নব্বইয়ের দশকের গ্রামীণ শৈশব ছিল যেন অন্য এক পৃথিবী। তখন গ্রামের স্কুলগুলোতে পড়ালেখার চাপ আজকের মতো ছিল না। সকালে স্কুল, সন্ধ্যায় ঘণ্টাখানেক পড়াশোনা—ব্যস! তারপর শুরু হতো অন্য এক জগৎ। রাতের খাবার খেয়ে দাদি-নানি কিংবা বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে রাজপুত্র-রাজকন্যা, রাক্ষস-খোক্কস, পরী, জিন-ভূত আর অদ্ভুত সব রূপকথার গল্প শুনতে শুনতেই কেটে যেত রাত। আর দিনের বেলাটা ছিল সম্পূর্ণ আমাদের।
স্কুল ছুটি হতো দুপুরের আগেই। বাড়ি ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে বই-খাতা একপাশে রেখে আমরা বেরিয়ে পড়তাম। বিশাল মাঠে দৌড়ঝাঁপ, গাছে চড়া, শাপলা-শালুকে ভরা খালে ডুব দেওয়া, শাপলা ফুলের মালা গেঁথে গলায় পরা, বাগানে বাগানে পাখির বাসা খোঁজা—এসবই ছিল আমাদের প্রতিদিনের আনন্দ। তখন আনন্দ খুঁজে নিতে কোনো মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট বা ভিডিও গেমের প্রয়োজন ছিল না; প্রকৃতিই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় খেলার মাঠ।
একদিন আমরা পাঁচ-ছয়জন বন্ধু খেলতে খেলতে গ্রামের অনেক দূরে চলে গেলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল এক বিশাল ঝোপঝাড়। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, জায়গাটিতে বহুদিন কোনো মানুষের পা পড়েনি। এতটাই ঘন ঝোপ যে গ্রামের বড়রাও সেখানে যেতে চাইতেন না। সাপ, বোলতা আর অজানা ভয়ের কারণে জায়গাটি যেন সবার কাছেই নিষিদ্ধ ছিল।
কিন্তু আমাদের বয়সে ভয়ের চেয়ে কৌতূহলই ছিল অনেক বড়।
আমরা লাঠি হাতে সাবধানে ঝোপ সরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। কয়েক কদম এগোতেই মনে হলো যেন প্রকৃতির এক গোপন রাজ্যে চলে এসেছি। চারদিকে নিস্তব্ধতা, শুধু পাখির ডাক আর বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ। মনে হচ্ছিল, বহু বছর ধরে প্রকৃতি নিজের হাতে এখানে এক গোপন ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে।
সবার আগে চোখে পড়ল কয়েকটি পেয়ারা গাছ। ডালে ডালে ঝুলছে অসংখ্য পাকা পেয়ারা। অনেকগুলো পাখির ঠোঁটে আধখাওয়া, আবার অনেকগুলো গাছের নিচে পড়ে আছে। এমন দৃশ্য দেখে আমাদের আর ধৈর্য রইল না। যে যার মতো গাছে উঠে পেয়ারা পাড়তে শুরু করলাম। পেট ভরে খেলাম, আবার জামার কোঁচড় আর হাতে করে অনেকগুলো সঙ্গে নিলাম।
আরও একটু ভেতরে গিয়ে আমরা অবাক হয়ে গেলাম। সেখানে একটি আখের ঝাড়!
আমাদের একজন বলল,
— "নিশ্চয়ই কেউ লাগিয়েছে।"
আরেকজন সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
— "না রে, এ জায়গাটা আমার চাচার। তিনি অনেক দিন ধরে এখানে আসেন না। একদিন বলেছিলেন, ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে হবে। কিন্তু মনে হয় আর হয়ে ওঠেনি।"
আমরা একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এত বছর মানুষের পা না পড়লেও প্রকৃতি ঠিকই নিজের মতো করে সবকিছু আগলে রেখেছে।
সেদিন সেই ঝোপঝাড় আমাদের কাছে আর সাধারণ কোনো ঝোপ ছিল না। মনে হচ্ছিল, এটি যেন প্রকৃতির লুকিয়ে রাখা এক গুপ্তধন।
আরও এগিয়ে আমরা পেলাম আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের পরিচিত ফল—মামা কলা। সাধারণত নদীর পাড়ের জঙ্গল আর লতানো গাছে এ ফল জন্মায়। পাকা ফলগুলো পেড়ে খেলাম। আশপাশে আরও দেখা গেল বিশাল জাম গাছ, ডেওয়া গাছ এবং আরও কয়েকটি ফলের গাছ। যদিও সেদিন সেগুলোতে ফল ছিল না, তবুও তাদের উপস্থিতিই জায়গাটিকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তুলেছিল।
এরপর শুরু হলো আমাদের আসল অভিযান—পাখির বাসা খোঁজা।
একটার পর একটা ঘুঘু পাখির বাসা চোখে পড়তে লাগল। গুনে দেখি অন্তত দশ-বারোটি বাসা। কোথাও ডিম, কোথাও সদ্য ফুটে ওঠা ছোট্ট ছানা, আবার কোথাও ডানা ঝাপটাতে শেখা বড় বাচ্চা। আমরা শুধু দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। বাসাগুলোতে হাত দিইনি। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন তাদের রাজ্যে অতিথি হয়ে এসেছি।
কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, টেরই পাইনি। হাতে ছিল কয়েকটি পেয়ারা, কিন্তু মনে ছিল অজস্র আনন্দ আর বিস্ময়।
আজ এত বছর পর বুঝি, সেদিন আমরা শুধু একটি ঝোপে ঢুকিনি; ঢুকে পড়েছিলাম এমন এক শৈশবের রাজ্যে, যেখানে প্রতিটি গাছ ছিল একেকটি গল্প, প্রতিটি পাখির বাসা ছিল একেকটি বিস্ময়, আর প্রতিটি বিকেল ছিল একেকটি উৎসব।
আজকের শিশুরা হয়তো প্রযুক্তির আশ্চর্য সব সুবিধা নিয়ে বড় হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতির বুকে লুকিয়ে থাকা এমন এক অজানা রাজ্য আবিষ্কারের আনন্দ, বুকভরা কৌতূহল নিয়ে নিষিদ্ধ এক ঝোপের ভেতরে ঢুকে বিস্ময়ের পর বিস্ময় খুঁজে পাওয়ার অনুভূতি—সেটা হয়তো তারা কোনো দিনই বুঝতে পারবে না।
আজও চোখ বন্ধ করলে সেই ঝোপঝাড়, পাকা পেয়ারার গন্ধ, ঘুঘুর ডাক আর বন্ধুদের হাসির শব্দ যেন কানে ভেসে আসে। মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ যদি কিছু থেকে থাকে, তবে তা কোনো ধন-সম্পদ নয়—সে হলো হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালি শৈশব।

মন্তব্য (1)