www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ফিরে দেখা

শীতের সকাল। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে ঘন কুয়াশার চাদর। রবিবারের ভোরবেলা এখানে একটা আলাদা নীরবতা থাকে। দোকানগুলো তখনও খোলেনি, কিন্তু রাস্তার ধারে ফুটপাতে সাজানো পুরানো বইয়ের স্তূপ যেন রাত জেগে অপেক্ষা করে থাকে—কোনো একজন সত্যিকারের পাঠকের জন্য।

অনির্বাণ চল্লিশ পেরিয়েছে কয়েক বছর আগে। পুলিশে চাকরি, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সল্টলেকে একটা ফ্ল্যাট, সপ্তাহান্তে মলে কেনাকাটা—একেবারে সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবন। কিন্তু রবিবারের সকালগুলো শুধুই তার। স্ত্রী অনন্যা জানে, এই দিনটায় তাকে ছাড়তে হবে। ছেলে শুভম কম্পিউটারের গেমে ব্যস্ত থাকবে। আর অনির্বাণ চলে যাবে তার সেই পুরানো পৃথিবীতে—কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায়।

আজ সকালেও সেই চেনা পথ। ট্রামের শব্দ, চায়ের দোকানের ধোঁয়া, আর বইয়ের গন্ধ। হ্যাঁ, পুরানো বইয়ের একটা আলাদা গন্ধ আছে। কাগজের পাতায় জমে থাকা সময়ের গন্ধ। অনির্বাণ গভীর শ্বাস নিয়ে সেই গন্ধ টেনে নেয়।

"আরে বাবু, আজ কি চাই?"

ফুটপাতের দোকানি রমেন কাকু। বছর ষাটেক বয়স হবে। এই ফুটপাতেই তাঁর সাম্রাজ্য—দুটো ভাঙা কাঠের বাক্সে সাজানো বই। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানেই বসেন।

"কিছু ভালো উপন্যাস পেলে..." অনির্বাণ বলে।

রমেন কাকু মুখ বিকৃত করে হাসেন। "উপন্যাস তো অনেক আছে। কিন্তু ভালো উপন্যাস কি সহজে মেলে? যে বই পড়লে মনটা কেঁদে ওঠে, বুকের ভেতরটা মুচড়ে যায়—সেই বই একশোটা বইয়ের মধ্যে একটা পাবেন কিনা।"

অনির্বাণ স্তূপের মধ্যে খুঁজতে শুরু করে। হাতে উঠে আসে একটার পর একটা বই। অচেনা লেখকের নাম, হলদে হয়ে যাওয়া প্রচ্ছদ, কোনো কোনোটায় আগের মালিকের নাম লেখা—সুব্রত মুখার্জি, ১৯৭৩; প্রণতি দেব, ১৯৬৫।

প্রতিটা পুরানো বই একটা গল্প। শুধু লেখকের গল্প নয়, যারা এই বই পড়েছেন, ভালোবেসেছেন, পাতায় দাগ দিয়েছেন, মার্জিনে নোট লিখেছেন—তাদেরও গল্প।

হঠাৎ একটা বই চোখে পড়ে অনির্বাণের। পাতলা, ছোট্ট একটা বই। প্রচ্ছদে শুধু একটা জানালা আঁকা, জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যার আকাশ। নাম—"ফিরে দেখা"। লেখক অমল সেনগুপ্ত। অচেনা নাম।

বইটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতেই ভেতরে একটা চিরকুট পড়ে যায়। হাতে লেখা—"প্রিয় ইন্দ্রনীল, তোমার ঊনিশতম জন্মদিনে এই বই উপহার দিলাম। জানি, আমাদের দুজনের মতো করে কেউ একাকীত্ব বোঝে না। এই বই পড়লে মনে হবে, লেখক আমাদের মনের কথাই লিখেছেন। ভালো থেকো। তোমার, অর্পিতা। ১৫ই মার্চ, ১৯৮৭।"

১৯৮৭। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে। ইন্দ্রনীল কোথায় এখন? অর্পিতাই বা কোথায়? তাদের জীবনে কী হয়েছে? এই বই কীভাবে এসে পৌঁছালো রমেন কাকুর স্তূপে?

"এই বইটা নেব," অনির্বাণ বলে।

"পনেরো টাকা," রমেন কাকু বলেন।

অনির্বাণ কুড়ি টাকা দিয়ে বাকিটা নিতে চায় না। এটা তাদের একটা অলিখিত চুক্তি। বই কেনার সাথে সাথে একটা দায়িত্বও কেনা—এই সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব।

বাড়ি ফিরে দুপুরে খাওয়ার পর অনির্বাণ বালকনিতে বসে বইটা পড়তে শুরু করে। প্রথম লাইন—"একাকীত্ব একটা শহর, যেখানে প্রতিটা মানুষ একটা দ্বীপ।"

গল্পটা সাধারণ। একজন মধ্যবয়সী মানুষ, যে জীবনে সব পেয়েছে কিন্তু কিছুই পায়নি। চাকরি, সংসার, সামাজিক মর্যাদা—সব আছে। কিন্তু নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে কোথাও। তারপর একদিন একটা পুরানো বইয়ের দোকানে গিয়ে খুঁজে পায় নিজের তারুণ্যের একটা ডায়েরি। সেই ডায়েরিতে লেখা তার স্বপ্ন, আবেগ, বিদ্রোহ—যা সে ভুলে গিয়েছিল।

অনির্বাণের বুক মুচড়ে ওঠে। এ যেন তারই গল্প। কত স্বপ্ন ছিল এক সময়—লেখক হবে, ভ্রমণ করবে, নিজের মতো করে বাঁচবে। কিন্তু কবে যে সব হারিয়ে গেল, টেরও পায়নি।

সন্ধ্যায় অনন্যা জিজ্ঞেস করে, "কী পড়ছ?"

"একটা পুরানো উপন্যাস," অনির্বাণ বলে। "অদ্ভুত ব্যাপার, মনে হচ্ছে এ আমারই গল্প।"

অনন্যা হাসে। "তুমি তো রবিবার মানেই বই পড়ো। এত বছরে তো হাজারখানেক বই পড়ে ফেলেছ।"

"হ্যাঁ, কিন্তু এই বইটা আলাদা।"

রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অনির্বাণ আবার সেই চিরকুটটা পড়ে। অর্পিতা আর ইন্দ্রনীল। তারা কারা? কোথায় তারা এখন?

পরের রবিবার আবার কলেজ স্ট্রিট। রমেন কাকুকে অনির্বাণ জিজ্ঞেস করে, "কাকু, গত সপ্তাহে যে বইটা কিনেছিলাম, 'ফিরে দেখা'—এই বই আপনি কোথায় পেলেন?"

রমেন কাকু ভাবেন। "অনেক বই আসে, মনে নেই। হয়তো কোনো পুরানো সংগ্রহ থেকে।"

"এই লেখক, অমল সেনগুপ্ত, এর বিষয়ে কিছু জানেন?"

"না তো। অচেনা নাম।"

অনির্বাণ আশেপাশের পুরানো বইয়ের দোকানে খোঁজ করে। কেউ চেনে না এই লেখককে। অবশেষে প্রেসিডেন্সি কলেজের কাছে একটা পুরানো লাইব্রেরিতে গিয়ে খোঁজ পায়। বয়স্ক লাইব্রেরিয়ান মশাই বলেন, "অমল সেনগুপ্ত? হ্যাঁ, মনে পড়ছে। সত্তর-আশির দশকে লিখতেন। খুব জনপ্রিয় ছিলেন না, কিন্তু যারা পড়তেন তারা পাগল ছিলেন তাঁর লেখায়। তারপর হঠাৎ হারিয়ে গেলেন। শোনা যায়, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন।"

"এখন তিনি..."

"জীবিত আছেন কিনা জানি না। অনেক বছর খবর নেই।"

অনির্বাণের মনে একটা তীব্র আগ্রহ জন্ম নেয়। সে ইন্টারনেটে খোঁজে, পুরানো সাহিত্য পত্রিকার আর্কাইভ ঘাঁটে। অবশেষে একটা ১৯৮৫ সালের সাক্ষাৎকার পায়। সেখানে অমল সেনগুপ্ত বলেছেন, "আমি লিখি একাকীদের জন্য। যারা ভিড়ের মধ্যেও একা, যাদের কথা কেউ বোঝে না—তাদের জন্য।"

সপ্তাহ কয়েক কেটে যায়। অনির্বাণ সেই বইটা বারবার পড়ে। প্রতিবার পড়ায় নতুন কিছু আবিষ্কার করে। লেখকের প্রতিটা শব্দে যেন তার নিজের অনুভূতি।

একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সে একটা সিদ্ধান্ত নেয়। পুরানো ডায়েরি বের করে, যেখানে কলেজের দিনগুলোয় কবিতা লিখত, গল্পের প্লট ভাবত। পাতা উল্টায়। কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা। কোথায় হারিয়ে গেল সব?

সেদিন রাতে অনন্যাকে বলে, "জানো, আমি একসময় লিখতে চেয়েছিলাম।"

অনন্যা চমকে ওঠে। "সত্যি? তুমি কখনো বলোনি।"

"ভুলে গিয়েছিলাম নিজেই। কিন্তু এই বই পড়ে মনে পড়ে গেল।"

"তাহলে এখন লেখো না। দেরি হয়ে যায়নি কিছু।"

অনির্বাণ হাসে। "এত বছর পর? সম্ভব?"

"চেষ্টা তো করতে পারো।"

সেই রাত থেকে অনির্বাণ আবার লিখতে শুরু করে। প্রথমে ছোট ছোট টুকরো, তারপর একটা গল্প। গল্পটা একজন মানুষের যে পুরানো বইয়ের দোকানে নিজেকে খুঁজে পায়।

আরও কয়েক মাস কাটে। একদিন কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে অনির্বাণ দেখে রমেন কাকু নেই। অন্য একজন বসে আছে।

"কাকু কোথায়?"

"হাসপাতালে ভর্তি। খুব অসুস্থ।"

অনির্বাণের বুক ধড়াস করে ওঠে। পরদিন হাসপাতালে যায়। রমেন কাকু শয্যায় শুয়ে, দুর্বল।

"বাবু, তুমি?" রমেন কাকুর চোখে জল।

"আপনাকে ছাড়া কলেজ স্ট্রিট অসম্পূর্ণ কাকু।"

"আমার দিন শেষ বাবু। কিন্তু বই থাকবে। বই কখনো মরে না। আর তোমার মতো পাঠক থাকলে আমাদের এই সংস্কৃতিও বেঁচে থাকবে।"

রমেন কাকু সুস্থ হয়ে ফিরলেও আগের মতো বসতে পারেন না। তাঁর জায়গায় এখন তাঁর নাতি বসে।

অনির্বাণ তার গল্পটা শেষ করে একটা সাহিত্য পত্রিকায় পাঠায়। আশ্চর্যজনকভাবে, ছাপা হয়। ছোট্ট একটা গল্প, কিন্তু কয়েকজন পাঠক চিঠি লেখেন—"আপনার গল্প পড়ে মনে হলো আমারই কথা লিখেছেন।"

অনির্বাণ বুঝতে পারে, পুরানো বইয়ের দোকান শুধু বই বেচাকেনার জায়গা নয়। এ একটা সেতু—অতীত আর বর্তমানের, স্বপ্ন আর বাস্তবের, হারিয়ে যাওয়া আর ফিরে পাওয়ার।

সেই চিরকুটটা এখনও আছে তার কাছে। অর্পিতা আর ইন্দ্রনীল কোথায় জানে না, কিন্তু তাদের ভালোবাসা, তাদের একাকীত্ব, তাদের খোঁজ—সব বেঁচে আছে একটা পুরানো বইয়ের পাতায়।

আর প্রতি রবিবার সকালে, কুয়াশার চাদর মাড়িয়ে, অনির্বাণ এখনও যায় কলেজ স্ট্রিটে। শুধু বই কিনতে নয়, নিজেকে খুঁজতে। কারণ পুরানো বইয়ের দোকানে শুধু বই বেচাকেনা হয় না—বেচাকেনা হয় সময়, স্মৃতি, আর হারিয়ে যাওয়া নিজেকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১১৮ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২১/০২/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast