www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

গোপলার কথা - ৭০

বাঙালীর_ঐতিহ্য
---------------
বাঙালীর ঐতিহ্য নিয়ে কিছু বলার আগে ভেবে দেখা দরকার আমরা সে অর্থে এখনো কতটা আর বাঙালী আছি। ভবানী প্রসাদ মজুমদারের ভাষায় 'জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না।'
আচ্ছা বাঙালীর নিজস্ব ঐতিহ্য কি? দুর্গাপূজা ও অন্যান্য পূজাতে ভক্তি অঞ্জলি, উৎসব, কীর্তন, তুলসীমঞ্চ, যাত্রা, নাটক, লালন গম্ভীরা চৌ লোকগীতি ভাটিয়ালি ইত্যাদি গান, রবীন্দ্রনাথ শরৎ থেকে শুরু করে বিপুল সাহিত্যসম্ভার, বিজ্ঞান চর্চা, পরচর্চা গসিপ, হাত পা ছড়িয়ে আও আও করে কত কথা বলে ফেলা, ছোট ছোট দেবালয়ের স্থাপত্য কীর্তি ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
এখন এইসব ঐতিহ্যের বাঙালী চর্চা কতটা সরে গেছে তার কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক।
প্রথমত দুর্গাপূজা ও অন্যান্য পূজোতে শ্রদ্ধা ভক্তি ও অঞ্জলি উধাও। থিম ও আড়ম্বরে যা পুরোটাই ঢাকা পড়ে গেছে। তার সাথে পূজোর পাঁচ সাত দিন আগে থেকে বিসর্জন পর্যন্ত যে মাইকাসুর বিকট বিক্রমে ব্যাণ্ড পার্টি সহযোগে বাজতে থাকে তাতে বাঙালী ঐতিহ্যের ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে 'ছেড়ে দে না কেঁদে বাঁচি'। যদিও এই ঐতিহ্য বাঙালি অন্য কোন ভাবধারা থেকে আমদানি করে নি তবু বাঙালীর এ ঐতিহ্যে বাঙালীয়ানা থাকে না।
শুধু পূজো নয় নানান কারণে অকারণে বিকারণে ডিজে সহযোগে যে মাইকাসুর চলে তাতে মনে হয় বাঙালী কি সত্যিই গান ভালোবাসে? নাকি তা কেবল বাঙালীর হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার জন্যে গাওয়া হয়েছে? দিন নেই রাত নেই মাইকাসুর উপস্থিত।
এবার আসা যাক উৎসব। বাঙালী ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও এত উৎসব আছে বলে তো মনে হয় না। সারা বছর নানা রকমের দেবদেবীর পূজো। সেইসাথে বিয়ে অন্নপ্রাশন জন্মদিন শ্রাদ্ধ এবং মেলা উদযাপন ইত্যাদি লেগেই আছে। আর সব কিছুর সাথে যুক্ত লাউড স্পীকার। উচ্চগ্রামে এ পাড়ায় ওপাড়ায় নয়তো রাস্তার ধারে মিছিলে ময়দানে। বাজতেই আছে বাজতেই আছে।
কিছু যাত্রা নাটক এখনো চলে তবে তা কমতে শুরু করছে। কেন না বাঙালীর ঠুনকো ভাবনায় ক্রমে গম্ভীর জীবনযাত্রা ঢুকে পড়েছে। চায়ের দোকানে আর সেই আলোচনা নেই। সবাই সতর্ক। এ পাড়ার বৌদি ও পাড়ায় পিসির সাথে কুচকাচালি পরচর্চা অথবা পরনিন্দা সেভাবে আর প্রাণ খুলে হয় না। কেন না প্রত্যেকের মধ্যে বিদেশী চর্চায় নিজের সংসার এবং শুধু নিজের নিজের গুছিয়ে নেওয়ার ভাবনা ঢুকে পড়েছে। বিয়ের আসরে যে আত্মীয়তার বাঁধনে খুঁনসুটিগুলো ছিল তাতেও এসে পড়েছে সতর্কতা।
স্বার্থের এত সতর্কতা বাঙালি মানসিকতায় আদৌ ছিল না। পুরান পাঁচালি লোক আখ্যানের সাথে সাথে স্বাধীনতা সংগ্রামে ও সাহিত্যে বিজ্ঞানে শিক্ষায় মননশীলতায় যে বাঙালির পরিচয় পাই বর্তমানের বাঙালি ঐতিহ্যের সাথে যার কোন মিল নেই।
রাস্তার মোড়ে মোড়ে ফাস্টফুডের সারি সারি দোকান দেখে মনে পড়ে যায় এখন আর কোন অনুষ্ঠানে বাঙালির অন্ন ব্যঞ্জন আর চোখে পড়বে না। বিভিন্ন বিদেশীয়ানী পদে বাঙালীর নিজস্ব ঐতিহ্য আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। বাঙালী গৃহস্থ আজ নিজে নিজেই ভাবছে 'ছ্যা ছ্যা, এই ছিল বাঙালী! বাদ দাও! বাদ দাও!
ছাতার মত গজিয়ে ওঠা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল আর কোট টাই এর দৌলতে বাংলা ভাষা এমনিতেই অনেকটা পিছিয়ে পড়ছে। গুড মর্নিং আর গুড নাইটের দৌরাত্ম্যে 'কেমন আছো?' এ জাতীয় হৃদয় কথা হারিয়ে যেতে বসেছে।
এবং এত সবের ভিড়ে জ্ঞানে পাণ্ডিত্যে মননশীলতা চিন্তা চেতনায় বাঙালি এখনও তার ছাপ রাখছে। তবে তা বাঙালি হিসেবে। বাঙালি ঐতিহ্য যদিও তার থেকে অনেকটাই সরে যাচ্ছে। তবে আশার কথা গাঁয়ে গঞ্জে পাড়ায় পাড়ায় আজও বাঙালিয়ানা আছে। তার ঐতিহ্যে সে আবহমান প্রবাহিত হয়ে যাবে।
বিষয়শ্রেণী: অভিজ্ঞতা
ব্লগটি ৩৮ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৩/০৩/২০১৯

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • কথা সত্য।
  • পরিতোষ ভৌমিক ২ ২৪/০৩/২০১৯
    যা যা বললেন, এগুলোই তো বাঙ্গালীর ঐতিহ্য । আর আপনার চোখে যা লেগেছে , সেটা হলো ঐতিহ্যের বিবর্তন । আমরা যে যা বলি ভাই, বাঙালী বাঙালীর মতোই চলবে , তবে যুগে যুগে দেখা গেছে বাঙালীরা চলনে - বলনে - আচার - আচরনে অন্যদের অনুকরণ করতে ভালবাসে । তবু চর্চা তো চলবেই ।
 
Quantcast