**পর্ব ১ এর লিংক , কমেন্ট এ দেয়া থাকবে **
এটা ছিল প্রায় প্রতি উইকেন্ডের নিয়ম। Sinead-এর কাছে কাবাব যেন একটা ছোট্ট আবদারের মতো ছিল। ছোট বাচ্চাদের মতো আবদার করত, কিন্তু সে মোটেও ছোট বাচ্চা ছিল না।
বরং ছিল সুঠাম দেহের অধিকারী, অসম্ভব চটপটে এক মেয়ে।
আমরা গল্প করতে করতে হাঁটছিলাম।
আমার বাসার ঠিক উল্টো পাশে একটা পাকিস্তানি কাবাবের দোকান ছিল। দোকানের পাশেই ছিল ট্যাক্সি বুথ।
দোকানের মালিক ছিলেন আরশাদ ভাই।
আরশাদ ভাই সম্পর্কে একটা কথা বলে রাখা দরকার। তিনি জন্মসূত্রে পাকিস্তানি ছিলেন। পাকিস্তানেই জন্ম, পাকিস্তানেই বড় হওয়া। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি সবসময় নিজেকে বাংলাদেশি পরিচয় দিতেন। কেন দিতেন, সেই গল্পটা, এই ঘটনার মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে।
আমি আর Sinead দোকানে ঢুকলাম।
আমাদের দেখে আরশাদ ভাই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন,
— কেমন আছো?
আর একটা ছোট্ট বিষয় এখানে বলে রাখা দরকার। আরশাদ ভাই এই কথাটা বাংলাতেই বলেছিলেন, Sinead-কে উদ্দেশ্য করে। কারণ Sinead অন্যদের মতো “How are you?” বলত না। সে মজা করে প্রায়ই বলত, " কিমুন আছো "
বিদেশের মাটিতে থেকেও ছোট ছোট কিছু অভ্যাস মানুষকে একে অন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
আমরা দুজনই স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলাম ,
— ভালো আছি।
Sinead একটু জোরে কথা বলার মানুষ ছিল। বিশেষ করে একটু বেশি ড্রিঙ্ক করলে তার গলার আওয়াজ আরও বেড়ে যেত।
সে হঠাৎ চিৎকার করে বলল,
— Arshad, would ya fix me up with a real hot kebab, so? Cheers. ( আরশাদ, আমার জন্য একটা একদম গরম ঝাল কাবাব বানিয়ে দাও তো। চিয়ার্স।”)
আরশাদ ভাই Sinead-কে আগে থেকেই চিনতেন। কারণ ড্রিঙ্ক করার পর প্রায়ই সে আমার সঙ্গে এই দোকানে আসত। তাই তার স্বভাব সম্পর্কেও আরশাদ ভাইয়ের ভালো ধারণা ছিল।
Sinead-এর কথা শুনে আরশাদ ভাই হেসে বললেন,
— Aray yaar, forget the kebab. You drank too much already. Last time you promised me you won’t. You are my sister, and it makes my heart hurt when I see you like this. ( আরে ইয়ার, কাবাবের কথা বাদ দাও। তুমি এরই মধ্যে অনেক বেশি ড্রিঙ্ক করে ফেলেছো। গতবার তো আমাকে কথা দিয়েছিলে, আর এমন করবে না। তুমি আমার বোনের মতো। তোমাকে এভাবে দেখলে আমার সত্যিই খারাপ লাগে, কষ্ট হয়। )
আরশাদ ভাইয়ের কথা শুনে Sinead হাসতে হাসতে বলল,
— Nooo lads, I just had the five packs, go on, ask Shon yourself. ( “না না, আমি তো শুধু পাঁচ প্যাকই খেয়েছি। যাও, Shon-কে জিজ্ঞেস করো, সে নিজেই বলবে।” )
এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো। আয়ারল্যান্ডে আমার বেশিরভাগ বন্ধু আমাকে Shon নামে ডাকত। আমার আসল নামের চেয়ে এই নামটাই তাদের কাছে বেশি পরিচিত হয়ে গিয়েছিল।
আরশাদ ভাই হাসলেন।
তারপর বললেন,
— Theek hai yaar, I believe you. Chalo, sit karo, sumon will fix a hot kabab for you. ( ঠিক আছে ইয়ার, আমি তোমাকে বিশ্বাস করলাম। চলো, গিয়ে বসো। সুমন তোমার জন্য একটা গরম কাবাব বানিয়ে দেবে। )
Sinead দোকানের কাস্টমার বসার জায়গায় গিয়ে বসল।
সেখানে তখন মাত্র দুজন ছেলে বসে ছিল। বাকি সব চেয়ার খালি।
ঘটনাটা বোঝার জন্য আরশাদ ভাইয়ের দোকানটার একটু বর্ণনা দেওয়া দরকার।
দোকানটা খুব বড় ছিল না। ছোট্ট একটা জায়গা। এক পাশে ছিল রান্নার অংশ—যেখানে নান, রুটি আর কাবাব তৈরি হতো। একটা হট স্টিল, একটা চুলা আর পাশে রাখা থাকত বিভিন্ন ধরনের সস।
কিচেন থেকে একটু দূরে ছিল কাস্টমারদের বসার জায়গা। খুব বেশি না, মোটামুটি ১০ থেকে ১২ জন বসতে পারত। কেউ চাইলে সেখানে বসে খাবার খেত, তবে বেশিরভাগ মানুষই আসত টেকওয়ের জন্য। কেউ খাবারের অপেক্ষায় বসে থাকত, কেউ আবার খাবার নিয়ে চলে যেত।
দোকানটার একটা ছোট্ট সমস্যা ছিল। কিচেন থেকে কাস্টমারদের বসার জায়গাটা সরাসরি দেখা যেত না।
আমার বাসার ঠিক উল্টো পাশেই ছিল আরশাদ ভাইয়ের দোকান। উনি একাই দোকান সামলাতেন। তবে উইকেন্ডে কখনো ভিড় বেশি হলে আমাকে ডাকতেন সাহায্য করার জন্য।
আমি যেতাম।
এই কারণে দোকানটার সঙ্গে আমার একটা আলাদা পরিচয় তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কোন কাবাব কীভাবে বানাতে হয়, কোনটার দাম কত—সবই আমার জানা ছিল।
সেদিনও আমি জানতাম না, এই ছোট্ট দোকানটাই কিছুক্ষণ পর এমন একটা ঘটনার সাক্ষী হবে, যেটা এত বছর পরও আমার মনে স্পষ্ট হয়ে আছে।
Sinead-এর কাবাবের অর্ডার নেওয়ার পর আরশাদ ভাই আমাকে বললেন,
— সুমন, কাজের চাপ একটু বেশি। যদি পারো, Sinead-এর কাবাবটা তুমি বানিয়ে দাও। পারলে আরও দুটো কাবাব বানিয়ে রেখো। আমি একটা সিগারেট খেয়ে আসি।
ছোট্ট একটা কথা বলে রাখা দরকার। আরশাদ ভাই পাকিস্তানি ছিলেন। জন্ম পাকিস্তানে, বড়ও হয়েছেন সেখানেই। কিন্তু তিনি খুব সুন্দর বাংলা বলতে পারতেন। কারণ তাঁর বাবা-মা দুজনই বাঙালি ছিলেন।
আমি বললাম,
— ওকে ভাই, আপনি যান। Sinead-এর কাবাব দিয়ে ওরে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিয়ে আপনাকে আবার হেল্প করব , তারপর আপনি একটু রেস্ট নিয়েন।
আমি কিচেনে ঢুকে Sinead-এর জন্য কাবাব বানাতে শুরু করলাম।
কিছুক্ষণ পর আরশাদ ভাই সিগারেট খেয়ে ফিরে এলেন। আমরা দুজন কাবাব বানাতে বানাতে গল্প করছিলাম।
হঠাৎ কাস্টমারদের বসার জায়গা থেকে একটা চেঁচামেচির শব্দ ভেসে এলো।
প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। কারণ Sinead একটু বেশি ড্রিঙ্ক করলে মাঝে মাঝে জোরে কথা বলত।
আরশাদ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— সুমন, একটু দেখে আসো তো, কী হয়েছে?
আমি হেসে বললাম,
— আজকে Sinead একটু বেশি ড্রিঙ্ক করেছে। ও যেদিন বেশি ড্রিঙ্ক করে, সেদিন এমন একটু চেঁচামেচি করে। চিন্তার কিছু নেই।
আমরা আবার কাবাব বানানোতে মন দিলাম।
কিন্তু চেঁচামেচি থামল না।
বরং ধীরে ধীরে শব্দ বাড়তে লাগল। Sinead-এর গলার আওয়াজই বেশি শোনা যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে গালাগালির শব্দও আসছিল।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম, আজকে ট্যাক্সি ড্রাইভারের অবস্থা খারাপ হবে। Sinead-কে ট্যাক্সিতে তুলে দেওয়াটাই আজকের সবচেয়ে ঝামেলার কাজ হবে মনে হচ্ছিল।
কিন্তু পরের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যা হলো, সেটা আমরা কেউই কল্পনা করিনি।
হঠাৎ চেঁচামেচির সঙ্গে মারামারির শব্দ শুরু হলো।
আমরা দুজন সঙ্গে সঙ্গে কিচেন কাউন্টার থেকে বের হয়ে কাস্টমারদের বসার জায়গার দিকে দৌড় দিলাম।
সেখানে গিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম, তাতে আমি আর আরশাদ ভাই দুজনই কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেলাম।
একজন ছেলে মেঝেতে পড়ে আছে। তার শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে।
আরেকজন ছেলের নাক দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরছে। সে প্রচণ্ড রাগে Sinead-এর দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে।
কিন্তু Sinead তখনও শান্ত হয়নি। বরং মেঝেতে পড়ে থাকা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আরও উত্তেজিত হয়ে উঠেছে।
আমি দ্রুত গিয়ে Sinead-কে থামানোর চেষ্টা করলাম।
আরশাদ ভাই ওই ছেলেটাকে ধরে দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ছেলেটাও এতটাই উত্তেজিত ছিল যে, বারবার Sinead-এর দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।
আরশাদ ভাই তাকে ধরে না রাখলে হয়তো আবার ঝামেলা শুরু হয়ে যেত।
এর মধ্যেই Sinead মেঝে মোছার Mop handle তুলে নিয়েছে। মারার জন্য , তার চোখেমুখে তখন এমন একটা রাগ, যা আমি আগে কখনো দেখিনি।
আমি আর আরশাদ ভাই দুজনেই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
কী হয়েছে?
কেন তারা এভাবে মারামারি করছে?
আর একজনই বা মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে কেন?
আমরা তখনও কিছুই বুজতে পারছিলাম না ।
আরশাদ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— সুমন, কী করব? Garda-কে খবর দিতে হবে। কিন্তু Sinead বিপদে পড়ে যাবে।
আমি সত্যিই বুঝতে পারছিলাম না কী করা উচিত।
পাঁচ বছর ধরে Sinead-কে চিনি।
এই দীর্ঘ সময়ে ওর স্বভাব, আচরণ—প্রায় সবকিছুর সঙ্গেই আমার পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। ওকে কখনো রাগতে দেখিনি।
অবশ্য Sinead একটু জোরে কথা বলত। অনেক সময় ওর কথা শুনে মনে হতো, হয়তো রেগে গেছে। কিন্তু আসলে সেটা ছিল ওর স্বাভাবিক ভঙ্গি।
হাসিখুশি, প্রাণবন্ত একটা মেয়ে ছিল Sinead। সবসময় নিজের মতো করে থাকতে পছন্দ করত।
কিন্তু সেদিনের Sinead যেন সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষ।
তার চোখেমুখে এমন একটা রাগ দেখেছিলাম, যেটার সঙ্গে আমি আগে কখনো পরিচিত ছিলাম না।
কিছুতেই মিলাতে পারছিলাম না—এই কি সেই Sinead, যাকে আমি গত পাঁচ বছর ধরে চিনি?
তার চোখেমুখে এমন একটা রাগ ছিল, যেটা আমার একদম অচেনা।
কেন এমন হলো?
কী কারণে এই মারামারি?
কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
( চলবে ....... )

মন্তব্য (1)
শুধু নিবন্ধিত সদস্যরা মন্তব্য করতে পারবেন। লগ ইন করুন