জীবনের কিছু পরিচয় খুব অল্প সময়ের হয়, কিন্তু তার প্রভাব থেকে যায় অনেকদিন। কিছু মানুষ হঠাৎ করেই জীবনে আসে, অথচ অজান্তেই তারা হয়ে ওঠে আপনজনের মতো।
রিদয়ের জীবনেও তেমনই একটি পরিচয়ের শুরু হয়েছিল একটি নাট্যকর্মশালায়। সেদিনটি হয়তো আর দশটা দিনের মতোই ছিল, কিন্তু সেই দিনের ছোট্ট একটি পরিচয় যে একসময় তার মনে এতটা জায়গা করে নেবে, তা সে নিজেও ভাবেনি।
সেখানেই পরিচয় হয়েছিল রিদয় ও নীলার।
পরিচয়টি ছিল খুব অল্প সময়ের। তবুও সেই ছোট্ট পরিচয়ের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল এক সুন্দর আন্তরিকতা। ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্কটি আর শুধুমাত্র পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
রক্তের কোনো সম্পর্ক ছিল না তাদের মাঝে, ছিল না কোনো পারিবারিক বন্ধন। তবুও রিদয়ের কাছে নীলা হয়ে উঠেছিল নিজের বড় বোনের মতো। সে সবসময় সেই সম্পর্কের মর্যাদা দিয়েছে। কখনো সীমা অতিক্রম করেনি, কখনো অসম্মানের কোনো সুযোগ তৈরি করেনি।
নীলার প্রয়োজন হলে রিদয় নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করত। আপুর একটি কথা তার কাছে শুধুই কথা ছিল না, বরং ছিল এক ধরনের দায়িত্ব।
এভাবেই চলছিল তাদের সুন্দর সম্পর্ক।
কোনো স্বার্থ ছিল না, ছিল না কোনো চাওয়া-পাওয়ার হিসাব। ছিল শুধু একজন ছোট ভাইয়ের আন্তরিকতা আর একজন বড় বোনের প্রতি গভীর সম্মান।
কিন্তু মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা একটি সুন্দর সম্পর্কের গল্পকেও হঠাৎ বদলে দেয়।
একদিন একজন মানুষ রিদয়কে নিয়ে নীলার কাছে কিছু মিথ্যা কথা বলল। কথাগুলো কতটা সত্য, তা জানার জন্য নীলা একবারও রিদয়ের কাছে জানতে চাইল না। নিজের মানুষটির কাছ থেকে সত্যটা জানার আগেই অন্যের বলা কথাকেই সে সত্য বলে ধরে নিল।
আর সেই একটি ভুল বোঝাবুঝিই ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি করল তাদের মাঝে।
যে মানুষটি একদিন আপন করে বলেছিল,
“আমাকে আপু বলেই ডাকো”—
সেই মানুষটিই একসময় এমন দূরত্ব তৈরি করল, যেন রিদয় তার পরিচিত কেউ নয়।
কথা কমে গেল, আগের মতো আন্তরিকতা আর রইল না। একটি সুন্দর সম্পর্ক ধীরে ধীরে নীরবতার আড়ালে হারিয়ে যেতে লাগল।
রিদয়ের কষ্ট হয়েছিল। খুব কষ্ট হয়েছিল।
কারণ সে নীলাকে শুধু একজন পরিচিত মানুষ হিসেবে দেখেনি, দেখেছিল নিজের বড় বোনের মতো।
তবুও সে নীলার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেনি, কোনো খারাপ কথা বলেনি। কারণ তার কাছে সম্পর্কের সম্মান, নিজের কষ্টের চেয়েও বড় ছিল।
সময় এগিয়ে গেছে। মানুষ বদলেছে। সম্পর্কের অবস্থানও বদলেছে। কিন্তু রিদয়ের মনে নীলার জন্য সেই সম্মান আজও আগের মতোই রয়ে গেছে।
আজও নীলা কোনো প্রয়োজনে কিছু বললে, রিদয় নিজের সাধ্যের মধ্যে থেকে সাহায্য করার চেষ্টা করে। কারণ তার কাছে সম্পর্ক শুধু ভালো সময়ের সঙ্গী নয়, বরং সম্মান ধরে রাখার একটি প্রতিশ্রুতি।
রিদয় বুঝেছে—সব সম্পর্ক দূরে যাওয়ার কারণে শেষ হয়ে যায় না, কিছু সম্পর্ক শেষ হয় ভুল বোঝাবুঝির কারণে। কিন্তু সত্যিকারের সম্মান কখনো দূরত্বের কাছে হেরে যায় না।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.