আমার কথাটা শুনে Sinead কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর তার মুখে একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল। হয়তো সে বুঝেছিল—বন্ধুত্বের কিছু জায়গায় কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না।
Sinead, ওই দুই ছেলে আর আমি—আমাদের নিয়ে তিনজন Garda একটা ছোট রুমে ঢুকল। ঘরের ভেতর একটা অদ্ভুত নীরবতা ছিল।
কালরাতে যেখানে রাগ, চিৎকার আর মারামারি ছিল, এখন সেখানে সবাই চুপচাপ বসে আছে।
একজন Garda প্রথমে ওই দুই ছেলের দিকে তাকালেন।
তিনি শান্ত গলায় বললেন,
— আইরিশ আইনে কেউ যদি বর্ণবাদের মতো অপরাধ করে, তাহলে তার শাস্তি অনেক গুরুতর হতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত তোমাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ করা হয়নি। যদি অভিযোগ হয় এবং সেটা প্রমাণিত হয়, তাহলে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে।
তিনি একটু থামলেন।
তারপর বললেন,
— তবে তোমরা সরাসরি আক্রমণাত্মক আচরণ করোনি, তাই বাস্তবে শাস্তি হয়তো কয়েক মাসের জেল এবং জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
এরপর Garda Sinead-এর দিকে তাকালেন।
বললেন,
— কিন্তু তোমার ক্ষেত্রেও একটা বিষয় আছে। প্রথম আঘাতটা তুমি করেছো। আইন অনুযায়ী এর শাস্তিও হতে পারে। সর্বোচ্চ ছয় বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে। তবে যেহেতু আঘাতটা তুলনামূলকভাবে গুরুতর নয়, বাস্তবে শাস্তি হয়তো অনেক কম হবে।
Garda খুব সংক্ষেপে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে দিলেন।
শেষে বললেন,
— এখন সিদ্ধান্ত তোমাদের। তোমরা কী করতে চাও, সেটা তোমরাই ঠিক করো।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর ওই দুই ছেলে একসঙ্গে বলল,
— আসলে আমরা ড্রাঙ্ক ছিলাম। পুরো ঘটনার জন্য আমরা দুঃখিত।
তারপর তারা আমার দিকে তাকাল।
একজন বলল,
— আমরা আসলে তোমাকে ছোট করার জন্য কিছু বলতে চাইনি। কিন্তু যা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি। আমরা সত্যিই দুঃখিত।
আমি কিছু বলার আগেই Sinead কথা বলল।
সে বলল,
— আমিও দুঃখিত। প্রথমে এভাবে আঘাত করা আমার ঠিক হয়নি। সুমন আমার খুব ভালো বন্ধু। ওকে কেউ অপমান করলে আমার খারাপ লাগে। হয়তো সেই রাগটা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।
তারপর একটু থেমে বলল,
— আমিও দুঃখিত।
সবাই যখন নিজের নিজের ভুল স্বীকার করছে, তখন মনে হচ্ছিল—মানুষের সবচেয়ে সুন্দর দিকটা হয়তো এটাই। ভুল করা নয়, ভুল বুঝতে পারাটাই বড় বিষয়।
এরপর Garda আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— তোমার কোনো অভিযোগ আছে?
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম,
— না, আমার কোনো অভিযোগ নেই।
Garda মাথা নেড়ে বললেন,
— আমরা একটা প্রাথমিক রেকর্ড রাখছি। তবে এটাকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হিসেবে গ্রহণ করছি না। তোমরা যেতে পারো।
কথাটা শুনে মনে হলো, বুকের ওপর থেকে একটা ভার নেমে গেল। আমরা সবাই উঠে রুম থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম।
ঠিক তখনই হাসপাতালে নেওয়া সেই ছেলেটা আমার কাছে এসে দাঁড়াল।
সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি তোমাকে কোনোভাবে ছোট করতে চাইনি। দয়া করে কিছু মনে করো না।
আমি শুধু বললাম,
— আমি কিছু মনে করিনি।
আমরা Garda Station থেকে বের হয়ে আসছিলাম।
হঠাৎ এক Garda Sinead-এর দিকে তাকিয়ে মজা করে বললেন,
— Ah, you’re very lucky, sure your lad loves ya to bits. ( আরে, তুমি তো বেশ ভাগ্যবতী। তোমার এই বন্ধু তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে। )
আমি শুনে হেসে ফেললাম। Sinead-ও হাসতে হাসতে উত্তর দিল,
— Ah no, he’s not my boyfriend. He’s my best mate. ( আরে না, ও আমার বয়ফ্রেন্ড না। ও আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।)
কথাটা শুনে আমারও হাসি পেল।
কিছু সম্পর্কের নাম হয় না।
তারা শুধু থেকে যায়।
আমরা Garda Station থেকে বের হয়ে এলাম।
ওই ছেলেগুলোও বের হলো। বের হওয়ার সময় হাসপাতালে নেওয়া সেই ছেলেটা আবার আমার কাছে এসে দাঁড়াল। আরেকবার দুঃখ প্রকাশ করল।
আমি শুধু মাথা নেড়ে বললাম,
— ঠিক আছে।
এরপর Sinead-কে ট্যাক্সিতে তুলে দিলাম। তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে বাসার দিকে ফিরলাম।
আপনাদের হয়তো জানতে ইচ্ছে করছে—Sinead-এর সঙ্গে এখনো আমার যোগাযোগ আছে কি না।
উত্তর হলো—ছিল।
কিন্তু এখন আর নেই।
কারণ Sinead এমন এক জায়গায় চলে গেছে, যেখানে চাইলেও আর যোগাযোগ করা সম্ভব নয়।
২০২২ সালের একদিনের কথা।
হঠাৎ আরশাদ ভাইয়ের ফোন পেলাম। তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক ভারী নীরবতা।
তিনি জানালেন, একটা সড়ক দুর্ঘটনায় Sinead আর তার boyfriend Richard মারা গেছে।
কিছু কিছু খবর মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দেয়।
সেদিনও আমি থেমে গিয়েছিলাম।
আয়ারল্যান্ডের জীবনে Sinead ছিল আমার মাথার ওপর ছায়ার মতো। বিদেশের মাটিতে যখন সবকিছু নতুন, অপরিচিত—তখন কিছু মানুষ নিজের অজান্তেই পরিবারের অংশ হয়ে যায়।
Sinead ছিল তেমনই একজন।
ওকে নিয়ে লিখতে বসলে হয়তো এক হাজার পৃষ্ঠাও কম পড়ে যাবে। তার হাসি, তার রাগ, তার পাগলামি, তার বন্ধুত্ব—সবকিছু মিলিয়ে সে ছিল একটা সম্পূর্ণ গল্প।
আমার একটা ছোট্ট ইচ্ছা আছে।
যদি কোনোদিন লেখক হিসেবে এমন একটা জায়গায় যেতে পারি, যেখানে মানুষ আমার লেখা পড়ার জন্য অপেক্ষা করবে, তখন Sinead-কে নিয়ে একটা বই লিখব।
এখন লিখব না।
কারণ আমি চাই না, Sinead-এর মতো একটা অসাধারণ মানুষ এবং তার গল্প শুধু হাতে গোনা কিছু মানুষের কাছে পৌঁছাক।
আমি চাই, তার গল্প লক্ষ লক্ষ মানুষ জানুক।
মানুষ জানুক—একজন আইরিশ মেয়ে, যে বন্ধুত্বের জন্য লড়াই করতে জানত; যে অন্যায়ের সামনে চুপ করে থাকত না; যে নিজের অজান্তেই একজন প্রবাসী মানুষের জীবনে পরিবারের মতো জায়গা করে নিয়েছিল।
আপনাদের হয়তো একটু মন খারাপ করে দিলাম।
আমারও লিখতে গিয়ে মন খারাপ হয়ে গেল।
তবে জীবন তো শুধু কষ্টের গল্প নয়।
চলুন, শেষ করার আগে আরেকটা ছোট্ট গল্প বলি।
খুব ছোট একটা গল্প।
একজন বৃদ্ধের গল্প।
যেখানে আমি তাকে খুব বড় কোনো শিক্ষা দিতে পারিনি, কিন্তু একটা ছোট্ট উত্তর দিয়েছিলাম—যেটা হয়তো তিনি অনেক দিন মনে রেখেছিলেন।
চলুন, সেই গল্প দিয়েই আজকের লেখা শেষ করি।
আয়ারল্যান্ডে থাকার সময় আমি একটা এয়ারলাইনে কনট্র্যাকচুয়াল ভিত্তিতে Cabin Crew হিসেবে কাজ করতাম।
একদিন লন্ডন থেকে ফ্লাইট নিয়ে Cork-এ ফিরছি।
যাত্রীদের খাবার, চা-কফি পরিবেশন করছি। হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে একজন বৃদ্ধ যাত্রীর কাছে গেলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— What do you like sir, tea or coffee?
তিনি বললেন,
— Coffee.
আমি আবার জানতে চাইলাম,
— Black or white coffee, sir?
বৃদ্ধ একটু হাসলেন।
তারপর বললেন,
— Coffee like you.
কথাটা শুনেই আমি বুঝতে পারলাম তিনি কী বোঝাতে চাইছেন।
আমি শান্তভাবে বললাম,
— Ok sir.
তারপর তাকে White Coffee দিয়ে দিলাম।
কফির কাপ হাতে নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
— What’s this ya handed me? I told ya, coffee like you!
আমি হাসলাম।
তারপর শান্তভাবে বললাম,
— Sir, my complexion is brown, not black. If you notice, the coffee resembles my colour. Thank you very much, and I hope you enjoy your journey. ( স্যার, আমার গায়ের রং কালো নয়, বাদামি। একটু ভালো করে দেখলে বুঝবেন, এই কফির রংটা আমার গায়ের রঙের কাছাকাছি। ধন্যবাদ স্যার। আশা করি আপনার যাত্রা আনন্দময় হবে। )
এরপর আমি খাবারের ট্রে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম।
একবারও পেছনে তাকাইনি।
সত্যি বলতে, খুব ইচ্ছে করছিল ঘুরে দেখি—বৃদ্ধের মুখের অভিব্যক্তি কেমন।
কিন্তু দেখিনি।
কারণ অনেক সময় উত্তর দেওয়ার পর আর পেছনে তাকানোর প্রয়োজন হয় না।
কিছু মানুষকে বোঝানোর দায়িত্ব আমাদের নয়।
আমাদের দায়িত্ব শুধু নিজের সম্মানটা ধরে রাখা।
লিখতে গিয়ে এই মুহূর্তে একটা কথা মনে পড়ে গেল। লোভ সামলাতে পারলাম না, তাই লিখেই ফেললাম।
এই কথাটা যদি Sinead শুনত, তাহলে বৃদ্ধ সাহেবের নাকের অবস্থা কী হতো, সেটা ভাবতেই আমার মুখে হাসি চলে আসছে। কারণ Sinead অন্যায় বা অপমান খুব সহজে মেনে নেওয়ার মানুষ ছিল না।
পরিশেষে
অনেকেই হয়তো আমার এই লেখার সঙ্গে বর্তমানে প্রকাশিত আমার বইগুলোর লেখার ধরন বা স্টাইলের মিল খুঁজে পাবেন না। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, এই লেখাটি প্রথম প্রকাশ করেছিলাম সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে। তখন আমি মাত্র গল্প লেখা শুরু করেছি।
তাই হয়তো কোথাও কোথাও পড়তে গিয়ে কিছুটা হোঁচট খেতে পারেন। কারণ নিজের পুরোনো লেখা পড়তে গিয়ে আমিও বুঝতে পেরেছি—কিছু জায়গায় পরিবর্তন আনলে লেখাটি আরও সুন্দর হতে পারত। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমি সেই পরিবর্তন করিনি।
এর কারণ একটাই—আমার পুরোনো লেখার ধরনগুলো আপনাদের মাঝে থাকুক। যেন একদিন আমি নিজেও ফিরে তাকাতে পারি, আর আপনারাও দেখতে পারেন একজন লেখকের লেখার পরিবর্তন, শেখা এবং এগিয়ে যাওয়ার পথ।
দিন দিন যদি নিজের লেখায় উন্নতি না আনতে পারি, তাহলে হয়তো একসময় খারাপ বা দুর্বল উপস্থাপনার কারণে হারিয়ে যাবো। কিন্তু আমি হাল ছাড়তে চাই না। আমি থাকতে চাই আপনাদের মতো পাঠকদের সঙ্গে, আর আমার লেখাগুলোও বেঁচে থাকুক আপনাদের মাঝে।
সবাই ভালো থাকবেন। আর যদি ইচ্ছা হয়, গল্পটি পড়ে আপনাদের অনুভূতি ছোট্ট করে জানিয়ে যাবেন।

মন্তব্য (0)
শুধু নিবন্ধিত সদস্যরা মন্তব্য করতে পারবেন। লগ ইন করুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।