আলেমরা মসজিদের মিম্বরে, মাহফিলের বয়ানে ইসলামের কোন কোন বিধান নিয়ে আলোচনা করবেন আর কোন বিধানের ব্যাপারে চুপ থাকবেন সেটাও তারা এবং তাদের দেশীয় গোলামেরা ঠিক করে দেয়। দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে মুসলিমরা কখনো এমন নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি। মুসলিমদের রাষ্ট্র, সমাজ ও দ্বীনী মারাকেজ সব এক সাথে কুফফারদের দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। কখনো কখনো একটা আক্রান্ত হয়েছে কিন্তু তখন অন্যগুলো স্বকীয়তা বজায় রেখে মুসলিমদের রাহনুমায়ী করে গেছে। কিন্তু ১৭ শতকের পর যখন থেকে মুসলিম দেশগুলো ইউরোপীয়দের উপনিবেশে পরিণত হল, এরপর থেকে পরিস্থিতি পালটে গেছে। তারা একসাথে সবগুলো কেন্দ্রকে আক্রমণ করেছে, যেন মুসলিমরা কোনভাবেই ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ না পায়। উপনিবেশবাদীরা চলে যাওয়ার পর ক্ষমতায় আসা পশ্চিমের দাসরাও প্রভূদের দেখানো পথে মুসলিমদের শাসন করছে।

ইতিহাসে দেখা গেছে, বেশ কয়েকবার রাজনৈতিকভাবে মুসলিমরা আক্রান্ত হয়েছে, ক্ষমতা বদ দ্বীন এবং বেদ্বীনদের হাতে গেছে। কিন্তু তারা ব্যপকভাবে সমাজকে ইসলামশূণ্য করার ক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি। আলেমদেরকে জিহাদ ও খিলাফাহর বিরুদ্ধে বলতে বাধ্য বা প্রভাবিত করতে পারেনি। আইন আদালত ও শাসনব্যবস্থাকে কুফরী সিস্টেমে সাজিয়ে আলেমদেরকে এর পক্ষে বয়ান দিতে এবং এটিকে ইসলামী ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরতে বাধ্য কিংবা প্রভাবিত করতে পারেনি।

তাতারীদের সময় সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে মুসলিমরা পরাজিত হয়েছিল, বর্তমান সময়ের মত একদল ধূর্ত লোক ক্ষমতায় আরোহন করেছিল। সেসময় তারা একটা সংবিধান লিখেছিল। নাম ছিল- ইয়াসিক। এটি তারা বিভিন্ন ধর্মের কিতাব থেকে নিজেদের খেয়ালখুশিমত আইন বিধান দিয়ে সাজিয়েছিল। এটি বর্তমান বাংলাদেশ পাকিস্তান ও অন্যন্য মুসলিমদেশের সংবিধানের মত ছিল অনেকটা। কিন্তু তখনকার উলামায়ে কেরাম এই সংবিধান মেনে নেননি, চুপ থেকে কুফরী বিধানগুলোর প্রতি নীরব সমর্থন দেননি। বরং এটিকে কুফরী বলে ফাতওয়া দিয়েছেন। এই সংবিধানের আলোকে পরিচালিত আদালতে বিচারপ্রার্থী হলে ঈমানহারা হতে হবে বলে মুসলিমদেরকে সতর্ক করেছেন। পরবর্তীতে আরো কিছু জায়গায় খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের অবস্থা কখনো এতটা নাজুক হয়নি, মুসলিমদের দ্বীন ঈমান রক্ষার সবগুলো কেন্দ্র একসাথে আক্রান্ত হয়নি। সেসময়কার আলেমরাও সেই অবস্থাকে মেনে নেননি, বরং সাধ্যমত প্রতিবাদ প্রতিরোধ করেছেন, অবস্থা পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা মেহনত করেছেন।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মুসলিমদের মধ্যে এক ধরণের স্থবিরতা বিরাজ করছে। কুফরী শাসনব্যবস্থা ও শাসক কর্তৃক কুফফারদের গোলামীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিবর্তে মেনে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি উম্মাহর জন্য অনেক বড় উদ্বেগ ও গভীরভাবে চিন্তা করার মত একটি বিষয়। কারণ আল্লাহ তাআলা নিজস্ব চেষ্টা না থাকলে কোন জাতিকে এমনি এমনি মুক্তি দেন না। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
اِنَّ اللّٰہَ لَا یُغَیِّرُ مَا بِقَوۡمٍ حَتّٰی یُغَیِّرُوۡا مَا بِاَنۡفُسِہِمۡ ؕ وَاِذَاۤ اَرَادَ اللّٰہُ بِقَوۡمٍ سُوۡٓءًا فَلَا
مَرَدَّ لَہٗ ۚ وَمَا لَہُمۡ مِّنۡ دُوۡنِہٖ مِنۡ وَّالٍ
আল্লাহ কোনও জাতির অবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। -[সুরা রাদ ১১]
গ'ণ'তন্ত্র, পুঁজিবাদ ও ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া শরীয়তের দৃষ্টিতে আমাদের জন্য মুক্তির কোনো পথ নেই। নিজেদের দ্বীন-ঈমান হেফাজত করতে হলে এসব কুফরী মতাদর্শের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ছাড়া ভিন্ন কোনো উপায় নেই। হাজার হাজার মাখলুকের দাসত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ও সমাজ ছেড়ে এক আল্লাহর গোলামীর রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
© শাইখ তামিম আল আদনানী হাফিজাহুল্লাহ