অনেক অনেক কাল আগে,
যখন চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষের নাগালের বহু দূরে ছিল, তখন রোগব্যাধি কিংবা ভাঙা হাড়ের চিকিৎসার জন্য মানুষ আশ্রয় নিত ওঝা, কবিরাজ, বৈদ্য কিংবা নানা লোকবিশ্বাসের ওপর। সেই সময়েই এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এক অতুলনীয় দক্ষ শিকারি। তাঁর তীরের নিশানা ছিল এতটাই নিখুঁত যে, দূর আকাশে উড়ন্ত পাখিকেও তিনি সহজেই লক্ষ্যভেদ করতে পারতেন।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—একদিন তাঁর একমাত্র কন্যা দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে পা ভেঙে ফেলল। গ্রামের বৈদ্য, কবিরাজ, ওঝা—যার কাছে যাওয়া সম্ভব, তিনি কারও দ্বারস্থ হতে বাকি রাখলেন না। তবু মেয়ের পা আর জোড়া লাগল না। কন্যার যন্ত্রণায় অসহায় পিতা দিনরাত কেবলই চিন্তায় ডুবে থাকতেন।
একদিন গ্রামের এক প্রবীণ ব্যক্তি তাঁকে এক বিস্ময়কর কাহিনি শোনালেন।
দূর উত্তরের অরণ্যঘেরা দুর্গম পাহাড়ে নাকি বাস করে এক অলৌকিক পাখি। সে যখন উড়াল দেয়, তখন প্রথম ডানার ঝাপটায় তার দেহের সমস্ত হাড় বিচ্ছিন্ন হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই হাড়গুলো আবার অদৃশ্য এক শক্তির বলে একত্রিত হয়ে তার শরীরে জুড়ে যায়, আর পাখিটি নির্বিঘ্নে আকাশে উড়ে বেড়ায়। জনশ্রুতি ছিল, সেই বিচ্ছিন্ন হাড়ের একটি যদি কেউ সংগ্রহ করতে পারে এবং দুধে ভিজিয়ে ভাঙা হাড়ে প্রলেপ দেয়, তবে যত কঠিন ভাঙনই হোক না কেন, তা অলৌকিকভাবে জোড়া লেগে যায়।
শেষ আশার আলো হিসেবে শিকারি সেই অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
যাত্রাপথ ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ। পাহাড়, নদী, জঙ্গল আর জনমানবহীন প্রান্তর পেরিয়ে সেখানে পৌঁছাতে প্রায় এক সপ্তাহ লেগে যেত। তিনি সঙ্গে নিলেন সামান্য শুকনো খাবার, একটি ধনুক এবং মাত্র সাতটি তীর। তারপর এক ভোরে তিনি সেই অরণ্যঘেরা দুর্গম পাহাড়ে উদ্দেশে রওনা হলেন।
সাত দিনের দুরূহ পথ পেরিয়ে অবশেষে তিনি সেই রহস্যময় অরণ্যে পৌঁছালেন। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে কিছুদূর উঠতেই তাঁর চোখে পড়ল—একটি সোনালি রঙের বিশাল ঈগল মাথার ওপর চক্কর দিচ্ছে। শিকারির বহু বছরের অভিজ্ঞতা বলল, এই পাখির আচরণ স্বাভাবিক নয়।
তিনি একে একে সাতটি তীর নিক্ষেপ করলেন।
অদ্ভুত ব্যাপার! প্রতিটি তীরই যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গেল। এমন ঘটনা তাঁর জীবনে কখনো ঘটেনি। শেষ তীরটিও ব্যর্থ হওয়ার পর ঈগলটি ধীরে ধীরে অরণ্যের গভীরে উড়ে গিয়ে এক বিশাল বৃক্ষের নিচে অবতরণ করল।
শিকারি সতর্ক পায়ে এগিয়ে গিয়ে যা দেখলেন, তাতে তাঁর শরীর শিউরে উঠল।
ঈগলটি আর নেই।
তার স্থানে বসে আছেন এক রহস্যময় বৃদ্ধা। তাঁর সামনে একটি ধাতব থালায় পরপর সাজানো রয়েছে শিকারির নিক্ষেপ করা সাতটি তীর।
বিস্ময়ে হতবাক শিকারি দূর থেকে সবকিছু দেখলেন। তারপর অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বৃদ্ধার পেছনে গিয়ে সালাম দিলেন।
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,
—“তোর ভাগ্য বড়ই ভালো। সামনে দিয়ে এলে তুই আর জীবিত ফিরতে পারতি না। তোর তীরের নিশানা আর ধৈর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। এবার বল, কী কারণে এখানে এসেছিস?”
শিকারি মাথা নত করে বললেন,
—“আমার মেয়ের পা ভেঙে গেছে। কোনো চিকিৎসাতেই সে সুস্থ হচ্ছে না। শুনেছি এই পাহাড়ে এমন এক অলৌকিক পাখি বাস করে, যার একটি হাড় পেলে ভাঙা হাড় জোড়া লাগে। সেই আশাতেই এসেছি।”
বৃদ্ধা কিছুক্ষণ নীরবে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
—“উত্তর দিকে আরও এগোলে একটি সুউচ্চ পাহাড় পাবি। পাহাড়ের গায়ে ঘন অরণ্যের আড়ালে আছে এক বিশাল গুহা। গুহার মুখে বসে থাকে সেই পাখি। তুই কাছে যেতেই সে উড়ে যাবে। উড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার দেহের সমস্ত হাড় চারদিকে ছিটকে পড়বে। কিন্তু মনে রাখিস—একটি হাড় হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখবি। যতক্ষণ না পাখির দেহ আবার সম্পূর্ণ হয়, ততক্ষণ শ্বাস নেওয়া যাবে না। একবার শ্বাস ছেড়ে দিলে সেই হাড় আর তোর হাতে থাকবে না।”
শিকারি কৃতজ্ঞচিত্তে বৃদ্ধাকে সালাম জানিয়ে রওনা দিলেন।
অনেক পথ পেরিয়ে তিনি পৌঁছালেন সেই গুহার সামনে।
সেখানে বসে আছে এক বিশালাকার কালো পাখি। তার পালক ছিল রাত্রির মতো কৃষ্ণবর্ণ, চোখ দুটি জ্বলছিল অঙ্গারের মতো লাল, আর তার নখর রূপার মতো দীপ্তিমান।
শিকারি এক পা এগোতেই পাখিটি প্রচণ্ড শব্দে আকাশে উড়ে গেল।
পরমুহূর্তেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য!
তার দেহের সমস্ত হাড় বিস্ফোরণের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
শিকারি বৃদ্ধার কথা মনে করে দ্রুত একটি হাড় শক্ত করে মুঠোয় ধরে নিঃশ্বাস বন্ধ করলেন। কয়েক মুহূর্ত পর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা হাড়গুলো ঘূর্ণিঝড়ের মতো আবার একত্রিত হয়ে পাখির শরীরে জুড়ে গেল। পাখিটি আকাশের অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই তিনি ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়লেন।
তাঁর হাতে তখনও রয়ে গেছে সেই অলৌকিক হাড়।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি গ্রামে ফিরে এলেন। লোকমুখে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী হাড়টি দুধে ভিজিয়ে কন্যার ভাঙা পায়ে প্রলেপ দিলেন। জনশ্রুতি বলে, অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর কন্যা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।
এরপর সেই অলৌকিক হাড়টি বংশপরম্পরায় সংরক্ষিত হতে থাকে। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, বহু যুগ ধরে ভাঙা হাড়ের লোকজ চিকিৎসায় এই রহস্যময় বস্তুই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তারা একে ডাকত—“জিস্সিং”।
আজও এই কাহিনি লোকমুখে বেঁচে আছে—বাস্তব ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস, আশা এবং অলৌকিকতার প্রতি চিরন্তন আকর্ষণের এক অনন্য লোককথা হিসেবে।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.