www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ডিলিটেড চ্যাট

নীলগিরি পাহাড়ের কোল ঘেঁষা ছোট শহরটায় যখন ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে, তখন নীল রঙের স্মার্টফোনটার স্ক্রিনটাই ছিল অর্কর একমাত্র পৃথিবী। কিন্তু আজ সেই পৃথিবীটা একদম ফাঁকা। ইনবক্সে গিয়ে উপর-নিচ স্ক্রল করল সে, কিন্তু কোথাও সেই পরিচিত নামটা নেই। 'অনন্যা'। শুধু নামটাই মুছে যায়নি, মুছে গেছে গত তিন বছরের জমানো কয়েক হাজার টেক্সট, অডিও ক্লিপ আর ঝাপসা হয়ে আসা কিছু ভিডিও কল লগ।
সবকিছু 'ডিলিট' করে দেওয়া যতটা সহজ, ভুলে যাওয়া কি ততটাই?
অর্ক আর অনন্যার পরিচয়টা হয়েছিল একটা ভুল গ্রুপের মাধ্যমে। অর্ক ছিল একটু শান্ত স্বভাবের, বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকা ছেলে। আর অনন্যা ছিল ঠিক তার উল্টো— চঞ্চল, প্রাণবন্ত এবং শব্দ দিয়ে ছবি আঁকতে পারদর্শী। তাদের কথোপকথন শুরু হয়েছিল তর্কের মাধ্যমে, যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর বন্ধুত্বে।
তাদের চ্যাটবক্সটা ছিল একটা জাদুর বাক্সের মতো। সেখানে কখনো থাকত রাত তিনটের কফি খাওয়ার আবদার, কখনো বা বৃষ্টির দিনে রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা। অনন্যা লিখত, "অর্ক, জানিস আজ আকাশটা ঠিক তোর গায়ের শার্টটার মতো নীল।" অর্ক হাসত, টাইপ করত— "পাগলী, আকাশ তো সবসময়ই নীল।"
এই ছোট ছোট কথাগুলোই ছিল তাদের সম্পর্কের অক্সিজেন। তারা একে অপরের মুখ দেখেনি অনেকদিন, কিন্তু একে অপরের টাইপিং স্পিড দেখে বুঝে যেত কার মন খারাপ।
সম্পর্কের বয়স যখন দুই বছর পার হলো, তখন কেন যেন অদৃশ্য এক দেয়াল তৈরি হতে শুরু করল। অর্কর কর্পোরেট জীবনের ব্যস্ততা আর অনন্যার উচ্চশিক্ষার চাপ— মাঝখানে দূরত্ব বাড়িয়ে দিল।
চ্যাটবক্সে এখন আর আগের মতো দীর্ঘ মেসেজ আসে না।
• অর্ক: হাই, খেয়েছ?
• অনন্যা: হ্যাঁ। তুমি?
• অর্ক: হুম।
ব্যস, এইটুকুই। একসময়ের অন্তহীন কথাগুলো এখন ছোট ছোট 'হুম', 'ওকে', 'আচ্ছা'-তে এসে থমকে গেল। ভুল বোঝাবুঝির পাহাড় জমতে শুরু করল। অনন্যা অভিযোগ করত অর্ক সময় দেয় না, আর অর্ক ভাবত অনন্যা বড্ড বেশি অধিকার সচেতন।
শেষ ঝগড়াটা হয়েছিল গত মঙ্গলবার। অনন্যা একটা দীর্ঘ মেসেজ পাঠিয়েছিল, যাতে লেখা ছিল— "হয়তো আমরা একে অপরের জন্য সঠিক নই অর্ক। এই রেশ টেনে ধরার চেয়ে ছেড়ে দেওয়া ভালো।" অর্ক রাগের মাথায় রিপ্লাই দিয়েছিল, "ঠিক আছে, তাই হোক।"
তারপরই সে করে বসল সেই কাজটা। চ্যাটবক্সের ওপরে থ্রি-ডট মেনুতে গিয়ে ক্লিক করল— 'Delete Chat'। ফোনের স্ক্রিনে পপ-আপ উঠল: 'Are you sure you want to delete this conversation?' অর্ক এক মুহূর্ত না ভেবে 'Yes' বাটনে চাপ দিল।


চ্যাট ডিলিট করার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অর্কর মনে হয়েছিল সে খুব বড় একটা বোঝা নামিয়ে ফেলেছে। কোনো পিছুটান নেই, কোনো মেসেজের অপেক্ষা নেই। কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে ঘরটা যেন আরও নিঝুম হয়ে এল।
অভ্যাসবশত সে ফোনটা হাতে নিল। বুড়ো আঙুলটা আপনাআপনি চলে গেল হোয়াটসঅ্যাপের আইকনে। কিন্তু সেখানে অনন্যার সেই চিরচেনা ডিপি (Display Picture) আর নেই। চ্যাট লিস্টে অনন্যার জায়গাটা এখন দখল করে নিয়েছে অফিসের বোরিং সব গ্রুপ।
অর্ক অনুভব করল, সে শুধু কিছু টেক্সট ডিলিট করেনি, সে ডিলিট করে দিয়েছে গত এক হাজার দিনের স্মৃতি। তার মনে পড়ল, একবার সে খুব অসুস্থ ছিল, তখন অনন্যা সারারাত জেগে তাকে চ্যাটে গল্প শুনিয়েছিল। সেই মেসেজগুলো এখন কোথায়? মহাকাশের কোনো এক ব্ল্যাক হোলে কি সেগুলো হারিয়ে গেল?
সে পাগলের মতো ক্লাউড ব্যাকআপ খুঁজতে লাগল। কিন্তু বিধি বাম, সে নিজেই তো গত সপ্তাহে অটো-ব্যাকআপ বন্ধ করে রেখেছিল।
পরের কয়েকদিন অর্ক এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে কাটাল। সে রাস্তা দিয়ে হাঁটে, আর তার মনে পড়ে অনন্যার কোনো এক মেসেজের কথা। কোনো একটা রেস্তোরাঁ দেখলে মনে পড়ে অনন্যা লিখেছিল, "এখানে একদিন আমায় নিয়ে যাবি?"
ডিলিটেড চ্যাটগুলো যেন অদৃশ্য কালিতে তার মস্তিষ্কে খোদাই হয়ে আছে।
• সে মনে করতে পারল অনন্যার পাঠানো সেই ভয়েস নোটটা, যেখানে সে প্রথম বলেছিল— "ভালোবাসি।"
• সে মনে করতে পারল সেই ইমোজিগুলো, যা দিয়ে অনন্যা তার রাগ প্রকাশ করত।
স্মৃতি এমন এক জিনিস, যা মেমোরি কার্ড থেকে মোছা যায়, কিন্তু হৃদপিণ্ডের দেয়াল থেকে ঘষে তোলা যায় না। অর্ক বুঝতে পারল, ডিজিটাল ডেটা মুছে ফেলা যায়, কিন্তু ইমোশনাল ডেটা চিরস্থায়ী।
এক সপ্তাহ পর। অর্ক তখন বারান্দায় বসে সূর্যাস্ত দেখছিল। হঠাৎ ফোনটা কেঁপে উঠল। নোটিফিকেশন প্যানেলে একটা নাম ভেসে উঠল— 'অনন্যা'।
বুকটা ধক করে উঠল অর্কর। সে কাঁপাকাঁপা হাতে মেসেজটা খুলল। অনন্যা লিখেছে:
"আমি জানি তুমি আমাদের চ্যাটগুলো ডিলিট করে দিয়েছ। আমার ফোনও আজ খুব ফাঁকা লাগছে। কিন্তু জানো অর্ক, সব মুছে দিলেও সেই রাতগুলোর কথা তো মুছতে পারছি না। আমরা কি নতুন করে একটা চ্যাট শুরু করতে পারি না? এবার না হয় ঝগড়াগুলো ডিলিট করব, মানুষটাকে নয়।"
অর্ক জানলার বাইরে তাকাল। পাহাড়ের ওপারে চাঁদ উঠছে। সে কিবোর্ডে আঙুল রাখল। এবার সে আর কোনো কিছু ডিলিট করার জন্য নয়, বরং নতুন কিছু গড়ার জন্য টাইপ করতে শুরু করল।
অনন্যার সেই মেসেজটা অর্কর স্ক্রিনে অনেকক্ষণ ধরে স্থির হয়ে রইল। বাইরের পাহাড়ী হাওয়ায় হিমেল পরশ, কিন্তু অর্কর বুকের ভেতরটা তখন অদ্ভুত এক উত্তাপে ফুটছে। সে ভাবছিল, একটা সাধারণ 'ডিলিট' বাটন কি সত্যিই আমাদের কয়েক বছরের ইতিহাসকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে? হয়তো ডিজিটাল মেমোরি থেকে কয়েক মেগাবাইট ডেটা কমেছে, কিন্তু সেই ডেটার প্রতিটি অক্ষর যে অর্কর রক্তকণিকায় মিশে আছে।
সে টাইপ করতে গিয়েও থেমে গেল। আঙুলগুলো কাঁপছে। সে কি বলবে? 'আমিও তোমাকে মিস করেছি'? নাকি 'সব ভুলে নতুন করে শুরু করি'?
শেষ পর্যন্ত অর্ক লিখল, "অনন্যা, আমি চ্যাট ডিলিট করেছিলাম ঠিকই, কিন্তু কাল রাতে স্বপ্নে দেখছিলাম আমরা সেই প্রথম দিনের মতো ঝগড়া করছি। ব্যাকআপ ফাইলটা হয়তো সার্ভারে নেই, কিন্তু আমার চোখের পাতায় সব সেভ করা আছে।"
পরক্ষণেই ওপাশ থেকে 'Typing...' লেখাটা ভেসে উঠল। অর্কর মনে হলো এই 'Typing' শব্দটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।
অনন্যা উত্তর দিল, "জানিস অর্ক, চ্যাটগুলো যখন ডিলিট করে দিলাম, মনে হলো নিজের একটা হাত কেটে বাদ দিয়েছি। তোর সেই ভয়েস নোটগুলো— যেখানে তুই গিটারে টুংটাং করতিস আর ভুল সুরে গান গাইতিস— ওগুলো শোনার জন্য মনটা খুব হাহাকার করছিল। আমি তোকে ফেরাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের ইগো বারবার আড়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছিল।"
অর্ক মনে মনে হাসল। আসলেই তো, মানুষের ইগো এক অদ্ভুত জিনিস। একটা ছোট্ট যন্ত্রের স্ক্রিনে কয়েকটা শব্দের লড়াইয়ে আমরা কত বড় বড় সম্পর্ককে বলি চড়িয়ে দিই।
সেদিন রাতে তাদের আর ঘুম হলো না। নতুন চ্যাটবক্সটা আবার সজীব হয়ে উঠল। তবে এবার আর আগের মতো অভিযোগের পাহাড় নেই। তারা পুরনো সেই দিনগুলোর কথা বলতে লাগল যেগুলো তারা চ্যাটে লিখেছিল।
• অর্ক মনে করিয়ে দিল সেই বৃষ্টির রাতের কথা, যখন অনন্যা মাঝরাতে আইসক্রিম খাওয়ার বায়না ধরেছিল এবং অর্ক ভিডিও কলে তাকে আইসক্রিম খাওয়ার কাল্পনিক গল্প শুনিয়ে শান্ত করেছিল।
• অনন্যা মনে করিয়ে দিল অর্কর সেই চাকরির ইন্টারভিউয়ের দিনটার কথা, যখন সে টেনশনে কাঁপছিল আর অনন্যা প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর তাকে চ্যাটে অনুপ্রেরণা দিচ্ছিল।
এই কথোপকথনের মাঝে অর্ক একটা বড় সত্য উপলব্ধি করল। আমরা চ্যাটবক্সে যে মানুষটাকে খুঁজি, সে আসলে একটা ছায়া। আসল মানুষটা তো ফোনের ওপাশে রক্ত-মাংসের আবেগ নিয়ে বসে আছে। আমরা মেসেজের 'টোন' বুঝতে ভুল করি, ইমোজির আড়ালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাস পড়তে পারি না।
অর্ক ভাবল, চ্যাট ডিলিট হওয়াটা আসলে একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। পুরনো সব আবর্জনা, ভুল বোঝাবুঝি আর তিক্ত মেসেজগুলো এক নিমেষে সাফ হয়ে গেছে। এখন তাদের সামনে একটা সাদা ক্যানভাস। তারা চাইলে আবার নতুন করে, নতুন রঙে এই ক্যানভাস সাজাতে পারে।
সে অনন্যাকে বলল, "এবার থেকে একটা নিয়ম করি চল। যখনই আমাদের মাঝে মেঘ জমবে, আমরা ফোনে চ্যাট না করে সরাসরি কথা বলব। শব্দের মারপ্যাঁচে যেন আমাদের অনুভূতিগুলো আর হারিয়ে না যায়।"
অনন্যা একমত হলো। সে পাঠাল একটা হৃদপিণ্ডের ইমোজি— যেটা এবার আর নিছক গ্রাফিক্স মনে হলো না অর্কর কাছে, মনে হলো অনন্যার হৃদস্পন্দন।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১৪৩ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৯/০২/২০২৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast