প্রায় দেড়শ বছর আগের কথা।
সেই সময়ের গ্রামবাংলা আজকের মতো আধুনিক ছিল না। ব্যাংক ছিল না, নিরাপদে অর্থ রাখার আধুনিক কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। মানুষের সঞ্চয়ের ভরসা ছিল ঘরের মাটির নিচে, মাটি অথবা পিতলের কলসিতে, সিন্দুকে কিংবা এমন কোনো গোপন স্থানে—যার কথা পরিবারের অন্যরাও জানত না।
এই কাহিনির শুরু তেমনই এক গোপন সঞ্চয়কে ঘিরে।
যে নারী এই সম্পদ সঞ্চয় করেছিলেন, তিনি ছিলেন আমার বড় নানার মা। তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে এবং তাঁর স্বামী ছিলেন তালুকদার। অর্থাৎ সে সময়ের বিচারে তাঁরা ছিলেন যথেষ্ট সচ্ছল ও প্রভাবশালী পরিবার।
সেই নারী দীর্ঘদিন ধরে অল্প অল্প করে স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা জমিয়েছিলেন। সম্পদের সঠিক পরিমাণ আজ আর জানা যায় না। তবে পরিবারের প্রবীণদের কাছ থেকে শোনা যায়, যারা কোনো এক সময় সেই মুদ্রাগুলো দেখেছিলেন, তাঁদের বর্ণনা অনুযায়ী তা একটি মাঝারি আকারের পিতলের কলসির প্রায় অর্ধেক পরিমাণ হবে।
সে সময়ের বিচারে সেটি ছিল বিপুল মূল্যবান সম্পদ।
এত সম্পদ তিনি কোথায় রাখবেন?
ব্যাংক ছিল না। আধুনিক লকারও ছিল না।
স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রাগুলো একটি পাত্রে ভরে তিনি বাড়ির একটি নির্দিষ্ট স্থানে মাটির গভীরে পুঁতে রাখলেন।
কিন্তু কাউকে কিছু জানালেন না।
আর সেটিই হয়ে উঠল এই কাহিনির সবচেয়ে বড় রহস্য।
কারণ, সম্পদটি পুঁতে রাখার অল্প কিছুদিন পরই তিনি মারা গেলেন।
মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যেন মাটির নিচে চাপা পড়ে গেল তাঁর সঞ্চয়ের সমস্ত ইতিহাস।
পরিবারের লোকজন পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করেছিল। বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় মাটি খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু কোথাও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সময় গড়িয়ে গেল।
তাঁদের বাড়িটি ছিল বেশ বড়। বাড়ির আশপাশে ছিল দুটি পুকুর। একটি পুকুরের পাড় ঘেঁষেই ছিল তাঁদের বসতবাড়ি। সেই সময় গ্রামবাংলার বাড়িগুলোতে বিভিন্ন ধরনের রান্নাঘর ব্যবহৃত হতো।
এর মধ্যে একটি ছিল ঘরের মতো করে তৈরি রান্নাঘর। আর অন্যটি ছিল অপেক্ষাকৃত খোলা—যার চারদিকে পূর্ণাঙ্গ বেড়া বা চালা থাকত না। স্থানীয় ভাষায় এ ধরনের স্থাপনাকে বলা হতো “পাঁচদুয়ার” বা “পাছদুয়ার”।
সেই পুরোনো অব্যবহৃত পাছদুয়ারে ছিল একটি মাটির চুলা।
চুলাটি বহু বছর ধরে ব্যবহার করা হয়নি।
তবে মৃত্যুর আগে সেই নারী চুলাটির পাশে একটি ছোট্ট চিহ্ন রেখে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে একটি গাছের কুঁড়ি বা চারা পুঁতে দিয়েছিলেন।
কেউ তখন সেই চিহ্নের অর্থ বুঝতে পারেনি।
সময়ের সঙ্গে চুলাটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ল। আগাছায় ঢেকে গেল চারপাশ। ধীরে ধীরে সবাই প্রায় ভুলেই গেল সেই পুরোনো রান্নাঘরটির কথা।
কিন্তু ভাগ্যের অদৃশ্য নিয়মে যেন সেই স্থানটির জন্য অন্য কিছু অপেক্ষা করছিল।
সেই নারীর মৃত্যুর প্রায় এক বছর পর পরিবারে আবার সেই পুরোনো রান্নাঘরটি ব্যবহারের কথা উঠল। চার-পাঁচ বছর ধরে পরিত্যক্ত থাকার পর সেটি পরিষ্কার করে পুনরায় ব্যবহার করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
আর ঠিক সেই সময় ঘটল প্রথম অদ্ভুত ঘটনা।
সেদিন রাতে আমার বড় নানার—অর্থাৎ সেই নারীর ছেলের—একটি স্বপ্ন হলো।
স্বপ্নে তিনি দেখলেন, কে যেন তাঁর সামনে এসে বলছে—
«“তোমার মা যে সম্পদ চুলোর মধ্যে লুকিয়ে রেখেছেন, তা এখন আমাদের দখলে। এই চুলা আর ব্যবহার করবে না। এখানে আর ফিরে এসো না।”»
ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর স্বপ্নটির কথা তাঁর মনে রইল। কিন্তু তিনি সেটিকে তেমন গুরুত্ব দিলেন না।
স্বপ্ন তো স্বপ্নই।
তিনি বিষয়টি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেন।
কিন্তু কিছুদিন পর রান্নাঘরটি আবার প্রস্তুত করার জন্য আশপাশের আগাছা পরিষ্কার করা হলো।
আর সেই রাতেই তিনি আবার একটি স্বপ্ন দেখলেন।
এবারও সেই একই অদৃশ্য কণ্ঠ।
«“তোমার মায়ের রেখে যাওয়া সম্পদ এখন আমাদের দখলে। তোমরা এখানে আর এসো না।”»
দ্বিতীয়বারের স্বপ্নটি তাঁকে আর স্বস্তিতে থাকতে দিল না।
মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর সম্পদ আসলে কোথায় লুকানো থাকতে পারে—এই প্রশ্নটি নতুন করে তাঁর মনে জাগল।
হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল সেই স্বপ্ন ও পুরোনো পাছদুয়ারের কথা।
সেদিন ভোরে, ফজরের নামাজের পর, তিনি একাই চলে গেলেন সেই পরিত্যক্ত রান্নাঘরের দিকে।
বহু বছর ব্যবহৃত না হওয়ায় মাটির চুলাটি তখন প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। দূর থেকে দেখলে সেটিকে আর চুলা বলেও মনে হতো না—শুধু পোড়া লালচে মাটির কিছু অংশ যেন মাটির ওপর ছড়িয়ে আছে।
কিন্তু চুলাটির পাশে গিয়ে তাঁর চোখ আটকে গেল।
সেখানে এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেই গাছের কুঁড়ি বা চারা—যেটি তাঁর মা বহু বছর আগে সেখানে পুঁতে দিয়েছিলেন।
তাঁর বুকের ভেতর কেমন যেন একটা ধাক্কা লাগল।
তিনি চুলাটির ভেতর মাটি খুঁড়তে শুরু করলেন।
কিছুক্ষণ পর তাঁর শাবল কোনো শক্ত বস্তুর সঙ্গে ঠেকে গেল।
তিনি থেমে গেলেন।
হাত দিয়ে মাটি সরালেন।
আর তারপর যা দেখতে পেলেন, তাতে তিনি বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
মাটির নিচে ছিল একটি পিতলের কলসি।
কলসিটির মুখও একটি পিতলের পাত্র দিয়ে ঢাকা ছিল।
তাঁর মনে হলো—
এটাই কি তবে সেই কলসি, যার মধ্যে তাঁর মা অর্থ সঞ্চয় করতেন?
উত্তেজনা ও বিস্ময়ে তিনি কলসিটি বের করার চেষ্টা করলেন।
কিন্তু ঠিক তখনই ঘটল এমন একটি ঘটনা, যার কোনো স্বাভাবিক ব্যাখ্যা তিনি খুঁজে পেলেন না।
তিনি যতই কলসিটির চারপাশের মাটি সরাতে লাগলেন, কলসিটিও যেন ততই নিচের দিকে সরে যেতে লাগল।
প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, মাটি আলগা হয়ে যাওয়ার কারণে এমন হচ্ছে।
তাই আরও মাটি সরাতে লাগলেন।
কিন্তু কলসি যেন তাঁর নাগালের বাইরে আরও গভীরে চলে যাচ্ছে।
তিনি এবার গর্তটি আরও প্রশস্ত করলেন।
এক হাত।
দুই হাত।
তারপর আরও গভীর।
মাটি কাটতে কাটতে তিনি ক্রমেই নিচে নামতে লাগলেন।
শেষ পর্যন্ত গর্তটি প্রায় আট থেকে দশ ফুট গভীর হয়ে গেল।
তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—কলসিটির শেষ আর পাওয়া গেল না।
এদিকে তাঁর একার এই অস্বাভাবিক খননকাজ আশপাশের মানুষের নজর এড়াল না। একে একে কয়েকজন লোক সেখানে এসে জড়ো হলো।
তারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এত গভীর করে মাটি খুঁড়ছেন কেন?”
তিনি প্রকৃত ঘটনা কাউকে জানালেন না।
শুধু বললেন,
“না, তেমন কিছু নয়। একটু মাটি খুঁড়ছি। গরুর গোবর রাখার জন্য।”
লোকজন গর্তের দিকে তাকিয়ে রইল।
একজন হয়তো বলল,
“গোবর রাখার জন্য এত বড় আর এত গভীর গর্ত?”
তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।
কারণ তাঁর নিজের মনেই তখন হাজার প্রশ্ন।
সেই পিতলের কলসি কোথায় গেল?
সত্যিই কি তার ভেতরে মায়ের সঞ্চিত স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা ছিল?
নাকি তিনি এমন কোনো রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন, যার ব্যাখ্যা তাঁর জানা ছিল না?
শেষ পর্যন্ত তিনি একজন ফকিরের কাছে গেলেন।
সেখানে গিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু খুলে বললেন—মায়ের গোপন সম্পদ, পুরোনো চুলা, চিহ্ন হিসেবে লাগানো গাছের কুঁড়ি, পরপর দেখা দুটি স্বপ্ন, মাটির নিচে পাওয়া পিতলের কলসি এবং সেটিকে তুলতে গিয়ে তার ক্রমশ গভীরে চলে যাওয়ার ঘটনা।
সব শুনে ফকির কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।
তারপর ধীরস্বরে বললেন,
“অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
তিনি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কেন?”
ফকির বললেন,
“এখন আর ওই সম্পদ তোমাদের হাতে আসার সম্ভাবনা খুব কম।”
তিনি জানতে চাইলেন,
“তাহলে কী করলে সেটা পাওয়া যেত?”
ফকির বললেন,
“তুমি যখন প্রথম কলসিটা দেখতে পেয়েছিলে, তখনই যদি আমার কাছে আসতে, তাহলে হয়তো একটা ব্যবস্থা করা যেত। কলসিটির ওপর থেকে মাটি সরিয়ে যেতে হতো না। বরং তার পাশ দিয়ে একটি গর্ত করতে হতো। তারপর একটি কাঠ কিংবা শক্ত কাঠের কাঠামো নিচে নামিয়ে কলসিটির নিচে ঠেকিয়ে দিতে পারলে সেটি আর নিচে চলে যেতে পারত না। তখন সেটিকে ধরে তোলার চেষ্টা করা যেত।”
কিছুক্ষণ থেমে তিনি আরও বললেন,
“আর তুমি একা একা এভাবে গভীর গর্তে নামতে গিয়েছিলে—এতে তোমার নিজেরও বিপদের আশঙ্কা ছিল।”
কথাগুলো শুনে তিনি নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।
কিন্তু ফকিরের মুখে তখনও শেষ কথা শোনা বাকি।
তিনি বললেন,
“তোমাদের বংশে একদিন এমন একটি ছেলে জন্ম নেবে, যার একুশটি আঙুল থাকবে। সেই বংশধরই একদিন এই সম্পদের সন্ধান পাবে।”
কথাটি সেদিন হয়তো একটি রহস্যময় ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবেই শোনা হয়েছিল।
কিন্তু এই কাহিনির সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়টি ঘটেছে পরবর্তী প্রজন্মে।
চার পুরুষ পরে সত্যিই সেই পরিবারে একটি ছেলে জন্মেছে ২০২৩ সালে, যার একুশটি আঙুল।
যে কথা একসময় একজন ফকিরের মুখ থেকে বেড়িয়েছিল, বহু বছর পর তার সঙ্গে যেন অদ্ভুত এক মিল খুঁজে পাওয়া গেল।
সেই ছেলেটি পরিবারের কাছে এই পুরোনো কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত রহস্য।
সে কি কোনোদিন সেই গুপ্ত সম্পদের সন্ধান পাবে?
মাটির গভীরে কি এখনও সেই পিতলের কলসি রয়ে গেছে?
তার ভেতরে কি সত্যিই রয়েছে দেড়শ বছরের পুরোনো স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা?
নাকি সময়, মানুষের স্মৃতি, স্বপ্ন ও লোকবিশ্বাস মিলে এই ঘটনাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—দেড়শ বছর আগে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক নারী তাঁর সঞ্চিত সম্পদ গোপনে কোথাও পুঁতে রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই সম্পদের সন্ধান হারিয়ে যায়। বহু বছর পর তাঁর ছেলের স্বপ্ন, পুরোনো চুলার চিহ্ন এবং মাটির নিচে পাওয়া একটি পিতলের কলসি সেই বিস্মৃত রহস্যকে আবার সামনে নিয়ে আসে।
আর সবশেষে—
চার পুরুষ পরে জন্ম নেওয়া একুশ আঙুলের সেই ছেলে যেন সেই রহস্যের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে আছে।
হয়তো একদিন সে সত্যিই সেই সম্পদের সন্ধান পাবে।
হয়তো পুকুরপাড়ের সেই পুরোনো মাটির নিচেই আজও লুকিয়ে আছে পিতলের কলসিটি।
অথবা হয়তো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাটির গভীরে চাপা পড়ে থাকা সেই রহস্য কোনোদিনই আর মানুষের হাতে ধরা দেবে না।
কিন্তু গল্পটি এখানেই শেষ নয়।
কারণ, ফকিরের ভবিষ্যদ্বাণীর একটি অংশ ইতোমধ্যেই সত্য হয়েছে।
বাকি অংশের উত্তর হয়তো সময়ই দেবে।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.