www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

রহস্যময় মৃত্যু লীলা - পর্ব - তিন

আমরা পর পর দুটো ঘর ক্রস করে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে যাবো এমন সময় দেখি সেই পালোয়ান লোকটা আমাদের মুখোমুখি। আমি ঘাবড়ে গেলাম কয়েক মুহুর্তের জন্য কিন্তু তার আগেই প্রান্তর আমাকে পিছনে সরিয়ে দিল। তারপর লোকটা একটা ছুরি বের করলে প্রান্তর সজোরে একটা কিল মারলো তার তলপেটে। লোকটা ধনুকের মতো বেঁকে গেলে প্রান্তর আরও একটা সজোরে কিল মারলো তার কানের পাশে চাওয়ালিতে এবং তৎক্ষণাৎ লোকটা মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। প্রান্তর লোকটির হাত থেকে ছুরিটা নিয়ে নিজের কাছে রাখলো। তারপর লোকটিকে একপাশে সরিয়ে রাখলো। আর এতগুলো ঘটনা ঘটলো এক্কেবারে নিঃশব্দে। তারপর আমরা উপরে গেলাম। দেখলাম একটা ঘরের সামনে আরও একটা পালোয়ান লোক পায়চারি করছে। প্রান্তর আমাকে উপরে লোকটার দিকে লক্ষ্য রাখতে বলে তাড়াতাড়ি নীচে গেল এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আবারও উপরে আসলো। প্রান্তরের হাতে একটা ছোটো বস্তু যেটাকে ও সেই লোকটার দিকে গড়িয়ে দিল। তারপর যেটা স্বাভাবিক সেটাই হল। লোকটি সেই বস্তুটির দিকে এগিয়ে এলো। আমরাও একটা দেওয়ালের একদম গাঁয়ে লেগে আছি। লোকটার হাতে একটা ধারালো ছুরি। এতটা দূর থেকেও চকচক করছে। লোকটা খুব ধীর পায়ে যত আমাদের দিকে এগিয়ে আসলে ততই যেন আমার নিশ্বাস বন্ধ হতে যাচ্ছে। কিন্তু দেখলাম প্রান্তর সেই ছুরিটা বের করে হঠাৎই লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর ধীরে ধীরে সেই লোকটিকে বলল, " আমি জানি, আপনি কোনো পালোয়ান নন, হয়ত কোনো বিশেষ কাজের জন্য আপনার টাকার দরকার, তাই এই পন্থা বেছে নিয়েছেন। আপনার হাতে ছুরি মানায় না। আপনি নিশ্চিন্তে আমাদের বলতে পারেন। " এতক্ষণ আমিও প্রান্তরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখলাম লোকটার চোখে জল, ছুরিটা ধীরে ধীরে নীচে নামিয়ে রাখলেন। লোকটা কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় প্রান্তর বললো, " আপনার গল্প কিছুক্ষণ পরে শুনব। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন আমাদের এখানে আসার কারণ কি ! লোকটা ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন। প্রান্তর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, " তাহলে আর দেরি কেন, আমাদের সাহায্য করুন। " লোকটা যে ঘরটার সামনে পায়চারি করছিল আমাদের সেই ঘরের দরজা খুলে দিল। আমি আর প্রান্তর ভিতরে প্রবেশ করলাম। আমি ওর কানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, " তুই কীভাবে বুঝলি লোকটা পালোয়ান বা গুন্ডা নয় ?" প্রান্তরও আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে আরও ধীরে ধীরে বলল, " ছুরিটা বের করতেই লোকটার যেভাবে হাত কাঁপছিল, সেটা খেয়াল করেছিলি ! " আমি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললাম, " ওহ, আচ্ছা।"
ঘরে ঢুকে দেখলাম একটা মেয়ে ঘরের একটা কোনার দিকে বসে কাঁদছে। হয়ত মেয়েটার উপর মানসিক ভাবে অত্যাচার করা হয়েছে। শারীরিক ভাবেই অত্যাচার হয়েছে বোঝায় যাচ্ছে।

প্রান্তর তার কাছে গেলেন। বললেন, " পুষ্পিতা, আমি প্রান্তর, প্রান্তর রায়। আমি জানি, তুমি আমাকে চিনবে না। তবুও নিজের পরিচয়টুকু দিলাম। আমরা পরিবারসহ মুর্শিদাবাদে বেড়াতে এসেছিলাম। আর তোমাদের বাড়ির উপরের ভাড়া ঘরগুলোতে রয়েছি। কিন্তু হঠাৎই আমার সন্দেহ হয়, তোমাদের বাড়িতে কোনো সমস্যা হয়েছে। সেইজন্য বলতে পারো নিজের ইচ্ছায় সেই সমস্যার সমাধানে বেরিয়ে পড়েছিলাম, আর সেজন্যই এখন এখানে।" এতক্ষণে পুষ্পিতা, প্রান্তরের দিকে তাকালো। কিন্তু চোখে মুখে সন্দেহের গ্লানি কাটেনি দেখে প্রান্তর আবারও বললো, " পুষ্পিতা, তুমি আমাদেরকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারো। আমাদের সাথে বাড়িতে ফিরে চলো। আমি জানি, আমরা সম্পূর্ণ অচেনা তবুও বলছি আমাদের সাথে চলো।"

কিছুক্ষণ পরে পুষ্পিতা উঠে দাঁড়ালো, তার চোখে জল। হয়ত কাঁদতে ইচ্ছে করছে কিন্তু পারছে না। হয়ত মনে মনে ও এটাই ভেবেছিল যে এই অচেনা মানুষ দুটির সাথে বেরোলে অন্ততঃ এখানকার অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যাই হোক, পুষ্পিতা বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হলে প্রান্তর আমাকে বললো, " দেবা, তুই একে নিয়ে বাড়ি ফিরে যা। আমি কিছুক্ষণ পরে আসছি। " তারপর প্রান্তর আমাদের একটা গাড়িতে তুলে দিয়ে ভাড়া মিটিয়ে দিল।
গাড়িতে আসতে আসতে পুষ্পিতার সাথে বেশ ভাব জমে উঠেছিল। একটু আগে যে মেয়েটা বন্দী ছিল, এখন তাকে দেখে কেউ সেটা বলবে না। খুব হাসিখুশি। দেখতেও বেশ সুন্দর। বয়সটা আমার প্রায় সমান। দেহের গঠন, কথাবার্তা সবকিছু .......। আমার মনে অনেক প্রশ্ন আছে, কিন্তু সেই প্রশ্ন করার মতো কোনো ব্যক্তি পাচ্ছি না। আমি এখনও পর্যন্ত জানি না আমার চারপাশে কি হচ্ছে !

পুষ্পিতা'কে নিয়ে বাড়িতে আসলে প্রথমে দেখলাম ওর বাড়ির লোকজন সবাই অবাক হয়ে গেল। একজন দেখলাম ওর কাছে এসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সম্ভাবত এটাই ওর মা। আমাকে জিজ্ঞাসা করা হলে আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিলাম, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তারপর কিছুক্ষণ এসব বিষয়ে আলোচনা চলছিল। আর ততক্ষণে আমি উপরে মা বাবার ঘর থেকে ঘুরে এলাম। দুপুরের কান্ড কারখানা বললে তারাও খুব উৎসুখ হলেন বাকিটা জানার জন্য।

আবার আমি নীচের তলায় আসলাম। সঙ্গে আমরা সবাই। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল। এখনও প্রান্তরের কোনো খোঁজ নেই। এদিকে অভিজিৎ বাবু এসেছেন, অপেক্ষা করছেন। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি, অভিজিৎ বাবু পুষ্পিতাকে দেখে প্রথমে অবাক হয়ে যান। সেজন্য তিনিও খুব উৎসুক, অন্যান্য সবার মতো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা আমাদের সমবয়সি ছেলেকে নিয়ে প্রান্তর ঘরে ঢুকলেন। ঘরে ঢুকেই প্রান্তর বললেন, " পুষ্পিতা কৈ ?" একজন মহিলা, যিনি সম্ভাবত পুষ্পিতার মা, তিনি বললেন, " ও তো নিজের ঘরে গিয়েছে এইমাত্র। " প্রান্তর তাড়াতাড়ি দৌড়ে একটা ঘরের দিকে ছুটলো, সম্ভাবত ওটাই পুষ্পিতার ঘর। ওর পিছন পিছন আমরা সবাই ছুটে গেলাম। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। প্রান্তর দরজা ভাঙার কথা বললে আমি ও প্রান্তর দরজায় সজোরে লাথি মারলাম। তারপর দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে এক্কেবারে থ হয়ে গেলাম। পুষ্পিতা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করছিল। প্রান্তর তাড়াতাড়ি সবেমাত্র কাত হয়ে যাওয়া টুলটিকে সোজা করে দিল, যাতে পুষ্পিতা পা দুটো ওটার উপর রাখতে পারে। অন্যদিকে আমি তাড়াতাড়ি উপরের থেকে দড়িটা কেটে দিলাম। পুষ্পিতাকে বেডের উপর শুইয়ে দিয়ে ওর মা ওকে দম দিতে থাকলো। যাই হোক, প্রায় আধঘণ্টার মধ্যে বিষয়টা মুটামুটি স্বাভাবিক হয়ে গেল। তারপর সবাই মিলে পুষ্পিতাকে নিয়ে বাইরে এলো।

এতক্ষণ পর পুষ্পিতা সেই নতুন ছেলেটাকে দেখতে পেল। দেখলাম পুষ্পিতাও একটু অবাক হয়ে গেল ওকে দেখে। প্রান্তর চারিদিকে তাকিয়ে দীপঙ্কর বাবুকে দেখতে না পেয়ে দীপঙ্কর বাবুর খোঁজ করলেন। এতক্ষণ দীপঙ্কর বাবু নিজের ঘরে একাকি ছিলেন। সুতরাং, তিনি এতক্ষণ যা কিছু ঘটেছে সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অগোচর। প্রান্তর আসার সাথে সাথেই তিনি সিঁড়ি থেকে নামতে নামতে বললেন, " কি ব্যাপার, হঠাৎ সবাই একসাথে .........! কোনো সিরিয়াস ব্যাপার নাকি ! " দেখলাম, প্রান্তর ইশারার মাধ্যমে দীপঙ্কর বাবুকে তাড়াতাড়ি এসে বসতে বললেন।
প্রান্তর পুষ্পিতার দিকে তাকিয়ে বললো, " মৃত্যুই জীবনের সব সমস্যার সমাধান নয়। বেঁচে থাকাটাই জীবনের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। তোমার সাথে যেটা হয়েছে সেটা সত্যি অন্যায়। তোমার হাতের দু একটা নখ এর আঁচড়ের দাগ দেখেই বুঝেছিলাম, তোমার উপর শারীরিক অত্যাচার করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তোমাকে অসম্মান করা হয়েছিল। তবে তার জন্য মৃত্যু সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। একটা কথা মনে রাখবে, জীবনের যেই মুহুর্তে হেরে যাবে ঠিক সেই মুহুর্ত থেকেই জেতার স্বপ্নকে প্রকট করবে। "

এবার প্রান্তর সবার দিকে তাকালেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ইনস্পেক্টর অভিজিৎ স্যার, ইনস্পেক্টর দীপঙ্কর চক্রবর্তী সহ আমাদের মা, বাবারা, বন্ধুরা। এছাড়াও এই বাড়ির মালিক সহ সকলে ........ ।

চলছে .......
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৪৪ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৯/০৬/২০২২

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast