www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

মানুষ পাচার

আবারও মানব পাচারকারীদের লালসার শিকার হয়ে করুণ পরিণতি বরণ করেছে একদল বাংলাদেশি। চাকরির সন্ধানে লিবিয়া থেকে ইতালীতে যাচ্ছিল তারা। কিন্তু সাধারণ নৌযানে করে ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালী যাওয়ার সে চেষ্টা ভয়ংকর এবং জীবনবিনাশী প্রমাণিত হয়েছে। গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, ওই বাংলাদেশিদেরসহ আরো কয়েক দেশের ভাগ্যান্বেষীদের নিয়ে অবৈধ যে নৌযানটি সাগর পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছিল সেটা গত ৯ মে বৃহস্পতিবার ঢেউয়ের প্রচন্ড আঘাতে তিউনিসিয়ার উপকূলে ডুবে যায়। অনেক ভাগ্যান্বেষীরই সলিল সমাধি ঘটেছে।

তিউনিসিয়ার নৌবাহিনী বেঁচে যাওয়া কয়েকজনকে উদ্ধার করেছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি রয়েছে ১৪ জন। তারা জানিয়েছে, বাংলাদেশিদের মধ্যে অন্তত ৩৯ জনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ওদিকে উদ্ধার করা মৃতদেহগুলোর মধ্যে শরীয়তপুরের নড়িয়া গ্রামের উত্তম কুমার দাশের দেহকে চিহ্নিত করেছে তার ভাই। অর্থাৎ অন্তত একজন বাংলাদেশির মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আশংকা করা হচ্ছে, নিখোঁজ ৩৯ জনের মধ্যেও বাংলাদেশের কয়েকজন থাকতে পারে। তেমন ক্ষেত্রে নিহত বাংলাদেশিদের সংখ্যাও অনেক বেড়ে যাবে। উল্লেখ্য, এই ৩৯ জনের মধ্যে বৃহত্তর সিলেট এলাকারই রয়েছে ২২ জন।

এদিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের কাছে দেশের অভ্যন্তরে তৎপর মানব পাচারকারীদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে রয়েছে নোয়াখালীর তিন ভাইয়ের একটি চক্র। তিনজনেরই নাম-ঠিকানা পেয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনী। তাদের সঙ্গে একটি শক্তিশালী মানব পাচারকারী চক্র জড়িত রয়েছে। ওই তিনজনের বাইরে মাদারিপুরের দু’জনকেও শনাক্ত করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বৃহত্তর সিলেটের যারা রয়েছে তাদের আত্মীয়-স্বজনরাও মানব পাচারকারী এবং তাদের দালালদের সম্পর্কে অনেক তথ্য দিয়েছে, যেসবের ভিত্তিতে অপরাধীদের চিহ্নিত করা এবং গ্রেফতার করা সম্ভব হতে পারে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধিসহ নৌযান ডুবিতে বাংলাদেশি যুবকদের ভয়ংকর পরিণতির খবর যে কোনো বিচারে অত্যন্ত আশংকাজনক। এবারই প্রথম নয়, দূর অতীতে তো বটেই, সাম্প্রতিক সময়েও বাংলাদেশিরা এ ধরনের এমনকি এর চাইতেও ভয়ংকর পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। যেমন গত বছর ২০১৮ সালের অক্টোবরে মেক্সিকোর দুর্গম জঙ্গলে দুইশ’র বেশি বাংলাদেশিকে আটক করা হয়েছিল। চাকরির অন্বেষণে অবৈধ পন্থায় তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মেক্সিকোর জঙ্গল পথে পা বাড়িয়েছিল। মানব পাচারকারীরা প্রথমে তাদের দুবাই নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে ব্রাজিল হয়ে বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, পানামা সিটি এবং গুয়াতেমালা ঘুরিয়ে তাদের মেক্সিকোতে আনা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশি দেশ মেক্সিকোতে আনার পরই মানব পাচারকারীরা তাদের সম্পূর্ণ অসত্য বলে দুর্গম জঙ্গলে ঢুকিয়ে দিয়েছিল, যেন সে জঙ্গল বাংলাদেশের সাধারণ বনজঙ্গলের মতো এবং দু’এক ঘণ্টার মধ্যেই তারা জঙ্গল পার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকে পড়তে পারবে। আর সেখানে গিয়েই তারা মানব পাচারকারীদের বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে চাকরি পেয়ে যাবে!

শুধু মেক্সিকো বা যুক্তরাষ্ট্রে নয়, লিবিয়া থেকে ইতালীসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও একই ধরনের অসত্য বলে ও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে প্রতারণা করে চলেছে মানব পাচারকারীরা। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ে ভূমধ্য সাগরের ওপর দিয়ে পাড়ি দেয়ার সময় প্রতি ৫০ জনে একজন করে বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটেছে। বাকি শত শত বাংলাদেশিকে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ চেষ্টার জন্য কারাগারে ঢোকানো হয়েছে। ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে এবং যথেচ্ছভাবে লাঞ্ছিত করেও দেশে ফেরৎ পাঠানো হয়েছে বহুজনকে। এখনো পুনরাবৃত্তি ঘটছে সেসব ঘটনার, যার সর্বশেষ শিকার হয়েছে নতুন একদল বাংলাদেশি যুবক।

আমরা মনে করি, এমন অবস্থা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে দেয়া যায় না। প্রথমত দেখা দরকার, ভয়ংকর পরিণতি ঘটতে পারে জানার পরও বাংলাদেশের যুবকরা কেন অবৈধ পন্থায় বিদেশে যাচ্ছে। শুধু যাচ্ছেই না, যাচ্ছেও শত শত এবং হাজার হাজার। বলা বাহুল্য, সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়ন এবং বেকার সমস্যা সমাধানের দাবি জানানো হলেও বাস্তব সত্য হলো, চাকরি পাওয়ার এবং জীবনে অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করার আশা নিয়েই প্রতিদিন অসংখ্য যুবক বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকার তার ব্যর্থতার দায় অস্বীকার করতে পারে না। এখানেও কথা আছে। সরকার শুধু বেকারদের চাকরি দিতেই ব্যর্থ হচ্ছে না, আইনসম্মত পন্থায় বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করতে পারছে না সরকার। মূলত সে কারণেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুবকদের দেশ ছেড়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝাঁপ দিতে হচ্ছে।

মানব পাচারকারীদের দমন ও প্রতিহত করতে না পারা সরকারের দ্বিতীয় প্রধান ব্যর্থতা। তিউনিসিয়ার উপকূলের সর্বশেষ ঘটনার মধ্য দিয়ে শুধু নয়, ইতিপূর্বেও প্রায় সকল মৃত্যু ও দুর্ঘটনার পরও নাম-ঠিকানাসহ মানব পাচারকারীদের সম্পর্কিত তথ্য জানা গেছে। ঘটনাক্রমে দু’-চারজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। কিন্তু তারপরই প্রশ্নসাপেক্ষ কারণে গ্রেফতার হওয়া লোকজন মুক্তি পেয়েছে। আর মুক্তি পাওয়ার পর আবারও তারা মানব পাচারের অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সময়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সবকিছুর পেছনে রয়েছে তথাকথিত প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ। এসব মহলের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের সুসম্পর্কের বিষয়টিও গোপন থাকেনি। এজন্যই বলা হচ্ছে, সরকারের গোপন অনুকূল্যই মানব পাচার অব্যাহত থাকার অন্যতম প্রধান কারণ।

আমরা আশা করতে চাই, তিউনিসিয়ার উপকূলে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে তার পর সরকারের টনক নড়বে এবং মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। সরকারকে একই সাথে আইনসম্মত পন্থায় বিদেশে চাকরি পাওয়ার মতো সুযোগ সৃষ্টির বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নিতে হবে। একদেশমুখী পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন ঘটিয়ে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে হবে, যাতে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। যাতে চাকরির জন্য আর কাউকে অবৈধ পন্থায় বিদেশে না যেতে হয় এবং যাতে জঙ্গল ও সাগরে তারা অপঘাতে জীবন না হারায়।
বিষয়শ্রেণী: সমসাময়িক
ব্লগটি ৮৩ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২১/০৫/২০১৯

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast