www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

যাকাতের দায়িত্ব

যাকাত শব্দের অর্থ শুচিতা ও পবিত্রতা, শুদ্ধি ও বৃদ্ধি। পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরিয়ত নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ কুরআনে বর্ণিত আট প্রকারের খাতে দান করে মালিক বানিয়ে দেয়াকে যাকাত বলে। ইসলাম সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ধর্ম। একজনের হাতে বিপুল অর্থ-সম্পদ জমা হওয়াকে ইসলাম পছন্দ করে না। ইসলাম চায় ধনী-গরীব সবাই স্বচ্ছন্দে জীবন যাপন করুক। তাই দারিদ্র্যের প্রতি লক্ষ্য করে যাকাতের বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে। সূরা বাকারায়ে মহান আল্লাহ বলেন ” আর তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।” অর্থাৎ সমাজে যারা সম্পদশালী তারা তাদের সম্পদ থেকে যাকাত আদায় করবে এবং যারা গরীর বা অসহয় তাদেরকে নিজ দায়িত্বে যাকাতের অংশ থেকে অর্থ প্রদান করবে। সংগতভাবে দুটি শব্দ প্রতিয়মান। একটি দারিদ্র্যতা ও প্রাচুর্যতা। দারিদ্র্য ও প্রাচুর্য দু’টি বিপরীতধর্মী শব্দ কিন্তু মানব জীবনে দু’টিই জড়িয়ে আছে অন্ধকার এবং আলোর মত। মানুষের জীবনে মাঝে মাঝে প্রাচুর্যের ছন্দময় উপস্থিতি আবার কিছু সময় পরই দারিদ্র্যের সেই অনাকাংখিত ভয়াল থাবা। কারো কারো জন্য প্রাসাদোপম আলীশান বাড়ী বিলাসবহুল গাড়ীসহ সুখের সব রকম সরঞ্জামাদির বিপুল সমাহার। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে কঠোর পরিশ্রমের পরও দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা নেই, নেই মাথা গোজার একটু ঠাঁই। দু’টি অবস্থাই প্রজ্ঞাময় মহামহীমের রহতমতায় সৃষ্টি। সম্ভবত ইবাদতের দু’টি অনুপত ধারা সৃষ্টিই এর মুল রহস্য। একটি সবর অন্যটি শুকর। দু’টিই আল্লাহ তাআালার বিশেষ ইবাদাত। দু’টির মাধ্যমেই রয়েছে মহামহীম রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য অর্জনের সুনিপুন ব্যবস্থা। রাসুল (সা.) বলেন, মুমিনের বিষয়টি অতিশয় বিস্ময়কর। তার প্রত্যেকটি বিষয়ই তার জন্যে কল্যাণকর আর এটি একমাত্র মু’মিনের জন্যেই। যদি তার সুদিন আসে, সমৃদ্ধি অর্জিত হয়, তা হলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এটি তার জন্যে কল্যাণকর। আবার যদি দুর্দিন আসে দারিদ্র্যে আক্রান্ত হয়, ধৈর্য ধারণ করে এটিও তার জন্যে কল্যাণকর।” যে বিষয়টি অনুধাবন করা প্রয়োজন তা হচ্ছে, এই যে ধন-সম্পদ এটি তার নিজের কৃতিত্বের ফসল নয় বরং তা মহান আল্লাহর দয়া ও ইচ্ছার ফসল। তাই প্রথমত তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। কোন অবস্থাতেই তাকে ভুলে যাব না। তাঁর বিধি নিষেধের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন চলবে না। নিজের ইচ্ছার উপর তাঁর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে হবে। তাঁর দাবীর কাছে নিজের ইচ্ছাকে বিলীন করে দিতে হবে। সূরা মুনাফিকুনে আল্লাহ বলেন, “মুমিনগণ তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহরস্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” সম্পদ মানুষকে আল্লাহ বিমুখ করে দেবে এমন আশংকা আছে তাই মু’মিনদেরকে সদা সর্তক থাকতে হবে। এ সম্পদ যেন কোনক্রমেই তাকে তার সৃষ্টিকর্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে না পারে। সম্পদের মোহ যেন আল্লাহর দাবীকে গৌণ করতে না পারে। আর সেটি তখনই সম্ভব যখন সম্পদপ্রাপ্ত ব্যক্তি এ সম্পদকে আল্লাহর অনুগ্রহ বলে মনে করবে। সম্পদের ব্যাপারে আল্লাহরযে নির্দেশ তা পালন করার প্রানান্তকর চেষ্টা অব্যাহত রেখে মনেরাখতে হবে প্রাচুর্যের কারণে জীবনের গতি যেন পাল্টে না যায়। সম্পদ যেন হারাম ও অনৈতিক কাজে ব্যয় না হয়। বরং এ ব্যাপারে আল্লাহরযে নির্দেশ তা যেন সঠিকভাবে পালন হয়। সূরা যারিয়াতে আল্লাহ বলেন, “তাদের সম্পদে অধিকার রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের।” সুতরাং অসহায়, বঞ্চিত ও প্রার্থীদের জন্যে সম্পদ ব্যয় করা আল্লাহর দাবী ও নির্দেশ। এ পর্যায়ে আল্লাহর নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে যে সব বিষয় সহায়ক হবে তা গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করা। আর তা হচ্ছে সম্পদ ব্যয়ের যে ফযীলত কুরআন ও সুন্নায় বর্ণিত হয়েছে তা স্মরণে আনা এবং ব্যয় না করে কুক্ষিগত করার মন্দ পরিণতির কথা বিবেচনা করা। সূরা মু’মিনুনে আল্লাহ তাআলা বলেন “মুমিনগণ সফলকাম হয়েছে, যারা নিজেদের নামাযে বিনয়- ন¤্র, যারা অনর্থক কথা-বার্তায় নির্লিপ্ত, যারা যাকাত দান করে থাকে। এরাই প্রকৃত উত্তরাধিকারী। যারা উত্তরাধিকার লাভ করবে। শীতল ছায়াময় উদ্যানের। তাতে তারা চিরকাল থাকবে।” তা হলে আল্লাহর নির্দেশ মত সম্পদ ব্যয় করলে পরকালে চিরন্তন জীবনের জন্যে চিরসুখময় জান্নাত প্রাপ্তি নিশ্চিত। অল্প সম্পদ ব্যয় করলে পরপারে তা অনেক বড় করে পাওয়া যাবে। যেমন রাসুল (সা:) বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সদাকা (দান) কবুল করেন এবং তা তাঁর ডান হাতে গ্রহণ করে থাকেন। এরপর তাকে লালন পালন করতে থাকেন যেমনি ভাবে তোমাদের কেউ স্বীয় জন্তু শাবক লালন পালন করে থাকে। এমনকি এক লোকমা খাবার (তার লালন পালনের কারণে) পাহাড়ের মত বিশাল হয়ে দেখা দিবে। অতএব তোমরা সাদকা কর।” পক্ষান্তরে ব্যয় না করে জমা করে রাখলে সে সম্পদ পরকালের জন্যে বিপদ হয়ে দাঁড়াবে। সূরা আত তাওবায়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে না, তাদের কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন, যে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে। (এবং বলা হবে) এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা করে রেখেছিলে। সুতরাং এতে আস্বাদ গ্রহণ কর জমা করে রাখার।” সম্পদ ব্যয় না করে জমা করে রাখার ভয়াবহতা কত মারাত্মক? রাসুল (সা:) বলেন, আল্লাহ যাকে সম্পদ দিলেন, কিন্তুসে তার যাকাত আদায় করল না তার সম্পদ কিয়ামতের দিন বিষধর সাপে রূপান্তরিত করা হবে যে, সাপের দু’পার্শ্বে তিলক থাকবে। ঐ সাপ তার দু’চোয়ালে ধরে দংশন করবে আর বলবে আমিই তোমার সম্পদ আমিই তোমার সঞ্চিত ধন-ভান্ডার।” সম্পদশালী ব্যক্তি তার অপর মুসলিম ভাইয়ের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের সুযোগ সন্ধান করবে এতে নিজেরই লাভ। রাসুল (সা:) বলেন ‘‘যারা দয়াশীল, দয়াময় প্রভু তাদের প্রতি দয়া করেন। যারা যমীনে বিচরণ করে তাদের প্রতি দয়া কর। যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।”
বর্তমান বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে যে দৃশ্য দেখতে পাব যে, দারিদ্র্যের কারণে প্রায়ই দেখা যায় জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশকে অনাহাওে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। বিনা চিকিৎসায় পথে প্রান্তরে বিভিন্ন হাসপাতালে ধুকে ধুকে মৃত্যুবরণ করছে। যে শিশু শিক্ষানিকেতনের আলোকময় পরিবেশে থেকে নিজেকে আলোকিত মানুষ রূপে গড়ে তোলার কথা ছিল কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে আজ তাকে দেখা যাচ্ছে পথে-ঘাটে, বাজারে, স্টেশনে শ্রমবিক্রি করতে ব্যস্ত এদের কেউ কেউ ভিক্ষা করছে আবার অনেককে নর্দমা, ডাস্টবিন থেকে ফেলে দেয়া খাবার তুলে খেতে দেখা যাচ্ছে। দারিদ্র্যের কারণে অনিশ্চিত ভবিষতের যাচ্ছে সমাজের বিশাল একটি অংশ যার কারণে বেকারত্ব বাড়ছে হুহু করে। দারিদ্র্য ও বেকারত্বেও অমানিশায় পতিত হয়ে হতাশা কাটানোর জন্যে মাদকাসক্তিতে আসক্ত হচ্ছে যুবসামজ সহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। ক্রমান্বয়ে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, খুন ও নারী ধর্ষণসহ মারাত্মক অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্ম। পরম মর্যাদাবান মাতৃ সমাজকে সতীত্ব বিক্রি করে বেচে থাকার সংগ্রাম করতে হচ্ছে পতিতা বৃত্তির মত চরম ঘৃণিত কাজ পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। ফলে মনুষ্যত্ব বোধের চরম অধপতন। সুদ ভিত্তিক দেশীয় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার দ্বারস্থ হয়ে সর্বস্বাস্থ হতে দেখা যাচ্ছে আমাদের ভাই-বোনদের। এ সুযোগে দারিদ্র্য বিমোচনের নাম করে অনেক আন্তর্জাতিক ফোরাম দেশে বিভিন্ন নামে সংস্থা খুলে সাহায্যের নামে অপসংস্কৃতি বিকাশ ঘটাচ্ছে মহা উৎসবে। ফলে সাংস্কৃতির নামে চর্চা হচ্ছে নগ্নতা, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার। মুক্ত সংস্কৃতির নামে যৌনতা নির্ভও চলচিত্র নির্মাণ, ফ্যাশন শো, কনসার্ট ইত্যাদির মাধ্যমে কেড়ে নিচ্ছে শত বছরের চর্চিত সভ্য সাংস্কৃতিক ধারা, শালীনতা, ভদ্রতা, ভব্যতা ও লজ্জাসহ পর্দা প্রথা প্রায় বিলুপ্তির পথে। এসব অপরাধ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধির কারণে জনমনে সৃষ্টি হচ্ছে আতংক, কষ্ট সাধ্য হয়ে যাচ্ছে নাগরিক জীবন যাপন, আইন শৃঙ্খলার অবনতি সহ যাবতীয় উন্নয়ন অগ্রগতি হচ্ছে বাধাগ্রস্ত, পিছিয়ে যাচ্ছে দেশ। আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দিত হচ্ছে দেশ ও জনগণ। দারিদ্র্যতার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের স্বাধীন মূলবোধ। দারিদ্র্যতার কারণে আজ আমাদের দেশীয় ও ধর্মীয় পরিচয় হুমকির সম্মুখীন। তাই মানবিক ও ঈমানী মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করলে অচিরেই এর চরম মূল্য দিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে এ অবক্ষয় রোধ একটি বিরাট উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেন সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গ।
ফলে ধর্মীয় মূল্যবোধ, ঈমানী চেতনা নিয়ে মুসলমান মুক্ত স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারবে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্বিঘে কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে। জাতি দিন দিন উপহার পেতে থাকবে ন্যায়-নীতি, সৎ, চরিত্রবান, সৃজনশীল উন্নত, আলোকিত প্রেমময় হৃদয়বান কাংখিত প্রজন্ম।
বিষয়শ্রেণী: সমসাময়িক
ব্লগটি ৯৭ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১১/০৬/২০১৯

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast