টিকটিক, টিকটিক।
দেয়ালঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটাটা বড্ড জোরে শব্দ করছে। ঘড়িতে এখন রাত একটা বেজে সাতাশ মিনিট।
১৯৮৪ সালের একটা বর্ষণমুখর রাত। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, সাথে দমকা হাওয়া। বৃষ্টির একটা নিজস্ব ঘ্রাণ আছে। সেই ঘ্রাণটা জানালার গ্রিল গলে ঘরের ভেতর চলে আসছে।
টেবিল ল্যাম্পের মৃদু নীল আলোয় বিছানায় উপুড় হয়ে জীবনানন্দের কবিতা পড়ছিল অয়ন। হঠাৎ মনে হলো, বন্ধু সাজ্জাদকে একটা ফোন করা দরকার। হয়তো এখনো ছেঁড়া খাতায় কবিতা কাটাকুটি করছে সে।
অয়ন বিছানা থেকে নেমে অন্ধকারে আন্দাজে ল্যান্ডফোনের রোটারি ডায়াল ঘোরাল—
ট্যাঁড়ড়ড়... ট্যাঁড়ড়ড়...।
তাড়াহুড়োয় শেষ ডিজিটটা বোধহয় ভুল হয়ে গেল।
তিনবার রিং হতেই রিসিভার তোলা হলো। খসখসে লাইনের ওপার থেকে ঘুম-জড়ানো, মায়াবী কণ্ঠ ভেসে এল,
"হ্যালো?"
অয়ন কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেল। বিষম খাওয়ার মতো করে বলল,
"দুঃখিত, আমি কি সাজ্জাদের নম্বর... মানে, এটা কি ৮৬৩...?"
“না, ভুল নম্বর,”
মেয়েটা শান্তভাবে বলল। ফোনটা রেখে দিতে যাচ্ছিল সে। অয়ন হঠাৎ বলে ফেলল,
"আরে, শুনুন! প্লিজ রাখবেন না।"
মেয়েটা থেমে গেল।
মেয়েটার কণ্ঠের মায়ায় অয়ন স্তব্ধ হয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল,
"আসলে... এত রাতে আপনার ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম। খুব অপরাধবোধ হচ্ছে। বাইরে এত বৃষ্টি, ভাবলাম আমার মতো কেউ বুঝি জেগে আছে।"
ওপাশে একটু চুপচাপ।
তারপর একটা চড়ুই পাখির ডানার ঝাপটানির মতো মৃদু হাসির শব্দ হলো।
“আমার জানালার পাশে বৃষ্টির পানি এসে পড়ছে। ঘুমটা আসছিল না তেমন।”
অয়ন বুঝল না কেন, তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ খুব হালকা হয়ে গেল।
মেয়েটা জিজ্ঞেস করল।
“আপনি কি কবিতা পড়েন?”
“হ্যাঁ… একটু।”
“তাহলে আজকের রাতটা আপনার জন্য ভালো রাত।”
এভাবেই শুরু হলো। কোনো পরিচয় নেই, নাম নেই—শুধু একটা ভুল লাইনের ভেতর দিয়ে দুটো অচেনা মানুষ কথা বলতে শুরু করল।
বৃষ্টি, পুরনো গান, ভেজা জানালা, একা ঘর—সব মিলিয়ে সময়টা যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছিল।
অয়নের মনে হচ্ছিল, এই কণ্ঠ সে বহুদিন কোথাও শুনেছে। হয়তো কোনো জন্মের আগের স্মৃতি।
ঘড়ির কাঁটা ঘুরে চলল। এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা। মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো বোধহয় খুব দ্রুত চলে যায়।
গভীর রাতে, কথার মাঝখানে মেয়েটি হুট করে বলল,
"আচ্ছা, একটা কথা বলব?"
অয়ন বলল, "বলুন।"
"আজকের রাতটা না বড্ড অদ্ভুত... কেমন যেন একটা জাদুকরী রাত।"
ঠিক তখনই প্রকৃতির জাদুটা ভেঙে গেল। বাইরের আকাশে প্রচণ্ড শব্দে একটা বাজ পড়ল। আর সাথে সাথে তখনকার ল্যান্ডফোন লাইনের স্বভাবসুলভ একটা তীব্র 'ক্লিক' শব্দ হলো।
ওপাশটা একদম নিস্তব্ধ। লাইনটা কেটে গেছে। অয়ন হন্যে হয়ে রিসিভার কানে চেপে ধরে রইল, "হ্যালো? হ্যালো? শুনতে পাচ্ছেন?"
ওপাশে আর কোনো সাড়া নেই। শুধু একটা একটানা, প্রাণহীন 'ডায়াল টোন' বেজে চলেছে—
তুউউউ... তুউউউ...।
অয়ন তাড়াহুড়ো করে আবার ডায়াল করতে গেল। কিন্তু হাতটা মাঝপথেই থেমে গেল। তখনই বুঝল—
অন্ধকারে আন্দাজে ডায়াল করেছিল, শেষ সংখ্যাটা কী ছিল, তার আর মনে নেই।
আর তখনকার ফোনে তো কলার আইডি নামের কোনো বিজ্ঞান ছিল না যে মেয়েটি তাকে খুঁজে নেবে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগল তখন, যখন অয়ন বুঝতে পারল—
দুই ঘণ্টা ধরে হৃদয়ের সব কথা বলেও, সে মেয়েটির নাম জানতে চায়নি। মেয়েটিও জানতে চায়নি তার নাম।
ঝুম বৃষ্টির রাতে, নিভৃত এক ঘরে, একটা নামহীন মায়াবী কণ্ঠ আর একটা হারিয়ে যাওয়া নম্বর চিরকালের জন্য একটা অপূর্ণ দীর্ঘশ্বাস হয়ে রয়ে গেল।
হিমু বা মিসির আলির দেশের কোনো এক অতৃপ্ত গল্প যেন ডানা মেলে মিলিয়ে গেল বাতাসে।

মন্তব্য (0)
শুধু নিবন্ধিত সদস্যরা মন্তব্য করতে পারবেন। লগ ইন করুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।