নিজের সাথে যুদ্ধ
রাত তিনটে বাজে। অর্ণব বসে আছে তার ছোট্ট ঘরের এককোণে, হাঁটুতে মুখ গুঁজে। বাইরে বৃষ্টি নামছে — অবিরাম, নিষ্ঠুর, যেন আকাশও কাঁদছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে। ঘরের একমাত্র বাল্বটা মিটমিট করছে, আলো-আঁধারির খেলা চলছে দেয়ালে।
টেবিলের উপর একটা চিঠি পড়ে আছে। তাতে লেখা আছে মাত্র কয়েকটা শব্দ — "তোমাকে আর দরকার নেই।" অফিসের লেটারহেড। সাত বছরের চাকরি শেষ।
অর্ণব আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। আয়নার সামনে গেল। আয়নায় যাকে দেখল, তাকে সে চিনতে পারল না। চোখের নিচে কালো দাগ, গালে কয়েকদিনের না-কামানো দাড়ি, আর চোখ দুটো — যেন নিভে যাওয়া দুটো প্রদীপ।
"তুমি কে?" সে আয়নায় জিজ্ঞেস করল নিজেকে।
আয়নার মানুষটা কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
অর্ণবের বয়স তেত্রিশ। এই বয়সে মানুষ সংসার পাতে, সন্তানের মুখ দেখে, জীবনের একটা ছন্দ তৈরি করে। কিন্তু অর্ণবের জীবনে ছন্দ কখনো ছিল না। বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়। মা একা হাতে মানুষ করেছেন। পড়াশোনায় ভালো ছিল — কিন্তু সেই "ভালো" কখনো "সেরা" হয়নি। চাকরি পেয়েছিল কষ্ট করে, ধরে রেখেছিল আরও কষ্ট করে।
আর এখন? সব শেষ।
ঘরের কোণে রাখা গিটারটার দিকে চোখ গেল। বছর পাঁচেক আগে কিনেছিল। স্বপ্ন ছিল — একদিন গান লিখবে। সুর করবে। কিন্তু অফিস, ক্লান্তি, আর অজুহাতের স্তূপে গিটারটা চাপা পড়ে গেছে। এখন তার গায়ে পাতলা ধুলোর আস্তর।
অর্ণব গিটারটা তুলে নিল। একটা তার ছেঁড়া। বাকি তারগুলোও বেসুরো।
ঠিক তার মতোই।
পরদিন সকালে ফোন বাজল। মায়ের নম্বর।
"অর্ণব, কেমন আছিস?"
"ভালো, মা।" — মিথ্যাটা এত সহজে বেরিয়ে এল যে সে নিজেই চমকে গেল।
"রাতে ঘুমাসনি? গলা শুনে বুঝলাম।"
মা কীভাবে জানে? এই প্রশ্নটার উত্তর সে কোনোদিন বুঝতে পারেনি। মায়েদের একটা অদ্ভুত রাডার থাকে — সন্তানের কষ্ট তারা কণ্ঠস্বর থেকেও টের পায়।
"একটু ঘুম কম হয়েছে।"
"শোন," মা একটু থামলেন, "মনে আছে, তুই যখন ক্লাস নাইনে ফেল করেছিলি?"
অর্ণব চুপ করে রইল।
"সেদিন তুই বলেছিলি, 'মা, আমি আর পারব না।' আমি কী বলেছিলাম?"
"বলেছিলে — পারব না, এই কথাটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা।"
"মনে রেখেছিস।" মায়ের গলায় একটু হাসি।
ফোন রাখার পর অর্ণব অনেকক্ষণ বসে রইল। মায়ের কথাটা মাথায় ঘুরছিল।
তিনদিন কাটল। অর্ণব বাইরে বেরোয়নি। খাওয়া-দাওয়া অনিয়মিত। ঘরের মধ্যে পায়চারি করে, ভাবে, আবার বসে পড়ে।
মাথার ভেতরে দুটো কণ্ঠস্বর লড়াই করছিল অনবরত।
একটা বলছিল — তুমি ব্যর্থ। সাত বছর কাজ করলে, তবু ছাঁটাই হলে। মানে তোমার মধ্যে কোনো দম নেই। তুমি গিটারও বাজাতে পারো না, গানও লিখতে পারো না। তুমি আসলে কিছুই না।
আরেকটা কণ্ঠস্বর — ক্ষীণ, কিন্তু জীবন্ত — বলছিল — থামো। একটু থামো। শেষ হয়নি।
এই দুটো কণ্ঠস্বরের মাঝখানে বসে অর্ণব বুঝতে পারছিল, এটাই আসল যুদ্ধ। বাইরের কেউ তার শত্রু নয়। শত্রু ভেতরে — সেই অন্ধকার কণ্ঠটা, যে তাকে ছোট করে, হারিয়ে দিতে চায়।
চতুর্থ দিন সকালে অর্ণব উঠল। স্নান করল। পরিষ্কার জামা পরল। তারপর গিটারটা হাতে নিল।
গিটারের দোকানে গেল। ছেঁড়া তার বদলাল। নতুন তার লাগাল। দোকানদার বয়স্ক একজন মানুষ, মাথায় পাকা চুল, চোখে মোটা চশমা।
"কতদিন ধরে বাজাচ্ছেন না?" লোকটা জিজ্ঞেস করল, গিটারটা হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে।
"বছর পাঁচেক।"
"কেন?"
"সময় ছিল না।"
লোকটা মাথা নাড়ল। হাসল একটু। বলল, "সময় কারো থাকে না। সময় করতে হয়।"
সরল কথা। অথচ কানে লাগল।
ঘরে ফিরে অর্ণব গিটারটা বুকে চেপে বসল। প্রথমে আঙুলগুলো অচেনা লাগছিল — তারে চাপ দিতে গিয়ে ব্যথা পাচ্ছিল, সুর মিলছিল না। কিন্তু সে থামল না।
একটা কর্ড। তারপর আরেকটা।
বেসুরো। আবার চেষ্টা।
একটু কম বেসুরো। আবার।
ঘণ্টা দুয়েক পর, ক্লান্ত হাতে, লাল হয়ে যাওয়া আঙুলে, সে একটা চেনা সুর তুলতে পারল। ছোটবেলায় শেখা — রবীন্দ্রনাথের একটা গান।
চোখ বন্ধ হয়ে এল।
চোখের কোণ ভিজে উঠল।
কিন্তু এবার কান্নাটা আলাদা ছিল। এতে পরাজয়ের স্বাদ ছিল না।
সপ্তাহ খানেক পর অর্ণব একটা ডায়েরি কিনল। প্রতিদিন রাতে লিখতে শুরু করল — কী ভাবছে, কী অনুভব করছে, কোথায় হোঁচট খাচ্ছে। এটা কেউ পড়বে না, জানত সে। কিন্তু লেখার মধ্যে একটা মুক্তি আছে — যা মুখে বলা যায় না, তা কলমে বলা যায়।
একদিন লিখল:
"আজ বুঝলাম, আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা আমি নিজেই। আমি নিজেকে এত কম বিশ্বাস করি যে, হারার আগেই হেরে যাই। যখন অফিস থেকে ছাঁটাই করল, প্রথম যে কথাটা মাথায় এল — 'এটাই হওয়ার ছিল।' কেন? কেন আমি ধরেই নিলাম যে আমি এটার যোগ্য ছিলাম না? হয়তো ছাঁটাইটা আমার দোষ ছিল না। হয়তো এটা শুধু একটা পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু আমি সেই পরিস্থিতিকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেললাম।"
পৃষ্ঠাটা ভরে গেল। সে থামল না।
দুই মাস পর অর্ণব একটা ছোট কাজ পেল — একটা স্টার্টআপে কনটেন্ট লেখার কাজ। মাইনে কম। আগের চাকরির তুলনায় অনেক কম। কিন্তু সে রাজি হয়ে গেল।
সহকর্মীরা তরুণ — বয়সে তার চেয়ে ছোট। প্রথম দিন একটু অস্বস্তি হল। মনে হল — এত বড় হয়ে আমি এখানে?
কিন্তু সেই পুরনো কণ্ঠটা এবার আর এত জোরালো ছিল না। অর্ণব সচেতনভাবে তাকে থামিয়ে দিল।
না। তুলনা করব না। এটা পিছিয়ে পড়া না — এটা নতুন করে শুরু।
একদিন অফিসের ছাদে বসে সে গিটার বাজাচ্ছিল — লাঞ্চ ব্রেকে। একজন তরুণ সহকর্মী এসে বসল পাশে।
"আপনি গিটার বাজান? দারুণ তো!"
"শিখছি। আবার।"
"আবার মানে?"
"মানে আগেও শিখেছিলাম। তারপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন আবার শুরু করেছি।"
ছেলেটা একটু ভাবল। বলল, "আমিও আঁকতাম। ছেড়ে দিয়েছি। মনে হয় আর পারব না।"
অর্ণব তার দিকে তাকাল। বলল, "পারব না — এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা।"
মায়ের কথা। কিন্তু এখন তার নিজেরও।
রাতে অর্ণব আয়নার সামনে দাঁড়াল। সেই একই আয়না। সেই একই মানুষ — কিন্তু আলাদা।
চোখের নিচের কালো দাগ এখনো আছে। দাড়ি এখনো আছে — তবে এখন সেটা পরিপাটি। কিন্তু সবচেয়ে বড় পার্থক্য — চোখ দুটো।
নিভে যাওয়া প্রদীপ নয় আর। একটা ক্ষীণ, কিন্তু স্থির আলো।
"তুমি কে?" সে আবার জিজ্ঞেস করল।
এবার আয়নার মানুষটা উত্তর দিল — অন্তত ভেতর থেকে শুনতে পেল সে।
আমি অর্ণব। আমি হেরেছি। আমি ভেঙে পড়েছি। কিন্তু আমি থেমে যাইনি। আমি লড়াই করেছি — নিজের সাথে। আর এখনো করছি। প্রতিদিন।
যুদ্ধটা শেষ হয়নি। হয়তো কোনোদিন শেষ হবে না। মনের ভেতরের সেই অন্ধকার কণ্ঠটা মাঝে মাঝে এখনো উঁকি দেয় — দুর্বল মুহূর্তে, ক্লান্ত রাতে।
কিন্তু অর্ণব এখন জানে — যুদ্ধটা চেনাই আসল জয়। নিজের শত্রুকে চিনতে পারা, তার চোখে চোখ রাখতে পারা — এটাই সাহস।
বাইরের দুনিয়া তাকে অনেকবার বলেছে, "তুমি পারবে না।" কিন্তু সবচেয়ে বেশি সেই কথা সে শুনেছে নিজের কাছ থেকে।
সেই নিজেকেই এখন সে বলে — "চুপ। আমি পারব।"
আর সেটুকুই যথেষ্ট। আপাতত।
তিন মাস পর অর্ণব একটা গান লিখল। ছোট্ট গান — মাত্র দুটো স্তবক। কথাগুলো সাজানো-গোছানো নয়, সুরটাও পেশাদার নয়। কিন্তু সেটা তার নিজের — হাড়ে-মাংসে অনুভব করা কথা।
সে গানটা রেকর্ড করল ফোনে, রাত বারোটায়, ঘরের আলো নিভিয়ে। কাউকে পাঠাল না। শুধু একবার শুনল।
তারপর চোখ বুজে হাসল।
এই হাসি পুরস্কারের নয়, প্রশংসার নয়। এ হাসি শুধু নিজের জন্য — সেই মানুষটার জন্য, যে একসময় ভেবেছিল সে আর কিছুই পারবে না।
টেবিলের উপর একটা চিঠি পড়ে আছে। তাতে লেখা আছে মাত্র কয়েকটা শব্দ — "তোমাকে আর দরকার নেই।" অফিসের লেটারহেড। সাত বছরের চাকরি শেষ।
অর্ণব আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। আয়নার সামনে গেল। আয়নায় যাকে দেখল, তাকে সে চিনতে পারল না। চোখের নিচে কালো দাগ, গালে কয়েকদিনের না-কামানো দাড়ি, আর চোখ দুটো — যেন নিভে যাওয়া দুটো প্রদীপ।
"তুমি কে?" সে আয়নায় জিজ্ঞেস করল নিজেকে।
আয়নার মানুষটা কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
অর্ণবের বয়স তেত্রিশ। এই বয়সে মানুষ সংসার পাতে, সন্তানের মুখ দেখে, জীবনের একটা ছন্দ তৈরি করে। কিন্তু অর্ণবের জীবনে ছন্দ কখনো ছিল না। বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়। মা একা হাতে মানুষ করেছেন। পড়াশোনায় ভালো ছিল — কিন্তু সেই "ভালো" কখনো "সেরা" হয়নি। চাকরি পেয়েছিল কষ্ট করে, ধরে রেখেছিল আরও কষ্ট করে।
আর এখন? সব শেষ।
ঘরের কোণে রাখা গিটারটার দিকে চোখ গেল। বছর পাঁচেক আগে কিনেছিল। স্বপ্ন ছিল — একদিন গান লিখবে। সুর করবে। কিন্তু অফিস, ক্লান্তি, আর অজুহাতের স্তূপে গিটারটা চাপা পড়ে গেছে। এখন তার গায়ে পাতলা ধুলোর আস্তর।
অর্ণব গিটারটা তুলে নিল। একটা তার ছেঁড়া। বাকি তারগুলোও বেসুরো।
ঠিক তার মতোই।
পরদিন সকালে ফোন বাজল। মায়ের নম্বর।
"অর্ণব, কেমন আছিস?"
"ভালো, মা।" — মিথ্যাটা এত সহজে বেরিয়ে এল যে সে নিজেই চমকে গেল।
"রাতে ঘুমাসনি? গলা শুনে বুঝলাম।"
মা কীভাবে জানে? এই প্রশ্নটার উত্তর সে কোনোদিন বুঝতে পারেনি। মায়েদের একটা অদ্ভুত রাডার থাকে — সন্তানের কষ্ট তারা কণ্ঠস্বর থেকেও টের পায়।
"একটু ঘুম কম হয়েছে।"
"শোন," মা একটু থামলেন, "মনে আছে, তুই যখন ক্লাস নাইনে ফেল করেছিলি?"
অর্ণব চুপ করে রইল।
"সেদিন তুই বলেছিলি, 'মা, আমি আর পারব না।' আমি কী বলেছিলাম?"
"বলেছিলে — পারব না, এই কথাটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা।"
"মনে রেখেছিস।" মায়ের গলায় একটু হাসি।
ফোন রাখার পর অর্ণব অনেকক্ষণ বসে রইল। মায়ের কথাটা মাথায় ঘুরছিল।
তিনদিন কাটল। অর্ণব বাইরে বেরোয়নি। খাওয়া-দাওয়া অনিয়মিত। ঘরের মধ্যে পায়চারি করে, ভাবে, আবার বসে পড়ে।
মাথার ভেতরে দুটো কণ্ঠস্বর লড়াই করছিল অনবরত।
একটা বলছিল — তুমি ব্যর্থ। সাত বছর কাজ করলে, তবু ছাঁটাই হলে। মানে তোমার মধ্যে কোনো দম নেই। তুমি গিটারও বাজাতে পারো না, গানও লিখতে পারো না। তুমি আসলে কিছুই না।
আরেকটা কণ্ঠস্বর — ক্ষীণ, কিন্তু জীবন্ত — বলছিল — থামো। একটু থামো। শেষ হয়নি।
এই দুটো কণ্ঠস্বরের মাঝখানে বসে অর্ণব বুঝতে পারছিল, এটাই আসল যুদ্ধ। বাইরের কেউ তার শত্রু নয়। শত্রু ভেতরে — সেই অন্ধকার কণ্ঠটা, যে তাকে ছোট করে, হারিয়ে দিতে চায়।
চতুর্থ দিন সকালে অর্ণব উঠল। স্নান করল। পরিষ্কার জামা পরল। তারপর গিটারটা হাতে নিল।
গিটারের দোকানে গেল। ছেঁড়া তার বদলাল। নতুন তার লাগাল। দোকানদার বয়স্ক একজন মানুষ, মাথায় পাকা চুল, চোখে মোটা চশমা।
"কতদিন ধরে বাজাচ্ছেন না?" লোকটা জিজ্ঞেস করল, গিটারটা হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে।
"বছর পাঁচেক।"
"কেন?"
"সময় ছিল না।"
লোকটা মাথা নাড়ল। হাসল একটু। বলল, "সময় কারো থাকে না। সময় করতে হয়।"
সরল কথা। অথচ কানে লাগল।
ঘরে ফিরে অর্ণব গিটারটা বুকে চেপে বসল। প্রথমে আঙুলগুলো অচেনা লাগছিল — তারে চাপ দিতে গিয়ে ব্যথা পাচ্ছিল, সুর মিলছিল না। কিন্তু সে থামল না।
একটা কর্ড। তারপর আরেকটা।
বেসুরো। আবার চেষ্টা।
একটু কম বেসুরো। আবার।
ঘণ্টা দুয়েক পর, ক্লান্ত হাতে, লাল হয়ে যাওয়া আঙুলে, সে একটা চেনা সুর তুলতে পারল। ছোটবেলায় শেখা — রবীন্দ্রনাথের একটা গান।
চোখ বন্ধ হয়ে এল।
চোখের কোণ ভিজে উঠল।
কিন্তু এবার কান্নাটা আলাদা ছিল। এতে পরাজয়ের স্বাদ ছিল না।
সপ্তাহ খানেক পর অর্ণব একটা ডায়েরি কিনল। প্রতিদিন রাতে লিখতে শুরু করল — কী ভাবছে, কী অনুভব করছে, কোথায় হোঁচট খাচ্ছে। এটা কেউ পড়বে না, জানত সে। কিন্তু লেখার মধ্যে একটা মুক্তি আছে — যা মুখে বলা যায় না, তা কলমে বলা যায়।
একদিন লিখল:
"আজ বুঝলাম, আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা আমি নিজেই। আমি নিজেকে এত কম বিশ্বাস করি যে, হারার আগেই হেরে যাই। যখন অফিস থেকে ছাঁটাই করল, প্রথম যে কথাটা মাথায় এল — 'এটাই হওয়ার ছিল।' কেন? কেন আমি ধরেই নিলাম যে আমি এটার যোগ্য ছিলাম না? হয়তো ছাঁটাইটা আমার দোষ ছিল না। হয়তো এটা শুধু একটা পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু আমি সেই পরিস্থিতিকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেললাম।"
পৃষ্ঠাটা ভরে গেল। সে থামল না।
দুই মাস পর অর্ণব একটা ছোট কাজ পেল — একটা স্টার্টআপে কনটেন্ট লেখার কাজ। মাইনে কম। আগের চাকরির তুলনায় অনেক কম। কিন্তু সে রাজি হয়ে গেল।
সহকর্মীরা তরুণ — বয়সে তার চেয়ে ছোট। প্রথম দিন একটু অস্বস্তি হল। মনে হল — এত বড় হয়ে আমি এখানে?
কিন্তু সেই পুরনো কণ্ঠটা এবার আর এত জোরালো ছিল না। অর্ণব সচেতনভাবে তাকে থামিয়ে দিল।
না। তুলনা করব না। এটা পিছিয়ে পড়া না — এটা নতুন করে শুরু।
একদিন অফিসের ছাদে বসে সে গিটার বাজাচ্ছিল — লাঞ্চ ব্রেকে। একজন তরুণ সহকর্মী এসে বসল পাশে।
"আপনি গিটার বাজান? দারুণ তো!"
"শিখছি। আবার।"
"আবার মানে?"
"মানে আগেও শিখেছিলাম। তারপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন আবার শুরু করেছি।"
ছেলেটা একটু ভাবল। বলল, "আমিও আঁকতাম। ছেড়ে দিয়েছি। মনে হয় আর পারব না।"
অর্ণব তার দিকে তাকাল। বলল, "পারব না — এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা।"
মায়ের কথা। কিন্তু এখন তার নিজেরও।
রাতে অর্ণব আয়নার সামনে দাঁড়াল। সেই একই আয়না। সেই একই মানুষ — কিন্তু আলাদা।
চোখের নিচের কালো দাগ এখনো আছে। দাড়ি এখনো আছে — তবে এখন সেটা পরিপাটি। কিন্তু সবচেয়ে বড় পার্থক্য — চোখ দুটো।
নিভে যাওয়া প্রদীপ নয় আর। একটা ক্ষীণ, কিন্তু স্থির আলো।
"তুমি কে?" সে আবার জিজ্ঞেস করল।
এবার আয়নার মানুষটা উত্তর দিল — অন্তত ভেতর থেকে শুনতে পেল সে।
আমি অর্ণব। আমি হেরেছি। আমি ভেঙে পড়েছি। কিন্তু আমি থেমে যাইনি। আমি লড়াই করেছি — নিজের সাথে। আর এখনো করছি। প্রতিদিন।
যুদ্ধটা শেষ হয়নি। হয়তো কোনোদিন শেষ হবে না। মনের ভেতরের সেই অন্ধকার কণ্ঠটা মাঝে মাঝে এখনো উঁকি দেয় — দুর্বল মুহূর্তে, ক্লান্ত রাতে।
কিন্তু অর্ণব এখন জানে — যুদ্ধটা চেনাই আসল জয়। নিজের শত্রুকে চিনতে পারা, তার চোখে চোখ রাখতে পারা — এটাই সাহস।
বাইরের দুনিয়া তাকে অনেকবার বলেছে, "তুমি পারবে না।" কিন্তু সবচেয়ে বেশি সেই কথা সে শুনেছে নিজের কাছ থেকে।
সেই নিজেকেই এখন সে বলে — "চুপ। আমি পারব।"
আর সেটুকুই যথেষ্ট। আপাতত।
তিন মাস পর অর্ণব একটা গান লিখল। ছোট্ট গান — মাত্র দুটো স্তবক। কথাগুলো সাজানো-গোছানো নয়, সুরটাও পেশাদার নয়। কিন্তু সেটা তার নিজের — হাড়ে-মাংসে অনুভব করা কথা।
সে গানটা রেকর্ড করল ফোনে, রাত বারোটায়, ঘরের আলো নিভিয়ে। কাউকে পাঠাল না। শুধু একবার শুনল।
তারপর চোখ বুজে হাসল।
এই হাসি পুরস্কারের নয়, প্রশংসার নয়। এ হাসি শুধু নিজের জন্য — সেই মানুষটার জন্য, যে একসময় ভেবেছিল সে আর কিছুই পারবে না।
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
অর্ঘ্যদীপ চক্রবর্তী ০২/০৩/২০২৬বেশ ভালো লাগলো
