সমুদ্র কি শুধু জলরাশি? না, তার বুকে লুকিয়ে থাকে এমন সব রহস্য, যা মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়।
বহুকাল আগের কথা, দশজন অভিজ্ঞ জেলে একদিন মাছ ধরার উদ্দেশ্যে বিশাল কাঠের জাহাজ নিয়ে গভীর সমুদ্রে পাড়ি জমালেন। প্রথম ও দ্বিতীয় দিন নির্বিঘ্নে কাটলেও তৃতীয় দিনের রাতে আকাশের রূপ হঠাৎ বদলে গেল। পশ্চিম দিগন্তে জমাট বাঁধল কালো মেঘ, মুহূর্তেই শুরু হলো প্রলয়ঙ্কর ঝড়। বজ্রপাতের আলোয় সমুদ্র যেন বিশাল এক দানবে পরিণত হলো। বিশাল ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়তে লাগল জাহাজের গায়ে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ঝড় থেমে গেল, কিন্তু ততক্ষণে তাদের দিকনির্দেশক যন্ত্র নষ্ট, পাল ছিঁড়ে গেছে, জাহাজের তলায় বড় ফাটল। আর কয়েকদিন সমুদ্রে থাকলে নিশ্চিত মৃত্যু।
ঠিক তখনই দূরে একটি সবুজ দ্বীপ চোখে পড়ল।
...
দ্বীপটি যেন স্বর্গের একটি হারিয়ে যাওয়া অংশ। পাহাড় থেকে নেমে এসেছে স্ফটিকস্বচ্ছ ঝরনা, বাতাসে অপরিচিত ফুলের ঘ্রাণ, রঙিন পাখির কলতান, চারদিকে সবুজ ঘাসের কার্পেট।
কিন্তু স্বর্গের মতো সুন্দর জায়গাই কখনো কখনো সবচেয়ে ভয়ংকর হয়।
খোলা প্রান্তরে তারা দেখতে পেল তিনটি সাদা ছাগল। আশ্চর্যের বিষয়—মানুষের উপস্থিতিতেও তারা বিন্দুমাত্র ভয় পেল না। বরং জেলেরা যত দূরে এগোতে লাগল, ছাগলগুলোও নীরবে তাদের অনুসরণ করতে লাগল। তারা আশ্বস্ত হলো হয়তো এখানে কেউ বসবাস করে।
কিন্তু দ্বীপের প্রতিটি কোণ খুঁজেও মানুষের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া গেল না।
তবু ছাগলগুলো ছিল।
এই প্রথম তাদের মনে সন্দেহের বীজ জন্ম নিল।
...
রাত নামতেই সবাই ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে দেখা গেল—দশজনের একজন নেই।
খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া গেল না। কিন্তু এখানে কোন হিংস্র জানোয়ারও চোখে পড়েনি।
পরের রাতেও আরেকজন হারিয়ে গেল।
এরপর প্রতিটি রাত যেন মৃত্যুর অপেক্ষা।
কোনো চিৎকার নেই।
কোনো সংগ্রামের শব্দ নেই।
ভোর হলে একজন কম।
শেষ পর্যন্ত বেঁচে রইল মাত্র তিনজন।
সেদিন তারা সিদ্ধান্ত নিল—
আজ কেউ ঘুমাবে না।
রাত গভীর হতেই ছাগলগুলোর শরীর কাঁপতে শুরু করল, হাড় ভাঙার শব্দ... চোখ জ্বলে উঠল রক্তের মতো লাল আলোয়... এবং তিনটি ছাগলের দেহ থেকে ধোঁয়ার মতো অসংখ্য অন্ধকার ছায়া বেরিয়ে এলো। সেই ছায়াগুলো যেন বহু শতাব্দী ধরে বন্দী থাকা রাক্ষসদের আত্মা—মুহূর্তের মধ্যেই তারা একে একে বিশাল রাক্ষসের রূপ নিল।
তিন বন্ধু প্রাণপণে দৌড়ে একটি সংকীর্ণ গুহায় ঢুকে কোনমতে প্রাণে বাঁচল।
...
পরদিন তারা ভেলা বানিয়ে পাশের আরেকটি দ্বীপে আশ্রয় নিল।
সেই রাতেই ভেসে এল এক নারীর করুণ কান্না।
কান্নার উৎস অনুসরণ করে তারা দেখতে পেল লতাপাতায় ঢাকা একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর।
ভেতরে শিকলে বাঁধা এক অপূর্ব সুন্দরী রাজকুমারী।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন—
"তোমরা চলে যাও। এই দ্বীপে যারা আসে, তারা আর ফিরে যায় না।"
তিন বন্ধু বিস্মিত।
রাজকুমারী বললেন—
"তোমাদের পদচারণায় তিনশো বছরের নিস্তব্ধতা ভাঙতে শুরু করেছে..."
আর কিছু বলার আগেই ঘরের প্রদীপ নিভে গেল।
তারা পুনরায় পাহাড়ের চূড়ায় ফিরে গেলেন।
...
সকালবেলা সেখানে ফিরে এসে হতবাক।
কুঁড়েঘর নেই।
সেখানে পড়ে আছে বিশাল একটি পাথর।
অনেক কষ্টে পাথর সরাতেই দেখা গেল মাটির নিচে নেমে যাওয়া প্রাচীন সিঁড়ি।
সতর্কতার সাথে নিচে নেমে তারা আবিষ্কার করল—এক বিশাল ভূগর্ভস্থ রাজপ্রাসাদ।
সেখানে রাজকুমারী ঘুমিয়ে আছেন।
তাকে জাগাতেই তিনি বিস্ময়ে বললেন—
"তোমরা কারা? আমি তোমাদের আগে কখনো দেখিনি তো!"
তিন বন্ধুর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
তাহলে গতরাতে কার সঙ্গে কথা বলেছিল?
ঠিক তখনই নীল আলোর ঘূর্ণি থেকে আবির্ভূত হলেন রাজ্যের প্রধান জাদুকর।
তিনি জানালেন তিনশো বছর আগের ইতিহাস।
"লোভী এক ডাইনি এই রাজ্য দখল করতে চেয়েছিল।
রাজা অস্বীকার করলে শুরু হয় ভয়ংকর যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ডাইনি তার কলোজাদু প্রয়োগ করে রাজ্যের সকল বাসিন্দাদেরকে পাথরে রূপান্তরিত করে। আমি জাদুবলে প্রাসাদের সবাইকে পাথরে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারলেও, ডাইনি ও তার রাক্ষস বাহিনী আমাদের বন্দি করে ফেলে। আমাদের আর কোন পথ খোলা ছিল না।
আমার শেষ সম্বল ছিল তিনটি 'মাস্টার উইশ'—যার দ্বারা হত্যা করা যায় না, কিন্তু ভাগ্য পরিবর্তন করা যায়।
আমি ইচ্ছা করেছিলাম—
প্রথমত, শত্রুরা যেন রাজ্য দখল করলেও কখনো শাসন করতে না পারে।
দ্বিতীয়ত, ডাইনি ও তার রাক্ষস বাহিনী দিনের বেলায় নিরীহ ছাগলে পরিণত হোক।
তৃতীয়ত, রাজপরিবার ঘুমিয়ে থাকুক যতদিন না কোনো বহিরাগত এসে তাদের মুক্তি দেয়।
কিন্তু আমার ইচ্ছার ভয়ংকর ফাঁক থেকে যায়।
সেই ইচ্ছার নিয়ম আমাকেও বেঁধে ফেলেছিল; বহিরাগত না এলে আমি অভিশাপ ভাঙতে পারতাম না। আমার সেই শেষ ইচ্ছাই তোমাদের এখানে নিয়ে এসেছে। অন্যথায় এই রাজ্যের পথ পৃথিবীর কোনো মানুষ কখনো খুঁজে পেত না। তারা গত তিনশো বছর ধরে পথ হারিয়ে এই দ্বীপে আসা প্রতিটি বহিরাগতকে হত্যা করেছে, যাতে কেউ কোনোদিন অভিশাপ ভাঙতে না পারে।
অন্যদিকে, রাত্রি নামলেই ছাগলগুলো আবার রাক্ষস হয়ে উঠবে।
আর ডাইনি দিনের বেলায় নিজের প্রাণ লুকিয়ে রাখে সামনের পদ্মপুকুরের একটি বিশাল বোয়াল মাছের মধ্যে।
...
জাদুকর আরও বললেন—
"সেই বোয়ালমাছের রক্ত আর পদ্মপুকুরের পাশে থাকা জীবনকূপের জল একসঙ্গে মিশিয়ে পাথরের মূর্তির গায়ে ছিটিয়ে দিলে অভিশাপ ভেঙে যাবে।"
এই বলে তিনি হাসতে হাসতে বললেন—
"আমি আমার জাদুবিদ্যার অতিরিক্ত ব্যবহার করে নিজেকে মুক্ত করেছিলাম এবং আমার সমস্ত জাদুশক্তি এই রাজ্যকে বাঁচাতেই ব্যয় হয়েছে। এখন আমার সময় শেষ। "
তার শরীর ধীরে ধীরে অসংখ্য জোনাকির আলো হয়ে আকাশে মিলিয়ে গেল।
...
দীর্ঘ চেষ্টার পরে তিন বন্ধু সেই ভয়ংকর বোয়াল মাছকে পরাস্ত করল।
তারা মাছটি হত্যা করল, বোয়াল মাছটির প্রাণ বেরিয়ে যেতেই সমগ্র দ্বীপ কেঁপে উঠল। আকাশ কাঁপিয়ে ভেসে এলো এক বিকট আর্তচিৎকার। মুহূর্তের মধ্যেই ডাইনির আত্মা কালো ধোঁয়ায় পরিণত হয়ে বাতাসে বিলীন হয়ে গেল।
তারা মাছের রক্ত সংগ্রহ করে জীবনকূপের জলের সঙ্গে মিশিয়ে তা পুরো রাজ্যে ছিটিয়ে দিল।
মুহূর্তের মধ্যে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল।
পাথরের মূর্তিগুলো নড়ে উঠল।
একজন...
দুজন...
শত শত মানুষ আবার জীবিত হয়ে উঠল।
রাজপ্রাসাদে বাজল শঙ্খধ্বনি।
বন্ধন ছিঁড়ে গেল রাজকুমারীর।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে প্রথম দ্বীপের সব ছাগল ধুলোর মতো ভেঙে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
ডাইনির অভিশাপ চিরতরে শেষ হলো।
রাজা তিন বন্ধুকে রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করলেন। তাদের প্রত্যেকের জন্য সমুদ্রতীরে নির্মাণ করা হলো একটি করে সুদৃশ্য অট্টালিকা এবং দেওয়া হলো 'রাজ্যের চিরন্তন রক্ষক' উপাধি।
কয়েক মাস রাজ্যের অতিথি হয়ে থাকার পর তিন বন্ধু নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। রাজা তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে তার লোকজন দ্বারা জাহাজটি সম্পূর্ণ নতুনের মতো মেরামত করালেন। বিদায়বেলায় জাহাজভর্তি স্বর্ণ, হিরা, মণিমুক্তা ও অমূল্য রত্ন উপহার হিসেবে তুলে দিলেন।
এরপর রাজা কোমরের বেল্ট থেকে একটি পুরোনো চামড়ায় আঁকা মানচিত্র বের করে বললেন,
"এই মানচিত্রটি পৃথিবীতে একটিই। এর পথ অনুসরণ করলেই কেবল আমাদের রাজ্যে পৌঁছানো সম্ভব। সমুদ্র নিজেই এই রাজ্যকে আড়াল করে রাখে। এই মানচিত্র ছাড়া পৃথিবীর কোনো নাবিক কখনো এখানে ফিরে আসতে পারবে না। একে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি যত্নে রেখো।"
তিন বন্ধু গভীর শ্রদ্ধায় মানচিত্রটি গ্রহণ করলেন।
বিদায়ের মুহূর্তে রাজা মৃদু হেসে বললেন,
"ইচ্ছা করলে তোমরা এখানেই থেকে যেতে পারতে।"
তিন বন্ধু বিনীত কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
"মহারাজ, এই রাজ্য ছেড়ে যেতে আমাদেরও মন চায় না। কিন্তু বহুদিন ধরে আমাদের পরিবার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের সঙ্গে দেখা করে একদিন আবার ফিরব—এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই আজ বিদায় নিচ্ছি।"
রাজা তাদের আলিঙ্গন করে বিদায় জানালেন।
অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে তারা অবশেষে নিজ দেশে ফিরে এলেন। পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের আনন্দে কেটে গেল বেশ কিছুদিন। কিন্তু একদিন যখন তারা আবার সেই স্বর্গরাজ্যে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন, তখন দেখতে পেলেন—অমূল্য সেই মানচিত্রটি কোথাও নেই।
বাড়ির প্রতিটি কোণ, জাহাজের প্রতিটি কক্ষ, এমনকি সমুদ্রতীরের বালুকাবেলাও তারা খুঁজে দেখলেন। কিন্তু মানচিত্রটি যেন পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গেছে।
তারপর বহু বছর ধরে তারা অসংখ্যবার সমুদ্রে পাড়ি জমিয়েছেন। দিগন্তের পর দিগন্ত পেরিয়েছেন। অজস্র অচেনা দ্বীপে পৌঁছেছেন। কিন্তু সেই রহস্যময় রাজ্য আর কখনো তাদের চোখে পড়েনি।
লোকমুখে আজও প্রচলিত আছে—পূর্ণিমার নির্জন রাতে গভীর সমুদ্রে ভেসে চললে দূরে কোথাও নাকি সোনালি আলোয় ঝলমল করে একটি অদ্ভুত রাজপ্রাসাদ দেখা যায়। কিন্তু জাহাজ যতই তার দিকে এগোয়, আলোটি ধীরে ধীরে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যায়।
সেই তিন বন্ধুর বংশধরেরা আজও যত্ন করে সংরক্ষণ করে রেখেছে রাজা প্রদত্ত কিছু অমূল্য রত্ন। তারা বিশ্বাস করে—সেগুলো কোনো ধনসম্পদ নয়; বরং এমন এক হারিয়ে যাওয়া স্বর্গরাজ্যের সাক্ষী, যার অস্তিত্ব আজও পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের অজানা।
অনেকে বলেন, মানচিত্রটি হারিয়ে যায়নি; স্বর্গরাজ্য নিজেই তাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিয়েছিল, যাতে লোভী মানুষের পদচারণায় আর কখনো সেই পবিত্র ভূমি কলুষিত না হয়।
সমাপ্ত।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.