নীরব ভাঙন
সব ভাঙন শব্দ করে না।
কিছু ভাঙন এতটাই নীরব, যে মানুষ প্রথমে বুঝতেই পারে না—ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। কোনো দরজা আছড়ে পড়ে না, কোনো কাচ চূর্ণবিচূর্ণ হয় না, কারও চিৎকার শোনা যায় না। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাকই মনে হয়। কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক যেমন পুরনো দেওয়ালের ভেতরে জমে থাকা আর্দ্রতা—চোখে পড়ে না, অথচ একদিন পুরো দেওয়ালটাই দুর্বল হয়ে যায়।
ঋদ্ধিমা সেন সেই ফাটলটা প্রথম টের পায়নি।
সেদিনও ছিল একেবারে সাধারণ একটা দুপুর। কলকাতার আকাশে তখন হালকা রোদ, বাতাসে শীতের শেষ গন্ধ। ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে কফির কাপটা দু’হাতে ধরে ছিল। কাপের উষ্ণতা তালু ছুঁয়ে শরীরটা একটু আরাম পেলেও, মনের ভেতর কোথাও একটা ঠান্ডা জমে ছিল।
বারান্দা থেকে নীচে তাকালে দেখা যায়—ট্রাফিকে আটকে থাকা বাস, হর্নের বিরক্তিকর শব্দ, রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষ। দূরে ট্রেন ছুটে যাচ্ছে। প্রত্যেকেরই কোথাও পৌঁছনোর তাড়া। শুধু ঋদ্ধিমার যেন কোনো গন্তব্য নেই।
ফোনটা পাশের টেবিলে রাখা ছিল। স্ক্রিনটা হঠাৎ জ্বলে উঠতেই তার চোখ সেদিকে চলে যায়। অগ্নিভ চট্টোপাধ্যায়।
নামটা দেখেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়। ভালো লাগা আর অনিশ্চয়তা—দু’টো একসঙ্গে।
সে ফোনটা হাতে নেয়। কিছু লিখবে বলে।
“কেমন আছ?”
এই দু’টো শব্দই তো। অথচ আঙুল এগোয় না। স্ক্রিনের সাদা বাক্সটা ফাঁকা পড়ে থাকে। ঋদ্ধিমা জানে, এই সময়ে অগ্নিভ ব্যস্ত থাকতে পারে। অফিস, মিটিং, কল—সব মিলিয়ে তার সময় নেই। এই জানাটাই যেন তাকে থামিয়ে দেয়।
শেষ পর্যন্ত সে ফোনটা উল্টে রাখে।
এই থেমে যাওয়াটাই সমস্যা—ঋদ্ধিমা তখনও বুঝতে পারেনি।
ভালোবাসা তার কাছে বরাবরই ছিল একটু নীরব, একটু সংযত। সে বিশ্বাস করত, বেশি বলা মানেই দুর্বলতা। বেশি চাওয়া মানেই ঝামেলা। তাই সে চুপ করে থাকতে শিখেছিল। সম্পর্কের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটাকেই সে ভালোবাসা ভেবে নিয়েছিল।
অগ্নিভের সঙ্গে তার সম্পর্কও এমনই ছিল—ধীরে গড়ে ওঠা, শব্দহীন।
কলেজের দিনগুলোতে সবকিছু কত সহজ ছিল।
সকালবেলা কলেজের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা। লাইব্রেরির সেই নির্দিষ্ট কোণায় পাশাপাশি বসে পড়া। মাঝে মাঝে পড়া বন্ধ রেখে জানালার বাইরে তাকানো। ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা—কোনো তাড়া নেই, কোনো হিসেব নেই।
সেই সময় ভালোবাসা মানে ছিল—সহজ থাকা।
কেউ কাউকে প্রমাণ করতে চাইত না। কেউ কারও কাছে অতিরিক্ত কিছু চাইত না। তারা দু’জনেই নিজেদের মতো ছিল, তবু একসঙ্গে।
কিন্তু সময় বদলায়।
কলেজ শেষ হয়। বন্ধুত্বগুলো ছড়িয়ে পড়ে। আর শুরু হয় জীবনের সেই অধ্যায়, যেখানে মানুষকে প্রতিদিন নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়।
অগ্নিভ ঢুকে পড়ে চাকরির দুনিয়ায়। নতুন দায়িত্ব, নতুন চাপ, নতুন প্রত্যাশা। সে ব্যস্ত হয়ে ওঠে—প্রথমে ধীরে, তারপর পুরোপুরি।
ঋদ্ধিমা তখনও নিজের জায়গা খুঁজছে। অনিশ্চয়তা তাকে একটু বেশি সংবেদনশীল করে তোলে। অগ্নিভই তখন তার একমাত্র নিরাপদ জায়গা।
কিন্তু নিরাপত্তা সবসময় দু’দিক থেকে আসে না।
প্রথমে ছোট ছোট পরিবর্তন।
একদিন ফোন কম আসতে শুরু করে।
একদিন দেখা না হওয়াটা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
একদিন “আজ খুব ক্লান্ত” কথাটার আর কোনো প্রশ্ন থাকে না।
ঋদ্ধিমা এসব লক্ষ করত, কিন্তু কিছু বলত না।
সে ভাবত—অগ্নিভ পরিশ্রম করছে। সে চায় না তার কারণে অগ্নিভের উপর বাড়তি চাপ পড়ুক। ভালোবাসা মানে তো বুঝে নেওয়া, তাই না?
এই বুঝে নেওয়ার মধ্যেই সে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে ফেলছিল।
অগ্নিভ বুঝতে পারেনি।
তার কাছে সম্পর্ক মানে ছিল—পাশে থাকা, দায়িত্ব নেওয়া। কথা বলাটা তার কাছে অত জরুরি ছিল না। সে ভাবত, ঝগড়া নেই মানেই সব ঠিক আছে।
কিন্তু ঝগড়া না থাকাটা সবসময় শান্তির লক্ষণ নয়।
অনেক সময় সেটা ক্লান্তির চিহ্ন।
ঋদ্ধিমা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। কিন্তু সে কাঁদত না। চোখ ভিজে গেলেও সে সেটা নিজের ভেতরেই রেখে দিত। কারও সামনে দুর্বল হতে তার ভয় লাগত। বিশেষ করে অগ্নিভের সামনে।
সে ভাবত—যদি সে তার কষ্টের কথা বলে, অগ্নিভ যদি বিরক্ত হয়? যদি মনে করে সে বেশি চায়? যদি দূরে সরে যায়?
এই ভয়টাই তাকে চুপ করিয়ে রেখেছিল।
একদিন চুপ থাকতে থাকতে চুপটাই তার অভ্যাস হয়ে যায়।
এই অভ্যাসের মধ্যেই নীরব ভাঙন শুরু হয়।
একটা unanswered call।
একটা দেখা না হওয়া উইকএন্ড।
একটা “পরে কথা বলব”।
ছোট ছোট ঘটনাগুলো আলাদা করে দেখলে কিছুই না। কিন্তু একসঙ্গে হলে তারা ভারী হয়ে ওঠে।
ঋদ্ধিমা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে—সব আগের মতো নেই।
সে আর আগের মতো অগ্নিভের কাছে নিজের কথা বলতে পারে না। অগ্নিভও আর আগের মতো জানতে চায় না।
এই না বলা, না চাওয়া, না শোনার মধ্যেই সম্পর্কের ভিত নরম হয়ে যাচ্ছিল।
সেদিন দুপুরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ঋদ্ধিমা এইসবই ভাবছিল। বাতাসে চুল উড়ছিল, কিন্তু সে টের পাচ্ছিল না। তার চোখ ছিল দূরের ট্রেনটার দিকে—যেটা ছুটে যাচ্ছিল নিজের লাইনে।
হঠাৎ তার মনে হলো—সে কি কোথাও আটকে আছে?
ফোনটা আবার হাতে নিল সে। এবার অগ্নিভের নামটা আর ঝলমল করছিল না। স্ক্রিন নিভে গেছে। এক অদ্ভুত শূন্যতা ছেয়ে যায়।
ঋদ্ধিমা বুঝতে পারে—এই শূন্যতা হঠাৎ আসেনি।
এটা তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে।
এই অধ্যায়ে কোনো বিদায় নেই। কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেই। শুধু একটা অনুভূতি—যেটা ঠিক শব্দে ধরা যায় না।
এটাই নীরব ভাঙন।
ভাঙনের শব্দ শোনা যায় না।
কিন্তু তার প্রতিধ্বনি থেকে যায় অনেকদিন।
ঋদ্ধিমা কখন প্রথম বুঝেছিল, সে আর আগের মতো নেই—ঠিক মনে করতে পারে না। কোনো নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট ঘটনা ছিল না। বরং একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে টের পেয়েছিল, বুকের ভেতর আর সেই হালকা উত্তেজনাটা নেই। অগ্নিভের মেসেজ আসবে—এই অপেক্ষাটাও যেন ক্লান্তিকর লাগছিল।
একসময় সে অগ্নিভের ফোন এলেই আলাদা করে খুশি হতো। কাজের মাঝেও মুখে হাসি ফুটে উঠত। এখন ফোন বেজে উঠলে প্রথম অনুভূতি হয়—কথা বলার শক্তি আছে তো?
এই পরিবর্তনটা তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল।
সে ভাবত, “আমি কি বদলে যাচ্ছি?”
নাকি সম্পর্কটাই বদলে গেছে?
এক সন্ধ্যায় অগ্নিভ ফোন করেছিল। খুব স্বাভাবিক কথা। অফিসের চাপ, বসের বিরক্তি, ট্রাফিকের ঝামেলা। ঋদ্ধিমা চুপ করে শুনছিল। মাঝে মাঝে “হুম”, “আচ্ছা” বলছিল। অগ্নিভ থামল না। কথা বলতে বলতে হঠাৎ বলল,
“তুমি কিছু বলছ না কেন?”
ঋদ্ধিমা তখন কী বলবে, বুঝে উঠতে পারেনি। তার মনে অনেক কথা ছিল—আজ সারাদিন কেমন কেটেছে, বুকের ভেতরের চাপ, একা লাগার অনুভূতি। কিন্তু সে বলল,
“কিছু না। শুনছি।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর ঋদ্ধিমা অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে ধরে বসে ছিল। এই “কিছু না”-র মধ্যেই সে কত কিছু লুকিয়ে ফেলছে, সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছিল।
সে ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। মনে হতো, এগুলো বলার মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। অগ্নিভ তো এমনিতেই চাপের মধ্যে আছে। তার উপর নিজের মন খারাপ চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়।
এই ভাবনাটা তাকে ভেতর থেকে ক্ষয় করতে শুরু করে।
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকেই প্রশ্ন করেছিল—
“আমি শেষ কবে মন খুলে হেসেছি?”
উত্তরটা মনে পড়েনি।
অগ্নিভ meanwhile ধরে নিয়েছিল—সব ঠিক আছে। ঋদ্ধিমা কোনো অভিযোগ করছে না, ঝগড়া করছে না, অতিরিক্ত কিছু চাইছে না। তার চোখে এই সম্পর্ক ছিল স্থিতিশীল। সে বুঝতেই পারেনি, এই স্থিরতা আসলে এক ধরনের জমাট বাঁধা নীরবতা।
ভালোবাসা নিয়ে তাদের ধারণা আলাদা হয়ে যাচ্ছিল।
ঋদ্ধিমার কাছে ভালোবাসা মানে ছিল—কথা বলা, শোনা, বোঝা।
অগ্নিভের কাছে ভালোবাসা মানে ছিল—থাকা, দায়িত্ব নেওয়া, ছেড়ে না যাওয়া।
এই দুই ধারণার ফাঁকে তৈরি হচ্ছিল ফাঁকা জায়গা।
রাতে শুয়ে শুয়ে ঋদ্ধিমার ঘুম আসত না। অগ্নিভের বলা কথাগুলো মনে পড়ত, আবার না বলা কথাগুলো আরও জোরে মাথার ভেতর বাজত। সে ভাবত—
“আমি যদি একদিন সব বলে ফেলি?”
আবার পরমুহূর্তেই নিজেকে থামাত—
“না, দরকার নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
এই “সব ঠিক হয়ে যাবে”—এই আশাটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল।
কারণ কিছু জিনিস নিজে থেকে ঠিক হয় না।
কিছু ভাঙন যত্ন না নিলে ধীরে ধীরে গভীর হয়।
ঋদ্ধিমা তখনও জানত না, সে ইতিমধ্যেই এক ধরনের মানসিক দূরত্বের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। যেখানে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না, কিন্তু নিজের কষ্টটা ক্রমশ ভারী হয়ে ওঠে।
নীরব ভাঙন ঠিক এইভাবেই কাজ করে।
কোনো ঘোষণা দেয় না।
কোনো সতর্ক ঘণ্টা বাজায় না।
শুধু একদিন হঠাৎ মনে করিয়ে দেয়—
কিছু একটা ভেঙে গেছে,
যেটা আর আগের মতো নেই।
শেয়ার করুন
সব ভাঙন শব্দ করে না।
কিছু ভাঙন এতটাই নীরব, যে মানুষ প্রথমে বুঝতেই পারে না—ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। কোনো দরজা আছড়ে পড়ে না, কোনো কাচ চূর্ণবিচূর্ণ হয় না, কারও চিৎকার শোনা যায় না। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাকই মনে হয়। কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক যেমন পুরনো দেওয়ালের ভেতরে জমে থাকা আর্দ্রতা—চোখে পড়ে না, অথচ একদিন পুরো দেওয়ালটাই দুর্বল হয়ে যায়।
ঋদ্ধিমা সেন সেই ফাটলটা প্রথম টের পায়নি।
সেদিনও ছিল একেবারে সাধারণ একটা দুপুর। কলকাতার আকাশে তখন হালকা রোদ, বাতাসে শীতের শেষ গন্ধ। ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে কফির কাপটা দু’হাতে ধরে ছিল। কাপের উষ্ণতা তালু ছুঁয়ে শরীরটা একটু আরাম পেলেও, মনের ভেতর কোথাও একটা ঠান্ডা জমে ছিল।
বারান্দা থেকে নীচে তাকালে দেখা যায়—ট্রাফিকে আটকে থাকা বাস, হর্নের বিরক্তিকর শব্দ, রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষ। দূরে ট্রেন ছুটে যাচ্ছে। প্রত্যেকেরই কোথাও পৌঁছনোর তাড়া। শুধু ঋদ্ধিমার যেন কোনো গন্তব্য নেই।
ফোনটা পাশের টেবিলে রাখা ছিল। স্ক্রিনটা হঠাৎ জ্বলে উঠতেই তার চোখ সেদিকে চলে যায়। অগ্নিভ চট্টোপাধ্যায়।
নামটা দেখেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়। ভালো লাগা আর অনিশ্চয়তা—দু’টো একসঙ্গে।
সে ফোনটা হাতে নেয়। কিছু লিখবে বলে।
“কেমন আছ?”
এই দু’টো শব্দই তো। অথচ আঙুল এগোয় না। স্ক্রিনের সাদা বাক্সটা ফাঁকা পড়ে থাকে। ঋদ্ধিমা জানে, এই সময়ে অগ্নিভ ব্যস্ত থাকতে পারে। অফিস, মিটিং, কল—সব মিলিয়ে তার সময় নেই। এই জানাটাই যেন তাকে থামিয়ে দেয়।
শেষ পর্যন্ত সে ফোনটা উল্টে রাখে।
এই থেমে যাওয়াটাই সমস্যা—ঋদ্ধিমা তখনও বুঝতে পারেনি।
ভালোবাসা তার কাছে বরাবরই ছিল একটু নীরব, একটু সংযত। সে বিশ্বাস করত, বেশি বলা মানেই দুর্বলতা। বেশি চাওয়া মানেই ঝামেলা। তাই সে চুপ করে থাকতে শিখেছিল। সম্পর্কের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটাকেই সে ভালোবাসা ভেবে নিয়েছিল।
অগ্নিভের সঙ্গে তার সম্পর্কও এমনই ছিল—ধীরে গড়ে ওঠা, শব্দহীন।
কলেজের দিনগুলোতে সবকিছু কত সহজ ছিল।
সকালবেলা কলেজের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা। লাইব্রেরির সেই নির্দিষ্ট কোণায় পাশাপাশি বসে পড়া। মাঝে মাঝে পড়া বন্ধ রেখে জানালার বাইরে তাকানো। ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা—কোনো তাড়া নেই, কোনো হিসেব নেই।
সেই সময় ভালোবাসা মানে ছিল—সহজ থাকা।
কেউ কাউকে প্রমাণ করতে চাইত না। কেউ কারও কাছে অতিরিক্ত কিছু চাইত না। তারা দু’জনেই নিজেদের মতো ছিল, তবু একসঙ্গে।
কিন্তু সময় বদলায়।
কলেজ শেষ হয়। বন্ধুত্বগুলো ছড়িয়ে পড়ে। আর শুরু হয় জীবনের সেই অধ্যায়, যেখানে মানুষকে প্রতিদিন নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়।
অগ্নিভ ঢুকে পড়ে চাকরির দুনিয়ায়। নতুন দায়িত্ব, নতুন চাপ, নতুন প্রত্যাশা। সে ব্যস্ত হয়ে ওঠে—প্রথমে ধীরে, তারপর পুরোপুরি।
ঋদ্ধিমা তখনও নিজের জায়গা খুঁজছে। অনিশ্চয়তা তাকে একটু বেশি সংবেদনশীল করে তোলে। অগ্নিভই তখন তার একমাত্র নিরাপদ জায়গা।
কিন্তু নিরাপত্তা সবসময় দু’দিক থেকে আসে না।
প্রথমে ছোট ছোট পরিবর্তন।
একদিন ফোন কম আসতে শুরু করে।
একদিন দেখা না হওয়াটা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
একদিন “আজ খুব ক্লান্ত” কথাটার আর কোনো প্রশ্ন থাকে না।
ঋদ্ধিমা এসব লক্ষ করত, কিন্তু কিছু বলত না।
সে ভাবত—অগ্নিভ পরিশ্রম করছে। সে চায় না তার কারণে অগ্নিভের উপর বাড়তি চাপ পড়ুক। ভালোবাসা মানে তো বুঝে নেওয়া, তাই না?
এই বুঝে নেওয়ার মধ্যেই সে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে ফেলছিল।
অগ্নিভ বুঝতে পারেনি।
তার কাছে সম্পর্ক মানে ছিল—পাশে থাকা, দায়িত্ব নেওয়া। কথা বলাটা তার কাছে অত জরুরি ছিল না। সে ভাবত, ঝগড়া নেই মানেই সব ঠিক আছে।
কিন্তু ঝগড়া না থাকাটা সবসময় শান্তির লক্ষণ নয়।
অনেক সময় সেটা ক্লান্তির চিহ্ন।
ঋদ্ধিমা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। কিন্তু সে কাঁদত না। চোখ ভিজে গেলেও সে সেটা নিজের ভেতরেই রেখে দিত। কারও সামনে দুর্বল হতে তার ভয় লাগত। বিশেষ করে অগ্নিভের সামনে।
সে ভাবত—যদি সে তার কষ্টের কথা বলে, অগ্নিভ যদি বিরক্ত হয়? যদি মনে করে সে বেশি চায়? যদি দূরে সরে যায়?
এই ভয়টাই তাকে চুপ করিয়ে রেখেছিল।
একদিন চুপ থাকতে থাকতে চুপটাই তার অভ্যাস হয়ে যায়।
এই অভ্যাসের মধ্যেই নীরব ভাঙন শুরু হয়।
একটা unanswered call।
একটা দেখা না হওয়া উইকএন্ড।
একটা “পরে কথা বলব”।
ছোট ছোট ঘটনাগুলো আলাদা করে দেখলে কিছুই না। কিন্তু একসঙ্গে হলে তারা ভারী হয়ে ওঠে।
ঋদ্ধিমা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে—সব আগের মতো নেই।
সে আর আগের মতো অগ্নিভের কাছে নিজের কথা বলতে পারে না। অগ্নিভও আর আগের মতো জানতে চায় না।
এই না বলা, না চাওয়া, না শোনার মধ্যেই সম্পর্কের ভিত নরম হয়ে যাচ্ছিল।
সেদিন দুপুরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ঋদ্ধিমা এইসবই ভাবছিল। বাতাসে চুল উড়ছিল, কিন্তু সে টের পাচ্ছিল না। তার চোখ ছিল দূরের ট্রেনটার দিকে—যেটা ছুটে যাচ্ছিল নিজের লাইনে।
হঠাৎ তার মনে হলো—সে কি কোথাও আটকে আছে?
ফোনটা আবার হাতে নিল সে। এবার অগ্নিভের নামটা আর ঝলমল করছিল না। স্ক্রিন নিভে গেছে। এক অদ্ভুত শূন্যতা ছেয়ে যায়।
ঋদ্ধিমা বুঝতে পারে—এই শূন্যতা হঠাৎ আসেনি।
এটা তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে।
এই অধ্যায়ে কোনো বিদায় নেই। কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেই। শুধু একটা অনুভূতি—যেটা ঠিক শব্দে ধরা যায় না।
এটাই নীরব ভাঙন।
ভাঙনের শব্দ শোনা যায় না।
কিন্তু তার প্রতিধ্বনি থেকে যায় অনেকদিন।
ঋদ্ধিমা কখন প্রথম বুঝেছিল, সে আর আগের মতো নেই—ঠিক মনে করতে পারে না। কোনো নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট ঘটনা ছিল না। বরং একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে টের পেয়েছিল, বুকের ভেতর আর সেই হালকা উত্তেজনাটা নেই। অগ্নিভের মেসেজ আসবে—এই অপেক্ষাটাও যেন ক্লান্তিকর লাগছিল।
একসময় সে অগ্নিভের ফোন এলেই আলাদা করে খুশি হতো। কাজের মাঝেও মুখে হাসি ফুটে উঠত। এখন ফোন বেজে উঠলে প্রথম অনুভূতি হয়—কথা বলার শক্তি আছে তো?
এই পরিবর্তনটা তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল।
সে ভাবত, “আমি কি বদলে যাচ্ছি?”
নাকি সম্পর্কটাই বদলে গেছে?
এক সন্ধ্যায় অগ্নিভ ফোন করেছিল। খুব স্বাভাবিক কথা। অফিসের চাপ, বসের বিরক্তি, ট্রাফিকের ঝামেলা। ঋদ্ধিমা চুপ করে শুনছিল। মাঝে মাঝে “হুম”, “আচ্ছা” বলছিল। অগ্নিভ থামল না। কথা বলতে বলতে হঠাৎ বলল,
“তুমি কিছু বলছ না কেন?”
ঋদ্ধিমা তখন কী বলবে, বুঝে উঠতে পারেনি। তার মনে অনেক কথা ছিল—আজ সারাদিন কেমন কেটেছে, বুকের ভেতরের চাপ, একা লাগার অনুভূতি। কিন্তু সে বলল,
“কিছু না। শুনছি।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর ঋদ্ধিমা অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে ধরে বসে ছিল। এই “কিছু না”-র মধ্যেই সে কত কিছু লুকিয়ে ফেলছে, সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছিল।
সে ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। মনে হতো, এগুলো বলার মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। অগ্নিভ তো এমনিতেই চাপের মধ্যে আছে। তার উপর নিজের মন খারাপ চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়।
এই ভাবনাটা তাকে ভেতর থেকে ক্ষয় করতে শুরু করে।
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকেই প্রশ্ন করেছিল—
“আমি শেষ কবে মন খুলে হেসেছি?”
উত্তরটা মনে পড়েনি।
অগ্নিভ ধরে নিয়েছিল—সব ঠিক আছে। ঋদ্ধিমা কোনো অভিযোগ করছে না, ঝগড়া করছে না, অতিরিক্ত কিছু চাইছে না। তার চোখে এই সম্পর্ক ছিল স্থিতিশীল। সে বুঝতেই পারেনি, এই স্থিরতা আসলে এক ধরনের জমাট বাঁধা নীরবতা।
ভালোবাসা নিয়ে তাদের ধারণা আলাদা হয়ে যাচ্ছিল।
ঋদ্ধিমার কাছে ভালোবাসা মানে ছিল—কথা বলা, শোনা, বোঝা।
অগ্নিভের কাছে ভালোবাসা মানে ছিল—থাকা, দায়িত্ব নেওয়া, ছেড়ে না যাওয়া।
এই দুই ধারণার ফাঁকে তৈরি হচ্ছিল ফাঁকা জায়গা।
রাতে শুয়ে শুয়ে ঋদ্ধিমার ঘুম আসত না। অগ্নিভের বলা কথাগুলো মনে পড়ত, আবার না বলা কথাগুলো আরও জোরে মাথার ভেতর বাজত। সে ভাবত—
“আমি যদি একদিন সব বলে ফেলি?”
আবার পরমুহূর্তেই নিজেকে থামাত—
“না, দরকার নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
এই “সব ঠিক হয়ে যাবে”—এই আশাটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল।
কারণ কিছু জিনিস নিজে থেকে ঠিক হয় না।
কিছু ভাঙন যত্ন না নিলে ধীরে ধীরে গভীর হয়।
ঋদ্ধিমা তখনও জানত না, সে ইতিমধ্যেই এক ধরনের মানসিক দূরত্বের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। যেখানে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না, কিন্তু নিজের কষ্টটা ক্রমশ ভারী হয়ে ওঠে।
নীরব ভাঙন ঠিক এইভাবেই কাজ করে।
কোনো ঘোষণা দেয় না।
কোনো সতর্ক ঘণ্টা বাজায় না।
শুধু একদিন হঠাৎ মনে করিয়ে দেয়—
কিছু একটা ভেঙে গেছে,
যেটা আর আগের মতো নেই।
শেয়ার করুন
কিছু ভাঙন এতটাই নীরব, যে মানুষ প্রথমে বুঝতেই পারে না—ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। কোনো দরজা আছড়ে পড়ে না, কোনো কাচ চূর্ণবিচূর্ণ হয় না, কারও চিৎকার শোনা যায় না। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাকই মনে হয়। কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক যেমন পুরনো দেওয়ালের ভেতরে জমে থাকা আর্দ্রতা—চোখে পড়ে না, অথচ একদিন পুরো দেওয়ালটাই দুর্বল হয়ে যায়।
ঋদ্ধিমা সেন সেই ফাটলটা প্রথম টের পায়নি।
সেদিনও ছিল একেবারে সাধারণ একটা দুপুর। কলকাতার আকাশে তখন হালকা রোদ, বাতাসে শীতের শেষ গন্ধ। ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে কফির কাপটা দু’হাতে ধরে ছিল। কাপের উষ্ণতা তালু ছুঁয়ে শরীরটা একটু আরাম পেলেও, মনের ভেতর কোথাও একটা ঠান্ডা জমে ছিল।
বারান্দা থেকে নীচে তাকালে দেখা যায়—ট্রাফিকে আটকে থাকা বাস, হর্নের বিরক্তিকর শব্দ, রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষ। দূরে ট্রেন ছুটে যাচ্ছে। প্রত্যেকেরই কোথাও পৌঁছনোর তাড়া। শুধু ঋদ্ধিমার যেন কোনো গন্তব্য নেই।
ফোনটা পাশের টেবিলে রাখা ছিল। স্ক্রিনটা হঠাৎ জ্বলে উঠতেই তার চোখ সেদিকে চলে যায়। অগ্নিভ চট্টোপাধ্যায়।
নামটা দেখেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়। ভালো লাগা আর অনিশ্চয়তা—দু’টো একসঙ্গে।
সে ফোনটা হাতে নেয়। কিছু লিখবে বলে।
“কেমন আছ?”
এই দু’টো শব্দই তো। অথচ আঙুল এগোয় না। স্ক্রিনের সাদা বাক্সটা ফাঁকা পড়ে থাকে। ঋদ্ধিমা জানে, এই সময়ে অগ্নিভ ব্যস্ত থাকতে পারে। অফিস, মিটিং, কল—সব মিলিয়ে তার সময় নেই। এই জানাটাই যেন তাকে থামিয়ে দেয়।
শেষ পর্যন্ত সে ফোনটা উল্টে রাখে।
এই থেমে যাওয়াটাই সমস্যা—ঋদ্ধিমা তখনও বুঝতে পারেনি।
ভালোবাসা তার কাছে বরাবরই ছিল একটু নীরব, একটু সংযত। সে বিশ্বাস করত, বেশি বলা মানেই দুর্বলতা। বেশি চাওয়া মানেই ঝামেলা। তাই সে চুপ করে থাকতে শিখেছিল। সম্পর্কের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটাকেই সে ভালোবাসা ভেবে নিয়েছিল।
অগ্নিভের সঙ্গে তার সম্পর্কও এমনই ছিল—ধীরে গড়ে ওঠা, শব্দহীন।
কলেজের দিনগুলোতে সবকিছু কত সহজ ছিল।
সকালবেলা কলেজের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা। লাইব্রেরির সেই নির্দিষ্ট কোণায় পাশাপাশি বসে পড়া। মাঝে মাঝে পড়া বন্ধ রেখে জানালার বাইরে তাকানো। ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা—কোনো তাড়া নেই, কোনো হিসেব নেই।
সেই সময় ভালোবাসা মানে ছিল—সহজ থাকা।
কেউ কাউকে প্রমাণ করতে চাইত না। কেউ কারও কাছে অতিরিক্ত কিছু চাইত না। তারা দু’জনেই নিজেদের মতো ছিল, তবু একসঙ্গে।
কিন্তু সময় বদলায়।
কলেজ শেষ হয়। বন্ধুত্বগুলো ছড়িয়ে পড়ে। আর শুরু হয় জীবনের সেই অধ্যায়, যেখানে মানুষকে প্রতিদিন নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়।
অগ্নিভ ঢুকে পড়ে চাকরির দুনিয়ায়। নতুন দায়িত্ব, নতুন চাপ, নতুন প্রত্যাশা। সে ব্যস্ত হয়ে ওঠে—প্রথমে ধীরে, তারপর পুরোপুরি।
ঋদ্ধিমা তখনও নিজের জায়গা খুঁজছে। অনিশ্চয়তা তাকে একটু বেশি সংবেদনশীল করে তোলে। অগ্নিভই তখন তার একমাত্র নিরাপদ জায়গা।
কিন্তু নিরাপত্তা সবসময় দু’দিক থেকে আসে না।
প্রথমে ছোট ছোট পরিবর্তন।
একদিন ফোন কম আসতে শুরু করে।
একদিন দেখা না হওয়াটা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
একদিন “আজ খুব ক্লান্ত” কথাটার আর কোনো প্রশ্ন থাকে না।
ঋদ্ধিমা এসব লক্ষ করত, কিন্তু কিছু বলত না।
সে ভাবত—অগ্নিভ পরিশ্রম করছে। সে চায় না তার কারণে অগ্নিভের উপর বাড়তি চাপ পড়ুক। ভালোবাসা মানে তো বুঝে নেওয়া, তাই না?
এই বুঝে নেওয়ার মধ্যেই সে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে ফেলছিল।
অগ্নিভ বুঝতে পারেনি।
তার কাছে সম্পর্ক মানে ছিল—পাশে থাকা, দায়িত্ব নেওয়া। কথা বলাটা তার কাছে অত জরুরি ছিল না। সে ভাবত, ঝগড়া নেই মানেই সব ঠিক আছে।
কিন্তু ঝগড়া না থাকাটা সবসময় শান্তির লক্ষণ নয়।
অনেক সময় সেটা ক্লান্তির চিহ্ন।
ঋদ্ধিমা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। কিন্তু সে কাঁদত না। চোখ ভিজে গেলেও সে সেটা নিজের ভেতরেই রেখে দিত। কারও সামনে দুর্বল হতে তার ভয় লাগত। বিশেষ করে অগ্নিভের সামনে।
সে ভাবত—যদি সে তার কষ্টের কথা বলে, অগ্নিভ যদি বিরক্ত হয়? যদি মনে করে সে বেশি চায়? যদি দূরে সরে যায়?
এই ভয়টাই তাকে চুপ করিয়ে রেখেছিল।
একদিন চুপ থাকতে থাকতে চুপটাই তার অভ্যাস হয়ে যায়।
এই অভ্যাসের মধ্যেই নীরব ভাঙন শুরু হয়।
একটা unanswered call।
একটা দেখা না হওয়া উইকএন্ড।
একটা “পরে কথা বলব”।
ছোট ছোট ঘটনাগুলো আলাদা করে দেখলে কিছুই না। কিন্তু একসঙ্গে হলে তারা ভারী হয়ে ওঠে।
ঋদ্ধিমা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে—সব আগের মতো নেই।
সে আর আগের মতো অগ্নিভের কাছে নিজের কথা বলতে পারে না। অগ্নিভও আর আগের মতো জানতে চায় না।
এই না বলা, না চাওয়া, না শোনার মধ্যেই সম্পর্কের ভিত নরম হয়ে যাচ্ছিল।
সেদিন দুপুরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ঋদ্ধিমা এইসবই ভাবছিল। বাতাসে চুল উড়ছিল, কিন্তু সে টের পাচ্ছিল না। তার চোখ ছিল দূরের ট্রেনটার দিকে—যেটা ছুটে যাচ্ছিল নিজের লাইনে।
হঠাৎ তার মনে হলো—সে কি কোথাও আটকে আছে?
ফোনটা আবার হাতে নিল সে। এবার অগ্নিভের নামটা আর ঝলমল করছিল না। স্ক্রিন নিভে গেছে। এক অদ্ভুত শূন্যতা ছেয়ে যায়।
ঋদ্ধিমা বুঝতে পারে—এই শূন্যতা হঠাৎ আসেনি।
এটা তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে।
এই অধ্যায়ে কোনো বিদায় নেই। কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেই। শুধু একটা অনুভূতি—যেটা ঠিক শব্দে ধরা যায় না।
এটাই নীরব ভাঙন।
ভাঙনের শব্দ শোনা যায় না।
কিন্তু তার প্রতিধ্বনি থেকে যায় অনেকদিন।
ঋদ্ধিমা কখন প্রথম বুঝেছিল, সে আর আগের মতো নেই—ঠিক মনে করতে পারে না। কোনো নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট ঘটনা ছিল না। বরং একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে টের পেয়েছিল, বুকের ভেতর আর সেই হালকা উত্তেজনাটা নেই। অগ্নিভের মেসেজ আসবে—এই অপেক্ষাটাও যেন ক্লান্তিকর লাগছিল।
একসময় সে অগ্নিভের ফোন এলেই আলাদা করে খুশি হতো। কাজের মাঝেও মুখে হাসি ফুটে উঠত। এখন ফোন বেজে উঠলে প্রথম অনুভূতি হয়—কথা বলার শক্তি আছে তো?
এই পরিবর্তনটা তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল।
সে ভাবত, “আমি কি বদলে যাচ্ছি?”
নাকি সম্পর্কটাই বদলে গেছে?
এক সন্ধ্যায় অগ্নিভ ফোন করেছিল। খুব স্বাভাবিক কথা। অফিসের চাপ, বসের বিরক্তি, ট্রাফিকের ঝামেলা। ঋদ্ধিমা চুপ করে শুনছিল। মাঝে মাঝে “হুম”, “আচ্ছা” বলছিল। অগ্নিভ থামল না। কথা বলতে বলতে হঠাৎ বলল,
“তুমি কিছু বলছ না কেন?”
ঋদ্ধিমা তখন কী বলবে, বুঝে উঠতে পারেনি। তার মনে অনেক কথা ছিল—আজ সারাদিন কেমন কেটেছে, বুকের ভেতরের চাপ, একা লাগার অনুভূতি। কিন্তু সে বলল,
“কিছু না। শুনছি।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর ঋদ্ধিমা অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে ধরে বসে ছিল। এই “কিছু না”-র মধ্যেই সে কত কিছু লুকিয়ে ফেলছে, সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছিল।
সে ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। মনে হতো, এগুলো বলার মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। অগ্নিভ তো এমনিতেই চাপের মধ্যে আছে। তার উপর নিজের মন খারাপ চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়।
এই ভাবনাটা তাকে ভেতর থেকে ক্ষয় করতে শুরু করে।
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকেই প্রশ্ন করেছিল—
“আমি শেষ কবে মন খুলে হেসেছি?”
উত্তরটা মনে পড়েনি।
অগ্নিভ meanwhile ধরে নিয়েছিল—সব ঠিক আছে। ঋদ্ধিমা কোনো অভিযোগ করছে না, ঝগড়া করছে না, অতিরিক্ত কিছু চাইছে না। তার চোখে এই সম্পর্ক ছিল স্থিতিশীল। সে বুঝতেই পারেনি, এই স্থিরতা আসলে এক ধরনের জমাট বাঁধা নীরবতা।
ভালোবাসা নিয়ে তাদের ধারণা আলাদা হয়ে যাচ্ছিল।
ঋদ্ধিমার কাছে ভালোবাসা মানে ছিল—কথা বলা, শোনা, বোঝা।
অগ্নিভের কাছে ভালোবাসা মানে ছিল—থাকা, দায়িত্ব নেওয়া, ছেড়ে না যাওয়া।
এই দুই ধারণার ফাঁকে তৈরি হচ্ছিল ফাঁকা জায়গা।
রাতে শুয়ে শুয়ে ঋদ্ধিমার ঘুম আসত না। অগ্নিভের বলা কথাগুলো মনে পড়ত, আবার না বলা কথাগুলো আরও জোরে মাথার ভেতর বাজত। সে ভাবত—
“আমি যদি একদিন সব বলে ফেলি?”
আবার পরমুহূর্তেই নিজেকে থামাত—
“না, দরকার নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
এই “সব ঠিক হয়ে যাবে”—এই আশাটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল।
কারণ কিছু জিনিস নিজে থেকে ঠিক হয় না।
কিছু ভাঙন যত্ন না নিলে ধীরে ধীরে গভীর হয়।
ঋদ্ধিমা তখনও জানত না, সে ইতিমধ্যেই এক ধরনের মানসিক দূরত্বের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। যেখানে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না, কিন্তু নিজের কষ্টটা ক্রমশ ভারী হয়ে ওঠে।
নীরব ভাঙন ঠিক এইভাবেই কাজ করে।
কোনো ঘোষণা দেয় না।
কোনো সতর্ক ঘণ্টা বাজায় না।
শুধু একদিন হঠাৎ মনে করিয়ে দেয়—
কিছু একটা ভেঙে গেছে,
যেটা আর আগের মতো নেই।
শেয়ার করুন
সব ভাঙন শব্দ করে না।
কিছু ভাঙন এতটাই নীরব, যে মানুষ প্রথমে বুঝতেই পারে না—ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। কোনো দরজা আছড়ে পড়ে না, কোনো কাচ চূর্ণবিচূর্ণ হয় না, কারও চিৎকার শোনা যায় না। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাকই মনে হয়। কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক যেমন পুরনো দেওয়ালের ভেতরে জমে থাকা আর্দ্রতা—চোখে পড়ে না, অথচ একদিন পুরো দেওয়ালটাই দুর্বল হয়ে যায়।
ঋদ্ধিমা সেন সেই ফাটলটা প্রথম টের পায়নি।
সেদিনও ছিল একেবারে সাধারণ একটা দুপুর। কলকাতার আকাশে তখন হালকা রোদ, বাতাসে শীতের শেষ গন্ধ। ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে কফির কাপটা দু’হাতে ধরে ছিল। কাপের উষ্ণতা তালু ছুঁয়ে শরীরটা একটু আরাম পেলেও, মনের ভেতর কোথাও একটা ঠান্ডা জমে ছিল।
বারান্দা থেকে নীচে তাকালে দেখা যায়—ট্রাফিকে আটকে থাকা বাস, হর্নের বিরক্তিকর শব্দ, রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষ। দূরে ট্রেন ছুটে যাচ্ছে। প্রত্যেকেরই কোথাও পৌঁছনোর তাড়া। শুধু ঋদ্ধিমার যেন কোনো গন্তব্য নেই।
ফোনটা পাশের টেবিলে রাখা ছিল। স্ক্রিনটা হঠাৎ জ্বলে উঠতেই তার চোখ সেদিকে চলে যায়। অগ্নিভ চট্টোপাধ্যায়।
নামটা দেখেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়। ভালো লাগা আর অনিশ্চয়তা—দু’টো একসঙ্গে।
সে ফোনটা হাতে নেয়। কিছু লিখবে বলে।
“কেমন আছ?”
এই দু’টো শব্দই তো। অথচ আঙুল এগোয় না। স্ক্রিনের সাদা বাক্সটা ফাঁকা পড়ে থাকে। ঋদ্ধিমা জানে, এই সময়ে অগ্নিভ ব্যস্ত থাকতে পারে। অফিস, মিটিং, কল—সব মিলিয়ে তার সময় নেই। এই জানাটাই যেন তাকে থামিয়ে দেয়।
শেষ পর্যন্ত সে ফোনটা উল্টে রাখে।
এই থেমে যাওয়াটাই সমস্যা—ঋদ্ধিমা তখনও বুঝতে পারেনি।
ভালোবাসা তার কাছে বরাবরই ছিল একটু নীরব, একটু সংযত। সে বিশ্বাস করত, বেশি বলা মানেই দুর্বলতা। বেশি চাওয়া মানেই ঝামেলা। তাই সে চুপ করে থাকতে শিখেছিল। সম্পর্কের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটাকেই সে ভালোবাসা ভেবে নিয়েছিল।
অগ্নিভের সঙ্গে তার সম্পর্কও এমনই ছিল—ধীরে গড়ে ওঠা, শব্দহীন।
কলেজের দিনগুলোতে সবকিছু কত সহজ ছিল।
সকালবেলা কলেজের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা। লাইব্রেরির সেই নির্দিষ্ট কোণায় পাশাপাশি বসে পড়া। মাঝে মাঝে পড়া বন্ধ রেখে জানালার বাইরে তাকানো। ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা—কোনো তাড়া নেই, কোনো হিসেব নেই।
সেই সময় ভালোবাসা মানে ছিল—সহজ থাকা।
কেউ কাউকে প্রমাণ করতে চাইত না। কেউ কারও কাছে অতিরিক্ত কিছু চাইত না। তারা দু’জনেই নিজেদের মতো ছিল, তবু একসঙ্গে।
কিন্তু সময় বদলায়।
কলেজ শেষ হয়। বন্ধুত্বগুলো ছড়িয়ে পড়ে। আর শুরু হয় জীবনের সেই অধ্যায়, যেখানে মানুষকে প্রতিদিন নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়।
অগ্নিভ ঢুকে পড়ে চাকরির দুনিয়ায়। নতুন দায়িত্ব, নতুন চাপ, নতুন প্রত্যাশা। সে ব্যস্ত হয়ে ওঠে—প্রথমে ধীরে, তারপর পুরোপুরি।
ঋদ্ধিমা তখনও নিজের জায়গা খুঁজছে। অনিশ্চয়তা তাকে একটু বেশি সংবেদনশীল করে তোলে। অগ্নিভই তখন তার একমাত্র নিরাপদ জায়গা।
কিন্তু নিরাপত্তা সবসময় দু’দিক থেকে আসে না।
প্রথমে ছোট ছোট পরিবর্তন।
একদিন ফোন কম আসতে শুরু করে।
একদিন দেখা না হওয়াটা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
একদিন “আজ খুব ক্লান্ত” কথাটার আর কোনো প্রশ্ন থাকে না।
ঋদ্ধিমা এসব লক্ষ করত, কিন্তু কিছু বলত না।
সে ভাবত—অগ্নিভ পরিশ্রম করছে। সে চায় না তার কারণে অগ্নিভের উপর বাড়তি চাপ পড়ুক। ভালোবাসা মানে তো বুঝে নেওয়া, তাই না?
এই বুঝে নেওয়ার মধ্যেই সে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে ফেলছিল।
অগ্নিভ বুঝতে পারেনি।
তার কাছে সম্পর্ক মানে ছিল—পাশে থাকা, দায়িত্ব নেওয়া। কথা বলাটা তার কাছে অত জরুরি ছিল না। সে ভাবত, ঝগড়া নেই মানেই সব ঠিক আছে।
কিন্তু ঝগড়া না থাকাটা সবসময় শান্তির লক্ষণ নয়।
অনেক সময় সেটা ক্লান্তির চিহ্ন।
ঋদ্ধিমা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। কিন্তু সে কাঁদত না। চোখ ভিজে গেলেও সে সেটা নিজের ভেতরেই রেখে দিত। কারও সামনে দুর্বল হতে তার ভয় লাগত। বিশেষ করে অগ্নিভের সামনে।
সে ভাবত—যদি সে তার কষ্টের কথা বলে, অগ্নিভ যদি বিরক্ত হয়? যদি মনে করে সে বেশি চায়? যদি দূরে সরে যায়?
এই ভয়টাই তাকে চুপ করিয়ে রেখেছিল।
একদিন চুপ থাকতে থাকতে চুপটাই তার অভ্যাস হয়ে যায়।
এই অভ্যাসের মধ্যেই নীরব ভাঙন শুরু হয়।
একটা unanswered call।
একটা দেখা না হওয়া উইকএন্ড।
একটা “পরে কথা বলব”।
ছোট ছোট ঘটনাগুলো আলাদা করে দেখলে কিছুই না। কিন্তু একসঙ্গে হলে তারা ভারী হয়ে ওঠে।
ঋদ্ধিমা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে—সব আগের মতো নেই।
সে আর আগের মতো অগ্নিভের কাছে নিজের কথা বলতে পারে না। অগ্নিভও আর আগের মতো জানতে চায় না।
এই না বলা, না চাওয়া, না শোনার মধ্যেই সম্পর্কের ভিত নরম হয়ে যাচ্ছিল।
সেদিন দুপুরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ঋদ্ধিমা এইসবই ভাবছিল। বাতাসে চুল উড়ছিল, কিন্তু সে টের পাচ্ছিল না। তার চোখ ছিল দূরের ট্রেনটার দিকে—যেটা ছুটে যাচ্ছিল নিজের লাইনে।
হঠাৎ তার মনে হলো—সে কি কোথাও আটকে আছে?
ফোনটা আবার হাতে নিল সে। এবার অগ্নিভের নামটা আর ঝলমল করছিল না। স্ক্রিন নিভে গেছে। এক অদ্ভুত শূন্যতা ছেয়ে যায়।
ঋদ্ধিমা বুঝতে পারে—এই শূন্যতা হঠাৎ আসেনি।
এটা তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে।
এই অধ্যায়ে কোনো বিদায় নেই। কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেই। শুধু একটা অনুভূতি—যেটা ঠিক শব্দে ধরা যায় না।
এটাই নীরব ভাঙন।
ভাঙনের শব্দ শোনা যায় না।
কিন্তু তার প্রতিধ্বনি থেকে যায় অনেকদিন।
ঋদ্ধিমা কখন প্রথম বুঝেছিল, সে আর আগের মতো নেই—ঠিক মনে করতে পারে না। কোনো নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট ঘটনা ছিল না। বরং একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে টের পেয়েছিল, বুকের ভেতর আর সেই হালকা উত্তেজনাটা নেই। অগ্নিভের মেসেজ আসবে—এই অপেক্ষাটাও যেন ক্লান্তিকর লাগছিল।
একসময় সে অগ্নিভের ফোন এলেই আলাদা করে খুশি হতো। কাজের মাঝেও মুখে হাসি ফুটে উঠত। এখন ফোন বেজে উঠলে প্রথম অনুভূতি হয়—কথা বলার শক্তি আছে তো?
এই পরিবর্তনটা তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল।
সে ভাবত, “আমি কি বদলে যাচ্ছি?”
নাকি সম্পর্কটাই বদলে গেছে?
এক সন্ধ্যায় অগ্নিভ ফোন করেছিল। খুব স্বাভাবিক কথা। অফিসের চাপ, বসের বিরক্তি, ট্রাফিকের ঝামেলা। ঋদ্ধিমা চুপ করে শুনছিল। মাঝে মাঝে “হুম”, “আচ্ছা” বলছিল। অগ্নিভ থামল না। কথা বলতে বলতে হঠাৎ বলল,
“তুমি কিছু বলছ না কেন?”
ঋদ্ধিমা তখন কী বলবে, বুঝে উঠতে পারেনি। তার মনে অনেক কথা ছিল—আজ সারাদিন কেমন কেটেছে, বুকের ভেতরের চাপ, একা লাগার অনুভূতি। কিন্তু সে বলল,
“কিছু না। শুনছি।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর ঋদ্ধিমা অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে ধরে বসে ছিল। এই “কিছু না”-র মধ্যেই সে কত কিছু লুকিয়ে ফেলছে, সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছিল।
সে ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। মনে হতো, এগুলো বলার মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। অগ্নিভ তো এমনিতেই চাপের মধ্যে আছে। তার উপর নিজের মন খারাপ চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়।
এই ভাবনাটা তাকে ভেতর থেকে ক্ষয় করতে শুরু করে।
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকেই প্রশ্ন করেছিল—
“আমি শেষ কবে মন খুলে হেসেছি?”
উত্তরটা মনে পড়েনি।
অগ্নিভ ধরে নিয়েছিল—সব ঠিক আছে। ঋদ্ধিমা কোনো অভিযোগ করছে না, ঝগড়া করছে না, অতিরিক্ত কিছু চাইছে না। তার চোখে এই সম্পর্ক ছিল স্থিতিশীল। সে বুঝতেই পারেনি, এই স্থিরতা আসলে এক ধরনের জমাট বাঁধা নীরবতা।
ভালোবাসা নিয়ে তাদের ধারণা আলাদা হয়ে যাচ্ছিল।
ঋদ্ধিমার কাছে ভালোবাসা মানে ছিল—কথা বলা, শোনা, বোঝা।
অগ্নিভের কাছে ভালোবাসা মানে ছিল—থাকা, দায়িত্ব নেওয়া, ছেড়ে না যাওয়া।
এই দুই ধারণার ফাঁকে তৈরি হচ্ছিল ফাঁকা জায়গা।
রাতে শুয়ে শুয়ে ঋদ্ধিমার ঘুম আসত না। অগ্নিভের বলা কথাগুলো মনে পড়ত, আবার না বলা কথাগুলো আরও জোরে মাথার ভেতর বাজত। সে ভাবত—
“আমি যদি একদিন সব বলে ফেলি?”
আবার পরমুহূর্তেই নিজেকে থামাত—
“না, দরকার নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
এই “সব ঠিক হয়ে যাবে”—এই আশাটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল।
কারণ কিছু জিনিস নিজে থেকে ঠিক হয় না।
কিছু ভাঙন যত্ন না নিলে ধীরে ধীরে গভীর হয়।
ঋদ্ধিমা তখনও জানত না, সে ইতিমধ্যেই এক ধরনের মানসিক দূরত্বের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। যেখানে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না, কিন্তু নিজের কষ্টটা ক্রমশ ভারী হয়ে ওঠে।
নীরব ভাঙন ঠিক এইভাবেই কাজ করে।
কোনো ঘোষণা দেয় না।
কোনো সতর্ক ঘণ্টা বাজায় না।
শুধু একদিন হঠাৎ মনে করিয়ে দেয়—
কিছু একটা ভেঙে গেছে,
যেটা আর আগের মতো নেই।
শেয়ার করুন
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
অর্ঘ্যদীপ চক্রবর্তী ০৩/০৩/২০২৬ভালো
