আমার নানুবাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি সরু খাল। খালটির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বহু বছরের পুরোনো একটি পরিত্যক্ত ভিটা। একসময় সেখানে মানুষের বসতি ছিল, কিন্তু নানা কারণে বাড়িটি ফাঁকা হয়ে যায়। তবে মাঝেমধ্যে দূর-দূরান্ত থেকে কেউ এসে কয়েক মাস বা কয়েক বছর সেখানে বসবাস করত।
বাড়ির পাশে একটি পুরোনো পুকুর ছিল। পুকুরটির সঙ্গে খালের একটি ছোট্ট সংযোগ ছিল, যেন সরু একটি জলপথ। আশ্চর্যের বিষয়, গ্রামজুড়ে একটি কথা প্রচলিত ছিল—যে-ই সেই জলপথটি বাঁধ দিয়ে বন্ধ করত, তার অদ্ভুত সব বিপদ শুরু হতো। কেউ জ্বরে পড়ত, কেউ আবার অস্বাভাবিক স্বপ্ন দেখত। অনেকেই এটিকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিত, আবার কেউ কেউ ভয়ে কখনো সেই জলপথে হাত দিত না।
একবার এক নতুন পরিবার এসে সেই বাড়িতে উঠল। পরিবারের কর্তা ছিলেন যুক্তিবাদী এবং বেশ একগুঁয়ে স্বভাবের মানুষ। বাড়ি পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি দেখলেন, পুকুরের পানি ছোট্ট একটি নালার মাধ্যমে খালের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মনে হলো, এতে পুকুরের ক্ষতি হতে পারে। তাই তিনি মাটি ফেলে সংযোগটি বন্ধ করে দিলেন।
সেদিন রাতেই তিনি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন। যেন কেউ তাঁকে বারবার বলছে, "বাঁধ খুলে দাও।"
ঘুম ভাঙার পর তিনি স্বপ্নটিকে গুরুত্ব দিলেন না।
পরদিন সন্ধ্যার একটু আগে তিনি বাঁধের কাছে গেলে অবাক হয়ে দেখলেন, সেখানে পাশাপাশি মাথায় ঝুঁটির মতো উঁচু অংশওয়ালা দুটি বিশাল সাপ বসে আছে। কিছুক্ষণ পর সাপ দুটি ধীরে ধীরে সরে গেল। গ্রামের মানুষ হলে হয়তো তখনই ভয়ে বাঁধ খুলে দিত, কিন্তু তিনি ছিলেন অন্যরকম। সবকিছুকে কুসংস্কার ভেবে তিনি কোনো গুরুত্বই দিলেন না।
কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর এবং তাঁর ছোট মেয়ের জ্বর এলো। তিনি আরও বিরক্ত হয়ে ভাবলেন, সবাই নিশ্চয়ই এসব গল্প বানিয়ে মানুষকে ভয় দেখায়। রাগের মাথায় আগের বাঁধ ভেঙে না দিয়ে উল্টো আরও শক্ত করে মাটি ফেলে সেটিকে মজবুত করে দিলেন।
এরপর কিছুদিনের মধ্যে তাঁর জ্বর সেরে গেল। কিন্তু ছোট্ট মেয়েটির অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে লাগল। চিকিৎসা চলল, তবু সে সুস্থ হলো না।
এই সময় তিনি বারবার একই ধরনের স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। স্বপ্নে যেন একটি অদৃশ্য কণ্ঠ তাঁকে সতর্ক করে বলত, "বাঁধ খুলে দাও। না হলে তোমার মেয়েকে বাঁচাতে পারবে না।"
তবুও তিনি বিশ্বাস করলেন না। তাঁর দৃঢ় ধারণা ছিল, অসুস্থতার সঙ্গে এসব স্বপ্নের কোনো সম্পর্ক নেই।
সময় গড়াল। দীর্ঘ অসুস্থতার পর একদিন তাঁর ছোট্ট মেয়েটি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল।
সেই ঘটনার পর আর কখনো তাঁদের পরিবারকে ওই ভিটায় থাকতে দেখা যায়নি। কিছুদিনের মধ্যেই তারা বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়।
আজও গ্রামের প্রবীণ মানুষরা সেই ভিটার কথা বললে এই ঘটনাটি স্মরণ করেন। কেউ বলেন এটি ছিল নিছক কাকতালীয়, কেউ বলেন প্রকৃতির অজানা কোনো রহস্য, আবার কারও বিশ্বাস—সেই পুরোনো খাল আর পুকুরের জলপথে এমন কিছু ছিল, যা মানুষের অজানাই থেকে গেছে।
সত্য-মিথ্যার বিচার আজও হয়নি। তবে গল্পটি এখনও গ্রামের মানুষের মুখে মুখে বেঁচে আছে—একটি রহস্যময় লোককাহিনী হয়ে।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।