www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

গোপলার কথা - ৬২

শিক্ষার মর্যাদা
------------
আমরা যদি বলি আমরা চিরকাল ছাত্র। সারা জীবনেও শেখার শেষ নেই। তাহলে জীবনের একেবারে শুরুর দিকে যা কিছু শিক্ষা গ্রহণ করি, সবই শিক্ষকের কাছে। বড় হয়ে তাও কোন শিক্ষকের কাছে কিছু শেখার পর আমরা নিজেরাই তা জাস্টিফাই করি। এটা শেখা কি ঠিক হচ্ছে। নাকি অন্য কিছু শেখা উচিত? কেন না বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে এ রকম জাস্টিফাই করার বোধ জন্মায়।
কিন্তু জীবনের প্রথমদিকে জাস্টিফাই করার বোধ থাকে না। বোধ তৈরি করতে হয় বা করাতে হয়। জীবনের প্রথম দিকে সমস্ত শিশুই শিক্ষার্থী। সমস্ত শিক্ষার্থী শিশু। ছাত্রছাত্রী। তাই শিক্ষকের উপর সম্পূর্ণ ভরসায় থাকে শিক্ষার্থী বা শিশু বা ছাত্রছাত্রী।
যে কোন শিশু বড় হয় বাড়ির পরিবেশে। তাকে ঘিরে তার সমাজিক পরিবেশ। এই ঘরোয়া বা সামাজিক পরিবেশে সবাই সব কিছু জানে না। জানবে এমন সম্ভাবনাও থাকে না। এমন কি সামাজিক মর্যাদাটুকুও অনেকে বোঝে না।
শিশু নিজের বাড়িতে মা বাবা এবং অন্যান্য আত্মীয় স্বজনের কাছে যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয় তাতে সে অনেক কিছু জানতে পারে না। সে শিক্ষা হোক বা জীবনবোধ হোক বা সামাজিক অবস্থান।
কেন না মা বাবা এবং ফ্যামিলির অন্যান্য সদস্য শিক্ষিত হতে পারে আবার নাও হতে পারে। বাবা মা সৎ শিক্ষিত চেতনাশীল হতে পারে কিংবা চোর গুণ্ডা বদমাস ঘুষখোর দুর্নীতিবাজও হতে পারে।
আবার যে কোন সামাজিক প্রেক্ষাপটে সমাজের কুটিল অবস্থানেই বেশিরভাগ শিশুকে বড় হতে হয়। গালাগাল, মারামারি, চাতুরী, নির্যাতন, খিস্তি খেউড় ইত্যাদি চোখের সামনে দেখে বেশিরভাগ শিশুরা বড় হয়। কিছু ভালও দেখে তবে তা খুবই সীমিত। চোখে পড়ে না। শিশুরা অবশ্য সেটুকু ভাল মন্দ বুঝে উঠতে পারে না।
কিন্তু স্কুলে শিক্ষকের কাছে শিশু বা শিক্ষার্থী বা ছাত্রছাত্রী সমস্ত কিছু জানতে পারে। জানা যায়। ছাত্রছাত্রীরা সেসবই জানতে পারে সম্পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে। শিক্ষকের শিক্ষা প্রদান ও বইয়ের পাতায় যা লেখা থাকে এবং স্কুলের স্নিগ্ধতার মাধ্যমে শিশু সহজেই বুঝতে পারে, পার্থক্য করতে পারে, জাস্টিফাই করতে পারে কোনটা ভাল কোনটা মন্দ, কোনটা দোষ কোনটা গুণ ইত্যাদি আরো অনেক কিছু।
আর শিশুরা স্কুলে গিয়ে বই খাতা পেন পেনসিল টেবিল চেয়ার আর স্কুল ব্লিডিংএর মধ্যে শিক্ষা খোঁজে না। খোঁজে শিক্ষকের মধ্যে। শিক্ষকই বই খাতা পেন পেনসিলে শিক্ষার প্রাণ সঞ্চার করে। এবং তাতেই শিশুরা শিক্ষিত হয়। সমাজ সুসভ্য হয়।
তাহলে শিশু বড় হওয়ার জন্য শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু একটা স্কুলে নয়, শুধু একজন শিক্ষক নয় সমস্ত দেশে, সমস্ত কালে শিক্ষক তাই মর্যাদা সম্পন্ন। Man making is best work in the earth. যা করে কেবলমাত্র শিক্ষক আর বাড়ির বাবা মা। তাই সবার কাছে এই দুই অবস্থান পরম পরম পরম শ্রদ্ধার পাত্র।
শিক্ষক যা পড়ান যা বলেন যা করেন সবই ছাত্রছাত্রীরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। অনেক সময় তিনি কিছু ভুল ইনস্ট্রাকশন দিলেও ছাত্রছাত্রীরা বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করে না। নীচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা তো শিক্ষকদের দিকে, শিক্ষকের লেখা কালো ব্ল্যাকবোর্ডের চকে লেখা সাদা অক্ষরের দিকে আজও হাঁ-করে তাকিয়ে থাকে।
শিক্ষক কম জানে কি বেশি জানে, কতটা ঠিক জানে কি জানে না, এ বিষয় জানে নাকি ও বিষয় জানে ওসব কোন ফ্যাক্টার নয়। তিনি শ্রেণিকক্ষের মধ্যে যে শিক্ষা দেন, যে শিষ্টতার সঙ্গে বুঝিয়ে দেন, যেভাবে ছাত্রছাত্রীদের সামনে উপস্থিত হন সেটাই আসল ব্যাপার। সেটুকুই ছাত্রছাত্রীদের কাছে সম্পূর্ণ আদর্শগত।
সেই আদর্শগত অবস্থান থেকে শিক্ষকদের বিচ্যুতি সেই দেশ সেই জাতির পক্ষে মর্যাদায় হানিকর। উন্নতির বিদ্রুপ সোপান।
তার মানে দেশ দশ জাতি মানুষ মনুষ্যত্ব মর্যাদা সবই শিক্ষা ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেমন ডাক্তারবাবুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষক মহাশয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত। শিক্ষার মূল ভিত্তি হল শিক্ষক। সমাজের অন্য কেউ যেখানে বললে কাজ হয় না। সেখানে শিক্ষক একবার বললে কাজ হয়ে যায়। সমাজে শুদ্ধতা এসে যায়।
সে রকম ডাক্তারবাবু ভুল করে দু চার জন মানুষের অসুবিধা হবে আবার শুধরানো যাবে। কিন্তু শিক্ষক মহাশয়ের ভুল নির্দেশনা লাখো লাখো ভবিষ্যতের উপর থাবা ফেলবে।
শিক্ষকের এই বলা, ভালো ভাবনা অন্য কাউকে নয় শুধুমাত্র তার শিক্ষার্থীকে বললেই সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। শিক্ষকের যে কোন বলাই শিক্ষার্থীর কাছে উপদেশ। একবার বললে একশ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে নব্বই জনের কাছে তা সারাজীবন মনে থাকে। কিংবা দশ জনের কাছে সারাজীবনের সম্পদ হয়ে যায়।
এখনও বয়স্ক মানুষ শিক্ষকের উদাহরণ দিয়ে বলেন - আমাদের বাংলার শিক্ষক এটা বলতেন ওটা বলতেন। ইত্যাদি ইত্যাদি।
অর্থাৎ শিক্ষকের বলা প্রতিটি শব্দ শিক্ষার্থীর কাছে বেদবাক্য। সেজন্যই বেদ শুধু শিক্ষার্থীর মুখ থেকে মুখে ঘুরে ফিরে বহুকাল থেকেছে। শুধু মাত্র শিক্ষকের বলার উপর ভিত্তি করে। শিক্ষক বলেছেন আর ছাত্রছাত্রীরা এমনভাবে মনে রেখেছে যার এক অক্ষরও হারায় নি বহুযুগ। পুরোটাই তো পরে লিখিত হয়েছে।
শিক্ষক-সমাজকে দেখে যেন শিক্ষার্থী শেখে যে শিক্ষকের কথাই বেদবাক্য।
বর্তমানে এবং যুগ যুগ শিক্ষকের ভরসায় প্রত্যেকের জীবন এবং দেশের দশের জীবন উন্নত শিখর চূড়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
যারা বাড়িতে নিজেরাই ছেলেমেয়েদের (শিক্ষার্থীকে) পড়ান (বাবা মা বা অন্য কেউ) তারা ভাল করেই জানেন স্কুলে শিক্ষক একবার বলে দিলে সেই হোম ওয়ার্ক যত বেশি হোক বা যত কষ্টকর হোক ছাত্রছাত্রী করবেই করবে। কিন্তু বাবা মা বললে গয়ং গচ্চ। শুনতেই চায় না। করছি করছি করব করব, এত তাড়া কেন? এমন কি টিউশন মাস্টার বললেও অতটা গুরুত্ব পায় না।
এবং শিষ্টাচার। শিক্ষক একবার বললেই একশ জনের মধ্যে আশিজন শিক্ষার্থী তা মানবেই। কিংবা বিশ পঞ্চাশ জন। কিংবা পুরো একশ জন। শিক্ষকের বলা যে কোন শিষ্টাচার একজনও শিক্ষার্থী মানবে না বা মানছে না এটা হতে পারে না। হয় না।
যে শিষ্টাচারের কথা বাড়ির লোক পই পই করে বলেও হয় না। যেমন সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা, পড়তে বসা, লিখে লিখে পড়ার অভ্যাস করা, নখ কাটা, খাওয়ার আগে ও পরে ভাল করে হাত মুখ ধোয়া, গুরুজনকে সম্মান করা, মানুষের বিপদে আপদে সাহায্য করা ইত্যাদি।
আবার একই শিষ্টাচারের কথা সেই শিক্ষক যখন রাস্তাঘাটে ঘরে বাইরে বাসে ট্রেনে বলেন বা পাশের জনকে বোঝানোর চেষ্টা করেন তখন কেউ শোনে না বা শুনতে চায় না। কিংবা একজনও শোনে না। উল্টে বলে - বেশি মাস্টারি মারতে আসবেন না তো।
আবার ওই শিক্ষক যখন নিজের ছেলে মেয়েকে পড়ার কথা, শিষ্টাচারের কথা বলেন তখনও ততটা কাজ হয় অথবা হয় না।
তাই স্কুলে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের বলা জরুরী। পড়ানো জরুরী। যেটুকু যতটুকু বোঝানো জরুরি। শিক্ষার্থীর বেঞ্চের সামনে নিয়মিত রোজ প্রতিটি পিরিয়ড দাঁড়ানো জরুরী। শুধু সিলেবাস অনুযায়ী শিক্ষার্থীর সাথে এগিয়ে যাওয়া জরুরী। পুরো চল্লিশ বা পঁয়ত্রিশ মিনিট কিংবা যতটা বেশি সম্ভব শ্রেণিকক্ষে যাওয়া জরুরী। স্কুলের অন্য কি কাজ, কত কাজ শিক্ষক করেন সেটা বড় কথা নয় শ্রেণিকক্ষ যেন ফাঁক না যায় সেটা দেখা জরুরী। তাতেই সমাজ উন্নত হবে। সামাজিক পরিবেশ উন্নত হবে। সম্পর্কের উন্নতি হবে। শিক্ষার্থী মানুষ হবেই হবে। চেতনার উন্মেষ ঘটবে। দেশ দশ এবং জাতি উন্নত হবে।
একশ জনের মধ্যে পাঁচজন, শিক্ষকের পড়ানো বোঝানো ঠিক শুনবে। পাঁচজন ঠিক মনে রাখবে। পাঁচজন এই কথাতে জীবনকে আদর্শের দিকে নিয়ে যাবে। এই পাঁচজন আরও পাঁচজনকে ডেকে আনবে। সেই পাঁচজন আরো পাঁচজনকে ঠিক বুঝিয়ে সঠিক পথে আনবে। ক্লাসে শিক্ষকের পড়া চলাকালীন সবাইকে চুপ করিয়ে শোনাতে বাধ্য করবে এই পাঁচ গুণ পাঁচজন। ফলে বদমাস দুষ্টু ছেলেমেয়ের জন্য আলাদা করে ছড়ি বা লাঠি সবর্স্ব শাস্তির কথা ভাবতেই হবে না।
শিক্ষকের পড়ানোটাই দুষ্টু পাজি শিক্ষার্থীর কাছে শাস্তি। শিক্ষার্থী বা যে কেউ যেটা পছন্দ করে না তাকে যদি তাই করতে বলা হয়, জোর করে করানো হয় তবে তার চেয়ে বড় শাস্তি আর কি হতে পারে? আবার এই শাস্তি সেই দুষ্টু পাজি বদমাস শিক্ষার্থীকে পড়াশুনাতে ফিরিয়ে আনবেই আনবে। কেন না পড়াশুনার যে রস তাকে সে পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়ে রসাস্বাধন করাতে হবে। তা করাতে পারে শিক্ষক। শুধুমাত্র শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর মাধ্যমে। তাহলে আর দুষ্টু ছেলে মেয়ে তৈরিই হবে না। এটাই সবচেয়ে বড় সমাজসেবামূলক কাজ।
এ কথা ঠিক চল্লিশ মিনিটে পুরো বিষয় হয় না। কিন্তু কিছুটা তো হয়। একটু তো হবে। এই একটু অনেকটার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করবে। তাই শিক্ষককে বলতে হবে, পড়াতে হবে, পড়া বোঝাতে হবে ক্লাসে। স্কুলে। স্কুলে প্রতিদিন পড়ানো, পড়া বোঝানো, পড়া দেওয়াই আদর্শগত। এই আদর্শ ভাবনা শিক্ষকের হাত ধরে তৈরি করবে উজ্জ্বল সুন্দর ভবিষ্যৎ।
যদিও শিক্ষক সমাজের মধ্যেই বাস করে। কুটিল সামাজিকতায় অবস্থান করে। তার মধ্যে সব রকমের মানুষ চেতনা থাকবে। ভাল মন্দ দোষ গুণ। তবু শিক্ষক যখন স্কুলে যাবেন তখন তার মধ্যে শিক্ষাদান প্রধান হয়ে উঠলেই শিক্ষা ব্যবস্থা জাগ্রত হবে। পড়ানোর আদর্শগত ভাবনা জাগ্রত হলেই সমাজ গঠনের দিকে শিশুরা মানুষ হয়ে সভ্যতার পথে এগিয়ে যাবে।
পড়ার যেমন কোন বিকল্প নেই তেমনি পড়ানোর কোন বিকল্প নেই। একজন শিক্ষক না পড়ালেও পড়া কিন্তু বসে থাকবে না। যে কোন পন্থায় পড়াশুনা করে ছাত্রছাত্রী এগিয়ে যাবেই। অভিভাবকরাও এই এগিয়ে যাওয়ায় ছাত্রছাত্রীদের বা শিশুটির পাশে থাকবে।
কিন্তু সেইসব ছাত্রছাত্রীরা বা শিক্ষার্থী বা শিশুরা শিক্ষকের না পড়ানো মনে রাখবে। শিক্ষকের ক্লাস পিরিয়ডে ফাঁকি দেওয়া মনে রাখবে। শিক্ষক সেই সময় অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন তা শিক্ষার্থী ধর্তব্যের মধ্যে আনবে না। কোন ছাত্রকে (সবাই হওয়া উচিত) প্রিয় ভেবে খুব ভাল না লিখলেও নম্বর বেশি দেওয়া মনে রাখবে। ক্লাসে না পড়িয়ে ঘর ভর্তি টিউশন পড়ানো মনে রাখবে। চল্লিশ মিনিটের ক্লাসে দশ বিশ মিনিট পরে ঢোকা মনে রাখবে। স্কুলে আছেন অথচ ক্লাসে এলেন না মনে রাখবে। শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষকের কথা ঘুরিয়ে শাক দিয়ে মাছ ঢাকা মনে রাখবে। শিক্ষক হয়েও আপনার অন্য উপার্জন মনে রাখবে। শিক্ষকের ভুলভাল বুঝিয়ে দেওয়া মনে রাখবে। ক্লাসে পড়ানোর জন্য শিক্ষক কোন প্রস্তুতি নিয়ে আসে নি মনে রাখবে। তাই বই ধরে শুধু রিডিং পড়ে গেলেন তাও মনে রাখবে। শিক্ষক সরকারের হয়ে কি কাজ করলেন ছাত্রছাত্রীর তাতে কি? শিক্ষক ক্লাসে আসে নি সেটাই সত্যি।
শিক্ষকের পড়ানোর ইচ্ছে, আগ্রহ ছাত্রছাত্রীরা ঠিক মনে রাখবে। সরল তরল করে বুঝিয়ে দেওয়া ঠিক মনে রাখবে। সিলেবাস অনুযায়ী শিক্ষকের প্রস্তুতি করে এসে পড়ানো মনে রাখবে। শিক্ষকের শিক্ষার্থী প্রীতি (student friendly) মনে রাখবে। আরও অনেক অনেক ভাল, ভালোর ভাল মনে তো রাখবেই।
এবং শিক্ষার্থীর এগিয়ে যাওয়ায় সব মনে থাকবে এবং চরিত্রগতভাবে আদর্শগতভাবে সেই সবই সাথে করে শিক্ষার্থী সমাজের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তেমনভাবে সমাজও এগিয়ে চলবে। আলোর পথে আলো আর আঁধারের পথে গভীর অন্ধকূপ।
কত ভালো ছেলে মেয়ে তার বাবা মাকে পাল্টে দিয়েছে এই স্কুল শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে। সেইসব বাবা মা তার প্রতিবেশীকে পাল্টে দিয়েছে। প্রতিবেশীর কাছে স্কুল শিক্ষায় শিক্ষিত সেই ছেলে মেয়ে আদর্শ হয়ে গেছে।
আবার কত মা বাবা ভাল শিক্ষকের খোঁজ (আদর্শ স্কুল যেখানে পড়ানো হয়) পায় নি বলে ছেলে মেয়েকে মানুষ করতে পারল না। নিজেদের (মা বাবার) আদর্শও ছেলে মেয়ে গ্রহণ করল না। স্কুলের আদর্শ পায় নি বলে।
শিশুদের খেলাধূলার মাঠ কম, শিশুরা খেলাধূলা করার সময় পায় না, নিজের বয়সী তেমন বন্ধুবান্ধব নাই, বেশিরভাগ ঘরবন্দী হয়ে থাকতে হয়, বাবা মায়ের শাসনে শৈশব চুরি হয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি নানা অবস্থান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে এসেছে।
কিন্তু স্কুলের সেই অবস্থান আজও আছে। সেখানে অল্প হলেও শিক্ষার্থীর খেলার মাঠ আছে। নিজের বয়সী বন্ধুবান্ধব আছে। টিফিনে নিজেদের মত করে খেলার সুযোগ আছে। বিভিন্ন চরিত্রের সাথে প্রতিদিন পরিচিত হওয়া যায়। সেখানে শিশু যা কিছু করে সম্পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে। শিক্ষক মর্যাদায়। শৈশবের এই অবস্থান আজও কোনভাবেই চুরি হয় নি। পড়াশুনার সাথে সাথে এই স্কুলচরিত জীবনের সাত রঙা রামধনু। যার হাত ধরে সমাজ সভ্যতা এগিয়ে চলেছে।
তাই হাই-ফাই নামী দামী বিল্ডিং সর্বস্ব স্কুল নয়, নিয়মিত ক্লাস নেওয়া নিয়ম নিষ্ঠ স্কুল দরকার। যেখানে বেশি জ্ঞান গর্ব বোমবাস্টিং ভাবনা নয়, শুধু নিয়মিত পড়া হয়। সিলেবাস অনুযায়ী পড়া হয়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক পড়া নেন পড়া দেন।
শিক্ষার্থীরা প্রাইমারীতে শিক্ষককে চার পাঁচ বছর ধরে দেখে। আর তার উপরের পর্যায়ে সাত আট বছর ধরে শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীরাও স্কুলে যায়। শিক্ষকের চলন বলন কথন বর্ণন ঘুর্ণন সব কিছু ছাত্রছাত্রীরা দেখে; দেখে শেখে। খারাপ ভাল দুই অবস্থান। কলেজে যাওয়ার আগে এইক'টা বছর সমস্ত মানুষের ক্ষেত্রে আদর্শ।
একটি শিশু শব্দের মাধ্যমে ১%
স্পর্শের মাধ্যমে ১.৫%
গল্পের মাধ্যমে ৩.৫%
শোনার মাধ্যমে ১১%
আর দেখার মাধ্যমে ৮৩% (একটি তথ্যসূত্র অনুযায়ী)
তাই এই শেখার দায় শিক্ষকের উপর অনেকটাই বর্তায়। প্রাইমারীতে শিক্ষকের শেখানোটাই সবচেয়ে জরুরী। কেন না সমাজের অন্য যে কোন স্তরের থেকে, মানুষজনের থেকে শেখা শিক্ষার্থীদের বা শিশুদের মনে তেমন প্রভাব বিস্তার করে না। যদি প্রভাব বিস্তার করেও স্কুলে শিক্ষকদের ভালো সেই সব অশিষ্টাচার হেলায় দূরে সরিয়ে ভাল হিসেবে প্রতিভাত হয়। খারাপকে ছাপিয়ে যায়। শিক্ষার্থীই উল্টে সমাজের বুকে খুব সহজে শিক্ষকের প্রভাব ছড়িয়ে দিতে পারে। সেই প্রভাব সমাজের সমস্ত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আরও সহজে।
তাহলে প্রভাব তৈরি করতে হবে শিক্ষককে। যাতে তাঁর অনুসারী হয়ে সমাজে সুফল ছড়িয়ে পড়ে। উল্টো করে দেখলেও তো ভাবা যেতে পারে বর্তমান সমাজের অবক্ষয় সে রকম কোন ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে না তো?
যেমন কোন ছাত্রছাত্রী ভালো ফল করলে বা মানবিক মুখ হলে শিক্ষক গর্ব করেন - এ আমার ছাত্র বা ছাত্রী ছিল। আমাদের ছাত্র বা ছাত্রী ছিল। ঠিক একই রকমভাবে "মাস্টার মশাই আপনি কিছু দেখেন নি" যে ছাত্র বা ছাত্রীর মধ্যে দেখা গেল তার দায় ভারও তো শিক্ষকের।
সেজন্য প্রতিটি সরকারের উচিত শিশুকে যে করে হোক বিদ্যালয়মুখী করা। বিশেষ করে প্রাইমারীতে। এই সময় শিশুর বা শিক্ষার্থীর অবুঝ মনে যতটুকু সবুজ দাগ পড়বে ততটাই সমাজও এগিয়ে যাবে সবুজের পথে। সবুজ তৈরি হলে তবেই তো সবুজ মনকে বলতে পারব,
ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা
ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।
এ রকম কবিতা লিখে, গল্প লিখে, প্রবন্ধ লিখে, উপন্যাস লিখে, উপদেশ দিয়ে সমাজ শুদ্ধিকরণ যতটা না হবে তার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ শুদ্ধিকরণ হবে শুধু মাত্র শিক্ষকের প্রতিদিন একটু একটু করে পড়ানোতে। প্রতি বছর একশজন কিংবা পঁচিশ তিরিশজন শিক্ষার্থী স্কুলে এলে একজন শিক্ষকের কম করে কুড়ি পঁচিশ বছরের শিক্ষকতায় কত ছাত্রছাত্রী প্রভাবিত হয়ে যায়।
আপনি কতটা জানেন সেটা বড় কথা নয় আপনি কতটা অন্যের মন ও মনন অনুসারে অন্যকে জানাতে পারলেন সেটাই বিচার্য। অন্যকে, অন্যের মত করে যতটা আপনি জানাতে পারলেন ততটাই আপনি শিক্ষক। শিক্ষা প্রদানকারীই শিক্ষক। জ্ঞানী পণ্ডিত প্রাজ্ঞ ব্যক্তি শিক্ষক নন। যদি তিনি অন্যের মন ও মননকে হেয় করেন।
অন্য যে কোন কিছুর সাথে শিক্ষক যুক্ত হতেই পারেন কিন্তু প্রথম প্রায়োরিটি পড়ানো। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে। শিক্ষার্থীর সেই প্রতীক্ষা যাতে সফল হয় তার জন্য অন্য কিছু নয়, শুধুমাত্র বিষয় ভিত্তিক পড়ানো দরকার।
এভাবেই পড়ানোর ফলে পুঁথিগত বিদ্যাই মননগত বিদ্যাতে পরিণত হবে। শিক্ষার প্রারম্ভ তো পুঁথি দিয়েই শুরু করতে হয়। তাছাড়া পুঁথিতেই সব লেখা আছে। শিক্ষকের হাত ধরে, গুরুর তত্ত্বাবধানে সেই পুঁথিগত বিদ্যা খুব সহজে মননগত হয়। শুধুমাত্র শিক্ষকদের শিক্ষাদানের মাধ্যমে।
আমি যদি নিজে নিজে কোন বই পড়ি সেটা হল পুঁথিগত বিদ্যা। আর আমাকে যদি কেউ সেই বই অনুসারে বলে বা বুঝিয়ে দেয় সেটা হল মননগত। শিক্ষক যদি শ্রেণিকক্ষে না পড়ায় তাহলেও শিক্ষার্থী পড়ে নিচ্ছে। তাহলে তা হয়ে যাচ্ছে পুঁথিগত বিদ্যা। এই পুঁথিগত বিদ্যা মননগত করতে না পারলে সমাজের অবক্ষয় অবশ্যম্ভাবী। দায়িত্ব শিক্ষকের।
বোধ জন্মানোর পরে মানুষের জীবনে একটা সময় তো পুঁথি নিজেই শিক্ষক হয়ে যায়। পুঁথিকে সাথে করে কত প্রাজ্ঞ বিজ্ঞ ব্যক্তি চরিত্রগতভাবে অনিন্দ্য সুন্দর হয়ে গেছেন। তার মানে পুঁথিই তখন মননগত।
কিন্তু বোধ জন্মানোর আগে শিক্ষক এবং গুরু বা শিক্ষাগুরু থাকা দরকার। সেই সাথে শিক্ষা দেওয়াও জরুরী। মননগত শিক্ষা দেওয়া জরুরি।
সেইজন্য সমস্ত অবস্থানে শিক্ষক জরুরী। প্রতিভা যতই থাক, যত বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন হোক সঠিক অবস্থানে, সঠিক দিশায় এবং সঠিক শিক্ষকের হাতে না পড়লে প্রতিভা বিনষ্ট হতে সময় লাগে না। খেলাধূলা, নাচ, গান, আঁকা, আবৃত্তি ইত্যাদি প্রতিভা প্রস্ফুটিত হওয়ার ক্ষেত্রেও শিক্ষক বা গুরু জরুরী।
এবং সেই শিক্ষা দিতে হবে সঠিক স্থানে। খেলাধূলা শেখাতে হবে খেলার মাঠে, নাচ শেখাতে হবে নাচের ক্লাসে, গান গানের প্রতিষ্ঠানে, আঁকা আঁকার পরিবেশে এবং স্কুলে শ্রেণিকক্ষে। না হলে হবে না। অন্য কোথাও (যেমন টিউশন) ছড়িয়ে ছিটিয়ে শিক্ষা হয়তো নেবে, প্রতিভা বুদবুদের মত হয়তো ফুটে উঠবে কিন্তু মানুষের মত মানুষ হবে না। স্পোর্টম্যান স্পিরিট পাবে না। শেখাকে মননগত করতে পারবে না।
সমাজের বুকে এমন হাজার হাজার লাখো লাখো স্কলার আছে তারা নিজ নিজ অবস্থানে উজ্জ্বল কিন্তু মানুষ হয় নি। প্রতিভার অবমূল্যায়নে কেমন যেন রুঢ় হয়ে গেছে। আমরা সেইসব নওজোয়ানদের দোষ দিই। অপব্যাখ্যা করি। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছি তার মূলসূত্রটা কোথায়? কেন এমন হল? তার প্রাথমিক শিক্ষাটুকু যে সে মননগতভাবে পেল না? কেন শুধু যান্ত্রিক পুঁথিগত বিদ্যা তাকে দেওয়া হল। সে তো বইয়ের "সদা সত্য কথা বলবে, গুরুজনকে মান্য করবে, চুরি করা অন্যায়, ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক, বাবা ছেলে সম্পর্ক, পরিবারের বন্ধন" এসব সে পুঁথিগতভাবে বুঝেছিল কিন্তু মননগতভাবে অনুভব করতে পারে নি।
এই অনুভব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় শ্রেনিকক্ষে। মননগতভাবে।
আমার ছেলে কারো কাছে ক্রিকেট শিখল না সে সচিন তেণ্ডুলকর হতে পারবে? খেলা শিখলেও পারবে না। গুরু হিসেবে তাকে খেলাটাও মননগতভাবে দিতে হবে। আমার মেয়ে কারো কাছে গান শিখল না লতা মঙ্গেশকর হতে পারবে? আমার শিশু কারো কাছে আঁকা শেখে নি তাও সে যোগেন চৌধুরি হবে? হবে না। হতে পারে না। গুরু বা শিক্ষকের অবস্থান যতটা স্বচ্ছ আন্তরিক ও মননগত হবে ততটাই শিক্ষার্থীর জীবনের পথে মানুষ হিসেবে অগ্রবর্তী হবে।
একলব্য নিজে নিজেই দেখে দেখে শিখে ধুনুর্ধর হয়ে উঠেছিল। তাও দ্রোনাচার্যের বিগ্রহ, গুরু হিসেবে সামনে রেখে। কেননা শিক্ষক বা গুরু দরকার। গুরু বা শিক্ষককে দেখে তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে শিশু বা শিক্ষার্থী বা প্রতিভা সমাজের বুকে প্রতিভাত হয়। একজন নয়, অনেকজন নয়, সবাই। সবাই সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ শিক্ষকের ভরসায়।

তাই শ্রীমদ্ভাগবৎ গীতার প্রারম্ভে বলা আছে

অখন্ড মন্ডলা কারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম।
তদপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ।
অজ্ঞান তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন শলাকয়া।
চক্ষুরুন্মিলিত যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ।
গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বর।
গুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ।
বিষয়শ্রেণী: সমসাময়িক
ব্লগটি ২৭৬ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ০৬/০৬/২০১৮

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • সেলিম রেজা সাগর ২০/০৬/২০১৮
    অসাধারণ।
  • খুব ভালো লাগলো
  • রবিউল হাসান ০৬/০৬/২০১৮
    অনেক গুরত্বপূর্ন লেখা।
 
Quantcast