশুর শাউরি আচে এট্টু তো নামতে হয় , আমারও হয়েচে যত জ্বালা এই বয়সে এট্টু জিরোবার যো নেই কো ? বলি অ খোকা তুইও কি অন্দ হয়ে গেলি না কি রে ? আপন মনে বকবক করতে থাকে রঞ্জণা, শ্বশুরের আমলের আটচালা দুই কামড়া আজ দুই তলা বিশাল দালানবাড়ী , ঠাকুর ঘরে নিয়মিত পুরোহিতের পূজা ,বছরে দু'বার অন্নভোগে নর নারায়ন সেবা ! দুইজন মাসমাইনের পুরুষ নারী ,একজন ঘরের কাজের অন্যজন বাইরের দাওয়া ,মন্দির , বাগান পরিচ্ছন্ন রাখা, ধোওয়া পোছা ইত্যাদি ফাইফরমাস খাটা ! দোকান বাজারও ওর কাজ পোঁয়াতি বৌয়ের শরীর খারাপ থাকায় ছুটিতে আছে চার/পাঁচদিন ! দরজা খুলে মা'কে ঘর পরিষ্কার করতে দেখে হ্যন্ডসেট টা নিয়ে খস খস ছবি তোলে হাবুল ওরফে হৃদিমন মিত্তির ! মায়ের সামনে পোজগুলো দেখায় , '' দেখ মা , চিনতে পার এটা তুমি''? '' আ মোল যা, মরণদশা দ্যাখো , বলি নাচচ যে দেকতে পাচ্চ না, না ? কাজের লোক তিনদিন আসবে না , খাটতে খাটতে আমার হাড় মাস এক হয়ে গেল গা ,এবার সর দিকিনি যে যার খাবার তৈরী করে নাও গে যাও'' ! '' ও এই কথা আমাদের নেমন্তন্ন আচে গো এক বন্ধুর বাড়ী '', পাশ কেটে চলে যায় হাবুল ! '' হ্যাঁ একন তো আমরা পর , তোমার কেউ হই না , বউ এনোচো তাও নিজের মর্জি মতো,বুড়ো বাপ মায়ের আর দরকার টা কি ''?চা টা কিছু হবে মা ? মুখ ঘুরিয়ে রঞ্জণা নিচে নেমে যায় ! বাম হাতে আঁচলের খুঁটে ঝাপসা হয়ে আসা চোখ ঢেকে নিয়ে ! ঠাকুরমশাই আসার সময় হয়ে এল যোগার যন্ত্র মিত্তির মশাই-ই করেন বরাবর এ এক অদ্ভুত নেশা ওর ভোর রাতে দু' এক পা হাঁটার নাম করে এর তার গাছের ফুল চুরি করে স্নানকার্য সম্পন্ন করা ! মূর্তির সাজ পরিষ্কার করে ঠাকুরের বাসন কোসন বার করে দিয়ে পূজোর আয়োজন করা ! এসবের কোনটাতেই রঞ্জণার হাত লাগাতে হয় না এই যা ! ঠাকুরমশাই চলে গেলে প্রসাদ বিতরণ করে তারপর স্বস্তি ! গত দু' দিন এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় মনের ভেতরটা খচ্খচ্ করতে থাকে মিত্তিরের ! '' কই কোতায় গেলে গো ''? বিশাল ঢাউস ব্যগ ভর্তি বাজার দাওয়ার ওপর রাখে ছেত্রী ! ঘরে ঢুকে জামা কাপড় ছেড়ে ফ্যনের তলায় বসে মিত্তির! '' দালানে ন্যতা পরেচে না পরেনি ? ছেত্রীকে বলি ন্যতা দিয়ে দেবে খন ''? '' কি বল তুমি এতটা বেলা পর্যন্ত ঠাকুর দালান বাসি থেকেচে কোনদিন''? ঠাকুর মশায় ঢুকলেন গেট খোলাই ছিল , মিত্তির এগিয়ে মন্দিরের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন ! ধূপ,ধূনোর ধোঁওয়ার সুগন্ধে জাগ্রত হচ্ছেন দেবতারা , পুরুতমশায়ের সঙ্গে গুণে গুণে একশোবার নামযপ করার অভ্যাস মিত্তিরের! প্রায় আধা ঘন্টা ধরে মন্ত্রপাঠ করার পর সাষ্টাঙ্গে পনেরো মিনিট গুনে গুনে প্রায় সবক' টি মূর্তিকে অন্তরাত্মার বিশুদ্ধ ভক্তিসহ প্রণাম জানান , জানান আগাম সমৃদ্ধির গুপ্ত ইচ্ছা ! পুরুতমশায়ের এই উচ্চস্বরের মন্ত্রপাঠে জাগ্রত হয় পরিবেশের শুভ প্রভাব , সুন্দর সুগন্ধে চারপাশটা যেন মুখরিত হয়ে ওঠে ! আশ পাশের গরীব শিশু, বৃদ্ধ বৃদ্ধা প্রায় অনেকেই আসেন প্রসাদ পাবার লোভে , প্রসাদ ছাড়াও প্রায় প্রত্যেকেরই জুটে যায় দু'চার আনা বখশিস্ ! আসলে ঠিক এই সময়টায় যেন দেবতা এসে ভর করেন মিত্তিরের ওপর , দান করেন প্রায় খোলা মনে ! বুকের কাছে টেনে নেন গরীব কোন শিশুকে চার পয়সা বেশী জুটে যায় তার ! এছাড়া মাসে দু' বার উৎসবে এ গ্রাম সে গ্রামের সব মানুষ জড়ো হন ,পেট পুরে খিচুরী প্রসাদ পান তার সাথে মিষ্টিও থাকে ! এই উদার মহানুভব মানুষটি পাড়ার একপ্রকার মধ্যমণি , যে কোন সমস্যায় , বিপদে আপদে ঝড় জল বর্ষায় মিত্তিরকে টেক্কা দিতে পারেনি আজ অবধি কেউ ! গোকূল মিত্তির গ্রামের সহায় সম্বলহীনদের পাশের অতি মহানুভবতার নাম,মনুষ্যত্বের নাম, সর্বোপরি ভয়ংকর এক শোষণের নাম ! তবে যেখানেই থাকুন না কেন রঞ্জণা ছাড়া তিনি অচল, খাবার পাশে , ঘুমের পাশে , সকাল সন্ধ্যায় এই মানস প্রতিমার আন্তরিক স্থাণটুক তার চাই ,সেখানেও ঐ মন্দিরের মত এক পূণ্যির দেবাত্মা এসে ভর করে আর তার কাছে সাষ্টাঙ্গে নিজেকে সঁপে দেন শিশুর মতো , মানুষের মতো !


( ক্রমশঃ)

উপন্যাস //ধূসর আয়না (পর্ব নয়)
মল্লিকা রায়


হঠাৎ করে পরিবহন ধর্মঘটে বন্ধ হয়ে যায় অতসীর অফিস যাত্রা ! রমেনের ফোন,'' মর্নিং এইমাত্র খবরটা পেলাম বারো ঘন্টা বন্ধ ,যাক একটু বিশ্রাম তো হবে "!" কি ? একটু জোরে বল আচ্ছা ঠিক আছে আমি ওপরে যাচ্ছি দাঁড়াও, বল এবারে , ধ্যুৎ কে বলল ? মোটেই না, আমার ম্যরেজ এ্যনিভার্সারির পাঁচমাস বাকি মশাই! ভালো খাওয়া দাওয়া আর কি হবে বল গরীবের বাড়ী , বাজার ? হপ্তামাফিক ,সপ্তাহে দু'দিন হাটবারে ! হু একটি ছেলে মাছ দিয়ে যায় বাড়ীতে ! ধ্যৎ্ ইয়ার্কি মের না তো সকাল বেলা, কেন প্রাইভেট গাড়ীর তো অভাব নেই , হ্যাঁ ,কিসের ভয় ? বন্ধুর জন্য এইটুক করতে না পারলে আর বন্ধু কিসের , কে ডাকছেন,তোমার গিন্নী বুঝি ? বুঝেছি ,ওকে টা টা ''! মা জানায় মৈত্রী আজ আসবে না অতু , মায়েরও শরীরটা ভাল নেই ওয়েদার চেঞ্জের জন্য সর্দি কাশি সঙ্গে জ্বরও ! ''তুমি আজ রেস্ট নাও মা , আমি চালিয়ে নেব '', কে শোনে কার কথা ধোঁওয়া পোছা , ঠাকুর দেবতার একরাশ সন্তুষ্টির পেছনে মা চোখ বুঁজে স্বস্তির নিশ্বাস নেন ! প্রতিদিনকার কাজে বিরতি নেই কোন ! কাছে এসে কপালে হাত রাখে অতসী ,''সাঙ্ঘাতিক জ্বর যে তোমার , প্যারাসিটামল আছে দিয়ে দেব , থাক না মা দু' একদিন ঠাকুর উপোস দিলে কিছু অশুদ্ধ হবে না , তোমার কিছু হয়ে গেলে আমি অনাথ হয়ে যাব মাগো ''! মা জানেন এই স্নেহান্ধ কন্যাটি আজও নিদারুণ শিশুসুলভ, কোমলতলার প্রলেপে ভরা ওর হৃদয় মন , '' ধূর পাগলি মেয়ে নিজে না খেয়ে ভগবানকে তুষ্ট করতে হয় না হলে অমঙ্গল হয় রে মা '', ''তুমি ভাল করেই জানো মা, তেত্রিশ কোটি দেবতার প্রতি কোনদিনই কোন ইন্টারেস্ট আমার আগেও ছিল না আজও নেই , তুমিই আমার ভগবান ঈশ্বর সব ! জীবন্ত প্রাণীর চেয়ে বড় ঈশ্বর আর নেই আমি তাদেরই আরাধণা করি মা , এ আমার বাবার সংস্কার ! আমি স্বামিজীর আদর্শে অণুপ্রাণিত তা তুমি ভাল করেই জানো !বেশ কোনরকম ফুল জল দিয়ে দেবখন তুমি যাও একটু রেস্ট তো নাও ! '' না না খবরদার তুই ঠাকুর ঘরে ঢুকিস নি যেন , ছুঁয়ে একাকার করবি আবার আমার গঙ্গাজলে পরিশুদ্ধী করতে হবে '', ! " কি করতে পারলে মা সারাটা জীবন ধরে তোমার দেবতা কি সুখ দিল তোমায় বল,ঘটা করে পঞ্জি গনক ডেকে রাশি নক্ষত্র ,হাতের পায়ের ছক কষে খরচ করে বিয়ে দিয়ে আমায় কি স্বর্গ রাজ্যটা দিলে মা ? কি পেলাম আমি ''? পাশের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে অতসী ! মা জানে এ প্রশ্নের কোন উত্তর হয় না, উত্তর হয় না জীবনে বহু প্রশ্নের ! এই উনষাট বছরের দীর্ঘ জীবন ছন্দাদেবীকে পরিণতই শুধু করে নি বাকরুদ্ধও করে রেখেছে অসংখ্য বাস্তব ন্যয় অন্যায়ের প্রেক্ষাপট ,চোখের সমুখে দেখেছেন বহু পারিবারিক অবিচার নৃশংসতা , দেখেছেন শুধু প্রতিবাদ করার সাহস পান নি কখনও ! আজ এই দীর্ঘ সময়ের অবসরে উচিত/অনুচিতের সেই আবছা টুকরোগুলোতে কেবল ভুলের প্রশ্নচিহ্ন আড়ালের দীর্ঘশ্বাস হয়ে রয়ে যায় ! কাপড় পাল্টে ঠাকুর ঘরে ঢোকেন মা ! থমথমে পরিস্থিতি ভেদ করে মৃগাঙ্কের বিরক্তি দরাম করে দরজা খুলে একপ্রকার গায়ের জোরে বাথরুমের দরজা বন্ধ করার শব্দে সন্ত্রস্ত মা অতুর দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে '', অ অতু , আরে সামলা তোর খ্যপাটাকে , ভাল লাগেনা বাপু এবার আমায় কাশী পাঠানোর ব্যবস্থা কর্'' ! '' যা খুশি করুক,আমায় আর জ্বালিও না তো '',সমস্ত কাজ পরে আছে রান্নাঘরে আজ আবার মৃগাঙ্কের চেকাপ ডেট ,কোমড় গুঁজে লেগে পরে অতসী ,চা জলখাবারে আলুর পরোটা অতসীর খুব প্রিয় বহুদিন ধরে সময় হয়ে ওঠে না ! খুব একটা সময় লাগে না , আকাশটা থম মেরে আছে কালো মেঘে , মৈত্রী আসবে না ! মৃগাঙ্ককে নিয়ে চিন্তার ব্যপার ,টেবিলে রাখে প্রাতঃরাশ,চেঁচিয়ে বলে ,'' টিফিন দেওয়া হয়েছে খেতে আসা হোক্ "! মা তো পূজোয় মানে আধা ঘন্টা , '' কি হল কথাটা শোনা যাচ্ছে না নাকি , ? অতঃপর মৃগাঙ্কের ঘরে টেবিলে প্লেট সহ চায়ের কাপ এবং সকালের ওষুধ বার করে রাখে অতসী ,'' আশ্চর্য এ বাড়ীতে না খেয়ে মরলেও কারুর কোন হুশ নেই , জলজ্যন্ত অমানুষ সব '', রান্নাঘরে প্রথম দফা শেষ করে ঝাঁটা হাতে বিছানা ঘর দোর সাফে মন লাগায় ও ! মা জলখাবারে ব্যস্ত ,'' বাহ চমৎকার বানিয়েছিস তো পরটা হ্যাঁ রে খুকু তোর মনে আছে তোর বর প্রতি ছুটির দিন রাতে আলুর পরটা আর কষা মাংস খাবার বায়না করত , নিজের হাতে ছাড়া কারুকে মাংস রাঁধতে দিত না সঙ্গে এট্টু আঁচার কি খুশীই না.. ..... '' উফ্ এই কাজের লোকগুলো হয়েছে যত ফাঁকিবাজ ,খাটের তলার হাল দেখেছ ? যেন নোংরার আঁতুর ! কি করব বল ? পরিষ্কার করে না তো হাতে যেন ওদের জন্মের ব্যামো ! লাট সাহেব সব ! বাইরে বেল বাজছে কে এল আবার , '' দিদি বাড়ী আছো ''? '' ও রহিম ভায় , কি খবর পাশে ওরা কে ''? '' আরে চিনতে পারচ না , ওইদিন যার শালিস হল গো ,বনিবনা হয়েচে গো বৌ নিয়ে এয়েচে তোমায় পেন্নাম করতি '', '' কেন রে আমি আবার কি মহৎ কাজ করলাম ''? '' তেমন নয় গো ওর বাপ মরিছে তাই জমিন বেঁচে অনেক ট্যকা পেল , ওই মোড়ের মাতায় ওর পানের দোকান গো দিদি খোব সেল এই তোমরা দিদিরে পেন্নাম দাও '', থাক থাক বাবা সুখে শান্তিতে বেঁচে থাকো তোমরা , দাঁড়াও ঘর থেকে দু'টি একশো টাকার নোট এনে ঘোমটা টানা বৌটির হাতে দেয় ! আসি গো দিদি ! যাক্ বেঁচে গেল মেয়েটি '', জানো মা মেয়েটি প্রায় মরেই যাচ্ছিল বাঁচিয়ে দিলাম, অন্তত কিছু মেয়েকে তো আমরা সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি বল এ-ই বা কম কিসে '' ! হাসতে চেষ্টা করেন মা '',তোর মুখটা বড্ড শুকনো লাগছে খুকু আমাদের তো খাওয়ালি নিজেরটা যে ঢাকা দেওয়াই রইল! ছোট্টবেলা থেকে খুকু অতু মামনি কত নামে ডাকেন মা ! খুব আদরে খুকু , আদর ছাড়া অতু,মামনি হল মায়ের ওপর মাতব্বারি করলে ! ''এই কাপড় ছাড় হাতে মুখে জল দিয়ে তবে খাবারে হাত দিবি '', '' উহু মা ভাল লাগছে না ছাড়ো তো ওসব ,হাত ধুয়ে বসে পড়ে টেবিলে ''জানো মা কষ্ট হয় বাবুটার জন্য , পারলাম না ছেলেটাকে মনের মত মানুষ করতে , আমি হেরে গেলাম মা , ট্যোটালি ফেলিওর ''! মাছওলা বাড়ীতে মাছ দিয়ে যায় ! ওঘর থেকে আওয়াজ আসছে টেবিল চাপরাচ্ছে মৃগাঙ্ক , প্রচন্ড রাগের বহিঃপ্রকাশ ! '' অমন করার কারণটা কি ? মুখে বলা যাচ্ছে না '' ? লিভার টনিকের শিশি গড়াগড়ি খাচ্ছে মেঝেয় ,ঘরময় লিভারের শ্রাদ্ধ ভাঙা কাঁচের টুকড়ো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ,এটাই রোগের প্রকোপ ! রান্না ঘর থেকে মুড়ি ঘন্টের গন্ধ ভেসে আসছে ,রান্না বান্নার কথা বলে দিতে হয় না মাকে মেয়ে জামাইয়ের পছন্দ অপছন্দের কথা মুখস্ত হয়ে গেছে ! এছাড়া ছোট থেকে মাকে কখনও শুয়ে বসে সময় কাটাতে দেখেনি অতসী ,অসুস্থ হলেও থেমে থাকেনি হাত, কত প্রকারের যে সেলাই না দেখলে বিশ্বাস হয় না , ফুল তোলা চাদর ,সোয়েটার, টিভির কভার,আয়নার কভার কত কি সেসব আজকাল আর চোখে পড়ে না ! এছাড়া গল্পের বই পড়া ছিল মায়ের আরেক নেশা, কত নামী দামী লেখকের বই যে বাবা কিনে আনতেন তার ইয়ত্ত্বা নেই , অবসরে সেসব নিয়ে বসতেন মা ! বড় হয়ে অবশ্য অতসীও কিছু পড়েছে তবে শেষ করতে পারেনি, স্কুল গন্ডী থেকে লেখার নেশা পেয়ে বসেছিল , তবে একটা খাতাও শেষ করতে পারে নি আজও! বাবার হঠাৎ মৃত্যু ঘোর অনিশ্চয়তার ফেলে দিয়েছে পরিবারটাকে , দিদির বিয়ে হয়ে গেল সর্বস্ব দিয়ে থুয়ে পরের বছর অতসীরও ,সে সময়টা একমাত্র কাকার অভিভাবকত্ত্বে কিছুটা মুখ তুলতে পেরেছিল সমাজে তার বছর তিন বাদে কাকাও চলে গেলেন অকস্মাৎ ব্যস্ ! আজও ঘর দুয়ারে যেন হেঁটে চলে বেড়ান তারা, কথা বলেন অস্তিত্বের, সাকারে নিরাকারে কতভাবে যে তাদের অভিভাবকত্ব ছড়িয়ে রয়েছে প্রতি মুহূর্তে সতর্কতার মূর্ত শরীরে যেন সদা প্রহরারত ! সন্ধ্যে ছ' টা, যথারীতি মায়ের মঙ্গল শঙ্খ ও সুগন্ধী ধূপের আঁতরে পরিবেশ মুখরিত ! লাল রংটা খুব মানায় মৃগাঙ্ককে , হাইট খুব বেশী না হলেও বেশ আকর্ষনীয় চেহারা ,মুখশ্রীতে লালিত্য আছে ,বিয়ের প্রথম বছর তিনেক চুটিয়ে সংসার করার পর হঠাৎই বিপর্যয়, তখন বাবুর জন্ম হয়নি খুব বেড়িয়েছে দু'টিতে,কোম্পানীর মোটা মাইনে ,কত সুযোগ ,সুবিধা ! সে এক সময় ছিল বটে আজ আর যেন বিশ্বাসই হয় না সেই ঘুড়ে বেড়ানোর কথা ,কতকাল কেটে গেছে ঘর আর অফিস , অফিস আর পেসেন্ট,গভীর দীর্ঘনিশ্বাস বেড়িয়ে আসে অতসীর ! ব্ল্যক প্যন্ট লাল টি শার্টে বেশ লাগছে মৃগাঙ্গকে সব গেলেও চেহারা ও মুখশ্রীর সৌন্দর্য আজও আছে ,প্রতি মাসে ওরা কর্তা গিন্নী একত্রে ডক্টরস চেম্বারে যান ! ওরও তো একটু বেড়িয়ে আসা হয় ,দিনরাত ঘরটার মধ্যে সুস্থ মানুষ ওতো অস্বাভাবিক হয়ে যায় ,সময় থাকলে সকাল বিকেল একটু বেড়িয়ে আনা যায় কিন্তু ঘর বাইরের এত পরিমাণ খাটাখাটুনির পর সম্ভব হয়ে ওঠে না কোন পরিকল্পনাই! '' সাবধানে যাস মা '' দেবতার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানান ,'' দুগ্গা ,দুগ্গা '' দরজা ঠিকমতো লক করে দিও মা , আজ আর বেড়িও না , কেউ এলে পরে আসতে বোল , দিনকাল খুব খারাপ কিন্তু ", " ঠিক আছে বাবা ঠিক আছে '', ! নিউরোলজিস্ট ডঃ বিশ্বাসের চেম্বার শহরের উপকন্ঠে একটি নামকরা ওষুধের দোকানে ! সপ্তাহে তিনদিন রোগী দেখেন ,খুবই যত্নের সঙ্গে ! অতসীর বাড়ী থেকে বাসে প্রায় আধা ঘন্টার পথ তবে ফোনে নাম বুকিং করা থাকলে সুবিধা হয়, কুড়ি নম্বরে নাম মৃগাঙ্কের, বহু পেসেন্ট সামনে জায়ান্ট স্ক্রীনে টি ভি ,বসার চেয়ার ,সুন্দর ব্যবস্থা ! ক'দিন ধরে মনটা উদাস হয়ে আছে অতসীর ! চাওয়া পাওয়ার মাঝের স্থাণটায় কেবল অনিশ্চয়তা , একান্তে সেখানে রোমন্থনের মত কোন সঞ্চয় নেই ,নেই প্রখর রৌদ্রে কোন স্নিগ্ধ কোমলতা ! স্মৃতির অন্তরালে কেবল প্রখর আঁচড় ,কামড়ের ভগ্নাবশেষ ! নার্সের কলে ডাক্তারের ঘরে প্রবেশ করে দু' জনে, গত মাসের প্রেসক্রিপশন রাখে টেবিলের পাশে ! '' পেসেন্টকে রেডি করুন সিসটার '', ''ওকে স্যর ,পাশের ঘরে বসুন ম্যম্'', '' ওকে, বেড়িয়ে যায় অতসী '' মিনিট কুড়ি পরে অতসীর হাতে তুলে দেন রিপোর্ট ,'' কিছুটা ইমপ্রুভ দেখছি তবে প্রচুর আউটডোর এক্সারসাইজ দরকার মিসেস , দ্যটস ফর হিজ্ হেলদি মাইন্ড , প্রচুর লোকজনের মধ্যে ওকে রাখুন , মেলামেশা করান ,ইটস মোর ইম্পর্ট্যন্ট ওকে ''? '' তবে ওষুধ খাওয়ায় খুব আপত্তি স্যর '', '' নো নো মাই বয় , য়্যু শুড ওবে হার ''! থ্যঙ্ক য়্যু স্যর '', বেড়িয়ে আসে দু' জন ,'' আজ আমার খুব হাঁটতে ইচ্ছে করছে জানো , তুমি জানো আমি এখনও দৌড়তেও পারি '', '' পাগল নাকি এই যানজটে অতদূর হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয় '', '' না আমি আজ হেঁটেই যাব ব্যস্ '', ''ছেলেমানুষের মত জেদ কোর না তো '', '' তবে টাকা দাও ওই দোকান থেকে আইসক্রীম কিনে আনি '', '' না '' আমার হাতে টাকা দাও বলছি'', '' মৃগাঙ্ক ইটস ঠু মাচ '' '' তুমি দেবে কি না '' ? না দেব না কি করবে তুমি ? '' দেবে না, না ? আমি কি তোমার নোকর না কি ''? আচমকা ছোঁ মেরে অতসীর হাত থেকে ব্যগ ছিনিয়ে দৌড় ,ওপারের একটি ফ্যন্সি মার্কেটে ! টাল সামলাতে না পেরে পরে যায় অতসী লোকজন জড়ো হয় মুহূর্তেই ! পথচারীর চিৎকারে রাস্তায় যানজটে গাড়ী দাঁড়িয়ে যায় পরপর ,মাঝখানে গোল জটলা , বিস্ময়, মানুষজন ! কোথায় গেল মৃগাঙ্ক উঠে দাঁড়িয়ে চতুর্দিকে খুঁজতে থাকে ! রাস্তার মাঝে মানুষের মাঝে স্থির হয় দৃষ্টি, জটলার মাঝে শুয়ে আছে নিথর এক ব্যক্তি ! মুখ ,দেহের সামনেটা সম্পূর্ণ থ্যতলানো ,রক্তে ভেসে যাচ্ছে রাস্তার জনপদ , '' না না ও মৃগাঙ্ক নয় ,'' ম্যডাম আপনার কেউ হন কি ''? ও তো লাল টি শার্ট আর ব্ল্যক প্যন্ট পরেছিল ! ''ম্যডাম দেখুন তো ভাল করে এনার পড়ণেও লাল টি শার্ট আর......."


( ক্রমশঃ)

উপন্যাস // ধূসর আয়না ( পর্ব দশ )
মল্লিকা রায়


মাথা নিচু করে আছে ছেলে , কোন খাবারই তার মুখে রুচছে না।বাবার কাজ মিটে গেছে আজ প্রায় দিন পনেরো হতে চলল। পড়াশুনার গতিক খুব একটা ভালো ঠেকছে না ,পরীক্ষা হয়ে গেছে তবে রেজাল্ট ভালোর সম্ভাবনা খুব কম। কুসঙ্গে পরে প্রায় বরবাদ জীবনে আজ স্বেচ্ছাচার চরম সীমায় । কাল সারারাত ফোনের উৎপাত ,অতসী পাশের ঘর থেকে টের পেয়েছে সব । কাল বাদে পরশু ফিরে যাবে মাসির কাছে শত চেষ্টা করেও আটকাতে পারে না অতসী । "বাবু তুই মাকে একেবারে ভুলে গেছিস না রে " ?
" কি যে বলনা মা " , তবে তুই এখানে চলে আয় না বাবা ,বুড়ো বয়সে মা বেটাতে একসাথে থাকি। " তুমি ও তো চলে আসতে পার মাসির বাড়ি , আমরা সকলে একসাথে থাকবো "। " যাঃ তাই হয় না কি "। "কেন হয়না ? তুমি যাবেনা তাই বল "। মায়ের কাশিটা বেড়েছে পাশে আরেকটি কাজের মেয়ে আজ দু'দিন হল এসেছে | রান্না ছাড়া সবটাই সামলে দেয় ,ওই জায়গাটা মায়ের প্রধান অবলম্বন " হ্যারে অতু ও তো ঠিকই বলেছে,চলনা আমরা একসাথে থাকি , এই বাড়িটা বরং তুই বেঁচে দে "| ভেঙে পরেছে অতসী বোঝাচ্ছেন মা,"এভাবে কি বেঁচে থাকা যায় ? গরু,ছাগলের মত জীবন,এখানে এভাবে থাকলে আমি অসুস্থ হয়ে পরব ,তুইও পারবি না । তার চেয়ে আমরা একসাথে থাকি চল"। পাশের বাড়ীর কেশব দা এসেছেন , " এত ভাবনার কি আছে আরে আমরা গাঁয়ের লোক জন তো মরে যায় নি রে বাবা , কোথায় যাবে বলতো আমি তো আচি না কি ", বাড়ির মিষ্টি কুমড়ো দিতে এলুম গো মে , খাও ভালো লাগপে ",সেই পড়ন্ত সন্ধ্যায় কেশব দার লোমশ হাত গলা বেয়ে বুক নাভি স্পর্শ করে, রক্তে বেসামাল ঢেউ | থরথর কেঁপে ওঠে অতসীর সর্বাঙ্গ ," না না কেশব দা এ পাপ,"কোন পাপ নাই রে এতে কুন পাপ লাগে না '" অদূরে মা উঠে যান সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালতে " , বাবু দৌড়ে উঠে যায় ছাদে । সন্ধ্যার আঁধার ভেদ করে নিশ্বাসের আওয়াজে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দুটি প্রাণির একাত্মতা। অদূরে কা৺পছে মাও । দীর্ঘ বছর ধরে শারিরীক মানসিক যে সান্তনা সে পেয়ে এসেছে এযাবৎ আজ তার যেন পরিসমাপ্তি তিনি দ্বিধা করেন না আলুথালু করে গুটিয়ে রাখা মেয়ে্র বীর্যরস যুক্ত কাপড় কেঁচে পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখতে। ঠোটের কোনে ফুটে ওঠা হাসিটুক সযত্নে গোপন করে মেয়েকে ভর সন্ধ্যায় পাঠান পাশের গায়ের মুদি দোকান তারপর অবসর বুঝে খপ্ করে চেপে ধরেন পয়তাল্লিশের কেশবকে ," কি রে ভাগ বাটোরা শুরু কল্লি বুজি,আমার টা দে হারামজাদা " | বহু চেষ্টা করেও খুশী করতে না পেরে উঠে দাঁড়ায় কেশব ", পারব নি বাপু,যাও অন্য নোক দেখে নেও গা ",। ভাঙণ এভাবেই আসে যথারীতি। বোনে বোনে,বন্ধুতে বন্ধুতে ,পরিবার ছাপিয়ে দেশ কাল রাজ্যে ক্রমশঃ পুরুষের হাত ধরে | ধ্বংস হয় সভ্যতা , কৃষ্টি সব । বস্তুত এক্ষেত্রে প্রাণিকূলের সাথে খুব একটা অমিল নেই মানুষের | রাতের রুটি বানাতে বলেন মা,কাশিটা সত্যিই বেড়েছে। ",কি হল দিদুন চা বানাতে বলল তুমি শুনলে না "? কেন কে আবার এল ? চা হাতে দাওয়ায় আশে পাশের গাঁ গ্রাম থেকে কয়েকজন এসেছে স্বান্তনা দিতে , যা তুই ওদের সামলা আমি রান্নাঘরে গেলাম। রাতের আঁধারে মেলে প্রকৃত ফল , কথা দেওয়া আছে কেশবকে। মা হলেন এব্যাপারে পা৺কা খিলাড়ি দীর্ঘ বাইশটা বছরের বিপর্যয় ওকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে | মাথা গুলিয়ে যায় অতসীর , কেন ? কি জন্যে ? লোকগুলোর বিদগুটে চাউনিতে ভয় পায় ও।আচ্ছা মা , হঠাৎ করে এদের দরদ উপচে উঠল কেন ,কোনদিন তো দেখিনি......." কাল নয় টুসকির বরকে বরং আসতে বল না একটু গল্প গুজব করলে মনটা একটু হালকা হবে ,না হলে বরং তুই ওর সাথেই যা দু একদিন থেকে আয় ভালো লাগবে । সে তো ওর সাথে আমি থাকছিই কিন্তু ........."না আর কোন কিন্ত্ত নয় "। " দিদুন খাবার দাও খিদে পেয়েছে , এই তো একটু আগে কত কি খেলি ,ওমলেট , পোলাও , রাতের খাবার আর একটু পরে দিচ্ছি বাবা "। খাবার জল দাও , বোতল হাতে পাশের ঘরে ঢুকে যায় বাবুন । গভীর রাতে কারা যেন গুটি গুটি এগিয়ে আসে,ছড়িয়ে যায় জড়িয়ে যায় , টানে ওঠায় , বসায় শোওয়ায় ,ক্রমশঃ এগিয়ে আসে নিভৃত যাপন গুটি গুটি পায়।ও পেছোতে থাকে ক্রমশঃ পেছোতে পেছোতে ধরমর করে উঠে বসে বিছানায় ,চিৎকারে মা ছুটে আসেন ", কিছু হয়নি ,একটা স্বপ্ন ,তুমি যাও" | গায়ে দরদর ঘাম অন্ধকার রাতে চেপে ধরেছিল এক বৃদ্ধ আগন্তুক তোমায় বলা...."সব ঠিক হয়ে যাবে মা একটু ধৈর্য ধর "।উফ্ কি কদর্য অভিজ্ঞতা। পাশের ঘরে মা হাসেন, অভ্যেসটা তারাতারি রপ্ত কর অতু | মেয়েমানুষের আবার জাত/বেজাত ,কচি/বুড়ো ? রাগ হয় মায়ের ওপর,সমাজের ওপর , তথাকথিত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ওপর | পাশের ঘরে চলছে ভিডিও উদোম এ মার্কা মুভির রগরগে ডায়লগ শোনা যাচ্ছে এঘর থেকে | তিন প্রজন্ম পাশাপাশি মধ্যে ব্যবধান কতখানি ? হয়তো অনেকটা কিংবা কিছুই না | বিছানায় নিথর পরে আছে অতসী খোঁজার চেষ্টা করছে গতকাল আর আজকের পার্থক্যটা | মাথাটা ভারী হয়ে উঠেছে যন্ত্রণায় , কোথাও একটা অসহ্য জটিলতা পাকিয়ে উঠছে,তৈরী হচ্ছে ফাটল কিংবা ফাটল জুড়বার প্রস্তুতি হয়তো । গলার ভেতর একটা ঘেন্না প্রবল ঘেন্না স্বস্তি দিচ্ছে না ওকে | অন্তরটা কেঁদে উঠছে হাউ হাউ করে| একটানে দরজা খুলে বাথরূমে ঢুকে সাওয়ারের তলায় টানটান দা৺ড়িয়ে থাকা অতসীর তলিয়ে যায় অতর্কিতে ঘটে যাওয়া ঘটনার আকস্মিকতা | রাতে পায় চারীর আওয়াজে চুপ করে কান পাতে , মা দোর খুললেন , আলো বন্ধ করে বহুক্ষণ চেয়ে থাকে মায়ের দোরের দিকে । বুঝতে ,মেনে নিতে,মানিয়ে নেবার কষ্ট মোচড় দিতে থাকে বুকের গভীরে | কি জানি , কষ্টে,দুঃখে যে মায়ের পা' জড়িয়ে থাকা যায় ঘন্টার পর ঘন্টা ,যে মায়ের কাছে এলেই জুড়িয়ে যায় জীবনের সমস্ত সন্তাপ । এও এক চরম পরীক্ষা মুহূর্ত, সন্তান তার জন্মদাতা ভগবানের যৌনতা বুঝতে পারছে,দেখতে পাচ্ছে এমনটার কি খুব দরকার ? এসব তো আড়ালেই মানায়, যেটা লজ্জার, নিন্দার তার তো আড়ালই প্রয়োজন |একবার উঠতি বয়সে ওর এক ছেলে বন্ধু জামার বোতাম খুলে দিয়েছিল তার হাতে চার আঙুলের দাগ করে দিয়েছিল অতসী। কাট্টি হয়েছিল জন্মের মত | রাত তিনটে,আর ঘুম আসে না কোনমতে, গোকূল মিত্তিরের তির্যক দৃষ্টি রয়েছে ওর ওপর , বাস্তূ ভিঁটের ওপর ।লোকটা লোভী কিন্তু অসৎ না ,যথেষ্ট ধার্মিক |সময়ে অসময়ে টাকা পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়ে গেছেন । ওর চোখে তেমন লোভ টোভ কিছু দেখতে পায় নি অতসী | পেছনের মতিবাবুর বামুন স্ত্রীর তো বেশ জোরদার গলা শোনা যায়," হু , সাতটে কায়েত ম'লে তবে একটা বামুন জম্ম, অত সহযে কি আমরা অজাতে নামতে পারি " | বড় ঘরটায় জানলার কাছে বসে থাকে চুপচাপ | মা জেগেছে , বাথরূমের দিকে যাবে মনে হয় , চোখে মুখে জল দিয়ে পাশে বসে অতসীর ",একি অলক্ষুণে কথা দেখ দেকিনি , সারাটা রাত ঘুম নেই তোর পরে কোন্ অপদেবতা ভর করল বল তো ", কি যা তা বলছ তুমি ? তুমি না মা ? "হ্যাঁ মা ই তো " হঠাৎ তোর হল কি আজ "? সেটা তুমিই জবাব দেবে । '"আমি ? কেন "? ওহ বুঝতে পেরেছি ," সরি আমার ভুল ছিল "| "বোঝ ? তুমি কি সেটা বুঝতে পারছ ? যাক্ আমি ভাবলাম নির্লজ্জের মত জোয়ারে গা ভাসাতে গিয়ে ভুলেই বসেছ সব | ভুলে যেও না মা এটা একটা গ্রাম । নিজের আত্ম সম্মান নিজের কাছেই রাখতে হয় মা শত টাকার বিনিময়েও ওটা কেনা যায় না মা "| বাড়িময় গঙ্গা জল ছেটানোর ঘটায় অতিষ্ট অতসী আজ যেন ধরে ফেলেছে কু্ৎসিত এক জঘন্য রূপ আর তাতেই উল্টে পাল্টে যাচ্ছে বর্তমান আর অতীতের শ্রদ্ধার জায়গাটুক ফাটল ধরছে বিশ্বাসে | মাত্র একটি রাত। ধ্বংস হয়ে যায় মনুষ্যত্ব, শেষ হয়ে যায় সম্পর্ক, শূণ্য হয়ে যায় ঘর দুয়ার । তার জন্য খুব বেশি সময়ের দরকার হয় না | বিপরীতে একটু ধৈর্য্য , একটু সময় , একটু মেনে নেওয়া মানিয়ে নেওয়ায় বেঁচে যায় কত গৃহকোন সবটাই আমাদের আয়ত্বে ও অধীনে | "আজ কত ফুল ফুটেছে দ্যাখ ,বাসি কাপড়ে আবার ছুঁয়ে দিসনি যেন ", | সত্যিই সাজি ভরে ফুল তুলেছে মা , " একি আমার একার নাকি ও পাশের দিদি,তুলি,পূর্বা দের জন্যেও পাঠাতে হয় , হ্যাঁরে মাছ তো সব শেষ,তাছাড়া কিছু মুদি জিনিসও শেষ ,বাবুর তো আজই যাবার দিন । হ্যাঁ আমারও তো ছুটি ফুরিয়ে এল আজ আর কালকের দিনটা । আজ আর কোথাও বেড়োব না ভালো লাগছে না ,আমি সঙ্গে যাবোখন | ডেকোনা জানি উঠবে ন'টায় | জামা কাপড় ধুয়ে চায়ের জল চাপায় অতসী স্পেশাল করে এককাপ চা নিয়ে বসে বাইরের বারান্দায় , "মা তোমার চা " | কাজের মেয়েটি তার দু'বছরের মেয়েকে হাত ধরে নিয়ে ঢুকে ধপ করে বসে পরে সিঁড়িতে |


( ক্রমশঃ)

উপন্যাস // ধূসর আয়না ( পর্ব এগারো )
মল্লিকা রায়


কারখানার গেটে এসে থমকে দাঁড়ায় অতসী।বন্ধ গেটের পাশেই বিশাল জটলা,ডানদিকে ছোট্ট ডায়াস ,ব্যানার জুড়ে মজদূরদের দশ দফা দাবীর বিবরণসহ দশদিনের ঘর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন উৎসবে ছুটি, মাইনে বৃদ্ধি,কারখানা ঘরের সুস্থ পরিবেশ,সুবিধা/অসুবিধায় কিংবা বিপদ আপদে ঋণের বন্দোবস্ত,কর্মশেষে শ্রমিকদের অবসর কালীন ভাতা,কম খরচে মধ্যান্হভোজন,পানীয় জল ও শৌচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এছাড়া যন্ত্রপাতি মেরামতি ও বিভিন্ন খাতে কিছু দাবির উত্থাপন। শনিবার মিটিংয়ে চটজলদি সিদ্ধান্ত ,অবশ্য ওর পনের দিন ছুটির পর আজই জয়েনিং। অনেকটা তারাতারিই এসেছে আজ।মিটিংয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন দয়াল দা, দয়াল অবস্তি। লেবার ম্যনেজার। হিন্দু , সাঁওতাল উপজাতিভূক্ত। তামাটে পিঙ্গল বর্ণের সাথে কোথাও খুব মিল রয়েছে দ্রাবীর সম্প্রদায়ের , "ম্যডাম, ওইপাশের চেয়ারে বসুন "। বাজখাই গলায় নির্দেশ দেওয়া হল। স্টোরকিপার অতসী কর্ম জীবনে অনেকবার সম্মুখীন হয়েছে এ ধরণের আন্দোলনের , কখনো সহযেই মেনে নিয়েছেন মালিক পক্ষ কখনও বাকী রয়ে গেছে দাবির অনেকাংশ। রাষ্ট্রযন্ত্রের শোষণ আর মুনাফার মাঝে সেঁধিয়ে যাওয়া শ্রমিক শ্রেনীর দাবী দাওয়া বরাবরই থেকে গেছে অনিশ্চিত । আজ সেই বাকী দাবির পূনর্নবিকরণ । সুদূর জোহাসেনবুর্গ থেকে উড়ে এসেছেন মালিক পক্ষের দুই উত্তরাধীকার রাতুল বর্মা ও প্রাণেশ বর্মা । দুই প্রজন্মের দুই ভাই অর্থাৎ বড় ছেলের পুত্র রাতুল এবং ছোট ছেলের প্রপৌত্র প্রাণেশ। দেশ সূত্রে পাঞ্জাবি , ঝকঝকে স্মার্ট চেহারার দুই যুবক। চিৎকার চেচামেচি শ্লোগানে উত্তপ্ত প্রাঙ্গণ । থেকে থেকেই দয়াল দা'র কর্কশ গলায় বিদীর্ণ আকাশ বাতাস,তার সাথে অগনিত হাতের বজ্র মুষ্ঠি শ্লোগান , " দশদফা দাবির ভিত্তিতে এ লড়াই চলছে ,চলবে ,চলছে,চলবে। শ্রমিক মালিক ভাই ভাই / পথে এস হাত মেলাই" ।
উত্তাল সাগরের মত আন্দোলিত হয়ে চলেছে অসংখ্য মেহনতী হাত। আগস্ট আন্দোলনকেও ছাপিয়ে যায় এই পরিমাণবিদ্রোহ। যথেষ্ট সম্ভ্রান্ত ভ্রাতৃদ্বয় ভিড় ঠেলে মঞ্চে উপবিষ্ট হয়েই হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে নিলেন নিজেদের অক্ষমতার জন্য । তারপর উপবিষ্ট আসন গ্রহণ করে মন দিয়ে শুনলেন শ্রমিক ভাইদের অভাব অভিযোগ ,পাওয়া না পাওয়ার সুখ দুঃখের ইতিহাস। এবং সকলকে প্রায় অবাক করে দিয়ে মাথা নত করে মেনে নিলেন এক গুচ্ছ দাবিদাওয়া তার সাথে যুক্ত হল পূজোর বোনাসসহ অতিরিক্ত কাজের জন্য বর্ধিত ভাতা হাততালিতে ফেটে পরে কারখানার এদতদঞ্চল, হুড়মুরিয়ে বহু শ্রমিক উঠে পরে ডায়াসে ,বহুদিন পরে মনের মত মালিক পক্ষের দেখা মিলেছে,পাওনা আদায় হবে আরও । কিভাবে ওদের অভিনন্দন জানাবে ভেবে পায় না খেটে খাওয়া মানুষগুলো । আসলে আধুনিক প্রজন্ম ঠিক ঠিক সময়মাফিক ধারায় মিশে যেতে পেরেছে একাল/সেকালের চিন্তা ধারার সাথে যেটা প্রবীণ পক্ষের অনুধাবন করতে কমপক্ষে আরও বেশ কয়েকটি প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হবে । এই প্রজন্ম বুঝে গেছে বাহুবলে কখনই মনের মত কাজ আদায় করা সম্ভব নয়,কাজ পেতে গেলে চাই সহানুভূতি,ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব এবং কর্মীদের পাশে থেকে এক পারিবারিক পরিবেশের মাধ্যমেই অতিরিক্ত উৎপাদন সম্ভব । সেক্ষেত্রে আর্থিক দিকটায় কিছুটা ছাড় তো দিতেই হয় , দশ আনা পেতে গেলে দু'আনা তো খরচ করতেই হবে নতুবা শ্রমিক পিটিয়ে,পেটে লাথি মেরে কখনই ব্যবসায়িক ভিত্তির উন্নতি ঘটানো সম্ভব নয়। অতএব সেই মৌ চুক্তি স্বাক্ষরে এই দুই বর্মা পুত্রদ্বয় প্রমাণ করে দিলেন শ্রমিক মালিক আসলেই ভাই ভাই । ঝুপ ঝুপ করে মালা,পুষ্প বৃষ্টির মধ্যেই শুরু হয়ে গেল কামীন উৎসব । কোমড় দুলিয়ে ফুলির দল গেয়ে ওঠে ", ও বাবু লো , মিঠা লিবি কওন ঘরে লো ", ফাগুয়ার রঙীণ আবিরে মাতোয়ারা মরদগুলোর ঢুম ঢুম বেজে ওঠে ঢাক,মাদোল। মরদগুলোর উস্কানি পেয়ে দুই বাবুর হাত নিয়ে রিতীমতো ফুলিদের টানাটানি। খস খস পোজ পৌছে যাচ্ছে সুদূর মার্জারিনার কাছে , গালে টোল ফেলে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠছে রিনা ," হাউ রোমান্টিক ! ওদের সাথে মাদোল নাচে বেশ আনন্দ পায় দুই বিদেশি ,এমনকি আনন্দের আতিশয্যে ঢক ঢক গিলে নেয় ওদের মোচ্ছবের হাড়িয়া। সবটাই প্রায় গলাধঃকরণ করেছে অতসী। হ্যন্ডশেকের আশায় ঢুকতে যেয়েও ফিরে আসতে হয়েছে। থেমে থাকতে হয়েছে দূর থেকেই । আকাশে মেঘ জমেছে ,ঘন ঘন প্রচার হছে ', বন্ধুগন , আপনারা আজ খুবই আনন্দিত বোঝাই যাচ্ছে , কারণ আপনাদের বহূ প্রার্থিত দশ দফা দাবি আজ মেনে নিয়েছেন মালিক পক্ষ , কাজেই আপনাদেরও দায় বর্তায় মালিক পক্ষকে নিরপত্তার ব্যবস্থা করে আপ্যায়নের আয়োজন করা। আমার সাথে ওদের কথা হয়েছে রাত আটটার মধ্যে ওদের কলকাতায় পৌ৺ছনোর বন্দোবস্ত করা আসুন আমরা সকলে এই কাজের সামিল হই । সঙ্গের আট দশজন কেয়ারটেকারসহ মালিকদ্বয় অপেক্ষারত জার্মান হুন্ডাইতে ঢুকানোর কারণে কিছু স্বেচ্ছাসেবকের সাহায্যে ভিড় ঠেলে একপ্রকার টেনে হিচরে গাড়িতে উঠিয়ে দেয় দয়াল দা ,মিলন ঘটে দুই পক্ষের মননে,ভ্রাতৃত্বে হাত মেলানোর বেশ কিছু দৃশ্য ক্যমেরা বন্দি হয়ে থাকে চিরতরে । অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যায় শাটার । পরের পর্বে তৈরি হয়ে নেয় ফুলিরা সারারাত পরবের মহোল্লাস , নাচ আর নেশা,ভাঙের মধ্য দিয়ে আরেক উদযাপনের প্রস্তুতি গুলিয়ে ওঠে ওদের চোখে মুখে । কোন ঘেষে বসেই থাকে অতসী দশদিনের ছুটির পর সবকিছুতেই যেন পরিবর্তনের আঁচ। কেউ কি ওকে লক্ষ্য করে নি ? বিশাল বিপর্যয়ে বিদ্ধস্ত অতসীর প্রয়োজন তবে কি শেষ হয়ে গেছে ওদের কাছে , রহমান , রঘু চাচা, রুমমেটের অধিকাংশ আজ উল্লাসে আত্মহারা । আসলে তেমন ফলাও করে বলাও হয়নি এখনো তাই কেউ খেয়াল করেনি হয়তো। উঠে যেতে মন চায় না, কোন তারা নেই যেন, তারপর মৃগাঙ্কই শুধু ছেড়ে যায় নি ছেড়ে গেছে বহু সুন্দর সুখের মূহুর্তরা ,সত্যিই যা আর ফেরানো যাবেনা কোনদিন । মূহূর্তেই বদলে গেছে স্থান কাল পাত্রের অবস্থান বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায়। হয়তো কোন ব্যবধান থাকবে না দুই প্রজন্মের মধ্যে ,এক অন্ধবিশ্বাসের মাঝখানে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে চিরকাল কারণ কিছু অভ্যাস নিয়মে পরিনত হয়ে গেছে আজ তার মহীরুহে অসংখ্য প্রশাখার বংশবীজ। এতদিনে ওর অবচেতনে প্রশ্নের মত সুপ্ত ছিল । কাল আর আজ বহু বরষের ব্যবধান বহু সময়ের পলি জমে পূর্ণাঙ্গ জমিনে এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাস । " দিদি চা ",ওহ রঘু চাচা ,এখন আবার চা কেন? আমার তো যাবার সময় হল । " পি লো বেটি , পাশের চেয়ারটায় বসে রঘুনাথ, ব্লক বী'র দরোয়ান , আমি জানি বেটি দিলকা হাল, ফা৺কা প্রায় মাঠটায় গুটিকয় জনমানব , সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত্রি আগত প্রহরের কাছে অতসীর মতই অসহায়তা নিয়ে অলসভাবে সমর্পণ করেছে নিজেদের । হয়তো খুব মিল ওদের প্রত্যেকের জীবনে । কেউ সর্বস্ব খুইয়ে হতাশ, কেউ লাঞ্ছিত সময়ের কাছে বসে আছে হেরে,কারুর বিশ্বাস গেছে চুরি, কেউ সময়ের মার খেয়ে ছেড়ে দিয়েছে জীবনের আশা। কেউ হারিয়েছে প্রেম, কেউ অগাধ প্রাপ্য ,আসলে সেই মানুষ গুলিই আজ নিশ্চল সময়ের কাছ থেকে গুটিয়ে নিয়েছে সমস্ত অস্তিত্ব। ", হ্যাঁ চাচা উঠব এবারে , কাল দেখা হবে "। সামান্য ব্যস্ততা দেখিয়ে দ্রুত পা চালায় অতসী , এই ক'দিনে অনেকটা ম্যচিওর হয়েছে ওর বোধবুদ্ধি। পুরুষ জাতির প্রতি কেমন একটা বিদ্বেষ তৈরী হয়ে গেছে অজান্তে একসময় যেখানে পাতা থাকত খোলা মনের একফালি মেঘ আর তার আলোয় রঙীণ হয়ে উঠত মনের আধো ফোটা পাপড়িগুলি , অজান্তে দু'একটি প্রজাপতির সন্তর্পণ পদার্পণ মেলে ধরত প্রাণ প্রাচুর্যের ডানা আজ তার পরতে পরতে ধূলো ময়লার চাষাবাদ। মানুষগুলো আবছা হয়ে যাচ্ছে ময়লার ঔদ্ধ্যত্বে । যদিও প্রেম আজও খুব নিবিড় মনে একাত্ম হয়ে আছে ওর মনে। তবুও তাকে মেলাতে গিয়ে কেবলই পিছু ফেরা। কেবলই ভ্রান্তির কবলে পরে অহেতুক নিজেই নিজেকে ক্ষত বিক্ষত করে তোলা। আটটা চল্লিশ, বৃষ্টি হয়নি,কালো মেঘ ভেদ করে আলোর রোশনায় ছড়িয়ে পরছে আকাশটায়। অনেকটা দেরি হয়ে গেছে,প্রায় দশটা বাজবে বাড়ি ফিরতে সঙ্গে মায়ের গা'ঘেষা কূট কাচালি," বলি ও অতু তুই কি এবারে চোকের মাথা টাতা সব খোয়ালি না কি রে ? বলি পড়শীরা কি ছেড়ে কতা কইবে নাকি হ্যাঁ,পাচটা লোক দেখলে কি ভাববে বল দেকিনি,দাঁড়া বাপু একটু গঙ্গা জল ছিটোয়ে দি সঙ্গের অপদেবতাগুলো বিদেয় হবেখন,নইলে তো আবার জ্বালায়ে মারবে সারাটা রাত............"! উঃ অসহ্য লাগে আজকাল। মাকে নাকি এই ছেলেমানুষিগুলোকে ! কে জানে !


ঘ্যস শব্দে বাস এসে দাঁড়ায় নির্দিষ্ট ষ্টপেজে। মাথা শরীর হালকা চাদরে জড়িয়ে প্রায় ফাঁকা বাসটায় সিট করে নেয় অতসী।


( ক্রমশঃ)

উপন্যাস // ধূসর আয়না (পর্ব বারো)
মল্লিকা রায়।


আজ মিটিং আছে সালিশ কমিটির কিছু পারিপার্শ্বিক দ্বন্দের মধ্যস্থতাও। যার প্রায় তিনভাগটাই সংস্কার জনিত নারী জগতের ভেদ বুদ্ধির অচলাবস্থা সম্পর্কিত। এ এক চিরাচরিত অবস্থা জীবনে শেকড়ের মত জড়িয়ে পেঁচিয়ে দৃঢ়তায় আবদ্ধ করে রেখেছে জাগতিক বোধাবোধকে, কাছ থেকে মনে হয় নির্ভুল,নিরপেক্ষ এক চিরন্তন ব্যবস্থা অথচ কি নিদারুণ বিপর্যয় ভেতরে ভেতরে ভাবা যায় না। মা বেশ সচল,পূজোর ঘর টর পরিষ্কার করে রান্নাঘরে। গতকাল বাজার করা আছে তেমন তাড়া নেই,ইতিমধ্যে আশপাশে দলাদলি শুরু হয়ে গেছে ,পক্ষে বিপক্ষের । পায়ের তলার মাটি বজায় রাখতে কেবল আটকে রাখা নিজেকে। বেলা আটটা, টিফিনের পর দিদির ফোন, " অতু একটা খুশির খবর দেবার ছিল রে বোন, বলব, " হ্যাঁ বলো "। " তুই রাগ করবি না তো কতা দে " ছ্যাঁত করে ওঠে অতসীর বুক , এমন কথা বলছে কেন দিদি ? আজকাল অবশ্য আর অবাক মনে হয় না কোনকিছুই, বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সাথেই বলে," তুমি আমার পরীক্ষা নিচ্ছ দিদি" । " না রে বলছিলাম কি আমাদের বৌ মা এয়েচে ", বৌমা ?কার বৌমা ? "আমাদের রে ,তো্র আমার , অনেক্ষণ চুপ থাকতে দেখে , আমাদের সূর্য বে করে এনেচে রে,খুব সুন্দর দেখতে ,কি সুন্দর কতা বলে রে আয় না ক'দিন থেকে যা ,কিরে কতা বলচিস না যে ছোট ........হ্যালো হ্যালো,ঝপ করে রিসিভার নামিয়ে রাখার আওয়াজ। সর্বস্বান্ত ! এই সেই বিশেষ স্থান যেখানে তিল তিল করে গড়ে উঠেছিল একটি চিরন্তন বিশ্বাসের ভিত্। কয়েকটি হাতের পরে হাতের অঙ্গীকার বদ্ধ প্রতিশ্রুতি। কোনটাই বজায় রইল না। তবে কিসের গৃহ কিসের পরিবার ? কিসের সমন্ময়ের তাগিদে আজীবন ছুটে চলা ? কেউ জানে না তিল তিল করে লুকিয়ে টিফিনের পয়সায় কেনা হত স্কুলের পাঠ্য বই ,দিদি নিতে না চাইলেও হাতে গুঁজে গলা জড়িয়ে বলেছে," তুমি তো সবই জানো দিদি , রেখে দাও কাজে লাগবে। অমন দেবতার মত জামাইবাবু ছিল বলে কষ্ট হয়নি কখনো। কিন্তু আজ আর চরম দুঃখে সঁপে দেবার মত বুকের ছাতিটা কেমন যেন নিশ্চল হয়ে পড়েছে । দেওয়ালের কোথাও কোন স্নেহবন্ধণ নেই, নেই ঝোড়ো হাওয়ায় বিদ্ধস্ত কাধে রাখবার মত কোন হাত। তবে কি অগ্রগতির জোয়ার এসে পরেছে ? শুরু হয়ে গেছে পরিবর্তনের প্রণালী ? সময় বলবে সব। মা'র সাথে ব্যবধান বাড়ছে ক্রমে। বাড়ছে কি ? আজ আর ওর কোলে মুখ লুকিয়ে কেন আছড়ে পরছে না কান্নারা,অসংযত মনটায় প্রবল দ্বন্দ যেন আটকে রাখছে পথ। পাল্টে যাচ্ছে মায়ের মুখ,ভাব ভঙ্গী। মুছে যাচ্ছে একত্রের সেই অবসর ,সেই সুখ দুঃখে পরষ্পরের ভাব বিনিময় । মধ্যে জন্ম নিচ্ছে আক্রোশের প্রবল মরুঝড়। এই নে ,কখন থেকে ফোনটা বাজছে বলি হল কি তোর ? ফোনটা টেবিলে রেখে একপ্রকার সরে পড়লেন মেয়ের পাশ থেকে । ওপাশে রমেন দা ," আপাতত তুমি ফ্রী তাহলে, কি বল "? টিপ্পনী কেটে কথা বলা ওনার অভ্যেস," ঠিকই বলেছ এ্যম টোট্যালি ফ্রী নাউ , আসবে? ইয়েস এনি টাইম,এনি ডে উই উইল এনজয় টুগেদার ", প্রবল হাসিতে ফেটে পরছে অতসী, দমফাটা হাসি ,এমন হাসি কখনো শোনেনি রমেন। "জানো রমেন আজ আমি মুক্ত ,এক্কেবারে , তোমাকে সময় দেওয়া আমার উচিৎ ছিল রমেন, বাইকটা এসে থামল বাড়ির সামনে," রহিম ভাই সাথে দু'জন ," দিদি খবর সব ভালো তো"? "" ও তোমরা ! হ্যাঁ আপাতত ভালো "" মিটিংয়ে আসছ তো "?"যাব তবে একটু তারাতারি ছাড়তে হবে,কাজ আছে "। " সে তুমি যাও না যাও তোমার ব্যাপার, জানো কি মিটিংয়ে রঞ্জণা দিদিমণি কে তোমার পোষ্টটা দেওয়া ফাইন্যল হয়ে গেছে , গোকূল মিত্তিরকে চেপে ধরো এই বেলা দিদি,মুশকিলে পরে যাবে কিন্তু বলে দিলাম ", অতসীকে অবাক করে দিয়ে কানের কাছে হাত দিয়ে মাথাটা টেনে এনে ফিসফিস করে বোঝানোর চেষ্টা করে রহিম ভায়। একগাল হেসে এগিয়ে আসে মা , হ্যাঁ বাবা দ্যাখো দিকি ও কেমন মিছিমিছি ভয় পায়,ও যাবে বাবা আমি পাঠিয়ে দেবখন ,একটু চা খেয়ে যাও বাবারা .............না মাসিমা পরে এসে খেয়ে যাবোখন , চলিগো দিদি।হুস করে বেড়িয়ে যায় ওরা। " মা আমাদের একটু টালিখোলা যেতে হবে ", কেনরে হঠাৎ, সবাই ভালো আচে তো ওরা ? " আছে আছে খুবই ভালো আছে,নতুন বৌমা এনেছেন গো তোমার নাতি। চলো আশীর্ব্বাদটা সেরে আসি এইবেলা ।" বলিস কি,দাদুভাই বে করেচে ? এতো তোর গব্বের কতা অতু ", "নয় ? গব্বে কেমন ঢ্যপঢ্যপ করতিছ্ আমার বুকের মধ্যিটা দ্যখো,দ্যখো মায়ের হাতটা জোড় করে বুকের মধ্যিখানে চেপে ধরে অতসী। কে একজন এসেছে মায়ের সম্পর্কের,তুমি যাও আজ আমি রা৺ধব,হেসেলে ঢুকে কোমড় বেধে লেগে পরে অতসী । বহুদিন ধরেই পাশাপাশি দুই পরিবার দ্বন্দে লিপ্ত। গাছের পাতা পরের বাড়ি পরলে নাকি শুকিয়ে যায় আয় ব্যয়,বহু দ্বন্দের পর পরিবারের কর্তা স্বয়ং সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, গাছে গরম জল ঢেলে মেরে ফেলতে হবে। শখের গাছগুলির মৃতদেহ দেখে দুই তরফে চুলোচুলি।হেসেলের জানলা দিয়ে দেখা যায় ওদের কাদা ছোরাছুরি। ওপাশের বাড়িটা রমেনদের পেশায় কল মিস্ত্রী পাশের বাড়ির সাথে লেগেই আছে ক্যচাল,রাতদিন সরষা পড়া ,তিল পড়া ঠাকুরবাড়ীর তেল পড়া,সিন্দুর পড়া এনে নাকি ছড়িয়ে রাখে ঘরের চারপাশে ওর বৌ। হাসি পায় অতসীর, মানুষ যখন ব্যস্ত চাঁদে মিথেন গ্যসের পরিমাণ আবিষ্কারে,বাড়ির চারপাশটা সুন্দর করে শিশুর বাসযোগ্য করে গড়ে তুলবার তাগিদে ,ওরা সদলবলে এ্যসিড বৃষ্টিতে লয় করে দিতে বদ্ধপরিকর। বিকেলে বেড়িয়ে পরে মিত্তির বাড়ির উদ্দেশ্যে। গরমে উঠোনে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে, মিত্তির হয়তো জানেন না আজ অতসী কোন পদের লোভে আসেনি,প্রয়োজনে পদত্যাগ করাও ওর কোন ব্যাপার নয়। লোভ জিনিসটা কোনদিনই ওকে গ্রাস করতে পারে নি। আচ্ছন্ন করতে পারেনি ওর মস্তিষ্ককে। যোগ্যতা আছে কি নেই বড় ব্যাপার নয়, আসল কথা হল চাহিদার যোগান যেখানে মহৎ সেখানে নিশ্চুপ থাকাই শ্রেয়। মিটিং শুরু হওয়ার আগে হাত জোড় করে উঠে দা৺ড়ায় অতসী," উপস্থিত সকল বন্ধু ও মাননীয়/মাননীয়া সকলকে আমার প্রণাম জানিয়ে প্রধানের কাছে আমার বিনিত অনুরোধ নিজের পদ থেকে আমি অব্যাহতি চাইছি ,অনুগ্রহ করে বিষয়টি বিবেচনা করা হোক"। রে রে করে ওঠেন মিত্তির," আরে খেপিছ নাকি ? ওটা তোমাকেই সামলাতে হবে" মুখে বিরক্তির শব্দ রঞ্জনার। দুই সহযোগী গলা মেলায় , ইলেকশনে স্থির করা হোক ,আপনারা রাজি থাকলে হাত তুলুন "। আশ পাশ থেকে আওয়াজ ওঠে," রাজি আমরা রাজি "। স্থির হয় আগামী মাসে দিনক্ষণ জানিয়ে দেওয়া হবে বহুদিন পর দেখা সাক্ষাৎ হওয়ায় কেমন আছ,কি করছ,আহা,উহুমূলক নানান খেদোক্তি ও কুশল বিনিময়ের সাথে জলযোগ।যেখানে হৃদয়ের জ্বলণ অণবরত সেখানে কোন প্রলেপের কাজ করেনা এসব আক্ষরিক তৎপরতা। লোক দেখানো শালিষে মিটিয়ে দেওয়া পড়শীর বিবাদ বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ তা বোঝা যায় হাত,কান,বাহুর তাবিচ,মাদুলি,শেকড়,বাকড় এমনকি পঞ্চায়েত প্রধানের হাত ভরতি চুনী,পান্না,মোতি,পোখরাজ ঝলকে ঝল্কে ওঠে চূড়ান্ত শুনানির রায়ে। কার মাথা কাটা যাবে,কার ঘিলু গুলে খাওয়ানো হবে গো জাতির দুগ্ধ বৃদ্ধির টনিকে, কে উঠবে,নামবে সবটাই প্রায় আঙুল চালের নিক্তি ওজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সভার সমাপ্তি ঘোষণা করে গ্রাম প্রধান অতসীকে দেখা করে যেতে বলেন। বৈঠকখানা ঘরে টিমটিমে আলোয় এদিক সেদিক চেয়ে ফিসফিস করে জানায়," আজ দশটার পর দোরটা খোলা রেখো। কতা আছে "। হনহন করে পা চালায় অতসী। রমেন আসছে হয়তো, গেট খুলতেই দু'জনে একসাথে ঢুকে পরে প্রায় , " গুড নাইট ম্যডাম"। ওকে ডিয়ার,চল ছাতে,গুমোট গরমে জীবন অতিষ্ঠ তুমি একটু ওয়েট কর প্লিজ আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। নাইট ড্রেস পরে আয়নাটার ঢাকনা টেনে খুলে দেয় ঝটকায় ,উড়ে যায় একরাশ ধূলো,ময়লার আবরণ ,ণতূন করে নিজেকে দেখবে বলে ওর খুশির ছায়া এসে পরে ধূসর আয়নায়। আলো আ৺ধারের আবছায়ে মানসী মূর্তি জাপটে ধরে রমেনকে , কেবল বাঁচার আর বাঁচানোর আকূতি ,উত্তপ্ত নিশ্বাস আর আবেগের তোড়ে ভেসে যায় ওরা।


( ক্রমশঃ)

উপন্যাস -13 পর্ব
মল্লিকা রায়

রমেন দার আজ ছোট ছেলের বিয়ে ,বড় সপরিবারে থাকে সুদূর জোহাসেনবুর্গে চাকরি সূত্রে,দু'দিন আগেই চলে এসেছে বাড়িতে,আত্মীয় কুটুমে বাড়ি সরগরম। বৌমাও ওখানে ভালো কোম্পানিতে কাজ জুটিয়ে নিয়েছে , এককথায় নির্ঝঞ্ঝাট ছোট পরিবার । ছোটটি বছর দুই চাকরির পর বাড়ির পিড়াপিড়ীতে বাধ্য হয়ে বাপ মায়ের পছন্দসূত্রে পরিণয়ে আবদ্ধ হবার মত্ প্রকাশ করেছেন । আর তাতেই খুশির জোয়ার চ্যটার্জী পরিবারে ,গোড়া বনেদী বামুন সেকেলে ধ্যান,ধারণা যুক্ত পরিবারটির রক্ষণশীলতা বয়ে চলেছে দুই প্রাক্তন সদস্যকে কেন্দ্র করে, অবিবাহিত জ্যঠামশায় ও বাল্য বিধবা বিন্নী পিসি। রমেনের জন্মসূত্রে এ বাড়ির মুখ্য সদস্য ।আজও বিনী পিসির কথায় তুলসী মঞ্চে বারের সিন্নি চড়ে,শনিদেবতার বাতাসা লুঠে পাড়ার কচিকাচাদের হুলস্থূল বেধে যায়। ঘটা করে প্রত্যেক শনি মঙ্গলবার গায়ের দশ বামুনকে পরমান্ন সেবায় তুষ্ট করতে হয় । সে অত নিয়ম কানুন তখন বুঝতোও না রমেন। সে শুধু দেখেছে ছোটবেলা থেকেই মা,বাবা দাদা বিন্নি পিসির ও জ্যঠদাদুর কথা ঠাকুর দেবতার মত মান্যি করে,মুখে টু শব্দটি করেনি কোনদিন অতএব এই প্রান্তিক সময়ে এসে সবটাই গা' সহা হয়ে গেছে ওদের সকলের। মিতা বৌদি, রমেনের বৌও একপ্রকার অভ্যাসের দাস হয়ে দো' বেলা পিসি ও জ্যঠদাদুর গোড়ামীর সংস্কার গুলোয় মদত জুড়তে থাকেন নিয়মিত। এতে রমেনের খুব একটা সমস্যা যে হয় তা নয়,চাহিদা মত সংসারে প্রায় সবটাই না চাইতেই প্রায় হাজির করেন বাড়ির নৈমিত্তিক প্রথা অর্থাৎ বাড়ির পুরুষদের প্রতি মহিলাদের সেবা ,যত্ন আত্তির প্রাচীন অনুশাসণ এ বাড়ির প্রধান নিয়ম কাজেই নিজের ঘর,সংসারের যাবতীয় দায় দায়িত্বের সবটাই আজ প্রায় সেই সূত্র ধরে আপন গতিতে এগিয়ে চলেছে। যেমন আসছেন দো'বেলা বাড়ির বামুন ঠাকুর, ধোপা,নাপিত,মিস্ত্রী, কাজের লোক,রাধুনী, এমনকি সুদূর তাঁতী পর্যন্ত কাপড়,চোপড় নিয়ে এই বামুন বাড়ির দাওয়ায় মেলে ধরেন পূঁজোর ধনেখালি,টাঙ্গাইল, তসর,সিল্ক আরো কত কি , এমনই আভিজাত্য। তবে রমেন খুব সাদাসিধে। বিশাল কোম্পানির উচ্চ পদ ওকে কিঞ্চিৎ বিলাসী করে তুলেছে ,নাক উচুও। শিশুকাল থেকেই দেখে আসছে সকালে কোন সদস্য বাড়ির বাইরে বেড়োলেই বিনী পিসির নির্দেশ ," রাধামাধবের চন্নমেত্ত মুখে না নিয়ে বাড়ির ফটক পেড়োলেই বিপদ কেউ রক্ষা করতে পারবে না এই বলে দিলুম , অবাক হয়ে রমেন দেখেছে ভয়েই হোক বা শ্রদ্ধায়ই হোক প্রত্যেকেই ওর আদেশ মেনে চলেছে, বাবাকে দেখতুম জোড় হাতে চন্নমেত্ত নিয়ে মাথায় হাত রেখে ভক্তিভরে গৃহদেবতার উদ্দেশ্য প্রণাম জানাতেন তিনবার ওংঁ বিষ্ণু মন্ত্র বলে। জ্যঠ দাদু তো এ বাড়ির সকলের অভিভাবক, কি বড় পাবন,বিয়ে,অনুষ্ঠান ছাড়াও যে কোন মাঙ্গলিক কাজ কম্মে ওনার পরিচালনায় কারুর কোন অভিযোগ করার সাহস হয় নি এ যাবৎ। তবে শৈশব থেকে স্নেহ,ভালোবাসার অধিক ভাগটাই জুটেছে রমেনের ভাগ্যে তা ওর অধিক সহজ সরল,বাধ্যতার কারণে অন্যন্যদের এতে যথেষ্ট অভিযোগ, আপত্তিও ছিল কিন্তু সমুখে কেউই রা করার সাহস পেত না। আজ বাড়িটা প্রায় ফাকা,কর্মসূত্রে সকলেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরেছে। সাত ভাই বোনের ছয়জন জীবিত , এই একজনই আগলে রয়েছে বাড়িটার ঐতিহ্য অবশ্য প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা এই পুত্রটির প্রতি বাড়ির সকলেরই সহমর্মীতা অধিকতর সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই, কথায় বলে ", দৃষ্টির বাইরে মনেরও বাইরে " অতএব সদাহাস্যময় রমেন অদ্যবধি একপ্রকার নিশ্চিন্ত এই জ্যঠদাদুর কারণেই, কোথায় কি ব্যবস্থা হবে,কাকে ডাকা হবে,প্রণামীতে ক'টা শাড়ি যাবে, আরো কি কি যাবে, কোন ক্যটারিং আজকাল বেশ নামী দামী আইটেম তৈরী করে , বরযাত্রীতে কার নাম থাকবে, কারা থাকবে বরণ কূলো নিয়ে আশীর্বাদে , কি কি পদ থাকবে,মিষ্টি ক' প্রকার ইত্যাদিতে ওনার সমকক্ষ মেলা ভার অতএব রমেন বেশ সুখী ও নিশ্চিত। মিতা বৌদির তো তুলনাই হয় না , বিনি পিসি ওর পেছনে আঠার মত লেগে থাকে সর্বক্ষণ ,এটা,ওটা,সেটা ,রান্না, বান্না,লোক লৌকিকতা,পূজো আচ্চা, দেনা পাওনার প্রায় সবটাই পিসির কাছে হাতে খড়ি। সকাল থেকেই পিসি বামুন ঠাকুরের তদারকীতে ব্যস্ত হলেও একবার আদুরে নাতপুতের কানে,একবার বেলাত ফে্রতা বড় শিবেনের ঘরে টিফিনের প্লেট হাতে খানকতক লুচি আলু চচ্চরি নিয়ে ফুটফুটে পুতনির টসটসে গাল টিপে আদর করে টিপ্পনী কাটতেও ভুল হয় না পিসির ", তোরা সব সায়েব বলে কতা , এ বাড়ির বড় , নিয়ম কানুন ঠিকমত মান্যি গন্যি কোর বাপু , এ আবার কি কতা জম্মে শুনিনি তুমি নাকি কিছু মান্যি করতে পারবে না ,তা বেশতো বামুন ঠাকুর যা বলেন সেটুক মানতে বাপু আপত্তি কোর না ঘোর অমঙ্গল হবে এই বলে রাখলুম ", নহবতে সুর মাতিয়ে তুলছে আশ পাশের পরিবেশ। ইয়া বড় ইলিশ প্রণামীর যৌতুকসহ জামাই ও অন্যান্য জনা দশেক রওনা হয়ে গেছে কিছুসময় আগেই। বাপ ঠাকুর্দার আমলে সাবেকী বড় সেকেলে বাড়িটায় ঝকঝকে রংয়ে আলোয় নহবতে সেজে উঠবে কিছুক্ষণ বাদেই। আদরের নাতপো'র দখল নেবে আরেক সুন্দরী। পিসির মনের মতন ছেলে, রাতদিন বই আর পড়া, নাওয়া,খাওয়া ভুলে শুধুমাত্র পড়ার টেবিল ওর চৌহদ্দির গন্ডী,মাঝে মধ্যে প্রিয় বন্ধু ক্লাশের ফার্স্ট বয় আর একজন সেও ওই ওরই মতন , পড়াশুনা নিয়ে আলোচনা হত বেশ অনেক্ষণ ,ব্যস্ ঐটুকই । না কোন খেলাধূলা,বেড়োনো,আড্ডা চোখের কোনটা ভারী হয়ে আসে পিসির, মনে মনে বলেন,"এমন ছেলে জীবনে দুটো দেখিনি বাপু ,ক্লাসের সেকেন্ড বয় বরাবর ,এমনকি এই জয়েন্টেও ওই দ্বিতীয় । চাকরিতেও দ্বিতীয় শ্রেণী। অমন কাদতে কোন পুরুষকে দেখেনি পিসি । " আজও ফার্স্ট হতে পারলাম না দিদুন ",দোর বন্ধ করে সে কি কান্না ছেলের। বিয়ে করতে নারাজ ছেলের কোনভাবেই রাজি করানো যায় না অবশেষে প্রিয় বন্ধুর বিয়ের খবরে আর অমত করেনি ঋক্ ভালো নাম ঋতম চ্যটার্জী , দ্য চিপ্ ডেভেলপমেন্ট জুনিয়র ক্লাস ওয়ান ম্যজিস্ট্রেট অফ দ্য ডিস্ট্রিক্ট। দু'চোখ ভরে দেখতে থাকেন বিন্নী ওরফে বিনি একপ্রকার নামেই পরিণত হয়েছে ইদানিং , কোন ভোরে সোয়ামি,ঘর,সংসার ছিল তা আর মনেও পড়েনা । ওমন একটি চোখ ভাসানো ছেলে আহা বুকে জড়িয়ে বাঁচা যায় বহুকাল। " কি দেখছ অমন করে দিদুন ",? সম্বিৎ ফেরে বিনির ", না রে বাবু,ধুতিটায় তোকে কি সূন্দর মানিয়েছে তাই দেখছিলুম রে সোনা ,নে এবারে হাঁ কর দেকি লুচি দুটো খেয়ে নে, কারুকে বলিসনি যেন ,তোর আজ বে তো তাই উপোস কিন্তু ,তুই তো আবার না খেয়ে থাকতে পারিস না আমি ছাড়া আর কে জানে বল্ ,মায়ের তো কোন খেয়ালই নেই আমার কিন্তু সব দিকে নজর থাকে বুঝলি বাবু ",। দিদুনের হাত জাপটে ধরে গোগ্রাসে লুচি গিলতে থাকে ঋক্,ফিসফিস করে বলে আরো গোটাকত আনো না দিদুন,বড্ড খিদে পেয়েছে "," না ঐটুক থাক্ বাকিটা বৌয়ের হাতেই খেও"। রমেন ব্যস্ত খুব সেই কোন সকালে এককাপ চা দিয়ে গেছে কাজের মাসি পেটে ছুঁচো ডাকছে যে, " ও পিসি .............."আনছি রে বাপু আনছি বলি অ বৌমা এবাড়ির লোকজন কি এখনই সব নাচতে লেগেচে এতটা বেলা হল ছেলেগুলোর জলখাবার জুটলো না , মরণ দশা সব , বে যেন আর কোতাও কারো বাড়ি হয়না হুহ্ যত্তসব গতরপুরির দল। নে এবারে মর বিনি একলা খেটে খেটে মর্,কেউ তোর মুখে জোর করে আদর করে কোনদিন লুচি গুজে দেবে না,তুই দিবি তোকে দিতেই হবে এই তোর ভবিতব্য বিনি"। " নাও আমার কেষ্ট ঠাকুর, বলি একটু রান্নাঘর থেকে নিজের খাবারটা রাঁধুনীর কাছে চেয়ে আনতে কি খুব কষ্ট হয় খোকা "? না পিসি এমনিই,মনে নেই ,আচ্ছা কালকে নেবখন। "বুঝেছি খাবারটা ফেলে এদিক সেদিক চলে যেও না যেন তাহলে কাকে খাবে,খেয়ে তবে যেও কেমন ",। রান্না ঘরের এক কোনে ওর নিরামিষ রান্নার মাসী রোজের মত আজও মুগ ডালের ঘন্ট, পাট শাক,উচ্ছে বেগুন রেধেছে তাই পরম সোয়াদের বিনির কাছে এই মেয়েটাই প্রকৃত ওর রান্নার পরম দায় গ্রহণ করেছে বলে মিতা বৌঠান গল্পে মত্ত, ছেলেমেয়েরা কেউ ফষ্টি নষ্টিতে কেউ খেলায় কেউ নতুন পরিচয়ে ইত্যাদি। বরের সাজগোজ শুরু হল,নতুন ধূতি,পাঞ্জাবি,মালা,চন্দন,টোপরে ইয়া বর্ লাগছে ঋককে। সঙ্গে নিতবর দিদির পুচকেটা। সেও কমতি নয় সেয়ানে সেয়ানে পাল্লা দিয়ে সাজানো হয়েছে ওকেও। কোনদিনই খুব একটা বেশি সাজগোজে অভ্যস্ত নয় অতসী, দেরাজ খুলে সমস্ত দামী শাড়িগুলো খাটের ওপর বিছিয়ে দিল তারপর একে একে সবকটা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে আয়নার দিকে তাকায় অতসী, মেরুণ বেনারসী,নীল সিফন , গয়নায় দারুণ জমকালো নববধূ সেই পুরোনো দিনগুলো যেন মূর্ত হয়ে নিমেষে রোমাঞ্চ ছড়ায় ঘরজুড়ে পেছন থেকে জাপটে ধরে মৃগাঙ্ক, "না এসে আর পারলাম না জানো,উফ্ কি হেব্বি লাগছে তোমায় যে.....ও দিদুন এদিকে একটু এস না দ্যাখোনা ধুঁতির খুটটা খুলে মেঝেতে লোটাচ্ছে যে, চোখে মুখে অস্থিরতা ঋক্ শিশুর মত কান্না করে দিদুনকে প্রায় টেনে ঘরে নিয়ে আসে।

( ক্রমশঃ)
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৫৭৫ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ০৮/০১/২০১৯

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast