www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ক্ষমতার অপব্যবহার

নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে হয়। তারা প্রায় এক দশক ধরে হামলা, মামলা ও গ্রেফতার, রিমান্ড-নির্যাতন দিয়ে দমিয়ে রাখা বিরোধী দলকে নির্বাচনকালীন সময়ে আরো কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টা করছে বলে জানা যায়। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেশব্যাপী গুম, হত্যা, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলায় গ্রেফতার নির্যাতন এবং বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনী এলাকা থেকে বিতাড়নের কাজ শুরু হয়েছে বলে রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন জেলা থেকে প্রাপ্ত অভিযোগ অনুযায়ী পুলিশ বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের ধরার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। তাদের শুধু গ্রেফতারই করছে না, সাথে জমিজমার দলিলপত্র, ছেলেমেয়েদের শিক্ষা সনদ, রেজাল্টশীট এমনকি আসবাবপত্রও নিয়ে যাচ্ছে। মোটা অংকের টাকা নিয়ে এগুলো ফেরত দিলেও সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের বেআইনি সমাবেশ ও নাশকতার ষড়যন্ত্র করার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন ও ফৌজদারী দণ্ডবিধির অধীনে মামলা দিচ্ছে। নির্বাচনের সময় বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা যাতে এলাকায় থাকতে না পারে তার জন্যই এই ব্যবস্থা।
ডেইলি স্টার পত্রিকা গত রোববার শেষের পাতায় পাঁচ কলামের একটি ছবি প্রকাশ করেছে। ছবিটি ক্রন্দনরত দুই মহিলার, যুবদল নেতা কাজী সোহেল রানার মা এবং খালার। গত শুক্রবার সোহেল রানাকে পুলিশ বিনাদোষে মালিবাগ থেকে গ্রেফতার করে। শনিবারে তারা এসেছিলেন ঢাকা চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে তার জামিনের জন্য। আদালত তাকে জামিন না দিয়ে জেলে প্রেরণ করলে তার মা এবং খালা গগনবিদারী কান্নায় ভেঙে পড়েন। সারা বাংলাদেশে এ ধরনের হাজারো ঘটনা ঘটছে। গত ২০ নবেম্বর ঢাকার খিলক্ষেত থানার ডুমনিতে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ নাজিমউদ্দিন নামক স্থানীয় এক জামায়াত সদস্যের বাড়িতে হানা দেয়। খিলক্ষেত থানার এসআই নজরুল ইসলাম ১৫/২০ জন পুলিশ নিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টার দিকে তার বাড়ি ঘেরাও করে এবং জনাব নাজিমউদ্দিনকে গ্রেফতার করে। তার বাড়িতে এত পুলিশ দেখে এবং তাকে গ্রেফতার করায় তার বৃদ্ধা মা অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তার জ্ঞান ফিরে আসেনি। তিনি রাত দেড়টার সময় ইন্তেকাল করেন। তার আত্মীয়স্বজন মাকে শেষ দেখা এবং তার জানাযায় শরীক হবার জন্য প্যারোলে তার মুক্তি চেয়ে আবেদন করেছিল কিন্তু তাদের আবেদন মঞ্জুর করা হয়নি। জানা গেছে যে, থানার এসআই নজরুল ইসলাম খান নিজে বাদী হয়ে ডুমনি পূর্ব, খিলক্ষেত, ভাটারা, ক্যান্টনমেন্ট ও বরুড়া এলাকার ২৫ জন জামায়াত নেতার নামে এবং অজ্ঞাত অসংখ্য নেতাকর্মীকে আসামী করে পরস্পর যোগসাজশে জনসাধারণের মাঝেও সরকারি স্থাপনা এবং যানবাহনে নাশকতামূলক কার্যকলাপ ও ত্রাস সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের প্রস্তুতি গ্রহণ করার অপরাধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা রুজু করেছেন। বলা হয়েছে কথিত সময়ে আসামীরা নাজিমুদ্দিনের বসতবাড়িতে নাশকতার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল। খবর নিয়ে জানা গেছে যে, ঘটনাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। নাজিমুদ্দিন ছাড়া ঐদিন ঐ সময়ে সেখানে কেউই উপস্থিত ছিলেন না। দু’জন আসামীর ব্যাপারে জানা গেছে যে, তারা সম্পূর্ণ অসুস্থ। এদের একজন ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ, কিছু দিন আগে ওপেন হার্ট সার্জারি করে এসেছেন, চলাফেরা করতে পারেন না। তিনি পিডিবির একজন অবসরপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী। অপরজন ইঞ্জিনিয়ার মোতাহার হোসেন। মালয়েশিয়ান শিপিং কর্পোরেশনের চীফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে এ মাসের ১৩ তারিখ থেকে হাসপাতালে আছেন এবং ১৪ তারিখে তার মাথায় অপারেশন হয়েছে। তিনি অনেকটা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় আছেন। ব্রেইন অপারেশনের প্রায় সংজ্ঞাহীন রোগী হাসপাতাল থেকে বের হয়ে কিভাবে ডুমনিতে গিয়ে নাশকতার ষড়যন্ত্রের প্রস্তুতি মিটিংয়ে শরিক হতে পারেন তা আশ্চর্যের বিষয়। পুলিশ কর্মকর্তা তার মামলায় বলেছেন যে, আসামীরা পুলিশের আগমনের বিষয়টি টের পেয়ে নাজিমুদ্দিন ছাড়া আর সবাই পালিয়ে যায় এবং ঘটনাস্থল থেকে তারা ১৩টি আলামত জব্দ করেছেন। আলামতগুলো হচ্ছে: (১) ‘মিডিয়ার মুখোমুখি অধ্যাপক গোলাম আজম’ শিরোনামের একটি বইয়ের ২ কপি (২) বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত ‘সূর্যোদয়ের পথে’ নামক বই ১ কপি, (৩) ইসলামী ছাত্রশিবির কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকা ‘আহ্বান’-১ কপি, (৪) ‘জামায়াতে ইসলামীকে নিশ্চিহ্ন করার আওয়ামী ষড়যন্ত্র’ নামীয় বই ১কপি, (৫) সংগ্রামী জননেতা অধ্যাপক গোলাম আযম ১ কপি (৬) ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন নামক বই ১ কপি (৭) আন্দোলন সংগঠন কর্মী নামক বই ১ কপি (৮) মাসিক প্রেরণা, সেপ্টেম্বর ২০১৮-১ কপি (৯) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর সেলিম উদ্দিনের আহ্বান শীর্ষক লিফলেট ১০ কপি (১০) সার্কুলার নং ০২/২০১৮, কর্মীদের উদ্দেশ্যে নির্দেশনা শীর্ষক লিফলেট- ৬ কপি, (১১) বিষয় ভিত্তিক আয়াত: আত্মগঠন ও মান উন্নয়ন সহায়িকা শীর্ষক পুস্তক ১ কপি, (১২) সফলতার মূল শক্তি জামায়াতী জিন্দেগী শীর্ষক পাঁচ পাতাবিশিষ্ট পুস্তিকা-১ কপি এবং (১৩) কালো রং-এর নকিয়া মোবাইল ফোনের ব্যবহৃত পুরাতন একটি সেট। পুলিশ কর্তৃক জব্দকৃত এগুলো হচ্ছে Incriminating naterid. এর মধ্যে ১৩ নং আইটেম ছাড়া বাকী ১২টি আইটেম বাইরে থেকে আমি সংগ্রহ করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেছি এবং এগুলোর কোনটিই অপরাধমূলক সামগ্রী বা সাহিত্যের মধ্যে পড়ে না। যে কেউ এগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। আমার মনে হয় আমাদের শাসক শ্রেণি রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় অন্ধ হয়ে পুলিশ বাহিনীকে দিয়ে এমন সব কাজ করাচ্ছেন অথবা তাদের তুষ্ট করার জন্য পুলিশের কিছু কর্মকর্তা কর্মচারি করছেন যা স্বীকৃত সকল শিষ্টাচার ও মানবিক মূল্যবোধকে লঙ্ঘন করছে। এ ধরনের ঘটনা সারা বাংলাদেশে ঘটছে এবং নিরিহ নিরপরাধ মানুষ সরকারি নিগ্রহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে এর মাত্রা অনেক বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে মনে হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে এই যে আমাদের পুলিশ বাহিনী এর হাতিয়ার হিসাবে কাজ করতে গিয়ে নিজেদের হাস্যাষ্পদ করে তুলছেন, মানুষ তাদের ওপর থেকে আস্থা হারাচ্ছেন। যে বইগুলো জব্দ করা হয়েছে সেগুলো নাশকতার হাতিয়ার হতে পারে এ কথা তো পাগলেও বিশ্বাস করবেন। অথচ এর ভিত্তিতে বিচারলয় আসামীদের রিমান্ড দিচ্ছেন। নির্বাচনের যদি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না হয় তাহলে দেশের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে পারে। এই অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব শাসক দলের। শাসক দল নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আতঙ্কে আছে বলে মনে হয়। এই আতঙ্ক থেকেই তারা নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সবকিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে দেশব্যাপী ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে বিরোধী দলগুলোকে ময়দান থেকে বিতাড়িত করে ফলাফল লুট করতে চায় বলে অভিযোগ উঠেছে। ভারতের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আওয়ামী লীগের জন্য আতঙ্কজনক অনেক খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব খবরে বলা হচ্ছে যে বাংলাদেশে নির্বাচনে কঠোর প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং এতে আওয়ামী লীগের পক্ষে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসা সম্ভবপর হবে না। কোনো কোনো বিশ্লেষক রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানের ভবিষ্যদ্বাণীও করছেন। কেউ কেউ মালয়েশিয়ার নির্বাচনী ফলাফলের বিষয়টি উল্লেখ করে বলছেন যে, মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী অস্বাভাবিক প্রতাপ নিয়েও নির্বাচনে তারই অত্যাচারে জর্জরিত ও অন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আনোয়ার ইবরাহিমের কাছে মাথানত করে ক্ষমতা ছেড়েই দিতে বাধ্য হননি দুর্নীতির দায়ে জেলে যেতেও বাধ্য হয়েছেন। শ্রীলঙ্কার ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্য নিপর্যয়ের বিষয়টি এখানে কেউ কেউ স্মরণ করছেন। আবার বাংলাদেশে পুলিশ সূত্রের একটি খবর “৩৩টি সীট নৌকার কর্নফার্মড ৬০-৬৫টিতে কনটেস্ট, বাকী সীটগুলোতে নৌকার সম্ভাবনা নেই, “কাজেই সাংঘাতিক কিছু করা ছাড়া উৎরানো যাবে না” এ ধরনের কিছু কথাবার্তাও শাসক দলকে প্রভাবিত করছে বলে মনে হয়।
এর ফলে অনেকেই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এমন সব কর্মকা- করে বসছেন যা কাম্য হতে পারে না।
সরকার আজ সকল রাষ্ট্রীয় শক্তিকে দলীয় শক্তিতে পরিণত করার অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসন যন্ত্র বিশেষ করে আমলাতন্ত্র, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতিদমন কমিশনসহ সাংবিধানিক সকল প্রতিষ্ঠানকে এই সরকার দলীয় কাজে ব্যবহার করছেন। এ ধরনের অবস্থা স্বাধীন বাংলাদশে ইতোপূর্বে ঘটেনি, পাকিস্তান আমলে ঘটেনি, এমনকি ব্রিটিশ আমলেও ঘটেনি। এর অবসান হওয়া দরকার। ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী হয় না।
বিষয়শ্রেণী: অভিজ্ঞতা
ব্লগটি ৩৯ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৮/১১/২০১৮

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast